বাংলাদেশে ইসলাম কায়েমের মডেল আফগান নয় তুরস্ক
এখন ই শরিয়া আইন চায় না কেন জামায়েত!?
যার প্রথম কারণ
দেশ ও জাতির বড় স্বার্থ নিহীত।
যেমন, চোখের সামনে মুসীর ইতিহাস টা একটু দেখি।
, মোটামুটি ৫টি প্রধান কারণে মোহাম্মদ মুরসির পতন হয়েছি
১. অর্থনৈতিক ব্যর্থতা (দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, জ্বালানি সংকট)
২. একতরফা শাসন ও ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ
৩. ধর্মীয়করণ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
৪. জনসমর্থনের দ্রুত পতন ও গণবিক্ষোভ
৫.সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ।
আরও ছোট করে চাইলে বলাও যায়: জনঅসন্তোষ + রাজনৈতিক ভুল + সেনাবাহিনী।
এই ৫ টি পয়েন্টের প্রত্যেকটির পিছনে বিছক্ষণতার ঘাটতি ছিল মুরসীর।
যেহেতু বাংলাদেশ এখনো স্বনির্ভর দেশ হয়ে উঠতে পারেনি সেহেতু পারিপার্শিকতার প্রয়োজন অনির্বায্য।
এসব কিছু মাথায় রেখেই জামায়েত ধীর পায়ে চলার পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। হয় তো এখানে কিছু ইসলামি দল বুঝে বা না বুঝে জামায়েতের প্রতি বিষ তীর নিক্ষেপ করে চলেছে, যা কোন সমজদার মানুষের কর্ম হতে পারে বলে মনে করি না।
একটি গনতান্ত্রিক দেশকে ইসলামি শাসনে কনভার্ট করতে ২টি মডেল অনুসরণ করা যায়।
১. আফগান মডেল
২. তুরস্ক মডেল
▶️ আফগান মডেল : কোনো মুসলিম দেশ যদি অত্যাচারী, দেশদ্রোহী, ইসলাম বিরোধী শাসকের হাতে নিপিড়ীত অবস্থায় থাকে, সেক্ষেত্রে অত্যাচারী শাসককে হটিয়ে ইসলামের আলোকে ইনসাফ ভিত্তিক শাসন বাস্তবায়নে আফগান মডেল অনুসরণ করা যায়।
এক্ষেত্রে শুরুতে শান্তিপূর্ণ ভাবে বিভিন্ন দল - সংগঠনের মাধ্যমে ইসলামি শাসন বাস্তবায়নের দাবি জানাতে হবে। সরকার রাজি না হলে আন্দোলন শুরু হবে। সরকার বল প্রয়োগ করবে, অত্যাচার, মানুষ হত্যা শুরু করবে।
শান্তিপূর্ণ ভাবে ক্ষমতা না ছাড়লে দেশ ও ইসলামের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত কর্মীর সমন্বয়ে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ ও সুসংগঠিত করে তুলতে হবে। দেশের মাটিতে থেকে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে বিধায় তারা কেবল যোদ্ধা হলে চলবে না, গুপ্তচরবৃত্তির কৌশলও জানাতে হবে।
অস্ত্র, আর্থিক ডোনেশন, আন্তর্জাতিক সমর্থক, মিত্র সংগ্রহ করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন অস্ত্রের চালান যোগাদ দেবে এমন আন্তর্জাতিক সোর্স ম্যানেজ করতে হবে।
এগুলো ম্যানেজ করে একটা প্রপার মিলিট্যান্ট ফোর্স গঠন করতে হবে, এরপর সসস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবে। সরকারের তাবেদার সামরিক, বেসামরিক ব্যাক্তিদের নিষ্ক্রিয় /টার্মিনেট করা, সামরিক স্থাপনায় হামলা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সরকারি স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।
বিদেশি প্রভুরা সরকারের সহায়তায় এগিয়ে আসবে। সেই বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। এভাবে দির্ঘ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। এরপর ইসলামি শাসন বাস্তবায়ন করা যাবে।
▶️ নেতিবাচক দিক:
➧ রক্তক্ষয়ী, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি।
➧ সফলতার নিশ্চয়তা নেই। তা'লে'বান সফল হলেও অনেক দল ব্যার্থ হয়েছে।
➧ দেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, অবকাঠামো, অর্থনীতি, শিল্পখাত ধ্বংস হয়, স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়।
