আল্লামা ইকবালের ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন এর কিয়দাংশ




ভারত উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক আল্লামা ইকবাল এর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি শেষ জীবনে লিখিত বই "Reconstruction of religious thought in islam এর অনুবাদ : ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন, অনুবাদক : শেখ ইলাহি বক্স, প্রকাশক : মল্লিক ব্রাদার্স - বইটির কিছু চুম্বক অংশ আমি এ পোষ্ট এ সেভ করে রাখলাম, আমার ব্যাক্তিগত কাজের জন্য। আস্তিক-নাস্তিক নিবের্শেষে সবাই দেখতে পারেন। তবে শর্ত হলো কেউ কোন মন্তব্য করতে পারবেন না। ইনশাআল্লাহ আমি পুরো বইটিই আরেকদিন টাইপ করে দিব।

---- প্রকৃত সুফিবাদ নি:সন্দেহে এই অভিজ্ঞতা গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাদের পরবর্তী যুগের প্রতিনিধিগণ আধুনিকতা সম্পর্ক অজ্ঞ থাকার কারনে আধুনিক চিন্তা এবং অভিজ্ঞতা থেকে নতুন অনুপ্রেরণা গ্রহণে অক্ষম। তারা আমাদের থেকে পৃথক এক প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পদ্ধতিসমূহ প্রতিষ্ঠা করেছেন। (পৃষ্ঠা : ৫)

------------ কোরআন শ্রবণ এবং দর্শনকে ঐশী দান বলে বর্ণনা করে। এবং বলে মানুষ তার কর্মের জন্য ঈশ্বরের বিচারাধীন। কোরআনের এই দিকটাই তার প্রথমিক গবেষক সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছিলেন - গ্রীক দর্শনের প্রভাবে। তারা কোরআন পাঠ করতেন গ্রীক চিন্তাধারার আলোকে, এটি বুঝতে তাদের দুশ বছর সময় লেগেছিল, যদিও স্পষ্টভাবে নয়, যে কোরআনের তত্ব পুরোপুরি গ্রীক দর্শনবিরোধী। এর ফলস্বরুপ সংঘঠিত হয়েছিল এক বৌদ্ধিক বিপ্লব। যার পূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধি করা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। আংশিকভাবে এই বিপ্লবের প্রভাবে এবং আংশিকভাবে তার ব্যাক্তিগত ইতিহাসের প্রভাবে গাজ্জালী ধর্মকে দার্শনিক পর্যালোচনার ভিত্তির উপর স্থাপন করেছিলেন - যা ধর্মের ভিত্তি হিসেবে নিরাপদ নয় এবং যা কোরআনের তত্ত্ব দ্বারা সম্পূর্ণ সমর্থিত নয়। (পৃষ্ঠা : ৯)

কান্ট এবং গাজ্জিালী উভয়েই দেখতে ব্যার্থ হয়েছেন যে, জ্ঞানের বাস্তবায়নে, চিন্তা সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। (পৃষ্ঠা : ১১)

বিগত পাচশ বছর ধরে ইসলামে ধর্মীয় চিন্তাধারা একইরকম স্থবির হয়ে থেকেছে। (পৃষ্ঠা : ১১)

মানসিক জ্ঞানের সর্বপ্রথম সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষক ছিলেন ইসলামের নবী (স.)। বুখারী ও অন্যান্য হাদীসবেত্ত্বারা তার ইহুদী যুবক ইবনে সৈয়দ এর মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির, পর্যবেক্ষণের পূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন। তারা ভাবাবেগ মহানবীর (স.) দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল। তিনি তার মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করেছিলেন, তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, এক সময় নিজেকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলেন তার স্বগতোক্তি শোনার জন্য। ছেলেটির মা তাকে মহানবী সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছিলেন, তাই ছেলেটি নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং মহানবী মন্তব্য করেছিলেন, "তার মা যদি তাকে একা ছেড়ে দিত তাহলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যেত।" (এখানে দাজ্জাল সম্পর্কিত সেই রহস্যময় ছেলেটি সম্পর্কে বলতেছে ইকবাল) -------যাই হোক, প্রথম মুসলমান, যিনি মহানবীর এই আচরণের মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি হলেন ইবনে খালদুন। (তারমানে সাহবাগণও বুঝতে সক্ষম হননি!)(পৃষ্ঠা - ১৯)