➧ অসংখ্য মানুষ নিহত, বিকলাঙ্গ হয়, পরিবার ধ্বংস হয়।
➧ উদ্বাস্তু, বাস্তুচ্যুত, শরনার্থী, গৃহহীন সমস্যার উদ্ভব।
➧ কর্মক্ষেত্র নষ্ট হয়, বেকারত্ব বৃদ্ধি।
➧দেশের অনেক মানুষ এর বিরোধিতা করে।
➧ অনেক দির্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আফগানে সফলতা আসতে ৪০ বছর যুদ্ধ করতে হয়েছে।
➧ বিজয়ের পরেও দির্ঘ্য সময় ক্ষয়ক্ষতির রেশ টানতে হয়।
▶️ সীমাবদ্ধতা : এই মডেল কেবলমাত্র বিদেশি আগ্রাসনের স্বীকার বা অত্যাচারী শাসকের দেশে কার্যকর। যেমন আফগানিস্তানে সোভিয়েত ও মার্কিন আগ্রাসনের মুখে এই মডেল ইমপ্লিমেন্ট হয়েছে। ফিলিস্তিন, কাশ্মীরেও একই কারনে এই মডেল অনুসৃত হচ্ছে।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল দেশে এই মডেল কার্যকর হয়না। সসস্ত্র বিপ্লবীদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দেশের জনগনই এর বিরোধিতা করে বলে জনসমর্থনের অভাবে বিপ্লব সফলতা পায়না, উল্টো জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। তাই স্থিতিশীল দেশে এই মডেল অনুসরণ করা নিজ পায়ে কুড়াল মারার মত।
▶️ বাংলাদেশে এই মডেলের অকার্যকরীতা:
আফগান মডেল বর্তমান বাংলাদেশে কার্যকর হবেনা। কারন বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সরাসরি কোনো বিদেশি আগ্রাসনের কবলে পরেনি, পাশাপাশি আপাতত ১৫ বছরের অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটেছে।
পাশাপাশি সসস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে গনতন্ত্র থেকে শরিয়ায় যেতে হলে জনগনের মাঝে যে পরিমান ঐক্য, ইমানী শক্তি এবং ত্যাগের স্পৃহা প্রয়োজন তা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।
বাংলাদেশের অনেক মানুষ নামে মুসলিম হলেও ইসলামি শাসন বিরোধি। মিলিট্যান্ট গ্রুপ গঠন করলে জনগনই মুজাহিদদের জ'গি বলে সরকারের হাতে ধরায় দিবে। যেই ৯২% মুসলমানের ভরসায় যুদ্ধে নামবেন তারাই আপনার কোমড় ভেঙে দিবে। কিছু বোমা ফাটাবেন, সেনা হত্যা করবেন, নিজেরাও মরবেন। কাজের কাজ কিছুই হবেনা। উল্টো দেশে বিপর্যয় তৈরি হবে।
নৈতিক কারণেও বাংলাদেশে আফগান মডেল কার্যকর নয়। কারন সরকার এবং সামরিক বাহিনীতে বর্তমানে যারা আছে তাদের বেশিরভাগই মুসলিম। এরা নীতিহীন, দুর্নীতিগ্রস্থ, দুর্বল ইমানের হলেও কাফির, মুশরিক নয়৷ এদেরকে গনহারে হত্যা করার মিশনে নামা খারেজী পন্থানুসরণের শামিল।
আওয়ামী আমলে সরকার এবং তার তাবেদার বাহিনীগুলো পথভ্রষ্ঠ, মুশরিকদের গোলামে পরিণত হয়েছিল৷ তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নৈতিক বাঁধা ছিলোনা। কিন্তু এখনকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশে আফগান মডেল কার্যকর না।
▶️ তুরস্ক মডেল: অবাক লাগতে পারে, তুরস্ক মুলত একটা স্যেকুলার দেশ, ইসলামি শাসন বাস্তবায়নে তুরস্ক মডেল হয় কিভাবে? মুলত এটা একটা কনসেপ্ট, যা চলমান অবস্থায় আছে। এই কনসেপ্ট বুঝতে হলে তুরস্কের ইতিহাস জানতে হবে।
১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর উসমানীয়রা দুর্বল হয়ে পড়লে ১৯২৪ সালে বামপন্থী মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কে উসমানীয় খিলাফত বিলুপ্ত করে পশ্চিমা স্টাইলের একদলীয় শাসন কায়েম করে। চরম ইসলাম বিদ্বেষী আতাতুর্ক তুরস্কের মাটি থেকে ইসলামকে পুরপুরি নির্মুল করার মিশনে কাজ শুরু করে। তার কিছু কাজ..
➧ আইন করে সমস্ত মাদ্রাসা বন্ধ করা।
➧ সরকারি পদ থেকে সমস্ত মৌলভীদের বের করা।
➧ মহিলাদের হিজাব নিষিদ্ধ করা, পুরুষদের বাধ্যতামুলক স্যুট, হ্যাট এবং মহিলা ছোট কাপড় পরার আইন করা।
➧ সকল সামাজিক ও পারিবারিক ইসলামি কালচার, অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ এবং পশ্চিমা কালচার প্রতিষ্ঠা করা।
➧ তুর্কি ভাষা আগে আরবি হরফে লেখা হতো,তা নিষিদ্ধ করে ল্যাটিন অক্ষরের প্রচলন।
➧ ১৯২৮ সালে নতুন সংবিধানে ইসলামকে পুরপুরি উচ্ছেদ করে পশ্চিমা প্রথার প্রয়োগ।
➧ নামাজ, রোজা, ঈদের নিয়ম বিকৃত করে বিদায়তি নিয়মের অবতারণা।
➧ মাইকে বা উচ্চস্বরে আজান দেয়া নিষিদ্ধ করা।
➧ আরবির পরিবর্তে তুর্কি ভাষায় আজান প্রচলন।
➧ সরকারি প্রতিষ্ঠানে জামায়াতে নামাজ আদায় নিষিদ্ধ।
➧ পাঠ্যপুস্তে ইসলামের পাশাপাশি উসমানীয় ইতিহাসও মুছে ফেলা হয়। জনগণ তাদের অতিত ভুলে যায়।
➧ ২০০০ সাল পর্যন্ত তুরস্কের সিনেমা হলগুলোতে উন্মুক্ত সে'ক্স সহ অশ্লীল সিনেমা প্রদর্ষিত হতো।
একবার ফজরের সময় মুয়াজ্জিনের আজানের শব্দে আতাতুর্কের ঘুম ভেঙে গেলে আতাতুর্ক সেই মুয়াজ্জিনকে হত্যা করে। সরকারের এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খিলাফতের ভুমি পুরোপুরি নাস্তিক দেশে পরিনত হয়। প্রবীনদের মৃত্যুর পর তুরস্কের তরুণ প্রজন্ম তাদের ইতিহাস, ধর্ম ভুলে পুরোপুরি স্যেকুলার হয়ে যায়। নামে মুসলিম থাকলেও এরা জানতোই না ইসলাম আসলে কি?
তবে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কিছু জনগোষ্ঠী গোপনে ইসলাম আকড়ে ধরে রাখে, ফলে আনাতোলিয়ার বুকে ইসলাম এক নিভু নিভু প্রদীপের মত টিকে থাকে।
▶️ ইসলামি রাজনীতির উথান :
সত্তরের দশকে তুরস্কের আকাশে নতুন এক সূর্যদয় ঘটে। আবির্ভুত হন আধুনিক তুরস্কে ইসলামী রাজনীতির মহান নেতা নাজমুদ্দিন এরবাকান। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ, ইসলামপন্থী, জনপ্রিয় নেতা।
কিন্তু রাজনীতিতে আসার পর তিনি সেকুলারদের টার্গেটে পরিনত হন। নাস্তিক সেনাবাহিনী এবং প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। বেশ কয়েকবার তার দল এবং তাকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
এমনকি নিরপেক্ষ নির্বাচনেও তিনি ভোট পেতেন মাত্র ৩০-৩৫%। কারন তুরস্কের বেশিরভাগ মানুষ ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে ছিলো, ইসলামী শাসন ভয় পেত, ঘৃণা করতো। যা ছিলো মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নাস্তিকীকরন প্রজেক্টের ফল। যার ফলে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক, ইসলামপন্থী নেতা হবার পরও শেষ পর্যন্ত নাজমুদ্দিন এরবাকান সফল হতে পারেন নি।
এরপর নম্বইয়ের দশকে প্রেক্ষাপটে আসেন রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। তিনি ছিলেন কৌশলী, চতুর। এর্দোয়ান বুঝতে পারে তুরস্কের সমাজে কট্টরপন্থি ইসলামের দাওয়াত দিয়ে লাভ নেই, এতে জনপ্রিয়তা বাড়বে না, বরং কমবে। সেই সাথে নাস্তিকদের টার্গেটে পরিনত হতে হবে।
সেই পরিকল্পনার এর্দোয়ান একটা উদারপন্থী নীতি অনুসরণ করেন। নাস্তিক, ইসলাম বিরোধী, ইসলামপন্থী সবাই সমর্থন করবে এরকম এক ভার্ষাম্যপূর্ন দল এবং নীতি গড়ে তোলেন। তুরস্কে নাস্তিক সেনাবাহিনীও তার উপর সন্তুষ্ট থাকে।