------------- এইভাবে দেখতে পাওয়া যাবে যে, এই অপরিহার্য চরিত্রের জন্যই ধর্ম অনুভব থেকে শুরে হলেও নিজের ইতিহাসে ইহা কখনও নিছক অনুভব হিসেবে থাকেনি। মরমী সাধকগণের জ্ঞানের উৎস হিসেবে বুদ্ধির অস্বীকৃতির সমর্থন ধর্মের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। (পৃষ্ঠা : ২২)

আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে আইনস্টাইনের সময়ের প্রকৃত প্রকৃতি হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। (পৃষ্ঠা : ৩৩)

রুমি গাজ্জালীর থেকে ইসলামের তত্ত্বের প্রতি অনেক বেশি বিশ্বস্ত ছিলেন। (পৃষ্ঠা : ৫৫)

----- পৃকৃতপক্ষ্যে কোরআন যে আয়াতসমূহে প্রথম মানবের উৎসের বর্ণনা দিয়েছে জীবন্ত বস্তু হিসেবে সেখানে বাসার বা ইনসান কথাটি ব্যবহার করেছে। আদমের পরিবর্তে, যা মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিরুপে বর্ণনা করে। কোরআনের উদ্দেশ্য আরও সুস্পষ্ট হয় বাইবেল এর নামসমূহ - আদম এবং ঈভ্ পরিহার করার মধ্যে, আদম শব্দটি রাখা হয়েছে এবং একে একটি ধারনা হিসেবে দেখা হয়েছে কোন ব্যাক্তি বিশেষের নাম বোঝাতে ব্যবহার করা হয় নি। (পৃষ্ঠা : ৬৩)

জান্নাত শব্দটির দ্বারা এখানে কোন অতিন্দ্রিয় স্বর্গের কথা বলা হয়নি, যে স্থান থেকে মানুষের পতন হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কোরআনের বর্ণনা অনুসারে মানুষ পৃথিবীতে নবাগত আগন্তুক ছিল না। কোরআন বর্ণনা করে, উপাখ্যানে বর্ণিত জান্নাত পুণ্যবানদের চিরস্থায়ী আবাসস্থল নয়। পুন্যবানদের চিরস্থায়ী আবাস (খেয়াল করুন স্থল বাদ দিয়েছে ইকবাল) হিসেবে কোরআন জান্নাতকে বর্ণনা করে। কোরআন জান্নাত সম্পর্কে আরও বলেছে, "যেখানে পূণ্যবানদের ক্লন্তি স্পর্শ করবেনা এবং তাদের সেখান থেকে বহিস্কৃত হতে হবে না"। উপাখ্যানে বর্ণিত জান্নাতে প্রথম যে ঘটনা ঘটেছিল তা হল মানুষের অবাধ্যতার পাপ, তারপর জান্নাত থেকে বিতাড়ন। কোরআন তার বর্ণনায় শব্দটি ব্যাখ্যা করেছে। দ্বিতীয় পর্বে কোরআন জান্নাতকে বর্ণনা করেছে, "ক্ষুধা, তৃষ্ণা, গ্রীষ্ম বা নগ্নতার বোধ নেই"। আমি মনে করি, কোরআনের বর্ণনায় জান্নাত একটি আদি অবস্থা যেখানে মানুষ প্রকৃতপক্ষ্যে তার পারিপার্শিক পরিবেশের সহিত সম্পর্কহীন, ফলে চাহিদার তীব্রতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, যার জন্ম মানব সভ্যতার আরম্ভকে সুচিত করে। এভাবে আমরা দেখতে পাই কোরআনের বর্ণনাসারে মানুষের পতনের সহিত তার পৃথিবীতে আবির্ভাবের কোন সম্পর্ক নেই। আসলে এর উদ্যেশ্য হল মানুষের আদিম অবস্থা থেকে সচেতন অবস্থায় উত্তরণের ইঙ্গিত দেওয়া যেখানে সে স্বাধীন সত্ত্বা, সন্দেহ করতে বা অবাধ্য হতে সক্ষম। এই পতন কোন নৈতিক অধপতনের তাৎপর্য বহন করে না। এটি আসলে মানুষের সাধারণ সচেতনতা থেকে আত্মসচেতনতায় উত্তরণ, প্রকৃতির স্বপ্ন থেকে নিজস্বতায় জেগে উঠা। (পৃষ্ঠা : ৬৪)