এইভাবে এর্দোয়ান ক্ষমতায় আসে। এরপর এর্দোয়ান সুকৌশলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র থেকে ইসলাম বিদ্বেষী এলিমেন্টগুলো দুর করতে শুরু করে।
➧ এর্দোয়ান অশ্লীল সিনেমা নির্মান বন্ধ করে। তার জায়গায় ইসলাম এবং উসমানীয় ইতিহাস অবলম্বনে বিভিন্ন ড্রামা সিরিজ তৈরি শুরু হয়। যেই তুর্কি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি একসময় অশ্লীল মুভির আতুরঘর ছিলো, সেটাই বিশ্বব্যাপি সুস্থ ধারার ইসলামী ইতিহাস প্রচারের মধ্যমনি হয়ে উঠে।
➧ পাঠ্যপুস্তক ও মিডিয়ায় তুর্কিদের হারানো ইতিহাস তুলে ধরা হয়।
➧ ২০১৩ সালে হিজাব নিষিদ্ধ আইন তুলে দিয়ে নারীদের হিজাব পরিধানের সুজোগ করে দেন।
➧ ২০১৬ সালে পুলিশ ও সেনাবাহিনীতেও নারীদের হিজাব পরিধানের অনুমোদন দেন।
➧ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ চালু করা।
➧ ইমাম হাতিপ স্কুল ( মাদ্রাসা টাইপের স্কুল) গুলোকে চাঙা করেন, নাস্তিকরা যা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলো। ২০০২ সালে ইমাম হাতিপ স্কুলগুলোর টোটাল শিক্ষার্থী ছিলো ৬৫ হাজার, বর্তমানে তা ১৪ লক্ষ।
➧ তুরস্ক জুড়ে সরকারি সহায়তায় নতুন নতুন মসজিদ নির্মাণ। ঐতিহাসিক মসজিদসমূহ (যেমন সুলতান আহমেদ, হায়া সোফিয়া, ফাতিহ, আইয়ুব সুলতান) সংস্কার ও পুনরুদ্ধার।
➧ তুরস্কের ধর্মবিষয়ক দপ্তরের বাজেট কয়েকগুণ বৃদ্ধি।
➧ ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় তুর্কি মসজিদ, স্কুল ও ইসলামিক কালচারাল সেন্টার নির্মাণে অর্থায়ন।
➧ অ্যালকোহল, জুয়া ও অনৈতিক সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়।
➧ ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন আইন প্রণয়ন।
এর মাধ্যমে তুরস্কের চরম নাস্তিক সমাজে ধীরে ধীরে ইসলামি রীতির অনুপ্রবেশ ঘটে। যার ফলস্বরূপ তুরর্কিরা আগের চেয়ে ইসলাম মুখী হয়েছে, ইসলাম ভীতি দুর হয়েছে। আবার নাস্তিকরাও এর্দোয়ানের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থেকেছে।
এর্দোয়ান জানতো ইসলামি সংস্কার শুরু করলেই পশ্চিমারা তাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেবে । তাই সংস্কারের আগে এর্দোয়ান তুরস্কের অর্থনীতি মজবুত ও স্বনির্ভর করে, সামারিক বাহিনীকে সুসংগঠিত করে, শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তোলে।
তার সন্দেহ সত্যি হয়েছিলো, ২০০৯ সাল থেকে তুরস্কের সাথে পশ্চিমাদের সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। IMF তুরস্কের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে নানামুখী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কুটনৈতিক এবং বানিজ্যিক চাপ আসতে শুরু করে। এমনকি গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ২০১৬ সালে সামরিক ক্যু করে এর্দোয়ানকে হটানোর চেষ্টা করা হয়। এসবের পরও তুরস্ক টিকে যায়, সাথে টিকে যায় এর্দোয়ান।