---------- কোরআনের কাহিনীর প্রথম পর্ব মানুষের জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্খার কথা বর্ণনা করে দ্বিতীয় পর্ব তার আত্ম-বহুত্ব এবং ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্খার কথা বলে। প্রথম পর্বে দুইটি বিষয় লক্ষ্যনীয়, প্রথমত, পর্বটি বর্ণনা করা হয়েছে আদম এর বস্তুর নাম স্মরণ করা এবং বলা সম্পর্কিত আয়াতসমুহের ঠিক পরেই। এই আয়াতসমূহের উদ্দেশ্য, আমি পূর্বেই উল্যেখ করেছি, মানুষের জ্ঞানের ধারনাগত চরিত্রটি প্রকাশ করা, দ্বিতীয়ত, মাদাম বলভতসকি যিনি প্রচীন সংকেত বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন, তিনি তার Secret Doctrine নামক গ্রন্থে বলেছেন যে, বৃক্ষের সংকেত প্রচীন মানুষদের নিকট গূঢ জ্ঞানের সংকেত। আদমকে এই ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল তার সত্বা হিসেবে সীমাবদ্ধতার জন্য। তার ইন্দ্রিয়যন্ত্র, তার বৌদ্ধিক ক্ষমতাসম্পূর্ণ পৃথক জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতাসম্পন্ন অর্থাৎ যে ধরনের জ্ঞানে সহিষ্ণু নিরীক্ষণ প্রয়োজন এবং যা ধীরে ধীরে পরিপূর্ণতা লাভ করে। যদিও শয়তান আদমকে গুপ্ত জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে প্ররোচিত করেছিল এবং আদমও প্ররোচিত হয়েছিলেন কারন তিনি প্রকৃতিগতভাবে দূর্বল তা নয় বরং দ্রুত (আজুল) হওয়ার কারণে তিনি জ্ঞান লাভের সোজা পথের কথা চিন্তা করেছিলেন। এই প্রবণতা শুদ্ধ করার একমাত্র পথ ছিল তাকে এমন পরিবেশে স্থানান্তর করা যা দু:সময় হলেও তার বোধ প্রস্ফুটিত হওয়ার জন্য অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত। তাই আদমের একটি শারীরিক বেদনাময় পরেবেশে প্রবেশ তার জন্য কোন শান্তি ছিলনা বরং এর উদ্যেশ্য ছিল শয়তানের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করা, মানুষের শত্রু হিসেবে তার উদ্যেশ্য মানুষকে কৌশলে চিরস্থায়ী বৃদ্ধি এবং ব্যাপকতার আনন্দ থেকে অজ্ঞ রাখার চেষ্টা। সসীম আত্মার জীবন একটি বন্ধনময় পরিবেশের জ্ঞানের চিরস্থায়ী বিকাশের জন্য প্রকৃত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে। সসীম আত্মা, যার কাছে বিভিন্ন সম্ভাবনাময় পথ উন্মুক্ত থাকে, তার অভিজ্ঞতা অর্জন হয় বারবার পরীক্ষা এবং ভুল করার দ্বারা। তাই ভ্রান্তি, যাকে এক ধরনের বৌদ্ধিক পাপ বলে বর্ণনা করা হয়, তা আসলে অভিজ্ঞতার জন্য অপরিহার্য উপাদান। ------------------ (পৃষ্ঠা : ৬৬)

----- প্রর্থনার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয় যখন প্রার্থনা ক্রিয়া সমবেতভাবে করা হয়। প্রকৃত প্রার্থনার উদ্দেশ্য সামাজিক। এমনকি সাধকগণ যে লোকালয় ত্যাগ করে একাকী অবস্থান করে, তাও ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাবার উদ্দেশ্যে। --------- প্রার্থনার রুপ নিয়ে কোন বিতর্ক হওয়া উচিত নয়। প্রার্থনার সময় তুমি কোন দিকে মুখ ফিরাবে তা প্রকৃত বিষয় নয়। (এই অধ্যায়টি ভালমত পড়লে বুঝা যায় তিনি সকল ধর্মের সকল প্রার্থনাকে বৈধ বলতে চাচ্ছেন !) (পৃষ্ঠা : ৭০)

--------- আশ্চার্যের বিষয় হল, মানব চেতনার ঐক্য যা মানব ব্যাক্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু গঠন করে, মুসলিম চিন্তার ইতিহাসে সেভাবে আলোচিত হয়নি। মুতাকাল্লিমিন আত্মাকে সূক্ষ্ণ বস্তু বা নিছক আকষ্মিক ঘটনা হিসেবে দেখে যার শরীরের সহিত মৃত্যু হয় এবং শেষ বিচারের দিন পুনরুত্থান হবে। ইসলামিক দার্শনিকগণ গ্রীক দার্শনিকদের অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন। মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম - গ্রীক, ইহুদী, পারসিক প্রভৃতি বিভিন্ন জাতি ধর্মকে নিজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, এদের বৌদ্ধিক চরিত্র গঠিত ছিল এমন একটি সংস্কৃতির দ্বারা যা এককালে সমগ্র মধ্য এবং পশ্চিম এশিয়া জুড়ে রাজত্ব করেছিল। এই সংস্কৃতির উৎস ছিল অগ্নিপুজক সংস্কৃতি যা গঠনগতভাবে দ্বৈতবাদী, এই চরিত্রই কমবেশি প্রতিফলিত হয়েছিল ইসলামি তত্ত্ব চিন্তাতে। ভক্তিমূলক সূফিবাদই একমাত্র আভ্যন্তরীন অভিজ্ঞতার ঐক্যকে বুঝতে চেষ্ঠা করেছিল, যাকে কোরআন মানবীয় জ্ঞানের তিনটি উৎসের একটি বলে বর্ণনা করেছে, অপর দুইট হল ইতিহাস এবং প্রকৃতি। ইসলামের ধর্মীয় জীবনে এই অভিজ্ঞতা বিকাশের সর্বোচ্চ সীমা ছিল হল্লাজের সুবিখ্যাত উক্তি - আমিই সৃষ্টিশীল সত্য। ----------- অতীতকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে তাদের ইসলামের পদ্ধতিকে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। প্রথম মুসলমান যিনি নিজের মধ্যে এই প্রাণময়তা অনুভব করেছিলেন তিনি হলেন দিল্লির শাহ ওয়ালিউল্লাহ। --------- আমাদের নিকট একটি মাত্র পথ উন্মুক্ত আছে, তা হল আধুনিক জ্ঞান সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল কিন্তু স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, তার আলোকে ইসলামের শিক্ষার মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, এমনকি এই জ্ঞান যদি আমদের পূর্বসুরিদের থেকে পৃথক হয় তবুও। এই বক্তব্যে আমি সেটিই করতে চাইছি। -------- (পৃষ্ঠা ৭৩)

--------- আপাত:দৃষ্টিতে এই বিপরীত শব্দ দুটি মানুষের মধ্যে দুই নীতির সংঘাত বোঝায়। যা ইসলামের বহু চিন্তাবিদকে ভ্রান্ত পথে নিয়ে গিয়েছিল। যদি ইবনে রুশদ এর দ্বৈতবাদ কোরআন এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে, আমি শঙ্কিত যে তিনি ভ্রান্ত পথে গিয়েছিলেন, কারন নফস্ শব্দটি কোন যান্ত্রিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি যা মুসলিম তত্ত্ববিদগণ কল্পনা করেছিলেন। --------- (পৃষ্ঠা : ৮২)

প্রানীর অবস্থা থেকে মানবের অবস্থায় অবস্থায় এনে সৃষ্টি করল মানুষ। এইভাবে মানুষ প্রকৃতির এক স্তর থেকে অপর স্তর অতিক্রম করেছিল, যতক্ষণ না সে আজকের মত বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, শক্তিশালী হয়েছিল। তার প্রথম অজৈব অবস্থা তার স্মরনে নেই এবং তার বর্তমান আত্মার পুনরায় পরিবর্তন ঘটবে। (এক কথায় বিবর্তনবাদ এর অপর রুপ) (পৃষ্ঠা : ৮৯)

যে বিষয়টি নিয়ে মুসলিম দার্শনিক এবং তত্ত্ববিদদের মধ্যে মতভেদ আছে তা হল মানুষের পুনরায় নির্গমন কি তার পূর্ব শারীরিক মধ্যমেই ঘটবে কিংবা অপর কোন মাধ্যমে। সর্বশেষ তত্ত্ববিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মনে করতেন যে, মানুষের পুননির্গমন অন্তত এমন একটি শারীরিক আকৃতিতে ঘটবে যা তার নতুন পরিবেশের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। আমার মনে হয়, এই ধারনার কারন হল এই যে, আত্মাকে একটি পরিপার্শ্বিক প্রসঙ্গ বা বোধগম্য পটভুমিকা ব্যতীত উপলব্ধি করা যায় না। এ প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত আয়াতটি কিছুটা আলোকপাত করবে : "কাফেররা বলে আমরা মরে গেলে এবং মৃত্তিকায় পরিণত হলে আবার পুনরুত্থিত হব ? এ পত্যাবর্তন সূদুর পরাহত। মৃত্তিকা তাদের কতটুকু গ্রাস করবে তা আমার জানা আছে, এবং আমার কাছে সংরক্ষিত কিতাব।" আমার মনে হয় উপরিউক্ত আয়াতটি সুস্পষ্টরুপে প্রমাণ করে যে জগতের প্রকৃতিই এরুপ। এটি মানুষের চুড়ান্ত বিচারের জন্য যে ধরনের ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন যেভাবেই হোক সেই ব্যাক্তিত্ব বজায় রাখে, এমনকি আমাদের বর্তমান পরিবেশে যে বস্তু আমাদের ব্যাক্তিত্বকে বিশেষত্ব প্রদান করে তার ধ্বংসের পরেও। সেই অপর পথটি কি আমরা জানি না। দ্বিতীয় সৃষ্টিতে কোন শরীর সংযুক্ত করা হবে কিনা,- যত সূক্ষ্ণ সে শরীর হোক না কেন, সেই সম্বন্ধে আমরা বেশি কিছু জানতে পারি না। কোরআন ঘটনাটির বাস্তবতা উল্লেখ করেছে উদাহরনের সাহায্যে, উদাহরনগুলির উদ্দেশ্য এর বাস্তব প্রকৃতি বা চরিত্র উল্লেখ করা। দর্শন শাস্ত্র অনুসারে বলা হলেও, আমরা এর বেশি কিছু বলতে পারি না- মানুষের পূর্ব অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এমনটি ঘটা অসম্ভব যে তার জীবধারা সমাপ্ত হয় তা শরীর ধংসের সাথে সাথে।

যাই হোক কোরআনের বর্ণনানুসারে, আত্মার পুনরায় নির্গমন তাকে "সূক্ষ্ণ দৃষ্টি" (৫০:২১) প্রদান করে যার সাহায্যে সে সুস্পষ্টভাবে স্ব-গঠিত ভাগ্যকে দেখতে পাবে আপন কন্ঠের চতুর্দিকে জড়ান অবস্থায়"।

বেহেস্ত এবং দোযখ প্রকৃতপক্ষে স্থান নয়, অবস্থা। কোরআনের বর্ণনা প্রকৃতপক্ষে অন্তর্নিহিত ঘটনা অর্থাৎ চরিত্রের দৃশ্যমান প্রকাশ। দোযখ, কোরআনের ভাষায় "আল্লাহর জলন্ত অগ্নি যা হৃদয়ের উপর উঠে"- মানুষ হিসেবে একজনের ব্যর্থতার যন্ত্রনাদায়ক উপলব্ধি। বেহেশত হল বিভাজক শক্তির উপর মানুষের জয়ের আনন্দ। চিরস্থায়ী দোযখভোগ এর ধারনা ইসলামে নেই। চিরস্থায়ী কথাটি কোরআনে দোযখ- এর বর্ণনায় কয়েকটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- কোরআনে বিষয়টির ব্যাখ্যাও আছে সময়কাল হিসেবে (৭৮:২৩)। সময় ব্যাক্তিত্বের উত্তরনে সম্পূর্ণ অপ্রাসংঙ্গিক নয়। চরিত্র চিরস্থায়ী হতে চায়, এর পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন সময়। দোযখ তাই, প্রতিশোধ এর মনোভাবসম্পন্ন ইশ্বরের শাস্তি প্রদানের স্থান নয়। এটি একটি সংশোধনকারী অভিজ্ঞতা যা আত্মাকে আল্লাহর করুনার জীবন্ত বাতাস অনুভব করার উপযুক্ত করে গড়ে তোলে। বেহেশত দুটি উপভোগ করার স্থান নয়। জীবন একটি এবং ধারাবাহিক। মানুষ সর্বদা সম্মুখে আগ্রসর হচ্ছে এক অসীম সত্য, যা প্রতি মুহুর্তে নতুন ওজ্জ্বল্যে প্রপাক কোন নিষ্ক্রিয় কগহণকারী নয়। স্বাধীন আত্মার প্রতিটি ক্রিয়া নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং এভাবেই সৃষ্টিশীল উদঘাটনের নতুন সুযোগ প্রদান করে। (পৃষ্ঠা : ৮৯-৯০)

ইসলামে সূফীবাদের দায়িত্ব হল অতিন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা প্রনালীবদ্ধ করা, যদিও স্বীকার করতেই হবে ইবনে খালদুন একমাত্র মুসলিম যিনি সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর প্রতি অগ্রসর হয়েছিলেন। (পৃষ্ঠা : ৯৩)

গ্রীক দর্শনের বিরুদ্ধে এই বৌদ্ধিক বিপ্লব চিন্তার প্রতিটি বিভাগেই সংঘঠিত হয়েছিল। আমি দু:খিত, আমি এই সমস্ত বিষয় আলোচনার জন্য উপযুক্ত নই কারন এই বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রে। এটি সুস্পষ্টরুপে প্রতীয়মান হয় আসিরীয় অধিবিদ্যায়, কিন্তু এটি প্রকাশিত হয় গ্রীক যুক্তিশাস্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম সমালোচনার সু-বর্ণিত দৃষ্টান্ত হিসাবে। এটি ছিল স্বাভাবিক, কারণ বিশুদ্ধ তত্ত্বমূলক দর্শনের প্রতি অসন্তুষ্টির তাৎপর্য হল জ্ঞানের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত যুক্তির অনুসন্ধান। আমার মনে হয়, নাজ্জাম প্রথম এই নীতির উদ্ভাবক ছিলেন যে সন্দেহ থেকে সমস্ত জ্ঞানের উৎপত্তি। গাজ্জালী এটিকে বিস্তৃত করেছিলেন তার Revivification of the science and religion নামক গ্রন্থে এবং তিনি দেকর্তীর পদ্ধতির অনুসারী ছিলেন। তিনি "দেকার্তীর পদ্ধতির" পথ পস্তুত করেছিলেন। কিন্তু গাজ্জালী যুক্তিশাস্ত্রে সামগ্রিকভাবে অ্যারিস্টটলের অনুসারী ছিলেন। তিনি তার তার Quistus নামক গ্রন্থে বেশ কিছু কোরআনের যুক্তিকে অ্যারিস্টটলীয় যুক্তি কাঠামোতে প্রয়োগ করেছিলেন ইশরাকি এবং ইবনে তাইমিয়া গ্রীক যুক্তিবাদকে খন্ডন করেছিলেন। আবু বকর রাজি সর্ব প্রথম আ্যারিস্টটলের পথম কাঠামোর সমালোচনা করেছিলেন। এবং আমাদের কালে তার সমালোচনা অবরোহনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কল্পনা করে স্টুয়ার্ট মিল পুনগর্ঠন করেছেন। ইবনে হাজম তার Scope of logic নামক গ্রন্থে জ্ঞানের উৎস হিসেবে ইন্দ্রিয়দর্শনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন; ইবনে তাইমিয়া তার Refutation of logic নামক গ্রন্থে প্রমাণ করেন আরোহমূলক পদ্ধতি বিশ্বাসযোগ্য জ্ঞান অর্জনের একমাত্র পদ্ধতি। ------- (পৃষ্ঠা : ৯৪)

--- স্পেনের বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবী সঠিকভাবেই বলেছিলেন যে, ইশ্বর হল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, জগত হল ধারনা। অপর মুসলিম সুফি চিন্তাবিদ এবং কবি গুরুত্ব দিয়েছেন স্থানসজ্জা এবং কালসজ্জার বহুত্বের উপর এবং একটি ঐশী সময় এবং ঐশী স্থানের কথা বলেছেন। এরুপ হতে সমর্থ আমাদের স্বভাবিক অভিজ্ঞতায় ধারনা ও বিশ্লষণের যা কাজ এই সকল স্তরে তাদের কাজ একইরুপ নয়। বলা যেতে পারে যে, অভিজ্ঞতার যে স্তরে ধারনা প্রয়োগ করা যায় না তা সার্বিক কোন জ্ঞান দেয় না, কারন একমাত্র ধারনাই শ্রেনীভুক্ত হতে সক্ষম। যেসব মানুষ সত্যতাকে উপলব্ধি করার পথ হিসেবে ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে বিশ্বাস করে, তাদের অভিজ্ঞতা সর্বদা সর্বদা ব্যক্তিগত এবং সংযোগাতীত হবে। এই ধারনার ভিত্তি থাকে যদি ধরা হয় মরমী অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণভাবে ঐতিহ্যগত পথে একই উদ্দেশ্য, একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হয়। সক্ষণশীলতা, মানবীয় অভিজ্ঞতার অন্যান্য ক্ষেত্রে যেরুপ খারাপ ধর্মেল ক্ষেত্রেও তাই। এটি আত্মার সৃষ্টিশীল স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে এবং আধ্যাত্বিক অভিজ্ঞতার নতুন পথকে অবরুদ্ধ করে। আমাদের মধ্যযুগীয় মরমীবাদ কেন পৃকৃত সত্য আবিষ্কার করতে পারেনি তার এটিই প্রধান কারন। ------ (পৃষ্ঠা : ১২৯)

--------- মধ্যযুগীয় মরমীবাদ, যে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য তার উচ্চতর প্রকাশ নিজেকে বিকশিত করেছিল, বর্তমান যুগে তা ব্যর্থ। মুসলিম প্রচ্যে এবং এর ধ্বংসকারী প্রভাব অন্যান্য স্থানের থেকে বেশি। -------- (পৃষ্ঠা : ১৩২)

আধুনিক নাস্তিক্যবাদী সমাজতন্ত্র, যা একটি নতুন ধর্মের সমস্ত প্রকার গুনের অধিকারী, অনেক বেশি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন। কিন্তু বামপন্থি হেগেলীয় দর্শন থেকে এর দার্শনিক ভিত্তিমূল গহণ করে এটি উৎসের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করে, যা তাকে শক্তি এবং উদ্দেশ্য দিতে পারত। জাতীয়তাবাদ এবং নাস্তিক্যবাদী সমাজতন্ত্র উভয়েই মানবীয় সামঞ্জস্য বিধানের বর্তমান স্তরে অন্তত ঘৃনা, সন্দেহ, বিদ্বেষ প্রভৃতি মানসিকতা পরিহার করবে যা আত্মাকে দূর্বল করে এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উৎসকে অবরুদ্ধ করে। মধ্যযুগীয় মরমীবাদ, জাতীয়তাবাদ কিংবা নাস্তিক্যবাদী সমাজতন্ত্র কোন মতবাদই মানবতাকে হতাশার অসুখ থেকে সুস্থ করতে পারে না।

------ ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সম্পদ এবং বৈচিত্র্যের সম্বন্ধে একটি ধারনা দেওয়ার জন্য আমি এখানে সপ্তদশ শতকের এক ধর্মীয় প্রতিভা সেখ আহমদ সেরহিন্দ এর রচনা থেকে এক অনুচ্ছেদের সারার্থ উল্লেখ করছি। সমসাময়িক সুফিবাদের বিরুদ্ধে তার কুন্ঠাহীন সমালোচনা পরিনতি পেয়েছিল একটি নতুন পদ্ধতির বিকাশে। ভারতের সমস্ত প্রকার সুফী পদ্ধতি এসেছিল মধ্য এশিয়া এবং আরব থেকে; তার পদ্ধত্তিই ছিল একমাত্র পদ্ধতি যা ভারতের সীমানা অতিক্রম করেছিল, এবং এখনও পর্যন্ত পাঞ্জাব, আফগানিস্তান এবং এশিয়ান রাশিয়ার ক্রিয়াশীল শক্তি। ----- ( পৃষ্ঠা : ১৩৬)

ধর্মীয় এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উভয়ে স্বতন্ত্র হলেও, প্রকৃতপক্ষে তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য অভিন্ন। উভয়ের লক্ষ্যই পরম সত্যে পৌছানো। ধর্ম, আমি পূর্বেই কারনটি উল্লেখ করেছি, পরম সত্যে পৌছাতে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন। এবং উভয়ের নিকট প্রকৃত বিষয়মুখীনতাতে পৌছানোর রাস্তা হল যাকে আমরা বলি অভিজ্ঞতার সংশোধন। ----------- বৈজ্ঞানিক এবং ধর্মীয় পদ্ধতি এক অর্থে একে অপরের সমকক্ষ, উভয়েই একই জগতের বর্ণনা দেয় কেবল এই পার্থক্যের সঙ্গে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বাহ্যিক অপরদিকে ধর্মীয় পদ্ধতিতে আত্মা তার প্রতিযোগিতামূলক প্রবণতা একত্রিত করে এবং একটি অন্তনির্হিত দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটায় এবং যার ফল অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে রুপান্তর। ---- (পৃষ্ঠা : ১৩৮)

------ মানবাত্মার ঐশী অনুসন্ধানে একমাত্র বিপদ হল তার কার্যে শিথিলতার সম্ভাবনা যার কারন চুড়ান্ত অভিজ্ঞতার পূর্বের অভিজ্ঞতাসমূহ উপভোগ করা বা সেখানে নিমজ্জমান থাকা। প্রাচ্য সুফিবাদের ইতিহাস দেখায় যে এটিই প্রকৃত বিপদ। এটিই হলো সংস্কার আন্দোলনের সম্পূর্ণ বিষয় যা শুরু করেছিলেন এক ভারতীয় সাধক, যার উদৃতি আমি কিছুক্ষণ পূর্বে উল্যেখ করেছি। কারনটি নিশ্চিত। আত্মার চুড়ান্ত লক্ষ্য কিছু "দেখা" নয় বরং কিছু "হওয়া"। আত্মার এই হওয়ার প্রচেষ্টাতে সে তার নৈর্ব্যক্তিকতাকে তীক্ষ্ণ করে এবং অধিকতর মৌলিক "আমি" কে খুজে পায়, যা তার বাস্তবতার প্রমাণ পায় কার্টেসিয় "আমি চিন্তা করি" তে নয় বরং কান্টের "আমি পারি"তে। ------- (পৃষ্ঠা : ১৩৯) Iqbal (so called Allama) Denies Heaven and Hell are Real Places The so called "Poet of the East", and great Islamic thinker, Muhammad Iqbal, was in fact a heretic. It is very sad that millions of Muslims throughout Pakistan and India respect Iqbal and consider him a great thinker of Islam. The reality is that there remained a big question mark over his faith. For example, Iqbal wrote that Jannat (Heaven) and Hell are only mental states and not actual real places. Reference: Tajdeed Fikriyat e Islam, p. 125 He further wrote (on the next page): "In Islam there is no such thing as eternal punishment. In some Quranic verses the word forever (khalideen) has been used, but in other places of the Quran it is clear that this only means a limited period of time." So Iqbal also denied that the punishment of Hell is eternal, he further writes: "Hell is not even a place of punishment that has been made by some Vengeful (Muntaqim Mizaaj) God, rather it is for the reformation of man and the acquiring of God's Mercy." Here Iqbal has denied the Quranic concept of Hell as being a place of punishment. Not only that, he has denied the Name and Attribute of Allah 'Al-Muntaqim' meaning the One who carries out retribution (revenge). Reference: (ibid, p. 126

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নির্ভেজাল ইসলামের স্বরুপ সন্ধানে

সাড়ে তিন হাত বডিতে ইসলাম !

ইসলাম ও গনতন্ত্র