এভাবে এর্দোয়ানের মাধ্যমে তুরস্কের স্যেকুলার ভুমিতে ধীরে কিন্তু ধারাবাহিক ভাবে ইসলামের পুনরুথান ঘটে। কট্টরপন্থী, হকপন্থি ইসলামি নেতা নাজমুদ্দিন এরবাকান ইসলামের উপকারে যা করতে পারেনি, একজন হাফ স্যেকুলার নেতা হয়ে এর্দোয়ান তারচেয়ে বেশী করতে সক্ষম হয়।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করায় এর্দোয়ানকে অনেকে ইহুদি, খ্রীষ্ঠানদের দালাল বলেন। তবে তুরস্কের পুর্নাঙ্গ ইতিহাস জানলে বুঝবেন এর্দোয়ানের আগের শাষকরা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দালালী করেছে। তুরস্কে এখনো পুরোপুরি পশ্চিমা বিরোধী হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। মানে এর্দোয়ান হচ্ছে মন্দের ভালো।
তাছাড়া আমাদের আলোচ্য বিষয় এর্দোয়ান নয়, বরং এর্দোয়ানের মডেল। এই মডেল অনুসরণ করে ইসলাম বিমুখ একটা জাতিকে সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে ইসলাম মুখি করা সম্ভব। এই মডেলে এর্দোয়ান ৩টা সাফল্য পেয়েছে..
১. ক্ষমতায় এসেছে
২. দির্ঘ্য সময় ক্ষমতায় টিকে থেকেছে (২০০৩-২০২৫)
৩. ইসলামি সংস্কার করে জনগণের ভেতর ইসলামি মুল্যবোধ ফিরিয়ে এনেছে।
বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো প্রথমটাই অর্জন করতে পারেনা, বাকিগুলো কিভাবে অর্জন করবে?
এটা প্রমান করে কেবল ধর্মীয় আবেগ থাকলেই হয়না, কৌশলেও প্রয়োজন আছে। শুধু জ্বালাময়ী ভাষন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে ইসলাম বাস্তবায়ন হয়না। কৌশল, দক্ষতা, সুদির্ঘ্য পরিকল্পনার মাধ্যমেও তা করা যায়।
▶️ তুর্কি মডেলের ভবিষ্যত: ইসলামি রীতি প্রবর্তনের ধারা চলমান থাকলে তুরস্কের জনগণ একসময় পুর্নাঙ্গ ইসলামী ধারায় ফিরে আসবে, নাস্তিক্যবাদ নির্মুল হবে। এভাবে জনগণের ভেতর পুণাঙ্গ ইসলামি শাসনের পক্ষে সমর্থন সৃষ্টি হবে এবং তা কায়েম করা সম্ভব হবে।
▶️ এই ব্যাবস্থা যদি কলাপ্স করে? : হ্যা, এই মডেল মাঝপথে কলাপ্স করতে পারে৷ ২০১৬ সালের সেনা অভ্যুথান সফল হলেই এর্দোয়ানের পতন হতো৷ এর আগে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড ও প্রেসিডেন্ট মুরসির পতন হয়েছে, বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের পতন হয়েছে। জিয়াউর রহমান এর্দোয়ানের কৌশলেই কাজ করছিলো, কিন্তু সামান্য ভুলে তার পতন হয়।
অর্থাৎ তুর্কি মডেল ব্যার্থ হতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্ষমতা আবার মুসলিম বিরোধীদের হাতে চলে যেতে পারে। কিন্তু পতনের আগে মৌলিক সংস্কার গুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের জনগণ ইসলামপন্থী হয়ে উঠবে। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের পতন প্রতিরোধ করবে, অথবা সসস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামি শাসন ফিরিয়ে আনবে। তুরস্কেও জনগণ রাস্তায় নেমে সেনাবাহিনীর ট্যাংক আটকে অভ্যুথান বানচাল করে দিয়েছিলো। মানে এর্দোয়ান ইতিমধ্যে বেশকিছু মৌলিক সংস্কার করে তার ভিত্তি শক্ত করে ফেলেছে।
▶️ বাংলাদেশে তুর্কি মডেল প্রয়োগ: কট্টরপন্থা ছেড়ে উদারপন্থী নীতি অনুসরণের মাধ্যমে মুসলিম, দুর্বল মুসলিম, স্যেকুলার, অমুসলিম সব ধারার জনগণের মধ্যে গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। সকলের সমর্থনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহন করতে হবে। এরপর বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে..
➧ শিক্ষা ব্যাবস্থা থেকে পশ্চিমা বিষ নির্মুল করে যুগোপযোগী আধুনিক ধারার প্রবর্তন।
➧ গবেষণা ও প্রযুক্তি খ্যাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
➧ পশ্চিমা চাপ সামলাতে অর্থনীতি এবং সামরিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন।
➧ ইসলামের নামে প্রচলিত ভ্রান্ত্র রীতি ও ধারনা নির্মুল করে এবং বিভিন্ন দল-মতের বিবাদ নিরসন করে পুরো উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা।
➧ সমাজ থেকে ইসলাম বিরোধী এলিমেন্ট, যেমন: অশ্লীলতা, মাদক, বিধর্মী কালচার, প্রথা নির্মুল করা।
➧ ব্যাপক গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি। দেশবিরোধী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র নির্মুল করা। সরকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা বিদেশি এজেন্টদের পাকড়াও করা। ইসকন, উদিচি, ছায়ানটের মত দেশবিরোধী সকল সংগঠন নিষিদ্ধ ও নির্মুল করা।
➧ দুর্নীতি, অব্যাবস্থাপনা, প্রশাসনিক জটিলতা দুর করে রাষ্ট্রব্যাবস্থা শক্তিশালী করা।
➧ জনগণের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি, বেকারত্ব হ্রাস করা। বেসিক সামরিক প্রশিক্ষন দিয়ে জনগনকে আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তোলা।
➧ বিদেশি রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষীতা দুর করা।
➧ ভারতীয় আধিপত্যবাদের কবল থেকে বেরিয়ে আসা।
উপরোক্ত টার্গেটগুলো পুর্নাঙ্গ বা আংশিক এচিভ করা গেলেই বাংলাদেশে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েমের গ্রাউন্ড তৈরি হয়ে যাবে। তখন সরকার চাইলে পুর্নাঙ্গ ইসলামি শাসন বাস্তবায়ন করতে পারবে।
▶️ বাংলাদেশে তুর্কি মডেলের উপযোগিতা: সব দৃষ্টিকোন থেকেই বাংলাদেশের জন্য তুর্কি মডেল উপযোগী। ৯২% মুসলমানের দেশ হলেও এখানকার মুসলিম শতশত দল-মতে বিভক্ত। একের সাথে অপরের দা-কুমড়া সম্পর্ক। সবাই মুখে মুখে ইমানদার, কিন্তু শরিয়াহ শাসনে কেউ আগ্রহী নয়।
এই হাফ স্যেকুলার জাতীর কাছে আজ পর্যন্ত কোনো ইসলামি দল জনপ্রিয় হতে পারেনি৷ তাদের কাছে লীগ, বিএনপির মত স্যেকুলার দলই প্রিয়। তাই বাংলাদেশে কট্টরপন্থী ইসলামি রাজনীতি মুল্যহীন।
তাই ন্যায় ও ইনসাফের আলোকে উদারপন্থী নীতি অনুসরণ করে সমাজের সব ধরনের মানুষের সমর্থন আদায় করে ক্ষমতায় আসতে হবে। এরপর উপরোক্ত প্রসেস ফলো করে জাতীর মাঝে ইসলামি জ্ঞান, ইমানী শক্তি, দক্ষতা এবং জাতীয় ঐক্য তৈরি করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশে শরিয়াহ শাসন কায়েম সম্ভব হবে।
তবে, আপনি বুদ্ধিমান হলে খেয়াল করবেন, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তুর্কি মডেল অনুসরণ শুরু হয়ে গেছে। এক বা একাধিক দল কট্টরপন্থা ছেড়ে উদারপন্থী নীতি গ্রহন করায় সব শ্রেনীর মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে। এর ফলও পাওয়া যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নিরব বিপ্লব ঘটেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন