নির্দিষ্ট এক মাযহাব এর তাকলীদ এর বিপক্ষের কতিপয় দলীল
'চার মাজহাব' সম্পর্কে নবীজী(সা) এর ভবিষ্যদ্বাণীঃ
.
[১১/১১] জাবির ইবনু আবদুল্লাহ(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী(সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত থাকা অবস্থায় তিনি একটি সরল রেখা টানলেন এবং তাঁর ডান দিকে দুটি সরল রেখা টানলেন এবং বাম দিকেও দুটি সরল রেখা টানলেন। অতঃপর তিনি মধ্যবর্তী রেখার উপর তাঁর হাত রেখে বলেনঃ এটা আল্লাহ্র রাস্তা। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং "এ পথই আমার সরল পথ। অতএব তোমরা এ পথেরই অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, অন্যথায় তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে" [সূরা আনআম ৬: ১৫৪]
সুনানে ইবনে মাজাহ, অধ্যায়ঃ ভূমিকা পর্ব, হাদিস নম্বরঃ ১১। তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: আহমাদ ১৪৮৫৩ তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ।
.
পৃথিবীতে যে চারটি মাসহাব হবে এ হাদীস তার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। হাদীসটি খেয়াল করুন, 'ডানে দুটি দাগ ও বামে দুটি দাগ' অর্থাৎ, হানাফী ও শাফেঈ একদিকে আর অন্যদিকে মালেকী ও হাম্বলী মাজহাব। আর আজকের এই ফেৎনাময় বিশ্বে মুসলিমরা যত দল, মতবাদ, ফির্কা, তরিকায় বিভক্ত হোক না কেন তবুও সবার মাঝে উক্ত ৪ মাজহাব হল কমন ফির্কা। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে চিন্তা করুন, এদেশে দেওবন্দী ও ব্রেরলিভী ফির্কা আছে। উভয়ে নিজেদের মাঝে 'কুফরী' ফতোয়া পর্যন্তও দিয়েছে, তারপরও তারা একই 'হানাফী' মাজহাব ফির্কায় বন্দী। অনুরূপ তাবলিগী, জামাতী, হেফাজতে ইসলাম প্রায় সবাই নিজেদের মাঝে দ্বন্ধ, তবে হানাফী মাজহাব ফির্কায় বন্দী। এদেশের প্রত্যেক পীর ও পীরের তরিকা ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু চরমুনাই, হাটহাজারী পীর, দেওয়ানবাগী, শর্শিনাপীর, চন্দ্রপুরী, রাজারবাগী, ফুলতুলী, আটরশি, মাইজভান্ডারী ইত্যাদি যত পীর তরিকা আছে সবাই এক ফির্কা তথা 'হানাফী' মাজহাব ফির্কায় বন্দী। এখন যদি প্রশ্ন করি, 'হানাফী' মাজহাব ঠিক হলে সেই মাজহাবে এত দল ও উপদল কেন? এখন প্রত্যেক উপদল ভাবছে তার দল ঠিক, সবাই তো ঠিক না। অর্থাৎ, বাতিলের ভিতরেও আরও বাতিল। অন্ধকারের উপর আরও ঘন অন্ধকার। নবীজী হাদীসের মাধ্যমে এটায় প্রমাণ করলেন, পৃথিবীতে কমন চারটি বড় দল তৈরী হবে। বাস্তবতা দেখুন,প্রত্যেক দল উক্ত চারটি মাজহাবের কোনও না কোনও মাজহাবের তাক্বলিদকারী। হাদীসে নবীজী মধ্যে অন্য একটি রেখা টেনে বললেন, এটায় আল্লাহর পথ। অর্থাৎ, চার মাজহাব অনুসরণ করতে গিয়ে এই চিরাচরিত শ্বাশত আল্লাহ্ ও রাসূলের পথ ও মাজহাব হতে সরে যাবে অনেকে। আর সেসব মানুষকে সতর্ক করতেই রাসূল সতর্ক করছেন। এভাবে এখন হতে ১৪শ বছর পূর্বেই নবী(সাঃ) বর্তমানে বড় ফিৎনা ৪ মাজহাব নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। যা আজ বাস্তব ও চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতেছি।
হানাফীদের কথিত ফিকহ কমিটি :
৪০ সদস্যর ফিকহ কমিটি তৈরীর তারীখ নিয়ে এখতেলাফ। নীচে তারীখ নিয়ে কিছু তথ্য দেয়া হল।
১. ১২০ হিজরী। { মুকাদ্দামা আনওয়ার,২/ ১৮}
২. ১২১ হিজরী।{ তারীখুল ফিকহ,পৃঃ ৬৫}
৩. ১৩২ হিজরী।{ লামাহাত,৩/ ৪২৫}
হায়রে! তারীখ নিয়েও ইখতেলাফ।
যাই হোক ৪০ জন সদস্য তেইশ বছরে ১৩ লাখ মাসলা লিপিবদ্ধ করেছেন।{ তারীখুল ফিকহ,পৃঃ ৭০}
যদি তাই হয় তবে প্রতিদিন ১২২ টা মাসলা লেখতে হয়েছে। কিন্তু বলা হয়েছে, কিছু কিছু মাসলা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দিনের পর দিন ব্যায় করতে হয়েছে।
পাঠক বুইজ্জা লন।
৪০ জন কারাঃ
১. শিবলী নুমানি আফসোস করে বলেনঃ আমি কেবল কতিপয়ের নাম জানতে পেরেছি।{ সীরাতে নুমান,পৃঃ ৩৯০}
২. আনওয়ার কিতাবের রচয়িতা বলেনঃ আমি সবার কথাই জানতে পেরেছি।{ মুকাদ্দামা আনওয়ার,১/ ১৬০}
তিনি যে ৪০ জনের নাম জানতে পেরেছেন তাদের হাল হাকীকত পরে আরেকদিন বর্ণনা করা হবে।
হানাফী ফিকহ কমিটিতে প্রথম যার নাম আসবে তিনি হলেন আসাদ বিন আমর আবুল মুনযির আল বাজালী।তিনি আবু হানীফা রহ.- এর শাগরিদ। তার বিষয়ে ইমামদের মতামতঃ
১. ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বলেন, তিনি সত্যবাদী। তবে আবু হানীফার ছাত্রদের হতে হাদীছ বর্ণনা করা উচিৎ নয়।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪ }
২. তিনি আবু হানীফার মাযহাবের পক্ষে্য হাদীছ বানাতেন। { আল মাজরুহীন,রাবী নং- ১১৭}
৩. ইমাম ইবনে আবু শাইবাহ বলেন, তিনি আর বাতাস সমান। { যিকরু মান ইখতালাফাল উলামা,১/ ৪১}
তার মানে তিনি হাদীছ বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. ইয়াহইয়া ইবনে মাইন বলেছেন, তার হাদীছ বর্ণনায় সমস্যা নেই।{ তারীখে ইবনে মাইন, রাবী নং-১৭৬২}
৫. অন্যত্র ইবনে মাইন তাকে মহামিথু্যক বলেছেন।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪}
ইবনে মাইনের মিথু্যক বলাই গ্রহণযোগ্য। কারণ এটা জারহ মুফাস্সার।
৬. তার হাদীছ লেখা যাবে না। { ঐ}
৭. তিনি কিছুই নন।{ ঐ}
৮. তিনি যইফুল হাদীছ। { আল জারহু ওয়াত তাদীল, ইবনে আবী হাতিম, রাবী নং- ১২৭৯}
৯. ইমাম বুখারী তাকে যইফ বলেছেন। { তারীখে কাবীর, রাবী নং- ১৬৪৬; আয যুয়াফাউল কাবীর, রাবী নং- ৩৪}
১০. ইমাম নাসাই তাকে শক্তিশালী নন বলেছেন। { আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, রাবী নং- ৫৩}
ফিকহ কমিটি যখন প্রতিষ্ঠা হয় তখন তিনি দুনিয়ায় জন্ম নিয়েছিলেন কি না তা আল্লাহই জানেন। তার মৃঃ ১৯০ হিজরীতে। জন্ম সাল জানতে পারি নি।
ফিকহ কমিটির তৃতীয় ব্যাক্তি হলেন। হিব্বান বিন আলী আনাযী। তার জন্মঃ ১১১ হিজরীতে। আর মৃঃ ১৭২ হিজরীতে। তার মানে আনুমানিক দশ বারো বছর বয়সেই তিনি ফিকহ কমিটির অন্যতম ফকীহ হয়ে গিয়েছিলেন।
নীচে তার সম্পরকে ইমামদের কথা তুলে ধরলামঃ
১. তিনি হাদীছ বর্ণনায় যঈফ। { তাবাকাতুল কুবরা, রাবী নং- ২৬৬৮}
২. মুহাদ্দিছদের নিকটে তিনি শক্তিশালী নন। { তারীখে কাবীর, ইমাম বুখারী, রাবী নং- ৩০৭}
৩. তিনি সত্যবাদী। তার হাদীছ বিধিসম্মত। { আছ ছিকাত, ইজলী, রাবী নং- ২৪২}
৪. তিনি যঈফ।{ আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, ইমাম নাসাই, রাবী নং- ১৬৩}
৫. ইবনে মাইন বলেন, তার বর্ণিত হাদীছ কিছুই না। { আল জারহু ওয়াত তাদীল, রাবী নং- ১২০৮}
৬. ইমাম আবু যুরয়াহ তাকে দুর্বল বলেছেন। { ঐ}
৭. তার হাদীছ লেখা যাবে। তবে দলীল হিসেবে মানা যাবে না।{ ঐ}
৮. তার মাঝে দুর্বলতা বিদ্যমান। { আল কামিল, রাবী নং- ৫৪৩}
৯. তিনি যঈফ। { আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, ইমাম দারাকুতনী, রাবী নং- ১৭৪}
১০. তিনি যইফুল হাদীছ। {আল মুতালাফ ওয়াল মুখতালাফ, ১/ ৪২০}
১১. ইবনুল মাদিনী বলেন, আমি তার হাদীছ লিখি না। { আয যুয়াফাউল মাতরুকীন, ইমাম ইবনুল জাওযী, রাবী নং- ৭৪৪}
হাসান বিন যিয়াদঃ ( ১১৬- ২০৪)
১. ইবনে মাইন তাকে কাযযাব বলেছেন। ইবনু নুমায়ের বলেন, তিনি ইবনে জুরাইজের উপরে মিথ্যা বলতেন। আবু দাউদ তাকে কাযযাব এবং ছেক্বাহ নন বলেছেন। মুহাম্মাদ বিন রাফে' বলেন, এই লোক ইমামের আগেই রুকু হতে মাথা উঠাতেন এবং ইমামের আগেই সিজদায় যেতেন।
আবু সাওর বলেন, আমি তার চাইতে বড় কাযযাব আর দেখিনি। উসামা তাকে খবীছ বলেছেন। উকায়লী এবং সাজী তাকে কাযযাব বলেছেন। { লিসানুল মীযানের,২/ ২০৮,২০৯; নুরুল আইনাইন, এর বরাতে, পৃঃ ৩৯}
২. তার সাথে একজন সাধারণ লোকের কথোপথন হয় যা নীচে তুলে ধরলাঃ
প্রশ্নকারীঃ নামাজে জোরে হাসি দিলে তার নামাজের হুকুম কি হবে?
হাসান বিন যিয়াদঃ নামাজ বাতিল।
প্রশ্নকর্তাঃ ওযুর কি হবে?
হাসানঃ ওযু ভি গ্যায়া।
প্রশ্নকারীঃ যে নামাজে থাকাবস্থায় কোন সতী নারীকে যেনার অপবাদ দেয় তার হুকুম কি হবে?
হাসানঃ তার নামাজ বাতিল।
প্রশ্নকারীঃ ওযু?
হাসানঃ ওযু ভাংগবে না বরং ঠিক থাকবে।
প্রশ্নকর্তাঃ তার মানে আপনার নিকটে, নামাজে জোরে হাসা যেনার অপবাদ দেবার চাইতেও বেশী খারাপ কাজ?
হাসানঃ জুতা হাতে নিলেন এবং...... (বুইজ্জা লন) { আল কামিল, ২/ ৭৩২; মীযান, পৃঃ ২৯১; দাস্তান ই হানফী- এর বরাতে, পৃঃ ৯৩-৯৪}
৩. তিনি ছেক্বাহ নন। নির্ভর্যোগ্য নন। { আয- যুআফা ওয়াল মাতরুকীন, ইমাম নাসাই, রাবী নং- ১৫৬}
{ চলমান..... ইনশা আল্লাহ}
★★মাযহাব মানা কি ওয়াজিব? এ ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের মতামতঃ
(1.))##Shaykh Al-Islam Imaam Ibn Taymiyyah Says: “it is not obligatory on a layman to follow a Madhab”
#শায়খ উল-ইসলাম ইমাম ইবন তায়মিয়্যাহ বলেছেনঃ “সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয়” [Majmu’ah 20/116, 124-126]
(2. ))##Ibn al-Humam al-Hanafi says in his Tahrir : “Adhering to a particular Madhab is not obligatory, according to the correct opinion”
#ইবন আল-হুমাম আল-হানাফী বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা সঠিক মতামত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়” [Mukhtasar al-Tahrir 103]
(3.))##Ibn Muflih al-Hanbali, in al-Furu’, mentions the difference of opinion amongst the Malikis and Shafi’is, saying: “It not(following a madhab) being obligatory is the most famous opinion”. Al-Mardawi comments: “And this is the correct opinion”.
#ইবন মুফলিহ আল-হাম্বলী, মালিকি ও শাফেয়ীদের মধ্যে মতভেদ উল্লেখ করে বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা ওয়াজিব নয়, ইহাই সবচেয়ে বিখ্যাত মতামত”।
এবং তিনি মন্তব্য করেছেনঃ “এবং এটাই সঠিক অভিমত” [আল-ফুরু]
(4.))##Ibn al-Najjar al-Hanbali says: “A layman is not obliged to adhere to a Madhab”
#ইবন আন-নাজ্জার আল-হাম্বলী বলেছেনঃ “একজন সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব মানা ওয়াজিব(আবশ্যক) নয়”
(5.))##Ibn Qawan al-Shafi’i says in his al-Tahqiqat, “The truth is that it is not incumbent to adhere to a Madhab; Rather, a person should ask whoever he likes.
#ইবন কাওয়ান আল-শাফেয়ী তার আল-তাহকীকাত এ বলেছেনঃ “সত্য হলো মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যক নয়,বরং একজন ব্যাক্তির প্রয়োজন তাকে জিজ্ঞাসা করা, যাকে সে পছন্দ করে” [আল-তাহকীকাত]
(6. ))##Mulla ‘Ali al-Qari al-Hanafi says: “It is not obligatory upon anyone from the Ummah to be a Hanafi, or a Maliki, or a Shafi’i, or a Hanbali; rather, it is obligatory upon everyone, if he is not a scholar, to ask someone from Ahl al-Dhikr (people of knowledge), and the four Imams are from amongst the Ahl al-Dhikr.”
#মোল্লা আলী আল-কারী আল-হানাফী বলেছেনঃ “এই উম্মাহ(মুসলিম) এর কারো উপর এটি আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয় যে তাকে হানাফী,শাফেয়ী,মালিকী,হাম্বলী হতে হবে; বরং যদি কেউ আলেম না হয়(সাধারন মানুষ) তাহলে তার জন্য আবশ্যক(ওয়াজিব) যে, সে আলেমদের মধ্যে থেকে কাউকে জিজ্ঞাসা করবে, এবং চার ইমাম আলেমদের মধ্য হতেই” [ by Muhammad hayath al-Sindī pg. 33-34,, Dar Ibn hazm Beirut, 1st edition]
★নির্দিষ্ট ইমাম(মাজহাব) মানার ক্ষেত্রে ডাঃ জাকির নায়েকের মতঃ--
সাধারণের মধ্যে কেউ যদি বিশেষ কোনো ইমামের রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। (লেকচার সমগ্র,ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তি সমূহের জবাব,মুসলিমরা এত দলে বিভক্ত কেন?,পৃঃ-২৩৪) এখানে তিনি মাজহাবকে জাতীয় পরিচয় হিসাবে উল্লেখ্য করতে নিষেধ করেছেন কারণ এতে করে ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
অতএব আপনার নিকট প্রশ্ন মাজহাব মানা ফরজ??/সুন্নত??/ওয়াজিব??/না অন্য কিছু বোঝায় বা এর গুরুত্তইবা কতটুকো যা নিয়ে আজ আমরা মুসলীম শ্রেনী এতদলে উপদলে বিভক্ত???
তথাকথিত হানাফী মাযহাব নামধারী এক শ্রেনীর আলেম এবং তাদের মোকাল্লেদদের কাছে আমার প্রশ্ন,
যারা বলতেছেন- চার মাযহাবের যেকোনো একটি মাযহাব মানা ফরজ কিংবা ওয়াজিব ।এটা মানার নাকি ইজমা হইছে । আপনারা আরোও বলে থাকেন যে, চারটা মাযহাবের মতামত সঠিক, চার ইমামই হক্ব (সত্য) ।
তাহলে, আপনি কেন আহলে হাদিস বা সালাফী মতের অনুসারী লোকদের সমালোচনা করেন । যেমন-
√√ ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা পাঠ বিষয়-
1. ইমাম আবু হানাফী (রহঃ)এর মতে ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা পাঠ করা নাজায়েজ ।
2. ইমাম শাফেঈ (রহ
এর মতে ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা পাঠ করা ফরজ সর্বাস্থায় (উচ্চ
ক্বেরাতে হউক কিংবা চুপি ক্বেরাতে হউক) । ইমামের পিছুনে সূরা ফাতেহা পাঠ
না করলে মোক্তাদির নামাজ হবে না ।
3. ইমাম মালেক (রহ
এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ
এর মতে উচ্চ ক্বেরাত হলে ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা পাঠ করবে না
কিন্তু চুপি ক্বেরাত হলে ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা পাঠ করা ফরজ
।
>> "এখন আহলে হাদীসগন ইমাম শাফেঈ (রহ
এর মত মানেন । কারণ তারা মনে করেন, ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা
পাঠ করা ফরজ সর্বাস্থায় (উচ্চ ক্বেরাতে হউক কিংবা চুপি ক্বেরাতে হউক) ।
ইমামের পিছুনে সূরা ফাতেহা পাঠ না করলে মোক্তাদির নামাজ হবে না ।"
╔╗ এখন হানাফী মাযহাব নামধারী এক শ্রেনীর আলেম এবং তাদের মোকাল্লেদদের কাছে আমার প্রশ্ন -
◘ আহলে হাদীসগন ইমাম শাফেঈ (রহ
এর মত মানেন । তাহলে তাদের মতকে মিথ্যাচার মত বলে দাবি করেন ক্যান ?
যদি তাদের মতকে ভীত্তিহীন (ভুল) মত বলে দাবি করেন তাহলে ইমাম শাফেঈ (রহ
এর মতকে ভীত্তিহীন (ভুল) বলতে হবে !
◘ আর যদি ইমাম শাফেঈ (রহ
এর মতকে ভীত্তিহীন (ভুল) বলেন, তাহলে শাফীঈ মাযহাব মানার কোনো প্রশ্নই ওঠে না । তাহলে মাযহাব মানা ফরজ কিংবা ওয়াজিব হয় কিভাবে ?
আপনারা কেন এই দ্বী'মুখী আচারণ করেন?
♀ আর যদি চার ইমামই হক্ব (সত্য) হন । তাহলে আপনি কোন আহলে হাদিস বা সালাফী মতের বিরুদ্ধে কথা বলবেন না । কারণ আহলে হাদিস বা সালাফী মতেরর সাথে হাম্বলী মাযহাবের প্রায় ৯০% বেশি মতের মিল রয়েছে । বাকীটা অন্য মাযহাবের সাথে মিল রয়েছে ।
√√ এখানে শুধু একটি মত আলোচনা করা হয়েছে, আর যারা হাদীস পড়েন তারা জানেন এরকম আরো অসংখ্য মত আছে যেগুলো পরস্পর বিরোধী । এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে সহী হাদীসের অনুসারী হওয়া ।
√√ আর একটা কথা চার মাযহাবের যেকোনো একটি মাযহাব মানা ফরজ কিংবা ওয়াজিব, এটার পক্ষে ইজমা হওয়ার এপর্যন্ত কোনো দলিল পাই না ।
√√ আর যদি ইজমা হয়ে থাকে তাহলে কোন শহরে হইছে? আর কখন ইজমা হইছিল? কে কে পক্ষে ছিল? আর কে কে বিপক্ষে ছিল? তার বিস্তারিত দলিল দিবেন । শুধু মুখে দাবি করলেই ইজমা হয় না । কে কে পক্ষে ছিল? কে কে বিপক্ষে ছিল?
√√ আমি এমন অনেক হানাফী বড় বড় আলেমদের নাম বলতে পারব এবং তাদের কিতাবের পৃষ্ঠা নম্বর দিতে পারব, যারা কোনো একটি মাযহাবে তাকলীদ (অন্ধ অনুসরণ) করাকে হারাম বলেছেন ।
যেমন - হানাফী আলেমদের তাকলীদ বিরোধী ফতোয়া - তাকলীদ
+আল্লামা ইবনুল (হোম্মাম হানাফী - ফতহুল কাদীর ৩/২৪৭ পৃঃ
+শাহ অলীউল্লাহ এর বাংলায় অনুবাদ শির্ক ও বিদাআ বই তে ,
+ আবদুল আজিজ হানাফী এর ফতওয়াফে আজীজীয়ায়
+ আশরাফ আলী থানবী হানাফী তার আল এখতেছারে ২/২৪৭ পৃঃর পর থেকে ও ফতওয়াফে এমদাদীয়ার ভিতরে
+ মওঃ রুমী এর উপর দুই শত লানত করেছেন
⊙ ইমাম আবু হানীফা (রহ
বলেছেন-
1. "হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব" [আল হাশিয়া ১ম খন্ড ৬৩ পৃ: , রাসমুল মুফতী ১ম খন্ড ৪র্থ পৃ:]
2. "আমরা কোথা থেকে মাসআলা গ্রহণ করেছি , তা জানার আগ পর্যন্ত আমাদের বক্তব্য গ্রহণ করা কারুর জন্য জায়েয নয়" [ইবনু আবদিল বার - ১৪৫ পৃ: , ইবনু আবেদীন ৬ষ্ঠ খন্ড ২৯৩ পৃ: , আশ শা'রানী ১ম খন্ড ৫৫ পৃ: , ইবনুল কাইয়েম ২য় খন্ড ৩০৯ পৃ:]
⊙ ইমাম মালেক (রহ
বলেছেন-
1. "আমি মানুষ, ভুল-শুদ্ধ দুটোই করি। আমার রায় দেখ, যা কোরআন ও সুন্নাহর মোতাবেক তা গ্রহন কর এবং যা তার বিপরীত তা প্রত্যাখ্যান কর" [আল ফোলানী - ৭২ পৃ: , আল জামে- ইবনু আবদিল বার ২য় খন্ড ৩২ পৃ: , উসুলুল আহকাম- ইবনে হাযম ৬ষ্ঠ খন্ড ১৪৯ পৃ:]
2. "রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পর এমন কোনো ব্যক্তি নেই, যার কথা ও কাজ সমালোচনার ঊর্ধে । একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সমালোচনার ঊর্ধে" [আল জামে- ইবনু আবদিল বার ২য় খন্ড ৯১ পৃ: , উসুলুল আহকাম- ইবনে হাযম ৬ষ্ঠ খন্ড ১৪৫-১৭৯ পৃ: , ইরশাদুস সালেক- ইবনু আবদিল হাদী ১ম খন্ড ২২৭ পৃ:]
⊙ ইমাম শাফেঈ (রহ
বলেছেন-
1. "তোমাদের কারোর কাছ থেকে যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সুন্নাহ ছুটে না যায় । আমি যতো কিছুই বলে থাকি তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাদীসের পরিপন্থী হয়, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কথাই আমার কথা" [ইলামুল মোকেঈন ২য় খন্ড ৩৬৩-৩৬৪ পৃ: , তারীখে দিমাশ্ক- ইবনে আসাকির ইকায- ১০০ পৃ:]
2. "আমি যা বলছি তার বিপরীত যদি
রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কোনো হাদীস কারো নিকট বিদ্যমান থাকে, তাহলে আমি আমার জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থাতেই ঐ হাদীসের দিকে ফিরে আসবো" [হিলইয়া- আবু নাঈম ৯ম খন্ড ১০৭ পৃ: , আর হারওয়াবী - ৪৭ পৃ: , আল ফোলানী - ১০৪ পৃ: , ইলামুল মোকেঈন ২য় খন্ড ৩৬৩ পৃ:]
⊙ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ
বলেছেন-
1. "তোমরা আমার, ইমাম মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ এবং সুফিয়ান ছাওরীর তাকলীদ (অন্ধ আনুগত্য) করবে না । বরং তারা যে উৎস থেকে গ্রহণ করেছেন তুমিও সেই উৎস থেকে গ্রহণ কর" [আল ফোলানী - ১০৪ পৃ: , ই'লাম- ইবনুল কাইয়েম ২য় খন্ড ৩০২ পৃ:]
2. "আওযাঈ, ইমাম মালেক ও ইমাম আবু হানীফার রায় তাদের নিজস্ব রায় বা ইসতিহাদ । আমার কাছে এসবই সমান । তবে দলীল হল আছার অর্থাৎ সাহাবী ও তাবেঈগনের কথা" [আল জামে- ইবনু আবদিল বার ২য় খন্ড ১৪৯ পৃ:]
⊙ ইবনুল কাসেম (রহঃ) বলেছেন-
"আমি ইমাম মালেক এবং ইমাম লাইসকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্যের বিষয়ে আলোচনা করতে শুনেছি । তাঁরা বলেন, লোকেরা বলে, তাতে প্রশস্ততা ও উদারতা রয়েছে । আসলে সে রকম নয় । আসলে তা ছিল ভুল ও শুদ্ধ কাজ । [জামে বায়ানিল ইলম ২য় খন্ড ৮১-৮২ পৃ:]
✔✔ যঈফ (দূর্বল) হাদীস থেকে সাবধান, কারণ যঈফ (দূর্বল) হাদীস থেকে শুধু ধারণা পাওয়া যায় । যঈফ (দূর্বল) হাদীস সত্যি হতেও পারে আবার মিথ্যাও হতে পারে । সুতরাং যঈফ (দূর্বল) হাদীস বাদ দিয়ে সহীহ হাদীস মানতে চেষ্টা করুণ । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-
⊙ "তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক । শুধুমাত্ত ধারণার ভিত্তিতে কথা বলা সবচেয়ে বড় মিথ্যা" [বুখরী ও মুসলিম]
আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে বলেছেন-
⊙ "ধারণা সত্যের ব্যাপারে কোনো কাজে আসে না"
[সূরা আন নাজম-৫৩: ২৮]
✔✔ আমি একজন অতি সাধারন নিরপেক্ষ মনোভাবের মানুষ ।
আমার প্রথম পরিচয়, আমি একজন মুসলিম । কেবল মাত্র আল্লাহর কথা এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর থেকে সহীহ হাদীস অন্ধ ভাবে অনুসরণ করি । এছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা ইমামদের তাকলীদ (অন্ধ অনুসরন) করি না । তবে তাদের মধ্যে মতবিরোধ থাকা সত্তেও তাদের সকলকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করি ।
✔✔ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যদি কোনো সহীহ সুন্নাহ জানতে পারি যা আমার এতদিনের কর্মকান্ডের বিপরীত, তখনই আমি তা সংশোধন করে নিব, ইন-শা-আল্লাহ । কারণ আমি আল্লাহকে ভালোবেসে এবং ভয় করে এটা করব । এতে লজ্জার কিছু নাই
:মাযহাব থেকে এই ইমামদের সময়ের পার্থক্য হল ============================ ইন্নাল হামদাইল্লাহ, ওয়াস সলাতু ওয়াস সালামু আলা রসুলিহিল কারিম।
#মাযহাবের ইমামদের এবং #সিহাহ সিত্তার ইমামদের জন্ম ও মৃত্যুর সন ¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤ #ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর জন্ম ৮০ হিজরী। মৃত্যু-১৫০ হিজরী। ¤¤¤¤ #ইমাম মালিক রহঃ এর জন্ম-৯৩ হিজরী। মৃত্যু-১৭৯। ¤¤¤¤ #ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর জন্ম-১৫০ হিজরী। মৃত্যু-২০৪ হিজরী। ¤¤¤¤ #ইমাম আহমাদ বিন বিন হাম্বল রহঃ এর জন্ম-১৬৪, মৃত্যু-২৪১ হিজরী। ¤¤¤¤ [_ইমাম_আবু _হানীফা_রহঃ_এর_ছাত্র_ইমাম_আবু_ইউসুফ_রহঃ_এর_জন্ম_১১৩_হিজরী_এবং_মৃত্যু_১৮২_হিজরী_এবং_ইমাম_মুহাম্মদ_রহঃ_এর_জন্ম_১৩১_হিজরী_এবং_মৃত্যু_১৮৯_হিজরী_ ¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤ ¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤ #মুহাদ্দিসীনদের_জন্ম_ও_মৃত্যু ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী রহঃ এর জন্ম-১৯৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৫৬ হিজরী। ¤¤¤¤ #মুসলিম বিন হাজ্জাজ ইমাম মুসলিম রহঃ এর জন্ম ২০৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৬১ হিজরী। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ঈসা বিন সাওরা ইমাম তিরমিজী রহঃ জন্ম-২১০ হিজরী এবং মৃত্যু ২৭৯ হিজরী। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ ইমাম ইবনে মাজাহ রহঃ এর জন্ম-২০৯ হিজরী এবং মৃত্যু-২৭৩ হিজরী। ¤¤¤¤ #সুলাইমান বিন আসআস ইমাম আবু দাউদ রহঃ এর জন্ম- ২০২ হিজরী এবং মৃত্যু-২৭৫ হিজরী। ¤¤¤¤ #আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইমাম নাসায়ী রহঃ এর জন্ম ২১৫ হিজরী এবং মৃত্যু ৩০৩ হিজরী। #এই হল সিহাহ সিত্তার জন্ম ও মৃত্যুর সন। ##লক্ষ্য করুন যে, #আর_মাযহাব_প্রতিষ্ঠা_হয়_৪০০_হি:_এখন_যে_মুর্খ_বলবে_যে সিহাহ_সিত্তার ইমামরা_মাযহাব মানতেন_তার_মাথার_গরুর_গোবর_ছাড়া_কি_আছে???
মাযহাব থেকে এই ইমামদের সময়ের পার্থক্য হল #ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মৃত্যুর ১৫০-৪০০=২৫০ বছর পর জন্ম লাভ করেছে হানাফি মাযহাবের ¤¤¤¤ #ইমাম মালিক রহঃ এর মৃত্যু ১৭৯-৪০০=২২১ বছর পর জন্ম লাভ করেছে মালেকি মাযহাবের ¤¤¤¤ #ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর মৃত্যু ২০৪-৪০০=১৯৬ বছর পর জন্ম লাভ করেছে শাফি মাযহাবের ¤¤¤¤ #ইমাম আহমাদ বিন বিন হাম্বল রহঃ এর মৃত্যু ২৪১-৪০০=১৫৯ বছর পর জন্ম লাভ করেছে হাম্বলী মাযহাবের ¤¤¤¤ #মুহাদ্দিসীনদের_মৃত্যু কত পরে মাযহাবের জন্ম হয় তা নিচে #মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী রহঃ এর মৃত্যু ২৫৬-৪০০=১৪৪ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #মুসলিম বিন হাজ্জাজ ইমাম মুসলিম রহঃ এর মৃত্যু ২৬১-৪০০=১৩৯ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ঈসা বিন সাওরা ইমাম তিরমিজী রহঃ এর মৃত্যু ২৭৯-৪০০=১২১ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ ইমাম ইবনে মাজাহ রহঃ এর মৃত্যু ২৭৩-৪০০=১২৭ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #সুলাইমান বিন আসআস ইমাম আবু দাউদ রহঃ এর মৃত্যু ২৭৫-৪০০=১২৫ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইমাম নাসায়ী রহঃ এর মৃত্যু ৩০৩-৪০০=৯৭ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ [অতিরিক্ত তথ্য_ #ইমাম ইবন খুজাইমা(রহ) (মৃত্যু- ৩১১ হিজরি) ¤¤¤ #ইমাম তহাবী(রহ) (মৃত্যু- ৩২১ হিজরি) ¤¤¤ #ইমাম তাবারানী(রহ) (মৃত্যু- ৩৬০ হিজরি) ]
ইমাম বুখারী নাকি শাফেয়ী মাযহাব মানতেন !!!! এ কথা ইমাম বুখারী তার কোন কিতাবে লিখে গেছেন ? ইমাম বুখারির কতিপয় অমুল্য ও অদ্বিতীয় কিতাবের নাম দিলাম যার কোথাও তিনি মাযহাব মানার কথা বলেন নি--: ১. আল জামে আস সহিহ তথা বুখারি শরীফ। ২.রফউল ইদাইন। ১৯৮ টা হাদিস এনেছেন রফউল ইদাইনের পক্ষ্যে। ৩.খালকু আফআলিল ইবাদ। ৪.যুজউ কিরাতে খলফাল ইমাম।ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পড়ার পক্ষ্যে বিষদ আলোচনা করেছেন এই বইতে। ৫. কিতাবুয যুআফা ওয়াল মাতরকিন। ৬. তারিখুল কাবীর। ৭. তাফসিরুল কাবীর। ৮. কিতাবুল কুনা । ৯. কিতাবুল ওয়াহদান । ১০.কিতাবুল মাবসুত। ১১. কাযাইয়া সাহাবা। ১২. কিতাবুল হিবাহ। ১৩. আসামিস সাহাবা। ১৪. আল মাশীখাহ। ১৫. কিতাবুল ইলাল। ১৬. বির্রুল ওয়ালিদাইন। ১৭. কিতাবুর রিকাক। ১৮. বাদউল মাখলুকাত। ১৯. কিতাবুল ফাওয়াইদ। ২০. কিতাবুল আশরিবাহ। ২১. তারিখুস সাগীর। ২২. আদাবুল মুফরাদ।]
হানাফী মাযহাবের ভাইয়েরা আহলে হাদীসদের বিরোধীতা করতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই অন্যান্য মাযহাবের বিরোধীতা করছেন তা তাদের মগজে ঢুকে না। আহলে হাদীসরা যেসব আমল করেন তা কোন না কোন মাযহাবের আমলের সাথে অবশ্যই মিল আছে।
যেমনঃ জুরে আমিন বলা, বুকে হাত বাঁধা, রাফউল ইয়াদাইন করা, ইমামের পিছনে সুরা ফাতেহা পড়া ইত্যাদি বেশির ভাগ মাস'আলার সাথে হানাফী মাযহাব বাদে বাকী তিন মাযহাব অর্থাৎ মালিকি, শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাবের মাস'আলার সাথে বেশির ভাগ মিল আছে। তাহলে কেন বিরোধীতা করেন? না কি আপনাদের মনের ভিতর ঐসব মাযহাবের প্রতি হিংসা আছে কিন্তু সরাসরী বলতে পারেন না তাই আহলে হাদীসের কাঁধে বন্দুক রখে শিকার করতে চান?
অনেক গজে উঠা হুজুরদের দেখা যায় তারা বড় বড় ফুটপাতের ডাক্তারের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন। জুরে আমিনের, বুকে হাত বাঁধার, রাফউল ইয়াদাইন করার এগুলি রাসুল(সাঃ) এর সুন্নত নয়। আহলে হাদীসরা কোথায় পেল ইত্যাদী বলে বেড়ান। আর তাদের জাহিল অনুসারীরা একবার ও চিন্তা করেন না যে, যেসব হুজুর বলতেছেন চার মাযহাব হক বা সঠিক কিন্তু আবার আহলে হাদীসদের আমল কোন না কোন মাযহাবের আমলের সাথে মিল আছে তার পরও হুজুরগণ বিরোধিতা করেন কেন? এটা তো আহলে হাদীসদের বিরোধিতা হচ্ছে না। এটা তো ঘুরে ফিরে অন্যান্য হক মাযহাবের বিরোধিতা হয়ে যাচ্ছে।
জুরে আমিন বললে, রাফউল ইয়াদাইন করলে, বুকে হাত বাঁধলে অন্যান্য মাযহাবের দোষ হয় না কিন্তু আহলে হাদীসরা করলে দোষ হয়ে যায় তা ইনসাফের কথা হলো কি করে?
এই সব আমল করা যদি সুন্নত হয় তাহলে আহলে হাদীসরা করলে সমস্যা কি? আর যদি সুন্নত না হয় তাহলে অন্যান্য মাযহাব কি সুন্নত বিরোধি আমল করতেছে? তাহলে চার মাযহাব সঠিক নয় কি?
মাযহাব বড়, নাকি সুন্নত বড়?
=====================
►হানাফী মাযহাব মতে মেয়েরা তাদের ‘ওয়ালী’ ছাড়া বিয়ে করলে বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বালি – এই ৩ মাযহাব মতে মেয়েদের ওয়ালী ছাড়া বিয়ে বাতিল। তাদেরকে নতুন করে মেয়ের ওয়ালী নিয়ে বিয়ে করতে হবে, নয়তো তারা স্বামী স্ত্রী হিসেবে বসবাস করতে পারবেনা।
► হানাফী মাযহাব মতে রাতের শেষ বিতির নামায ৩ রাকাত, এর কম বা বেশি কোনোটাই পড়া যাবেনা এবং তাদের মতে ১ রাকাত কোন নামায-ই শুদ্ধ নয় অথচ অন্য মাযহাব অনুযায়ী বিতির নামায ১, ৩, ৫, ৭ রাকাত পড়া যাবে।
► হানাফী মাযহাব মতে মাগরিবের ফরয নামাযের আগে দুই রাকাত নামায পড়া যাবেনা, এই নামায পড়লে কোন সওয়াব পাওয়া যাবেনা। অন্য মাযহাব অনুযায়ী মাগরিবের ফরয নামাযের আগে ২ রাকাত নামায পড়া যাবে।
► হানাফী মাযহাব মতে জামায়াতে ফজরের ফরজ সালাত আরম্ভ হয়ে গেলেও আগে সুন্নাত পড়েত হবে, অথচ সহীহ হাদীসে আছে ইকামত হয়ে গেলে কোন সালাত নাই।
► হানাফী মাযহাব মতে জামায়াতে সালাতের সময় সুরা ফাতেহা পড়তে হবে না, অথচ অন্য মাযহাব ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী সুরা ফাতেহা ছাড়া সালাত হয় না।
► হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নারীরা ঈদের দুই রাকাত নামাজ পড়তে পারবেনা, তাদের জন্য ঈদের মাঠে যাওয়া ঠিকনা। সহীহ হাদীস ও অন্য মাযহাব মতে নারীদেরকে ঈদের মাঠে নিতে হবে, তাদের মতে নারীদেরকে ঈদের মাঠে নিয়ে যাওয়া ‘ওয়াজিব’!
► হানাফী মাযহাব মতে কোন লোক মৃত স্ত্রী লোকের অথবা চতুষ্পদ জন্তুর স্ত্রী অঙ্গে বা অন্য কোন ভাবে সিয়ামরত অবসন্থায় ধর্ষণ করে তাহেল তার সিয়াম নষ্ট হবে না, অথচ সহীহ হাদীসে আছে যেকোন প্রকারে বীর্য বের হলেই সিয়াম ভেঙ্গে যায়।
► হানাফী মাযহাব মতে বাদশাহ যদি যিনা করে তার কোন হদ বা শাস্তি নেই অথচ সহীহ হাদীসে জিনার সাস্তির অধ্যায়ে বাদশাহ এর জন্য কোন ছাড় দেওয়া হয় নাই!
মাযহাবের প্রায় ৯৫টি সহীহ হাদীস বিরোধী ফতোয়া থেকে আমি উপরে ৭টি মাত্র উল্লেখ করলাম। এখন জ্ঞানী ভাই ও বোনদের কাছে আজকে আমাদের প্রশ্নঃ
উপরের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আপনারা কার কথা মানবেন? মাযহাবের নাকি সহীহ হাদীসের?
আর যারা বলছেন ৪ মাযহাবই ঠিক, তাহলে কিভাবে ৪টা মাযহাবই এক সাথে ঠিক হয়?
এখানে একদল আরেকদলের ফতোয়াই মানছেন না। হানাফীরা বলতেছে ওয়ালী ছাড়া বিয়ে হবে, বাকি ৩ মাযহাব বলতেছে বিয়ে হবেনা, সেটা জিনা-ব্যভিচার হবে। হানাফীরা বলেছে ১ রাকআত কোন সালাত জায়েজ নাই, অথচ অন্য মাযহাবীরা দেদারছে ১ রাক’আত বিতর আদায় করছেন। মেয়েদের মসজিদে যাওয়া হানাফীরা নাজায়েজ বলেন, অথচ অন্য মাযহাবীরা মেয়েদের জন্য আলাদা ফ্লোর পর্যন্ত তৈরী করছেন, ইত্যাদি কত উল্টা চিত্র এক মাযহাবের সাথে আর এক মাযহাবের!
এসকল ক্ষেত্রে কি করে ৪ মাযহাব-ই কে সাথে ঠিক থাকলো?
এইরকম আরও বহু বিষয় আছে, এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ। চিন্তাশীলদের জন্য আমি কয়েকটি তুলে ধরলাম মাত্র।
এরপরও আপনারা চিন্তাভাবনা না করেই যদি বলেন,
“এইটা ঠিক, ঐটাও ঠিক” -তাহলে তা হবে ইসলামী শরীয়ত নিয়ে ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়!
মাজহাব মানা কি ফরজ?
হানাফ এর মত অনুযায়ী: - “মাজহাব মানা ওয়াজিব বা ফরজ।”
-- যাক আসুন মূল কথায় যাই।
=> আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর সাথে সব সময় সব সাহাবী থাকতেন
না। কেউ নবীর (সাঃ) থেকে একটা হাদিসের
বাণী শুনলে সেটা পৌছে দিতেন অন্যের নিকট। যেমন আবু
হুরাইরা (রাঃ)নবীজি (সাঃ) এর অনেক বাণী পৌছে দিয়েছেন অন্যান্য
সাহাবীদের নিকট। যেমন বিদায় হজ্বের সময় ১ লাখেরও
বেশী সাহাবী ভাষন শ্রবণ করেছেন। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন
দেশে ছড়িয়ে গিয়েছেন।
=> ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) জন্ম গ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরীতে।
তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর যতগুলো হাদিস পেয়েছেন [ইমাম আবু
হানিফা (রহ
সর্বমোট ১৩,০০,০০০ লক্ষ হাদীস
সংগ্রহকারী ছিলেন]এবং সংরক্ষণ করেছেন সেগুলোর উপর
ভিত্তি করেই ফতোয়া দিয়েছিলেন। অধিকন্তু বলা যায় যে, যেহেতু
তিনি সকল সাহাবাদের হাদিস সংগ্রহ করতে পারেন নাই, সকল
সাহাবাদের সাক্ষাত পান নাই এবং যেহেতু হাদিস এর ধারক
সাহাবারা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন তাই
তিনি যতগুলো হাদিস পেয়েছেন তার উপরেই ফতোয়া দিয়েছেন।
তাই এরই প্রেক্ষাপটে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মূল কথা ছিলঃ-
"ইযা সহহাল হাদিসু ফা হুয়া মাজহাবা" অর্থ্যাৎ বিশুদ্ধ হাদিস
পেলে সেটাই আমার মাজহাব বা মতামত।
(তথ্যসূত্র: ১/৬৩ ইবনু আবিদীন এর হাশিয়া, পৃঃ ৬২ ছালিহ আল-
ফাল্লানীর, ১/৪৬ শামী)।
ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল হে শায়খ, যদি এমন
সময় আসে যখন আপনার কথা কোন সহীহ হাদিসের
বিপরীতে যাবে তখন আমরা কি করব?
তিনি উত্তরে বলেছিলেন, তখন তোমরা সেই সহীহ হাদিসের উপরই
আমল করবে এবং আমার কথা প্রাচীরে/দেয়ালে নিক্ষেপ করবে।
=> ১৩৫ হিজরিতে জন্মগ্রহন কারী ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এর
বক্তব্য হলো,
তোমরা যখন আমার কিতাবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাহ
বিরোধী কিছূ পাবে তখন আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত
অনুসারে কথা বলবে। আর আমি যা বলেছি তা ছেড়ে দিবে। (৩/৪৭/১
আল হারাবীর, ৮/২ খত্বীব, ১৫/৯/১ ইবনু আসাকির, ২/৩৬৮ ইবনু
কাইয়িম, ১০০ পৃঃ ইহসান ইবনু হিব্বান)।
=> ৯৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ কারী ইমাম মালেক রহঃ এর বক্তব্যও
একই।
ইমাম মালেক বিন আনাস (রহঃ) বলেছেন, আমি নিছক একজন মানুষ।
ভূলও করি শুদ্ধও বলি। তাই তোমরা লক্ষ্য করো আমার অভিমত/
মতামত/মাজহাব এর প্রতি। এগুলোর যতটুকু কোরআন ও সুন্নাহ এর
সাথে মিলে যায় তা গ্রহণ করো আর যতটুকু এতদুভয়ের সাথে গরমিল
হয় তা পরিত্যাগ করো। (ইবনু আবদিল বর গ্রন্থ (২/৩২)।
=> ১৬৪ হিজরীতে জন্মগ্রহনকারী ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল
রহঃ ছিলেন ১০ লক্ষ হাদিসের সংগ্রহ কারী। সবচেয়ে বেশী হাদিস
উনার মুখস্থ ছিল এবং উনার সংগ্রহে ছিল। উনার লিখিত গ্রন্থ
মুসনাদে আহমাদ এ মাত্র ২৩০০০ এর মতো হাদিস লিপিবদ্ধ আছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সকল ইমামই কোরআন ও সহীহ হাদিস
মেতে নিতে বলেছেন। কিন্তু কেউ যদি বলেন মাজহাব
মানতে তাহলে এই মুসলিম জাতি কখনো এক হতে পারবে না।
সকলে দলে দলে বিভক্ত হয়ে যাবে যেমন হানাফী, শাফেঈ, হাম্বলী,
মালেকী, শিয়া, সুন্নী, কুর্দি, দেওবন্দী, বেরলভী ইত্যাদি।
উপরের যতগুলো গ্রুপে মুসলিমরা ভাগ হয়েছেন তার একটাই কারণ
মাজহাব বা মতামতকে তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণ করা। প্রত্যেক
গ্রুপই তাদের ইমামদের, বুজুর্গদের মাজহাব বা মতামতকে প্রাধান্য
দিয়ে গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়েছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দল
নিয়ে সন্তুষ্ট।
এখন দেখেন যারা ইমামদের তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণ করে নিজ নিজ
দল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে যেমন হানাফী, শাফেঈ, আহলে হাদিস
ইত্যাদি এবং কোরআন ও সহীহ হাদিস ত্যাগ করে, তাদের ব্যাপার
আল্লাহ কি বলেছেনঃ-
(হে নবী) আপনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হবেন না যারা দ্বীনের
মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ে যায়,
যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে সন্তুষ্ট। [সূরা রুম-৩১-৩২]
এই আয়াতে আল্লাহ তাদের মুশরিক বলে আখ্যায়িত করেছেন
যারা কোরআন ও সহীহ হাদিস ছেড়ে ইমামদের আলেমদের
বুজুর্গদের তাকলীদ করে তাদের। যেমন শীয়ারা। এক্ষেত্রে বলা যায়
যে, অনেকেই আবার আহলে হাদীসদেরকে শিয়া বলে অভিহিত করেন
কিন্তু এটা নিতান্তই ভুল। যাই হোক, শিয়ারা তাদের বুজুর্গদের
মাজহাব বা মতামতকে কঠোরভাবে মানে। বুঝতে চায়
না কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। এ কারনেই মহান আল্লাহ
সুবহানুতালা পবিত্র করআনে বলেছেনঃ-“যারা দ্বীনকে খন্ড বিখন্ড
করে, দলে দলে বিভক্ত হয় তাদের সাথে (হে নবী) আপনার কোন
সম্পর্ক নাই। [সূরা আনআম-১৫৯]”
এই আয়াতে যারা দলে দলে বিভক্ত হয় তাদের সাথে নবীর সম্পর্ক
না থাকার কথা বলা হয়েছে। যাদের সাথে নবীজি (সাঃ)এর সম্পর্ক
নাই তাদের সাথে আমাদের মুসলিমদেরও কোন সম্পর্ক নাই।
মুসলিম উম্মাহর মধ্যেও কেউ কেউ যদি দলে দলে বিভক্ত হন,
ইমামদের তাকলীদ করেন, তাহলে তাদের সাথেও নবীজি (সাঃ) এর
সম্পর্ক থাকবে না। আর যার সাথে নবীজি (সাঃ) এর সম্পর্ক নাই,
তার সাথে আমাদের সম্পর্কের তো প্রশ্নই উঠে না।
যারা কোরআন ও সহীহ হাদিস মেনে নিতে রাজি আছেন
তারা আমাদের মুসলিমদের দ্বীনি ভাই। আর যদি কেউ না মেনে নেন
তাহলে এই আয়াতটা তাদের জন্য –
যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ (কোরআন ও হাদিস অমান্যের
মাধ্যমে) করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব
মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব
যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।
আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। [সূরা নিসা-৪:১১৫]
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ্ পাকের। আসুন আমরা মাজহাবের
নামে বিভক্ত না হয়ে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ
করি যাতে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করতে পারি।
>>>> ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) কি সত্যিই তাবেঈ ছিলেন? <<<<
>>>> “অথবা” চার ইমাম কি সাহাবায়ে কিরামকে দর্শন করেছেন?
<<<<
দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে আমাদের সমাজে অনেক আলেম-উলামা -
সাধারন অসাধারন ব্যক্তিগন ইমামদের নামে অনেক
মিথ্যা রচনা করে থাকেন। ঠিক তেমনি একটি বহুল প্রচারিত
মিথ্যা কথা “চার ইমামের অনেকে সাহাবায়ে কিরামকে দর্শন
করে ধন্য হয়েছিলেন।“কথাটা সম্পূর্ন মিথ্যা। চার ইমাম হলেন ইমাম
আবূ হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহ্মাদ বিন
হাম্বল। ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম মালেক সমকালীন। কিন্তু কেউ
সাহাবাদের মধ্য হতে কাউকে দেখেন নাই, কারো সাথে সাহাবার
সাক্ষাত হয় নাই।
ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আল খতীব বলেন -
১।. ইমাম আবু হানীফা জীবিত অবস্থায় চার জন
সাহাবা বেঁচে ছিলেন।
(ক) আনাস বিন মালিক (রাঃ) (মৃত্যুঃ ৯১ হিজরী) বসরাতে।
(খ) আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা (রাঃ) (মৃত্যুঃ ৮৭ হিজরী) কুফাতে।
(গ) সাহাল বিন সায়াদ সায়েদী (রাঃ) (মৃত্যুঃ ৯১ হিজরী) মদীনাতে।
(ঘ) আবু তোফায়েল আমের বিন অসেলা (রাঃ) (মৃত্যুঃ ১১০ হিজরী)
মক্কাতে।
ইমাম আবূ হানীফা কারো সাথে সাক্ষাত করেন নাই
এবং কারো নিকট হতে হাদীসও শিক্ষা করেন নাই। (আল আক্মাল
ফি আসমাউর রেজাল মায়া মেশকাত পৃঃ ৬২৪)
ইমাম আবু হানীফার জন্ম ৮০ হিজরী মৃত্যু ১৫০ হিজরীতে।
(ক) আনাস বিন মালিক (রাঃ) যখন মারা যান তখন ইমাম আবু
হানিফার বয়স (৯১-৮০)= ১১ বৎসর। এই ১১ বৎসর সাহাবা আনাস বিন
মালিকের (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাতের প্রশ্নই উঠে না।
(খ) আব্দুল্লাহহ বিন আবী আওফা (রাঃ) যখন মারা যান তখন ইমাম
আবু হানিফার বয়স (৯৮৭-৮০)= ৭ বৎসর। সাক্ষাতের প্রশ্নই
উঠে না।
(গ) সাহাল বিন সায়াদ সায়েদী (রাঃ) যখন মারা যান তখন ইমাম আবু
হানিফার বয়স (৯১-৮০) = ১১ বৎসর।
(ঘ) আবু তোফায়েল আমের বিন অসেলা (রাঃ) যখন মারা যান তখন
ইমাম আবু হানিফার বয়স (১১০-৮০) = ৩০ বৎসর। আবু তোফায়েল
(রাঃ) সাথে সাক্ষাত হতে পারত, কিন্তু তিনি ইমাম আবু
হানিফা সাক্ষাত করেন নাই।
২। ইমাম মালেকের (রহঃ) কর্মময় সময় বেঁচেছিলেন মাত্র একজন
সাহাবী, যার নাম আবু তোফায়েল (রাঃ)।. তিনি মক্কায় বসবাস
করতেন। তিনি যখন মারা যান তখন ইমাম মালেকের বয়স (১১০-৯৫)
= ১৫ বৎসর। ইমাম মালেক মদীনা হতে হজ্জের কাফেলার
সাথে রওনা করেন এ সাহাবার সাথে সাক্ষাত ও হজ্জের উদ্দেশ্যে।
তারা পথিমধ্যে থাকা অবস্থায় আবু তোফায়েল (রাঃ) মারা যান।
ইমামের সাথে আবু তোফায়েল (রাঃ) সাথে সাক্ষাত হয় নাই।
৩। ইয়ামা শাফেয়ীর জন্ম ১৫০ হিজরীতে। অতএব, সকল সাহাবাগণ
তার জন্মের পূর্বে মারা যান।
৪। ইমাম আহ্মাদ বিন হাম্বল জন্ম গ্রহণ করেন ১৬১ হিজরীতে।
তার সকল সাহাবাগণ তার জন্মের পূর্বে মারা যান।
আশা করি বিষয়টি সবার কাছে তুলে ধরতে পেরেছি এবং সবাই
বুঝতে পেরেছেন।
>>>> কোন ইমামের ব্যক্তিগত ফতোয়ার
করনে ইসলামকে খাটো করে দেখবেন না। <<<<
আজ আমরা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে পবিত্র ইসলামকে কলুষিত
করছি। অমুসলিম ভাইরা ভাবছে, এই নাকি ইসলাম? তারা হাসছে,
ধিক্কার দিচ্ছে আর রাসূল (সঃ) কে জঘন্য ভাষায় গালি গালাজ করছে,
কুরআনকে অবমাননা করছে। আপনাদের
সামনে একটি বিষয়ে তুলে ধরছি যাহা ইসলামে জঘন্য হারাম কাজ।
অথচ আমরা না জেনে না বুঝে ইসলামকে কত ছোট করি!
কয়েকটা উদাহরন নিম্নে তুলে ধরলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার
হবে ইনশাল্লাহ।
এক মজলিসে প্রদত্ত তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে হালালার
নামে গোপন যিনাঃ
“হালালা’ আল্লাহ তা’আলার নাফরমানিমূলক অপকর্ম- যাকে শরীয়ত
সিদ্ধ বলে বিশ্বাস করা একটি শয়তানি উত্তেজনা এবং লাঞ্ছনামূলক
আচরণ। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সঃ)
হালালাকারী ব্যক্তিকে “ভাড়াটিয়া পাঁঠা” বলে আখ্যায়িত করেছেন
এবং হালালা বিবাহকে আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের হাদীসের
সাথে উপহাস ও বিদ্রুপ বলে মন্তব্য করেছেন। ইবনু মাজাহ
শরীফে একটি হাদীস বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেন-
“আমি কি তোমাদের ভাড়াটিয়া পাঁঠা সম্বন্ধে অবহিত করব না?
সাহাবগণ আরজ করলেন, জি হাঁ আল্লাহর রাসূল। রাসূল (সাঃ)
বললেন, যারা শুধু তিন তালাক দাতা স্বামীর জন্য তার তিন তালাক
প্রদত্ত স্ত্রীকে হালালা করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্ষণিকের জন্য
বিবাহ করে।”
আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে হালালাকারী ব্যক্তিগণ
সম্বন্ধে জিজ্ঞেসা করা হলে তিনি বলেন, “উভয়ই জিনাকার”। ওমর
ফারুক (রাঃ) বলতেন, “হালালাকারী এবং যার জন্য হালালা করা হয়
এমন ব্যক্তিদ্বয়কে আমার সামনে উপস্থিত করা হলে আমি তাদের
উভয়কে রজম তথা প্রস্তর খন্ড ছুড়ে মেরে খতম করে দিব।
(বিস্তারিত দেখুন ইগাসাতুল লাহফান)
তাই গভীর দুঃখ বেদনা নিয়ে- মুহাদ্দিস গুরু প্রখ্যাত ইমাম জনাব
ইবনে কুতায়বা (রহঃ) স্বীয় কিতাবুল মায়ারিফ
গ্রন্থে যা সন্নিবেশিত করেছেন- তার শেষ ছত্রটি এই আবূ হানিফার
ফতওয়ার ভিত্তিতে কতনা সতী সাধ্বীর হারাম গুপ্তাঙ্গ হালাল
করা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। (দেখুন আল মায়ারিফ মিসর মুদ্রিত ও
হাকিকাতুল ফিকাহ ১৭০ পৃঃ, বিস্তারিত দেখুন তালাকের নিয়ম বিধান-
শায়খ আবূ নুমান আঃ মান্নান)
>>>> সহীহ দলীল ছাড়া ফতওয়া গ্রহণ করা হারাম তার প্রমাণ
<<<<
মহান আল্লাহপাক তাঁর পবিত্র কোরআনে বলেন, “আপনার পূর্বেও
আমি প্রত্যাদেশসহ মানবকেই তাদের প্রতি প্রেরণ করেছিলাম।
অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেসা কর, যদি তোমাদের জানা না থাকে;
প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে নির্দেশাবলী ও অবতীর্ণ গ্রন্থসহ
এবং আপনার কাছে আমি স্মরণিকা অবতীর্ণ করেছি,
যাতে আপনি লোকদের সামনে ঐসব বিষয় বিবৃত করেন,
যেগুলো তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা-
ভাবনা করে।” (সূরা নাহাল ৪৩-৪৪)
ইয়াহুদি ও নাসারগণ তাদের আলেম ও দরবেশগণকে আল্লাহ
বানিয়ে নিয়েছে- (সূরা আত-তওবাহ ৩১ আঃ)। অর্থাৎ তাদের আলেম
ও দরবেশগণ যাই বলে তা-ই তারা অন্ধভাবে গ্রহণ করে।
তারা জানতে চায়না যে উল্লেখিত বিষয়ে আল্লাহর কি হুকুম
এবং তার রাসূলের কি হুকুম।
ইমাম ইবনে হযম (রহঃ) লিখেছেন, তাকলীদ অর্থাৎ অন্ধ অনুসরণ
হারাম- (নজবুল কাফিয়াহ গ্রন্থে দেখুন)। ইমাম মালিক (রহঃ)
বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) ব্যতীত অন্য সকলের
কথা সম্বন্ধে জিজ্ঞেসাবাদ করা যাবে।
বিনা বিচারে দলিলে কারো উক্তি গ্রহণীয় হবে না- (হুজ্জাতুল্লাহ)।
ইমাম আবূ ইউসুফ, যোফার ও আকিয়াহ বিন যয়দ হতে বর্ণিত-
তারা বলতেন যে, কোন লোকের জন্য
আমাদে কথা দ্বারা ফতোয়া দেয়া হালাল নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত
আমরা কোথা হতে বলেছি তা তারা অবগত না হবে। (ইকদুল ফরিদ
গ্রন্থের ৫৬ পৃষ্ঠা)।
এখানে একটু আলোচনা না করলে পাঠকগণ হয়তো ভাবতে পারেন
আমি ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর ফতওয়াকে ছোট করে দেখছি।
আসুন দেখি ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) সকল মাসায়ালা সঠিক ছিল
কি-না।
০১) যে কোন ভাষায় নামাযের সূরা (কেরআত) পড়লে ইমাম আবু
হানিফার মতে উত্তম যদিও সে ব্যক্তি আরবী ভাষা জানে। কিন্তু
ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে তা নাজায়েয।(হিদায়ার
১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ১০২ পৃষ্ঠা)।
০২) আল্লাহ তা’আলা কুরআনে যে সকল মেয়েদেরকে বিবাহ
করা হারাম করেছেন সে সকল মেয়েদেরকে কেউ বিবাহ করলে ও
যৌন ুধা মিটালে ইমাম আবূ হানিফার মতে কোন হদ (শাস্তির)
প্রয়োজন নাই। কিন্তু ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের
মতে হদ দিতে হবে। (হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম
খন্ডের ৫১৬ পৃষ্ঠা)।
০৩) রোগ মুক্তির জন্য হারাম জানোয়ারের প্রস্রাব পান
করা ইমাম আবূ হানিফার মতে হারাম কিন্তু ইমাম আবূ ইউসুফ ও
ইমাম মুহাম্মাদের মতে হালাল।(হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ
ছাপার ১ম খন্ডের ৪২ পৃষ্ঠা)।
০৪) কুয়ার ভিতর ইঁদুর পড়ে মরে গেলে ঐ কুয়ার পানি দ্বারা অযু
করে নামায পড়লে ইমাম আবু হানিফার মতে নামা হবে কিন্তু
শাগরেদদ্বয়ের মতে নামায হবে না।(হিদায়ার ১৪০১
হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ৪৩ পৃষ্ঠা)।
০৫) কোন ব্যক্তি যদি কো স্ত্রীর মল দ্বারে যৌন ুধা মিটায়
তবে ইমাম আবূ হানিফার মতে কোন কাফফারার (শাস্তির)
প্রয়োজন নেই। কিন্তু ইমাম মুহাম্মাদের মতে কাফফারা দিতে হবে।
(হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ৫১৬ পৃষ্ঠা)।
০৬) ইমাম আবূ হানিফার মতে ছায়া দ্বিগুণ হওয়ার পর হতে আসরের
নামাযের সময় আরম্ভ হয় কিন্তু ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম
মুহাম্মাদের মতে ছায়া একগুণ হওয়ার পর হতেই আসরের সময়
আরম্ভ হয়।(হিদায়ার ১২৯৯ হিঃ৯মোস্তফায়ী ছাপার ১ম খন্ডের ৬৪
পৃষ্ঠা)।
০৭) ফারসি ভাষায় তাকবীর বলে নামায পড়া ইমাম আবূ হানিফা ও
আবূ ইউসূফের মতে জায়েয, কিন্ত ইমাম মুহাম্মাদের মতে নাজায়েয।
(হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ১০১ পৃষ্ঠা)।
০৮) খেজুর ভিজানো পানি যাতে ফেনা ধরে গেছে এরূপ পানিতে অযু
করা ইমাম আবূ হানিফার মতে জায়েজ কিন্তু ইউসুফের মতে হালাল
নয়।(হিদায়ার ১২৯৯ হিঃ মোস্তফায়ী ছাপার ১ম খন্ডের ৩০ পৃষ্ঠা)।
০৯) ইমাম আবূ হানিফার মতে নামাযে সিজদার সময় নাক
অথবা কপাল যে কোন একটি মাটিতে ঠেকালেই নামায হবে। কিন্তু
মুহাম্মাদের মতে জায়েয হবে না। নাক কপাল দুটোকেই ঠেকাতে হবে।
(হিদায়ার ১২৯৯ হিঃ মোস্তফায়ী ছাপার ১ম খন্ডের ৯০ পৃষ্ঠা)।
পাঠকগণ এমন ৬১ টি মতবিরোধ হিদায়া কেতাবে রয়েছে যাহা সব
সময়ের অভাবে টাইপ করতে পারলাম না। এই মতবিরোধ
থেকে বোঝা যায় ইমাম আবু হানিফা ভুলের উর্দ্ধে ছিলেন না।
ওনাদের সময় সহীহ হাদীস সংকলন করা ছিল না তাই বেশীর ভাগ
সমস্যাই ইজমা-কেয়াস আর যুক্তি দ্বারা সমাধান করতেন।
অবশেষে এ সংকটময় অবস্থায় চার ইমাম সাহেবই নিজ নিজ
অনুসারীদেরকে বলে যান,
“আমি যে ফয়সালা দিয়েছি ভবিষ্যতে যদি সহীহ হাদীস সংকলিত হয়
এবং আমার ফয়সালা সহীহ হাদীসের পরিপন্থী হয়, তা হলে আমার
ফয়সালা পরিত্যাগ করে সহীহ হাদীসের অনুসরণ করবে।”
এর পরেও যদি কেউ অন্ধ গোঁড়া স্বভাবের হয় তাহলে আবু হানিফার
নিম্ন ফতোয়াগুলিও অবশ্যই মানবেন। কারণ এগুলো বিখ্যাত
হিদায়া ও অন্যান্য ফতোয়ার বই হতে সংকলিত। এখানে ভুল হবার
কোন আশংকা নাই। যদি এই ফতোয়াগুলো অস্বীকার করেন
তাহলে হিদায়াকেই অস্বীকার করতে হবে অথচ হিদায়া সম্পর্কে এমন
কথা বলা আছেঃ “নিশ্চয় হিদায়া কিতাবখানা নির্ভুল পবিত্র
কুরআনের মত। নিশ্চয় এটা তার পূর্ববর্তী রচিত শরিয়তের সকল
গ্রন্থরাজিকে রহিত (বাতিল) করে ফেলেছে।” (হিদায়া মোকাদ্দমা-
আখেরাইন ৩য় পৃঃ, হিদায়া ৩য় খন্ড ২য় ভলিউম ৪পৃঃ আরবী,
মাদ্রাসার ফাজেল কাসের পাঠ্য হিদায়া ভুমিকা পৃষ্ঠা ৬, আরাফাত
পাবলিবেশন্স)।
আসুন তাহলে এর পবিত্রতা যাচাই করিঃ
রাসূল (সাঃ)-এর হাদীস অনুযায়ী স্বামী ও স্ত্রী সঙ্গম করার
উদ্দেশ্যে উভয়ের লিঙ্গ একত্র করে সামান্য অং প্রবেশ করলেও
উভয়ের উপর গোসল ফরজ হয়, তাতে বীর্যপাত হোক বা না হোক।
(সহীহ তিরমিযী) সহী হাদীসের বিপরীতমুখি যে সকল জঘন্যতম
ফতওয়া এখনও মাযহাবীগণ চালু রেখেছেন তার
কিছুটা নমুনা নিচে তুলে ধরলামঃ
নিশ্চিত হিদায়া কিতাবখানা পবিত্র কুরআনের মত। (নাউযুবিল্লাহ)ন
িশ্চয় এটা তার পূর্ববর্তী রচিত শরীয়তের সকল গ্রন্থরাজিকে রহিত
(বাতিল) করে ফেলেছে। (হিদায়া মোকাদ্দমা-আখেরাইন ৩য় পৃঃ,
হিদায়া ৩য় খন্ড ২য় ভলিউম পৃঃ ৪ আরবী, মাদ্রাসার ফাজেল কাসের
পাঠ্য হিদায়া ভ’মিকা পৃঃ ৬, আরাফাত পাবলিকেশনন্স)।
০১) ইমাম আবূ হানিফার তরীকা অনুযায়ী চতুষ্পদ জন্তু, মৃতদেহ
অথবা নাবালিকা মেয়ের সঙ্গে সঙ্গম করার উদ্দেশ্যে উভয়ের লিঙ্গ
একত্র হয়ে কিছু অংশ প্রবেশ করলেও অযু নষ্ট হবে না। শুধু
পুং লিঙ্গ ধৌত করতে হবে। (দুররে মুখতার অযুর অধ্যায়)।
০২) যদি কোন লোক মৃত স্ত্রী লোকের অথবা চতুষ্পদ জন্তুর
স্ত্রী অংগে বা অন্য কোন দ্বারে রোযার অবস্থায় বালৎকার
করে তাহলে তার রোযা নষ্ট হবে না। (শারহে বিকায়া, লক্ষৌভি-
এরইউসুফী ছাপার ১ম জেলদের ২৩৮পৃষ্ঠা)।
০৩) আল্লাহ তা’আলা কুরআনে যে সকল মেয়েদেরকে বিবাহ
করা হারাম করেছেন। যথা- মাতা, ভগ্নি, নিজের কন্যা, খালা, ফুফু
ইত্যাদি স্ত্রী লোককে যদি কোন ব্যক্তি বিবাহ করে ও তার
সংগে যৌন সঙ্গম করে তাহলে ইমাম আবু হানিফার মতে তার উপর
কোন হদ (শাস্তি) নেই। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ
ছাপা ৫১৬ পৃষ্ঠা, আলমগিরী মিসরী ছাপা ২য় খন্ড ১৬৫ পৃষ্ঠা, বাবুল
ওয়াতী ৪৯৫ পৃষ্ঠা)।
০৪) বাদশাহ যদি কারো সাথে জোর পূর্বক জিনা করে তাহলে আবূ
হানিফার মতে সেই ব্যক্তির উপর কোন শাস্তির প্রয়োজন নাই।
কিন্তু বাদশাহ ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি যদি জোর পূর্বক
কারো সাথে জিনা করে তবে আবূ হানিফার মতে সেই ব্যক্তির উপর
হদ জারী করতে হবে। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম
খন্ড ৫১৯ পৃষ্ঠা)
০৫) কোন ব্যক্তি যদি কারো সাথে জিনা (যৌন সঙ্গম)
করতে থাকে এবঙ জিনার অবস্থায় যদি অন্য কেহ দেখে ফেলে আর
জিনাকারী ব্যক্তি যদি মিথ্যা করে বলে এই মেয়েটি আমার
স্ত্রী তাহলে উভয় জিনাকারীর উপরই হদের (শাস্তির) প্রয়োজন
নেই। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম খন্ড ৫১৯ পৃষ্ঠা)
০৬) রমযান মাসে রোযার অবস্থায় যদি কেউ মল দ্বারে সঙ্গম
করে তবে ইমাম আবূ হানিফার মতে কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না।
(হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম খন্ড ২১৯ পৃষ্ঠা)
০৭) কেউ যদি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কুকুর যবেহ করে তার মাংস
বাজারে বিক্রয় করে তবে অবশ্যই তা জায়েয হবে।
(শারহে বেকায়া ১ম খন্ড)।
০৮) গম, যব, মধু, জোয়ার হতে যে মদ প্রস্তুত করা হয় তা ইমাম
আবূ হানিফা’র মতে পান করা হালাল এবং এই সকল মদ
পানকারী লোকের নেশা হলেও হদ (শাস্তি) দেয়া হবে না। (হিদায়ার
মোস্তফায়ী ছাপা ২য় খন্ড ৪৮১ পৃষ্ঠা)।
০৯) আঙ্গুলি ও স্ত্রীলোকের স্তন মল-মূত্র দ্বারা নাপাক
হয়ে গেলে, তিনবার জিবদিয়ে চেটে দিলেই পাক হয়ে যাবে।
(দুররে মোখতারের ৩৬ পৃষ্ঠায় বাবুল আনজাসে দেখুন)
১০) যদি কেউ তার পিতার কৃতদাসীর সাথে সহবাস (যৌন মিলন)
করে তবে কোন শাস্তি নাই। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ
চাপা ১ম খন্ড ৫১৫ পৃষ্ঠা)।
১১) কোন স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে এবং মারা যাওয়ার দুই বৎসর
পর সেই স্ত্রীর সন্তান হলে, তবে সেই সন্তান তার মৃত স্বামীরই
হবে। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম খন্ড ৩৩১
পৃষ্ঠা)।
১২) স্বামী প্রবাসে রয়েছে, সুদীর্ঘকাল অতীত হয়েছে বহু বছর
ধরে স্বামী ফিরেনি এই দিকে স্ত্রীর পুত্র সন্তান জন্ম
হয়েছে তাহলেও এই ছেলে হারামী বা জারজ হবে না সেই স্বামীরই
ঔরসজাত হবে। (বেহেস্তি জেওর ৪র্থ খন্ড ৪৪পৃষ্ঠা)
১৩) আবূ বকর বিন ইসকান বলেন, যদি কোন ব্যক্তি কারো মাল
চুরি ডাকাতি করে নিয়ে এসে চিবিয়ে চিবিয়ে খায় তাহলে ইমাম আবূ
হানিফার মতে হালাল হবে। (কাজি খাঁ ৪র্থ খন্ড ৩৪৩ পৃষ্ঠা)।
১৪) পিতার পে পুত্রের দাসীর সঙ্গে যৌন মিলন করা সর্বাবস্থায়
হালাল। আরো যুক্তি দর্শান হয়েছে দাসী হচ্ছে পূত্রের সম্পদ আর
পুত্রের সম্পদে পিতা পূত্র উভয় ব্যক্তিরই হক আছে। ফলে একই
নারী দ্বারা উভয় নরের যৌন ুধা মিটানো হালাল। (নুরুল আনওয়ার
৩০৪পৃষ্ঠা)।
১৫) কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট বিরোধী মাসআলাহ- চার
মাযহাব চার ফরয। হানাফী, শাফেঈ, মালেকী ও হাম্বলী এই চার
মাযহাব। (বেহেস্তি জেওর স্ত্রী শিা ১০৪ পৃঃ দ্রঃ, আলহাজ্জ
মৌলভী আব্দুর রহীম। কুরআন মঞ্জিল লাইব্রেরী-বরিশাল)
১৬) যদি কোন ব্যক্তি পয়সরা বিনিময়ে কোন নারীর
সাথে জিনা করে তবে আবূ হানিফার বিধান মতে কোনই হদ (শাস্তি)
নেই। (অর্থাঃ সারা পৃথিবীতে যত বেশ্যাখানা রয়েছে সবই বৈধ।)
(জাখীরাতুল উকবাও শারহে বিকায়ার হাশিয়া চাল্পিতে আছে।
(বিস্তারিত দেখুন ‘আসায়ে মুহাম্মাদী’)
১৭) কুরআন ও সহীহ হাদীসকে পদাঘাত করে হানাফী মাযহাবের
বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাবে চুরি, ডাকাতি, মাস্তানি, লুট, খুন
বা হত্যা করাকে বৈধ করা হয়েছে। (দেখুন হিদায়া ২য় খন্ড ৫২৭ পৃঃ,
৫৩৭ পৃঃ, ৫৪০-৫৪২ পৃঃ, ৫৪৬ পৃঃ, ৫৫৭ পৃঃ, ৫৫৮ পৃঃ, হিদায়া ৩য় খন্ড
৩৫৬ পৃঃ, ৩৬৪-৩৬৫পৃঃ। হিদায়া ৪র্থ খন্ড ৫৪৭ পৃঃ, ৫৫০ পৃঃ)
১৮) পবিত্রতম সূরায়ে হৃদের ৮৪-৮৫ অর বিশিষ্ট ৪৪ নম্বর আয়াত
পবিত্রতম সূরা মূলকের প্রায় ৪০ অর বিশিষ্ট পবিত্র শেষ
আয়াতে কারীমাটি তাবীজরূরে ধারণ করলে শীঘ্র বীর্যপাত হবে না।
(বেহেস্তি জেওর ৯ম খন্ডের ১৫৪পৃঃ) …. এই হচ্ছে আমাদের ফেকাহর
কিতাব!?
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এখনও কি আমরা বলব যে,
মাজহাব মানা ফরয? আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ অনুসরণ করার
তৌফিক দান করুন।
এবার আমি শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী র. এর আল-ইনসাফ কিতাব থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি -
হাদীস বিশারদগণের ফিকাহর প্রতি মনোযোগ
এ সময় আরো যারা হাদীস শাস্ত্রে যারা অবদান রাখেন, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের ছিলেনঃ আবদুর রাহমান ইবনে মাহদী, ইয়াহিয়া ইবনে সায়ীদ কাতান, ইয়াযীদ ইবনে হারূন, আবদুর রাযযাক, আবু বকর ইবনে আবী শাইবা, মুসাদ্দাদ, হান্নাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুইয়া, ফদল ইবনে দুকাইন, আলী ইবনে আলমাদানী এবং তাঁদের সমপর্যায়ের আরো কতিপয় মুহাদ্দিস। এটা হাদীস বিশারদহণের সেই তবকা যা ছিলো সকল তবকার চাইতে সেরা। গবেষণ পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে হাদীসশাস্ত্রকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পর এ শাস্ত্রে মুহাক্কিকগণ কিকাহর প্রতি মনোনিবেশ করেন। তাঁদের পূর্বেকার ফিকাহর ইমামদের কোনো একজনের তাকলীদ করার ব্যাপারে একমত হওয়া তাদের জন্যে সম্ভব হয়নি। কারণ, তাঁরা দেখলেন, প্রত্যেকটি মাযহাবের এমন অনেক মতামত রয়েছে যা বহুসংখ্যক হাদীস এবং আছারের৪১ সাথে সাংঘর্ষিক।
৮. সঠিক পন্থা ও সুষম নীতি
সঠিক পন্থা হলো মধ্যমপন্থা
উপরে যে দুটি পন্থার কথা আলোচনা করে এলাম, অর্থাৎ (১) হাদীসের শব্দের হুবহু অনুসরণ এবং (২) ফকীহদের বক্তব্য থেকে মাসয়ালা তাখরীজ করা –এই উভয় পন্থারই দ্বীনি ভিত্তি রয়েছে। সকল যুগের মহাক্কি আলিমগন দু’টি পন্থাই অনুসরন করে আসছেন। তবে (পার্থক্য ছিলো কেবল উভয় পন্থার মধ্যে সাওঞ্জস্য বিধানের)। অর্থাৎ তাদের কেউ তাখরীজের তরীকার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়েন আবার কেউ অধিক ঝুঁকে পড়েন হাদীসের শব্দ অনুসরণ নীতির প্রতি। (উভয় নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের প্রতি তাঁরা কেউই মনোযোগ দেননি।) আসলে, এই দুটি পন্থার কোনো একটিকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করা যেতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত উভয় পন্থার (অর্থাৎ আহলে হাদীস ও আহলে ফিকাহর) লোকেরাই এই কাজটী করেছেন। তাঁরা একটিকে পরিত্যা করে অপরটির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু সঠিক পন্থা ছিলো এর চাইতে ভিন্নতর। উচিত ছিলো, উভয় তরীকাকে একত্র করে একটিকে আরেকটির সাথে তুলনা করে দেখা এবং একটিতে কোন ভুল ক্রুটি থাকলে অপরটির দ্বারা তা নিরসন করা। এ কথাটিই বলেছেন হাসান বসরী তার নিম্নোক্ত বক্তব্যেঃ
“কসম সেই আল্লাহর, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তোমাদের পথ হচ্ছে গালী (সীমালংঘনকারী) এবং জাফী (অপরিহার্য সীমার নিচে অবস্থানকারী) এর মাঝখান দিয়ে।”
অতএব আহলে হাদীসের উচিত, তাদের অনুসৃত ও অবলম্বিত যাবতীয় মাসয়ালা এবং মাযহাবকে তাবেয়ী এবং পরবররীকালের মুজতাহিদ ইমামগণের রায়ের সাথে তুলনা করে দেখা এবং তাদের ইজতিহাদ থেকে ফায়দা হাসিল করা। আর আহলে ফিকাহর লোকদেরও উচিত সাধ্যানুযায়ী হাদীসের ভান্ডারে চিন্তা ও গবেষণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা, যাতে করে সরীহ ও সহীহ হাদীসের বিপরীত মত প্রদান থেকে বাঁচতে পারেন এবং যেসব বিষয়ে হাদীস কিংবা আছার বর্তমার রয়েছে, সেসব বিষয়ে মত প্রদান থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
কখন নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করা ওয়াজিব
একজন ইমামের তাকলীদ করার বিষয়টি ও এই মূলনীতির আলোকেই কিয়াস করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করাটা কখনো ওয়াজিব থাকে। আবার কখনো ওয়াজিব থাকে না। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবেঃ ভারতবর্ষ কিংবা ইউরোপ বা আমেরিকায় যদি কোনো জাহিল মুসলমান বর্তমান থাকে আর সেখানে মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবে কোনো আলিম বা গ্রন্থ না থাকে, তবে এ ব্যাক্তির জন্যে আবু হানীফার মাযহাবের তাকলীদ করা ওয়াজীব এবং এ মাযহাবের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া বৈধ নয়। কারণ, এমতাবস্থায় সে এই মাযহাবের বন্ধন থেকে বেরিয়ে পড়লে, ইসলামের বন্ধন থেকেই মুক্ত হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে কোনো ব্যাক্তি যদি মক্কা বা মদীনায় অবস্থানকারী হয়, তবে তার জন্যে নির্দিষ্ট এক ইমামের তাকলীদ করা ওয়াজিব নয়। কেননা সেখানে সকল মাযহাব সম্পর্কে অবগত হওয়া তার পক্ষে খুবই সহজ।
চার মাযহাবের ইজতিহাদের ইতিহাস
১. তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর পর আবু হানীফার মাযহাবে ‘মুজতাহিদ মতলক মুনতাসিব’ আবির্ভাব হবার ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায় কারণ, হানাফী আলিমরা আগে পরে সবসময়ই হাদীসশাস্ত্রের সাথে খুব কমই সম্পর্ক রাখতেন ও রাখছেন। আর হাদীসশাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী হওয়া ছাড়া একজন আলিম কোনো অবস্থাতেই ‘মুজতাহিদ মতলক মনতাসিব’ হতে পারে না।
৪. বাকী থাকলো শাফেয়ীর মাযহাব। মূলত এ মাযহাবেই সর্বাধিক ‘মুজতাহিদ মতলক মুনতাসিব’ ও মুজতাহিদ ফীল মাযহাবের আবির্ভাব ঘটে। এখানেই সর্বাধিক আবির্ভাব ঘটে উসূল ও ইলমে কালাম বিশেষজ্ঞদের। কুরআনের মুফাসসির এবং হাদীসে ব্যাখ্যাদাতাদেরও আবির্ভাব ঘটে এখানে সর্বাধিক। এ মাযহাবের রেওয়ায়েত ও সনদসমূহও অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় সর্বাধিক মজবুত। এর ইমামের মতামতসমূহ সর্বাধিক মজবুতভাবে সংরক্ষিত। ইমামের এবং আসহাবুল উজুহ’র বক্তব্য এখানে সুস্পষ্টভাবে পৃথক রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মত ও বক্তব্যের একটিকে আরেকটির উপর অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বাধিক মনযোগ দেয়া হয়েছে।
এই কথাগুলো সেইসব লোকদের অজানা নয়, যারা উপরোক্ত মাযহাবসমূহ সম্পর্লে বিশ্লেষণমূলক অধ্যয়ন করেছেন এবং একটা দীর্ঘসময় এর পিছে লেগে থেকেছেন।
শাফেয়ীর প্রথম দিককার ছাত্ররা সবাই মুজতাহিদ মতলক (মুনতাসিব) ছিলেন। তাদের মধ্যে এমন কেউই ছিলেন না, যিনি তাঁর (শাফেয়ীর) সকল ইজতিহাদের তাকলীদ করতেন। অতঃপর ইবনে সুরাইজের যামানা এলো। তিনি তাকলীদ ও তাখরীজের নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর তাঁর শিষ্যরা তাঁর দেখানো পথে চলতে থাকে। এ হিসেবেই তাঁকে সেই মুজতাহিদদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয় , প্রতি শতাব্দীর মাথায় যাদের আগমনের সংবাদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
যে ব্যাক্তি দীর্ঘ সময়কাল ধরে মাযহাবসমূহের বিশ্লেষণমূলক অধ্যায়ন করেছেন, তাঁর কাছে একথাও গোপন থাকতে পারে না যে, যেসব হাদীস ও আছারের উপর শাফেয়ীর মাযহাবের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত সেগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংকলিত ও সম্পাদিত। এ কথাগুলো সকল আহলে ইলমেরই জানা। এবং এগুলো থেকে তারা উপকৃত ও হয়েছেন। এটা এই মাযহাবের এমন একটা মর্যাদা, যা আর কোনো মাযহাবই লাভ করতে পারেনি।
১১. চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর পর ফিকহী মতপার্থক্য
ফিতনার যুগ এলো
এ যাবত যাদের কথা আলোচনা করলাম, অরপর তাদের সময়কাল অতীতের কোলে পাড়ি জমায়। তাঁদের আবির্ভাব ঘটে মুসলমানদের নতুন প্রজন্মের। এই নতুন প্রজন্ম ডানে বামে যেতে থাকে। (তাদের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের বিপ্লব ঘটে। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে যেসব ধ্বংসাত্মক রোগ তাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে, সেগুলোর কয়েকটি নিম্নরূপঃ
৩. ফিকহী মতামতের তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞতা
আমি দেখতে পেয়েছি, এদের (হানাফীদের) কিছু লোক মনে করে ফিকাহ ও ফতোয়ার গ্রন্থাবলীতে যতো টিকা টিপ্পনী ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে সবই আবু হানীফা কিংবা সাহিবাইনের মতামত। মূল জিনিস আর তার তাখরীজের মধ্যে তারা কোনো পার্থক্য করে না। ‘কারখীর ফতোয়া অনুযায়ী বিষয়টি এরূপ’ এবং ‘তোহাবীর ফতোয়া অনুযায়ী এরূপ’—তারা যেনো এ ধরনের বাক্যগুলোকে অর্থহীন মনে করে। ‘আবু হানীফা এরূপ বলেছেন’ এবং ‘এটি আবু হানীফার মাযহাবের মত’ তাদের দৃষ্টি তে এ দু’টি কথার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
আমি আরো দেখেছি, কিছুলোক মনে করে, আবু হানীফার মাযহাব সারাখসী প্রণীত মাবসূত এবং হিদায়া ও তিবঈন প্রভৃতি গ্রন্থাবলীতে ছড়িয়ে থাকা বিবাদমূলক বাহাছসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত। অথচ তারা জানে না যে, তার্কিক বাহাছের ভিত্তির উপর তাঁর মাযহাব প্রতিষ্ঠিত নয়। তাদের মধ্যে এরূপ বাহাছের সূত্রপাত করে আসলে মুতাযিলারা। ফলে পরবর্তী লোকেরা ধারণা করে বসে, ফিকহী আলোচনার মধ্যে হয়তো এরূপ কথাবার্তার অবকাশ রয়েছে। তাছাড়া এর ফলে শিক্ষার্থীদের মনমস্তিষ্কেও তর্কবাহাছের তীক্ষ্মতা স্থান করে নিয়েছে।
৫. অন্ধ অনুকরনের প্রাধান্য
আরেকটি প্রধান বিপর্যয় হলো, এ সময় লোকেরা চরমভাবে অন্ধ অনুকরণে (তাকলীদে) নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এতোটা নিশ্চিন্তে তারা এ পথে অগ্রসর হয় যে, তারা তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে যায়। এর পিছনে নিম্নোক্ত কারণগুলো কাজ করেছিলঃ
একটি কারণ ছিলো ফকীহদের মধ্যে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ। ফলে, একজন ফকীহ যখন কোথাও কোনো ফতোয়া দিলেন, সাথে সাথে আরেকজন ফকীহ তা খন্ডন করে, আরেকটি ফতোয়া দিয়ে বসেন। সে কারণে প্রত্যেকেই স্বীয় ফতোয়াকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে মুজতাহিদ ইমামদের (মতামতের) প্রতি প্রত্যাবর্তন করেন।
এ সময় শাসকদের যুলুমের কারণে মুসলমানগণ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে, তাদের নিয়োগকৃত কাজীদের প্রতিও জনগণ আস্থাশীল ছিল না। তাই, তারা বাধ্য হয়েই নিজেদের ফতোয়া ফায়সালার পক্ষে ইমাম মুজতাহিদ্গণের মতামত দলিল হিসেবে পেশ করতো।
আরেকটি কারণ এই ছিলো যযে, এ সময় সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকেরা দ্বীনি জ্ঞান লাভ থেকে ছিলেন অনেক দূরে। ফলে, লোকেরা ফতোয়া নেয়ার জন্যে এমনসব লোকদের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাদের না হাদীসের জ্ঞান ছিলো আর না তাখরীজ এবং ইস্তিম্বাতের যোগ্যতা ছিলো। পরবর্তীকালের আলিমদের মধ্যে এ অবস্থা তোমরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছো। ইমাম ইবনে হুমাম প্রমুখ এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করেছেন। এ সময় মুজতাহিদ নয় এমন লোকদেরও ফকীহ বলা হতে থাকে।
. শাস্ত্রীয় গবেষণার অপ্রয়োজনীয় হিড়িক
এ সময় আরেকটি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তা হলো, শরীয়তের আসল উৎসকে উপেক্ষা করে অধিকাংশ লোক বিভিন শাস্ত্রীয় গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে কেউ কেউ আসমাউল রিজাল এবং জারাহ ও তা’দীলের ক্ষেত্রে গবেষণায় অবতীর্ণ হয়ে ধারণা করে বসে আমি এ বিষয়ের ভিত্তি মযবুত করছি। কেউ নিমজ্জিত হয় প্রাচীন ও সমকালীন ইতিহাস গবেষণায়। কেউ নিমজ্জিত হয় বিরল, গরীব এমনকি মওদু’ হাদীসসমূহের যাচাই বাছাইর কাজে।
কেউ কেউ তাঁর গবেষণার ঘোড়া দৌড়ান উসূলে ফিকাহর ক্ষেত্রে। স্বীয় অনুসারীদের জন্যে আবিষ্কার করেন বিবাদ করার নিয়ম কানুন। অতঃপর অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের তুফান ছুটান। বীরদর্পে জবাব্দেন অন্যদের অভিযোগের। প্রতিটি জিনিসের সংজ্ঞা প্রদান করেন। মাসয়ালা এবং বাহাছকে শ্রেণী বিভক্ত করেন। এভাবে এসব বিষয়ে দীর্ঘ হ্রস্ব গ্রন্থাদি রচনা করে যান।
অনেকে আবার এমনসব ধরে নেয়া বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা গবেষণা চালান, যেগুলো ছিলো নিতান্তই অনর্থক এবং কোনো জ্ঞানবান ও বুদ্ধিমান ব্যাক্তি যেগুলোকে তাকিয়ে দেখারও যোগ্য মনে করে না। এসব মতবিরোধ ঝগড়া বিবাদ ও বাহুল্য গবেষণার ফিতনা ছিলো প্রায় সেই ফিতনার মতো, যারশিকার হয়েছিল মুসলমানরা তাদের প্রাথমিক যুগে। যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হ্য আর প্রত্যেকেই নিজ নেতাকে ক্ষমতাসীন করা বা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কাজে আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছিল। এর ফলে তখন যেমন মুসলমানদের উপর যালিম অত্যাচারী একনায়ক শাসকরা সওয়ার হয়ে বসেছিল এবং ইসলামের ইতিহাসের সবচাইতে ন্যাক্কারজনক ঘটনাবলো সংঘটিত হয়েছিল, ঠিক তেমনি এই নব ফিতনাও মুসলিম সমাজে অজ্ঞতা, অন্ধতা, সন্দেয়-সংশয় ও ধারণা কল্পনার চরম ধ্বংসকারী ঝড় তুফান বইয়ে দেয়।
অতঃপর আসে এদের পরবর্তী জেনারেশন। এই জেনারেশন তাদের পূর্বসূরীদের অন্ধ অনুকরণ করে সম্মুখে ধাবিত হয়। ফলে, তারা সত্য মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যার্থ হয়। ঝগড়া বাহাছ এবং সঠিক ইস্তিম্বাতের মধ্যে পার্থক্য করার চেতনাই তারা লাভা করেনি। এখন সেই ব্যাক্তিই ফকীহ উপাধি পেতে থেকে যে বেশী বকবক করতে এবং মিথ্যা জটিলতা পাকাতে পারে, যে কোনো বিষয়ে নীরব থাকতে এবং সত্য মিথ্যা যাচাই করতে জানে না এবং ফকীহদের দুর্বল ও মযবুত বক্তব্যের পার্তক্য নির্ণয় করতে পারে না। একইভাবে এমনসব লোকদেরকে মুহাদ্দিস বলা হতে হাকে, যারা সঠিক ও ভ্রান্ত হাদীসের মধ্যে পার্থক্য করতে জানে না এবং সঠিক ও ভ্রান্ত হাদীসকে সমানভাবে চালিয়ে দেয়।
সকলেরই এরূপ অবস্থা ছিলো, সে কথা আমি বলি না। আল্লাহর একদল বান্দাহ সব সময়ি তাঁর সন্তুষ্টির পথে কাজ করেছেন, কোনো শত্রুতা তাদেরকে এপথ থেকে ফিরাতে পারেনি। পৃথিবীতে এরাই আল্লাহর হুজ্জত।
অতঃপর এদের পরে যে জেনারেশনের আগমন ঘটে, তারা এদের চাইতেও বড় ফিতনাবাজ প্রমাণিত হয়। তারা বিদ্বেষমূলক তাকলীদের দিক থেকেও ছিলো অগ্রগামী। তাদের অন্তরে না ছিলো জ্ঞানের আলো আর না ছিলো অন্তরদৃষ্টি। তারা দ্বীনি বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করাকে ‘বিদআত’ বলে আখ্যায়িত করে সদর্পে ঘোষণা দিয়েছেঃ
“আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এভাবেই চলতে দেখেছি আর আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরন করতে থাকবো।”
এখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই এ বিষয়ে অভিযোগ করা যায়! তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তিনিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য সত্ত্বা আর তাঁর উপরই ভরসা করা যেতে পারে।
তাদের জন্যেও তাকলীদ করা নিষেধ, যারা সুস্পষ্টভাবে জানেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) অমুক কাজের হুকুম দিয়েছেন, অমুক কাজ নিষেধ করেছেন এবং অমুক হুকুম রহিত।’ এ জ্ঞান তারা সরাসরি হাদীস অদ্যায় করে অর্জন করুক কিংবা অর্জন করুক দ্বীনের সেরা আলিমদের আমল দেখে, তাতে কিছু যায় আসে না। এ সত্যের প্রতিই ইংগিত করেছেন শাইখ ইযযুদ্দীন আবদুস সালাম। তিনি বলেছেনঃ
“ঐসব ফকীহদের অবস্থা দেখে আমি বিস্মিত হচ্ছি, যারা স্বীয় ইমামদের ইজতিহাদী ভ্রান্তি সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্বেও সেই ভ্রান্তিকে আঁকড়ে ধরে থাকে এবং তা ত্যাগ করে কিতাব, সুন্নাহ ও কিয়াসের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ মতকে গ্রহণ করে না। বরং এসব অজ্ঞ অন্ধরা তাদের অন্ধ তাকলীদের ভ্রান্ত জজবায় অনেক সময় বাস্তবে কুরআন সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে যায় এবং স্বীয় ইমামকে ক্রুটিহীন প্রমাণ করার জন্যে কুরআন সুন্নাহর এমন ভ্রান্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে যা কালামের তাহরীফ ছাড়া আর কিছু নয়।”
তিনি অন্যত্র লিখেছেনঃ
“প্রথম যুগের লোকেরা যে আলিমকেই সামনে পেতেন, তাঁর কাছেই ফতোয়া জেনে নিতেন। তিনি কোন খেয়াল ও মসলকের লোক, তা জানার চেষ্টা করতেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। চার মাযহাবের আবির্ভাব ঘটে। সেগুলোর অন্ধ অনুকরণকারীদের আগমন ঘটে। লোকেরা হিদায়াতের আসল উৎস থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল ইমামদের বক্তব্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাদের কোনো বক্তব্য যতোই দুর্বল ও দলিলবিহীন হোক না কেন। ভাবটা যেন এমন যে, মুজতাহিদরা মুজতাহিদ নন বরং আল্লাহর রাসূল, মাসূম এবং তাদের কাছে ওহী নাযিল হয়! এটা সত্য ও হকের পথ নয়। বরঞ্চ নির্ঘাত অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির পথ।”
এ প্রসঙ্গে ইমাম আবু শামাহ বলেনঃ
কেউ যদি ফিকাহর প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন, তিনি যেনো কোনো একটি মাযহাবেকে যথেষ্ট মনে না করেন। বরঞ্চ প্রত্যেক মুজতাহিদের মতামত যেনো মনোযোগ দিয়ে দেখেন। প্রত্যেকের মধ্যে ডুব দিয়ে সত্যের বাতি জ্বালিয়ে দেখা উচিত। অতঃপর যে মতটিকে কুরআন সুন্নাহর অধিকতর মনে কাছাকাছি মনে করবেন সেটাই যেনো গ্রহন করেন। প্রাচীন আলিমগণের জ্ঞান ভান্ডারের প্রয়োজনীয় অংশগুলোর প্রতি যদি তিনি নযর দেন, তবে ইনশাল্লাহ যাচাই বাছাইর এ শক্তি অর্জন করা তার জন্যে সহজ হয়ে যাবে এবং সহজেই শরীয়তের সত্যিকার রাজপথের সন্ধান পেয়ে যাবেন। এরূপ লোকদের কর্তব্য হলো গোষ্ঠীগত গোঁড়ামী থেকে নিজেদের মন মস্তিষ্ককে পবিত্র রাখা। বিবাদ বসম্বাদের ময়দানে একটি কদমও না ফেলা। কারণ সেখানে সময় নষ্ট করা এবং স্বভাব ও আচরণে বিকৃতি লাভ করা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। ইমাম শাফেয়ী তাঁর এবং অন্যদের তাকলীদ করতে লোকদের নিষধ করে গেছেন। একথা বলেছেন শাফেয়ীর ছাত্র আল মুযনী তাঁর গ্রন্থ মুখতাসার এর সূচনায়। ইবনে হাযমের মন্তব্য এমন সাধারণ ব্যাক্তির ব্যাপারেও প্রযোজ্য যে দ্বীনি ইলম সম্পর্কে পূর্ণাংগ না থাকার তাকলীদ করে বটে, কিন্তু কোনো একজন ফকীহর তাকলীদ এই দৃষ্টিভঙ্গিতে করে যে, তিনি ভুল করে না, তিনি যা বলেন সবই সঠিক। তাছাড়া দলিল প্রমাণের দিক থেকে তাঁর মত যতোই ভুল এবং বিপরীত মত যতোই বিশুদ্ধ হোক না কেন, সর্বাবস্থায়ই সে তাঁর তাকলীদের উপর জমে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত এ নীতি সেই ইহুদীবাদেরই অনুরূপ যা তাওহীদী আদর্শকে শিরকে রূপান্তরিত করে দিয়েছিল। এ প্রসংগে একতি হাদীস উল্লেখযোগ্য। হাদীসটি মুসলিম শরীফে আদী ইবনে হাতিম থেকে বর্ণিত হয়েছে।
“রাসূলুল্লাহ (সা) ‘ইত্তাখাযু আহবারাহুম ওয়া রুহবানাহুম আরবাবাম মিন দুনিল্লাহ—তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা মাশায়েখদের রব বানিয়ে নিয়েছে।’৮১
[৮১. সূরা তাওবা আয়াতঃ ৩১]
আয়াত পড়ে বলেছেনঃ ইহুদীরা তাদের উলামা মাশায়েখদের ইবাদাত করতো না বটে, কিন্তু তারা যখন কোনো জিনিসকে বৈধ বলতো। তারা সেটাকেই (নির্বিচারে) বৈধ বলে গ্রহণ করতো আর তারা তাদের জন্যে যেটাকে নিষিদ্ধ করতো, সেটাকেই অবৈধ বলে মেনে নিতো।”
সুতরাং এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো একজন মাত্র ইমাম এর তাকলীদ করা যে, তিনি শরীয়তের নির্ভুল মুখপাত্র—তার পূজা করারই সমতুল্য।
ঐ ব্যাক্তির ব্যাপারেও ইবনে হাযমের ফতোয়া প্রযোজ্য যে মনে করে, কোনো হানাফীর জন্যে শাফেয়ী ফকীহর কাছে এবং কোনো শাফেয়ীর জন্যে হানাফী ফিকাহর নিকট ফতোয়া চাওয়া বৈধ নয়, কিংবা হানাফীর জন্যে শাফেয়ী ইমামের পিছে এবং শাফেয়ীর জন্যে হানাফী ইমামের পিছে (নামাযে) ইক্তেদা করা বৈধ নয়। এটা সাহাবী, তাবেয়ী ও উলামায়ে সলফের কর্মনীতির সুস্পষ্ট বিরোধিতা। এরূপ চিন্তা ও কর্ম কোনো অবস্থাতেই বৈধ হতে পারে না।
মূলত এই হল ইবনে হাযমের মন্তব্যের সঠিক তাৎপর্য। যেখানে অবস্থা এরূপ নয়, সেই ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যও প্রযোজ্য নয়। যেমন, এক ব্যাক্তি কেবল রাসূলুল্লাহর (সা) বক্তব্যের ভিত্ততেই দ্বীনকে দ্বীন মনে করে, আল্লাহ ও রাসূল যা হালাল করেছেন, সেটাকেই হালাল মনে করে, আল্লাহ ও রাসূল যা হারাম করেছেন সেটাকেই অবৈধ মনে করে এবং কনো অবস্থাতেই কোনো মানুষের বক্তব্যকে বৈধ ও অবৈধতার মানদন্ড বানায় না।
কিন্তু এরূপ বিশুদ্ধ ঈমান আকীদার অধিকারী হওয়া সত্বেও যেহেতু সে কুরআন হাদীস সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেনা, বিরোধপূর্ণ হাদীসসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের যোগ্যতা রাখেনা এবং কুরআন হাদীসের ভিত্তিতে মাসায়েল ইস্তিম্বাতের যোগ্যতা রাখে না, সেহেতু সে যদি তার দৃষ্টিতে সুন্নাতের রাসূলের ভিত্তিতে ফতোয়াদেবার উপযুক্ত নির্ভরযোগ্য কোনো আলিমের ইক্তেদা-অনুসরণ করে এবং মনে এই চিন্তা রাখে যে, যখনই সে আলিমের কোনো ফতোয়া কুরআন সুন্নাহর প্রমাণিত দলিলের বিপরীত দেখতে পাবে, তখনই তা ত্যাগ করবে, কোনো প্রকার গোঁড়ামী করবে না, এরূপ ব্যাক্তির জন্যে তাকলীদকে কিছুতেই অবৈধ বলা যেতে পারে না। কারণ, রাসূলুল্লাহর সে যুগ থেক এ নিয়ে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে ফতোয়া চাওয়া এবং ফতোয়া দেয়ার এ নিয়মই অবিচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। সুতরাং এই নীতিতে আমল করার পর এক ব্যাক্তির কাছে সবসময় ফতোয়া কিংবা বিভিন্ন ফকীহর নিকট বিভিন্ন সময় ফতোয়া চাওয়া উভয়টাই বৈধ। এটা কেমন করে অবৈধ হতে পারে? কারণ আমি তো কোনো ফকীহর ব্যাপারে এরূপ ঈমান পোষণ করি না যে, তাঁর নিকট আল্লাহ তায়ালা ফিকাহ সংক্রান্ত ওহী নাযিল করেন, তাঁর ইতায়াত করা আমার জন্যে ফরয এবং তিনি নিষ্পাপ। আমি যখন কোনো ফকীহর ইক্তেদা করি, তখন তার সম্পর্কে এ ধারণা নিয়েই তাঁর ইক্তেদা করি যে, তিনি কুরআন ও সুন্নাতে রাসূলের একজন আলিম। সুতরাং তাঁর বক্তব্য কুরআন সুন্নাহ মুতানিকই হবে। হয় সরাসরি কুরআন হাদীস দিয়েই কথা বলবেন, কিংবা কুরাআন হাদীসের ভিত্তিতে ইস্তিম্বাত করে কথা বলবেন।……এরূপ না হতে তো কোনো মুমিনই কোনো মুজতাহিদের তাকলীদ করতো না। কোনো বিশুদ্ধ নির্ভরযোগ্য সুত্রে যদি আল্লাহর সেই মাসুম রাসূলের (সা) কোনো হাদীস আমার নিকট পৌছে, যাঁর আনুগত্য করা আমার জন্যে ফরয, সেই হাদীসটি যদি আমার ইমাম এর (বা মাযহাবের) মতের বিরোধী হয়, তখন যদি আমি হাদীসটিকে ত্যাগ করে ইমাম এর মতকে আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে গোঁড়ামী প্রদর্শন করি, তাহলে আমার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে? এক্ষেত্রে কিয়ামতের দিন রাব্বুল আলামীনের দরবারে আমি কি জবাব দেবো?
২. তাকলীদের পর মুসলমানদের মধ্যে সবচাইতে বড় সমস্যার কারণ হয়েছে কুরআন হাদীসের শাব্দিক অনুসরণ এবং ইস্তেখরাজ।
এখানে দু’টি নিয়ম রয়েছে। একটি হলো, হাদীসের শাব্দিক অনুসরণ। আর দ্বিতীয়টি হলো, মুজতাহিদ ইমামদের প্রণীত উসূলের ভিত্তিতে মাসায়েল ইস্তিম্বাত করা। শরয়ী দিক থেকে এই দু’টি নিয়মই সর্বস্বীকৃত। সকল যুগের বিজ্ঞ ফকীহগণ দু’টি বিষয়ের প্রতিই গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তবে কেউ একটির প্রতি অধিক মনোনিবেশ করেন, আবা কেউ অপরটির প্রতি বেশী যত্মবান হন। কিন্তু কোনো একটিকে সম্পুর্ণ পরিত্যাগ কেউ করেননি। সুতরাং হক পথের কোনো পথিকেরই কেবল একটি মাত্র পন্থার প্রতি সম্পূর্ণ ঝূঁকে পড়া উচিত নয়। অথচ দুঃখের বিষয়, বর্তমানকালে এই প্রবণতাই তাদের গোমরাহীর জন্যে দায়ী। এই দু’টি পন্থার একটিকে বাদ দিয়ে বাকো একটি দ্বারা হিদায়াএর রাজপথের সন্ধান পাওয়া খুবই দুষ্কর। সঠিক নীতি হচ্ছে, উবয় পন্থাকে প্ররথক করে না দিয়ে উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা। একটি দ্বারা আরেকটির কাঠামোকে আঘাত না করে একটির সাহায্যে আরেকটিকে ক্রুটিমুক্ত করা। কেবল এভাবেই অটল মজবুত ভিতের উপর দ্বীনী বিধানের এক দুর্ভেদ্য প্রাসাদ নির্মিত গতে পারে। এভাবেই তাতে কোনো ভ্রান্তির প্রবেশ পথ বন্ধ হতে পারে। এ নীতির প্রতিই আমাদেরকে অংগুলি নির্দেশ করে দেখিয়েছেন হাসান বসরীঃ
“আল্লাহর কসম, তোমাদের পথ হচ্ছ, সীমা থেকে দূরে অবস্থান এবং সীমাতিক্রম—এ দূটির মাঝখানে।”
গ. দুই বলয়ে অবস্থিত উপরোক্ত দু’টি পন্থার মধ্যবর্তী ও সঠিক পন্থা হচ্ছে কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে এতোটা অবগত থাকা, যাতে করে ফিকাহর উসূল ও মৌলিক মাসায়েলসমূহ এবং সেগুলোর দলিল প্রমাণ সংক্রান্ত জ্ঞান অতি সহজের অর্জন করা যায়। তাছাড়া এরূপ ব্যাক্তিকে কিছু কিছু ইজতিহাদী মাসয়ালা, সেগুলোর দলিল-আদিল্লা ও একটিকে আরেকটির উপর অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। অন্যদের তাখরীজের ক্রুটি নির্দেশ এবং খাঁটি ও মেকীর মধ্যে পার্থক্য করার মতো যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। তবে একজন মুজতাহিদ মতলককে যতোটা ব্যাপক ও সমুদ্রসম জ্ঞান, দূরদৃষ্টি ও অন্তরদৃষ্টির অধিকারী হতে হয়, তার মধ্যে সেসব শর্ত পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান না থাকলেও চলবে। এ পর্যায়ে পৌছার পর বিভিন্ন মাযহাবের ক্রুটিপূর্ণ মতসমূহের সমালোচনা করা তাঁর জন্যে বৈধ। তবে সমালোচনা করার পূর্বে তাঁকে অবশ্য সেগুলোর পক্ষে তাদের যেসব দলিল প্রমাণ আছে, সেগুলো অবহিত হতে হবে। এ পর্যায়ে পৌছে বিভিন্ন মাযহাবের মতামতের দলিল প্রমাণ পর্যালোভনার পর তিনি যদি এই মাযহাবের কিছু এবং ঐ মাযহাবের কিছু মত গ্রহণ করেন এবং তাঁর গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হওয়ায় সব মাযহাবেরই কিছু মতের সমালোচনা করেন এবং বর্ণনা করেন, যদিও প্রাচীনরা তা গ্রহণ করেছেন, তবে এমনটি করাও তাঁর জন্যে বৈধ।
এ কারণের দেখা যায়, যেসব আলমরা নিজেদেরকে মুজতাহিদ মতলক বলে দাবী করতেন না, তাঁরা ফিকহী গ্রন্থাবলী রচনা করেছেন, মাসয়ালা সংকলন করেছেন, তাখরীজ করেছেন এবং পূর্ববর্তী আলিমগণের একটি মতকে আরেকটি মতের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন, কারণ ইজতিহাদ আর তাখরীজ তো মুলত একই জিনিসের দু’টি অন্ধ। আর উভয়টিরই উদ্দেশ্য কোনো বিষয়ে সত্যের কাছাকাছি পৌছা বা সত্যিকার ধারণা লাভ করা।
এবার ওইসব লোকদের কথায় আসা যাক, যারা মাসায়েল যাচাই বাছাই করার মতো দ্বীনি জ্ঞানের অধিকারী নয়। তাদের উচিত প্রচলিত যাবতীয় বিষয়ে নিজেদের পূর্বপুরষ ও স্থানীয় মুসলমানদের অনুসরণ করা, আর যখন কোনো নতুন বিষয় তাদের সামনে আসবে, সে বষয়ে নিষ্ঠাবান মুফতীগণের নিকট ফতোয়া চাওয়া আর মামলা মুকদ্দমার ক্ষেত্রে কাযীগণের ফায়সালা অনুসরণ করা। এটাই তাদের জন্যে সরল সঠিক ও উত্তম পন্থা।
প্রত্যেক মাযহাবের প্রাচীন ও আধুনিক মুহাক্কিক আলিমগণকে এইরূপ চিন্তা চেতনার অধিকারীই পেয়েছি। সকল মাযহাবের ইমামগণ তাঁদের সাথী ও ছাত্রদেরকে এই ধারণার অনুসরণেরই অসীয়ত করেছেন। ‘ইয়াকুত ও জাওয়াহেরে’ উল্লেখ আছে যে, আবু হানীফা (রহ) বলতেনঃ
আমার মতের পক্ষে গৃহীত দলিলসমূহ যার জানা নেই আমার মতানুযায়ী ফতোয়া দেয়া তার উচিত নয়। আবু হানীফা স্বয়ং কোনো ফতোয়া দেয়ার সময় বলতেনঃ “এটা নুমান বিন সাবিতের (অর্থাৎ আমার) মত। আমার নিজের বুঝ জ্ঞান আনুযায়ী আমি এটাকেই উত্তম মনে করি।”
ইমাম মালিক (রহ) বুতেঃ
“রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া এমন কোনো মানুষ নেই, যার পুরো বক্তব্য গ্রহযোগ্য হতে পারে। তিনি ছাড়া আর সকলের বক্তব্যের কিছু অংশ গ্রহণযোগ্য এবং কিছু অংশ বর্জনীয়।”
হাকিম ও বায়হাকীতে বর্ণিত হয়েছে, শাফেয়ী ( রহ) বলতেনঃ
“কোনোঃ বিষয়ে সহীহ-বিশুদ্ধ হাদীস পাওয়া গেলে সে বিষ্যে সেটাই আমার মত।” অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে, শাফেয়ী (রহ) বলেছেনঃ
“তোমরা যখন আমার কোনো মতকে হাদীসের সাথে বিরোধপূর্ণ দেখতে পাবে, তখন তোমরা হাদীসের ভিত্তিতে আমল করবে এবং আমার মতকে দেয়ালের ওপাশে নিক্ষেপ করবে।”
শাফেয়ী (রহ) একদিন ইমাম মুযনীকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “হে আবু ইব্রাহীম! আমার প্রতিটি কথার অন্ধ অনুকরণ (তাকলীদ) করো না। বরঞ্চ সে বিষয়ে নিজেও চিন্তা গবেষণা করা উচিত। কারণ, এটা যা-তা ব্যাপার নয়, দ্বীনের ব্যাপার।”
তিন আরও বলতেনঃ
“রাসূলুল্লাহ (স) ছাড়া আর কারো কথার মধ্যে কোনো হুজ্জত নেই, তাদের সংখ্যা যদি বিরাটও হয়।”
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) বলতেনঃ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার সাথে বিরোধপূর্ণ হলে কোনো ব্যাক্তির কথাই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি এক ব্যাক্তি কে বলেছিলেনঃ
“আমার তাকলীদ করো না। মালিক, আওযায়ী, ইব্রাহীম নখয়ী প্রভৃতি কারই তাকলীদ করো না। তারা যেমন কিতাব ও সুন্নাহ থেকে মাসয়ালা গ্রহণ করেছেন, তোমরাও অনুরূপভাবে কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই মাসয়ালা গ্রহণ করো। সকল ইমামের মাযহাব ও মতামত সম্পর্কে অবগত হওয়া ছাড়া কারোই ফতোয়া দেয়া উচিত নয়। কারো নিকট যদি এমন কোনো মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করা হয়, যেটির বিষয়ে স্বীকৃত ইমামগণ একমত পোষণ করেছেন সেটির সেই সর্বসম্মত জবাবটি বলে দেয়াতে কোনো দোষ নেই। কারণ এরূপ ক্ষেত্রে সেটা তার নিজস্ব মতামত নয়, বরঞ্চ ইমামা মুজতাহিদ্গণের মতেরই ভাষ্য বলে গণ্য হবে। তার নিকট যদি কেউ কোনো মতবিরোধপূর্ণ মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করে, সেক্ষেত্রে এটা অমুকের মতে জায়েজ আর অমুকের মতে নাজায়েজ জবাব দেয়াতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু এরূপ ক্ষেত্রে এক পক্ষের মত বলে দেয়া উচিত নয়।”
আবু ইউসুফ ও যুফার (রহ) প্রমুখ বলেছেনঃ
“এমন কোনো ব্যাক্তির আমাদের মত অনুযায়ী ফতোয়া দেয়া উচিত নয়, যিনি আমাদের মতের ভিত্তি সম্পর্কে অবগত নন।”
ইমাম আবু ইউসুফকে বলা হয়ঃ ‘আবু হানীফার সাথে আপনার ব্যাপক মতপার্থক্য লক্ষ্য করছি।‘ তিনি তাকে জবাবে বলেনঃ “এর কারণ, আবু হানীফাকে যতোটা বুঝ জ্ঞান দেয়া হয়েছে, ততোটা আমাদেরকে দেয়া হয়নি। তিনি তাঁর বুঝ জ্ঞানের মাধ্যমে যা অনুধাবন করেছেন, তার সবটা বুঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর তাঁর যে বক্তব্য আমরা উপলদ্ধি করতে পারি না, তা দিয়ে ফতোয়া দেয়া আমাদের জন্যে বৈধ হতে পারে না।”
মুহাম্মদ ইবনুল হাসানকে জিজ্ঞসা করা হয়, কখন একজন লোক ফতোয়া দেয়ার বৈধতা অর্জন করে? জবাবে তিনি বলেনঃ “ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করলে।” জিজ্ঞাসা করা হয়ঃ ‘কিভাবে ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন হয়?’ জবাব তিনি বলেনঃ “যখন কোনো ব্যাক্তি কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে মাসায়েলের সকল দিকের উপর নজর দিতে পারেন এবং তার মতের বিরোধিতা করা হলে যুক্তিসঙ্গত জবাব দিতে পারেন, তখন তিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করেন।”
কেউ কেউ বলেছেনঃ “ইজতিহাদের নুন্যতম শর্ত হলো ‘মাবসূত’ গ্রন্থ মুখস্থ থাকা” ইবনুস সিলাহ বলেছেনঃ “শাফেয়ী মাযহাবের কোনো ব্যাক্তির নজরে যদি এমন কোনো হাদীস পড়ে, যেটি শাফেয়ীর মতের সাথে সাংঘর্ষিক, এরূপ ক্ষেত্রে তিনি যদি ইজতিহাদের মতলকের অধিকারী হন কিংবা সেই বিষয় বা মাসয়ালাটি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হন, তবে বিষয়টি সম্পর্কে গবেষোণা করার পর হাদীসটি বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে, সেক্ষেত্রে হাদীসটির উপর আমল করা এবং তাকলীদ পরিহার করা তাঁর জন্যে জরুরী। আর তিনি যদি এরূপ যোগ্যতার অধিকারী না হন আর দেখেন যে, অপর কোনো ইমাম এর মত হাদীসটির অনুরূপ। সে ক্ষেত্রেও হাদীসটির উপরই আমল করা তাঁর জন্য জরুরী। কারণ, এতে করে তাঁর কোনো না কোনো ইমামের তাকলীদ করা হয়ে যাচ্ছে।”—ইমাম নববীও এ মতই পোষণ করেন।
৪. চতুর্থ সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে ফকীহদের পারস্পরিক মতপার্থক্য কে কেন্দ্র করে। অথচ ফকীহদের মধ্যে তো মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব বিষয়ে, যেসব বিষয়ে স্বয়ং সাহাবায়ে কিরামের (রা) নিকট থেকেই পার্থক্যপূর্ণ মত (ইখতেলাফ) পাওয়া গেছে। যেমনঃ তাশরীক ও দুই ঈদের তাকবীর, মুহরেমের (যিনি ইহরাম বেধেছেন) বিয়ে, ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদের (রা) তাশাহুদ, বিসমিল্লাহ এবং আমীন সশব্দে কিংবা নিঃশব্দে পড়া প্রভৃতি বিষয়ে। এসব ক্ষেত্রে তাঁরা একটি মতকে আরেকটি মতের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন মাত্র।
অতীত আলিমগণের মতপার্থক্য মূল শরীয়তের ব্যাপারে ছিলোনা। মতপার্থক্য হয়েছে আনুসঙ্গিক বিষয়াদিতে। আর সেসব মতপর্থক্যও ছিলো নেহতই সাধারণ ধরণের। মতপার্থক্য ছিলো দু’টি বিষয়ের মধ্যে কোনটি উত্তম, তাই নিয়ে। কেউ মনে করেছেন এটি উত্তম, আবার কেউ মনে করেছেন ওটি উত্তম। যেমন, কারীগণের কিরআতের পার্থক্য। বিভিন্ন কারী বিভিন্ন দৃষ্টিভংগিতে তিলাওয়াত করেন। একই শব্দ বা আয়াত এর তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তুমি তাদের মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখতে পাবে। ফকীহদের মতপার্থক্যের ধরনও অনুরূপ। ফকীহগণ তাঁদের মতপার্থক্যের কারণ হিসেবে বলেছেন, এই মতও সাহাবীদের থেকে পাওয়া গেছে, ঐ মতও সাহাবীগণের (রা) নিকট থেকে পাওয়া। অর্থাৎ তাদের মধ্যেও পারস্পরিক মতপার্থক্য ছিলো এবং তা সত্বেও তাঁরা সকলেই হিদায়াতের উপর ছিলেন। এ কারণে হকপন্থী আলিমগণ ইজতিহাদী মাসায়েলের ক্ষেত্রে সকল মুজতাহিদের ফতোয়াকেই জায়েজ মনে করেন, সকল কাযীর ফায়সালাকেই স্বীকার করেন এবং অনেক সময় নিজ মাযহাবের বিপরীত মতের উপরও আমল করেন। এ কারণেই তুমি দেখতে পাচ্ছো, তারা মাসয়ালার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং ইখতেলাফী দিকসমূহ আলোচনার পর বলে দেন, ‘আমার মতে এটাই উত্তম’, ‘আমার মতে এটা গ্রহণ করা ভালো’। আবার কখনো বলেনঃ ‘আমি কেবল এতোটুকুই জানতে পেরেছি।‘ ‘আল মাসবূত’ আছারে মুহাম্মাদ এবং শাফেয়ীর বক্তব্যের মধ্যে এ কথাগুলোর সাক্ষ্য তুমি দেখতে পাবে।
অতঃপর শুভবুদ্ধির অধিকারী দ্বীনের সেই মহান খাদিমদের কাল অতিক্রান্ত হয়। তাদের পরে এমনসব লোকের আগমন ঘটে, যারা সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগির অধিকারী হবার কারণে হিংসা বিদ্বেষ ও বিবাদের ঝড় বইয়ে দেয়। মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরে। এ মতের অধিকারীদের এক পক্ষ আর ঐমতের অধিকারীদের আরেক পক্ষ হিসেবেভাবএ থেকে। এভাবেই শুরু হয় ফিরকা-পুরস্তী। এতে করে মানুষের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে তাহকীক ও চিন্তা গবেষণার জজবা। তারা নিজ নিজ ইমামের মাযহাবকে আকড়ে ধরে অন্ধভাবে। আফসোস তাদের এই বস্থার জন্যে!
অথচ এইসব মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়ে সাহাবী, তাবেয়ী ও তাদের পরবর্তী মহান আলিমগণের অবস্থা দেখো! তাঁরা (নামাজে) কেউ বিসমিল্লাহ পড়তেন, আবার কেউ পড়তেন না। কেউ তা সশব্দে পড়তেন, আবার কেউ নিঃশব্দে পড়তেন। কেউ ফজরে দোয়ায়ে কুনুত পড়তেন, আবার কেউ তা পড়তেন না। কেউ নকসীর, বমি ও ক্ষৌরকার্য করার পর অযু করতেন, আবার কেউ করতেন না। কেউ কামনা সাথে স্বীয় লিংগ এবং স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অযু করতেন, আবার কেউ করতেন না। কেউ রান্না করা খাদ্য খেলে অযু করতেন আবার কেউ করতেন না। তাদের কেউ উটের গোশত খেলে অযু করতেন আবার কেউ করতেন না।
এতদসত্বেও তাঁদের একজন অপরজনের পিছনে নামাজ পড়তেন। যেমন, আবু হানীফা ও তাঁর সাথীরা এবং শাফেয়ী প্রমুখ মদীনার ইমামদের পিছনে নামাজ পড়তেন। অথচ তাঁরা ছিলেন মালিকী অন্যান্য মতের লোক এবং তাঁরা সশব্দে কিংবা নিঃশব্দে বিসমিল্লাহও পড়তেন না। ইমাম আবু ইউসুফ হারুনুর রশীদের পিছে নামাজ পড়েছেন। অথচ হারুনুর রশীদ ক্ষৌরকার্য করার পর নতুন করে অযু করতেন না। কারণ ইমাম মালিক (রহ) ফতোয়া দিয়েছেন, ক্ষৌরকার্য করার পর অযু করার প্রয়োজন নেই। আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) ক্ষৌরকার্য এবং নকসীর৮২ এর জন্যে অযু করার কথা বলেছেন।
[৮২. গরমের প্রকোপে নাক দিয়ে যে রক্ত বের হয়, তাকে নকসীর বলে। –অনুবাদক]
কিন্তু যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলোঃ “যদি ইমামের শিরীর থেকে রক্ত বের হয় আর তিনি অযু না করেন, তিবে কি আপনি তার পিছে নামাজ পড়বেন?” জবাবে তিনি বললেনঃ ‘কেমন করে আমি মালিক ও সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেবের পিছে নামাজ না পড়ে থাকতে পারি?’৮৩
[৮৩. এ দু’জনের মতে এটা অযু ভঙ্গের কারণ নয়। –অনুবাদক]
বর্ণিত আছে, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ উভয়েই ঈদে ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত আকবীরের অনুসরণ করতেন। হারুনুর রশীদের পছন্দের কারণে তাঁরা এটা করতেন। অথচ তাঁরা ইবনে মাসউদ বর্ণিত তাকবীরের অনুসারী।
একবার শাফেয়ী আবু হানীফার কবরের কাছাকাছি স্থানে ফজরের নামাজ আদায় করেন। এ সময় আবু হানীফার সম্মানার্থে তিনি ফজরের নামাজে দোয়ায়ে কুনুত পড়েননি। তিনি বলতেন, আমি অনেক সময় ইরাকবাসীদের (আবু হানীফার) মাযহাবের উপর আমল করি।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মালিক (রহ) মানসুর এবং হারুনুর রশীদকে কি বলেছিলেন, এর আগে এ গ্রন্থে আমরা সে কথা উল্লেখ করেছি।
‘আল বাযাযিয়া’ গ্রন্থে ইমাম সানী অর্থাৎ আবু ইউসুফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, একবার তিনি হাম্মাম থেকে গোসল করে এসে জুমার নামাজ পড়ান। নামাজ শেষে লোকেরা চলে যাবার পর তাঁকে জানানো হয়, তিনি যে কুয়োর পানি দিয়ে গোসল করেছিলেন, তাতে মরা ইঁদুর পাওয়া গেছে। খবরটি শুনে তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, এ বিষয়ীখন মাওরা মাদের মদীনার ভাইদের (মালিকী মাযহাবে) মতের অনুসরণ করলাম যে, দুই কুল্লা পরিমাণ পানি থাকলে তা অপবিত্র হয় না। কারণ, এ পরিমাণ পানির বিধান ‘অধিক পানির’ বিধানের মতো।”
ইমাম খানজাদীকে শাফেয়ী মাযহাবের এমন এক ব্যাক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, যে ব্যাক্তি এক বা দুই বছরের নামাজ ছেড়ে দিয়েছিল, অতঃপর আবু হানীফার মাযহাব গ্রহণ করে। এখন সে কোন মাযহাবের রীতিতে নামাজগুলো কাযা করবে? শাফেয়ী মাযহাবের রীতিতে নাকি হানাফী মাযহাবের রীতিতে? জবাবে ইমাম খানজাদী বলেনঃ “সে বৈধ মনে করে, এমন যে কোনো মাযহাবের রীতিতে পড়লেই নামাজ আদায় হয়ে যাবে।”
কোনো হানাফী মাযহাবের লোক যদি শপথ করে যে, ‘আমি যদি অমুক মহিলাকে বিয়ে করি, তবে তাকে তিনি তালাক দিলাম।’৮৪
[৮৪. উল্লেখ্য, হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এভাবে শপথ করলে সেই মহিলাকে বিয়ে করার সাথে সাথে তার উপর তিন তালাক প্রযোজ্য হয়ে যাবে। –অনুবাদক]
অতঃপর কোনো শাফেয়ী আলিমের নিকট ফতোয়া চাইলে তিনি যদি বলেনঃ ‘তালাক হয়নি, তোমার শপথ বাতিল, সেটা ছিলো একটা বাহুল্য কথা।’ এমতাবস্থায় এ ব্যাপারে সে যদি শাফেয়ী মাযহাবের অনুসরণ করে, তবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ, এর পক্ষে বিরাট সংখ্যক সাহাবীর মত রয়েছে। এ কথাগুলো উল্লেখ হয়েছে ‘জামিউল ফাতাওয়া’ গ্রন্থে।
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ) তাঁর ‘আমালী’ গ্রন্থে বলেছেনঃ “কোনো ফকীহ যদি তার স্ত্রীকে বলে, ‘তোমাকে তালাক দিয়ে দিলাম’ এবং তার মাযহাব অনুযায়ী সে যদি এটাকে তিন তালাক বা বায়েন তালাক মনে করে, কিন্তু সমকালীন কাযী যদি সেটাকে তালাকে রিজয়ী (ফেরতযোগ্য) বলে ফায়সালা দেয়, তবে তার স্ত্রীর সাথে ঘর করার অবকাশ তার রয়েছে।”
একইভাবে হালাল হারাম, লেনদেন ও পারস্পরিক সম্পর্কের সেইসব বিষয়ে, যেগুলোর ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, প্রত্যেক ফকীহর উচিত সেসব বিষয়ে ইসলামী আদালত তার মাযহাবের বিপরীত রায় দিলেও সে রায়ের উপর আমল করা এবং সেসব ক্ষেত্রে স্বীয় মাযহাবের উপর আমল না করা।
আলোচনাকে অন্যন্ত দীর্ঘায়িত করলাম। যেসব কারণে বিভিন্ন মাযহাব ও দল উপদলের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদ লেগে আছে, সেগুলোর কারণ উদ্ঘাটিত করা এবং সত্য ও সঠিক পথের দিশা দেয়াই এ দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য। কেউ যদি বিদ্বেষী এবং অতি সংকীর্ণ ও অতি উদার মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে ন্যায় ও সত্যানুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে এ কথাগুলোর প্রতি দৃষ্ট দেয়, তবে সত্য ও সঠিক পথের অনুসরণের জন্যে এ কথাগুলোই তার জন্যে যথেষ্ট। আর প্রকৃত সত্য সম্পর্কে তো আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
আল্লামা ইকবাল ইসলামকে চারমাযহাবে বন্দী করে স্থবির করার তীব্র নিন্দা করেন। এবং আব্দুল ওহাব নজদীর মাযহাব বিরোধী অবদানের ভুয়োশী প্রশংসা করেন। আমি তার বই “ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনগর্ঠন“ এর ১০৬ পৃষ্ঠা থেকে ১২৭ পৃষ্ঠার কতিপয় অংশ তুলে ধরছি।
১. “ ———- আমাদের প্রাচীন আরবীয় এবং অনারবীয় আইন পন্ডিতগণ সংগৃহীত আইনগুলোর সংস্কার করেছিলেন যতক্ষণ না তারা আমাদের অনুমোদিত আইন গোষ্ঠীসমূহের স্বীকৃতি পেয়েছিল। এই আইন গোষ্ঠী ইজতিহাদের তিনটি স্তরের কথা বলে :
১. আইনের উপর পূর্ণ কর্তৃত¦ যা প্রকৃতপক্ষে সীমাবদ্ধ ছিল আইন গোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাতাদেও মধ্যে।
২. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যা একটি বিশেষ গোষ্ঠির জন্য কাজ করবে।
৩. বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নকারী, যেসব ক্ষেত্রে আইন গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতাগণ কোন নির্দেশ দিয়ে যান নি।
এই বক্তব্যে আমি ইজতিহাদের প্রথম স্তর নিয়ে আলোচনা করব। ইজতিহাদের এই স্তরে তাত্ত্বিক সম্ভাবনার কথা সুন্নীগণ স্বীকার করেছিল। কিন্তু এই গোষ্ঠীসমূহ প্রতিষ্ঠা করার পূর্ব পর্যন্ত এর বাস্তব প্রয়োগকে অস্বীকার করেছিল, এই কারণে যে পূর্ণ ইজতিহাদ একটিমাত্র ব্যাক্তির পক্ষ্যে অসম্ভব। যে আইন পদ্ধতির ভিত্তিমূল কোরআন তার এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি অদ্ভ’ত। আমরা সম্মুখে অগ্রসর হবার পূর্বে এই বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করব যা ইসলামী আইনকে প্রকৃতপক্ষে স্থির অবস্থায় এনেছে।———————-। “
২. “————- ত্রয়োদশ শতক এবং তার পরে ইসলামি আইনে অতীত ইতিহাসের প্রতি অন্ধ শ্রদ্ধার জন্য যে অতি সংগঠনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, যা ছিল ইসলামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের বিরোধী; পরিণতিতে আহ্বান করেছিল ইবনে তাইমিয়ার প্রতিক্রিয়া, ইসলামের অক্লান্ত লেখক এবং ধর্মপ্রচারক, যার জন্ম হয়েছিল ১২৬৩ খৃ: বাগদাদের পতনের পাচ বছর পর। ইবনে তাইমিয়া নিজের জন্য ইজতিহাদের স্বাধীনতা দাবি করে এই গোষ্ঠীসমূহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উত্থাপন করেন, এবং নতুন করে শুরু করার উদ্দেশ্যে প্রথম নীতিতে ফিরে গিয়েছিলেন, ইবনে হাজামের মত যিনি জাহিরি আইনের প্রতিষ্ঠাতা হানাফি মাযহাব এর উদাহরণ এবং ইজমার দ্বারা বিচার পদ্ধতি বাতিল করেছিলেন। কারণ তিনি ভেবেছিলেন চু্িংঁঢ়৩; কুসংস্কারের ভিত্তি এবং নি:সন্দেহে তার সময়ের জরাজীর্ণ নৈতিক এবং বৌদ্ধিক পরিস্থিতি বিচার করে তিনি ঠিকই করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সুয়ূতী ইজতিহাদের একই একই সুবিধা দাবি করেন যার সাথে তিনি যুক্ত করেছিলেন প্রত্যেক শতাব্দীর শুরুতে নবীয়কারকের ধারণা। ইবনে তাইমিয়ার শিক্ষার মূলকথা প্রকাশ পায় বিশাল সম্ভাবনায্ংুঁঢ়৩; এক বিপ্লবে যার শুরু হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে নজদেও বালুকা থেকে; ম্যাকডোনাল্ড বর্ণনা করেছিলেন, “ক্ষয়শীল ইসলাম জগতে পরিচ্ছন্নতম স্থান” এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে আধুনিক ইসলাম জীবনে প্রথম হৃদস্পন্দন, এই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুপ্রেরণা ছিল এশিয়া এবং আফ্রিকায় সমস্ত বৃহৎ মুসলিম বিপ্লব যেমন, সেনুসী বিপ্লব, প্যান-ইসলামিক বিপ্লব, কবি বিপ্লব, যা কেবলমাত্র আরবীয় প্রগতিবাদের পার্সি পতিক্রিয়া। বিখ্যাত পিউরিটান সংস্কারক মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী, যিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৭০০ খৃ: শিক্ষা লাভ করেছিলেন মদীনায় এবং ভ্রমন করেছিলেন পার্সিয়াতে, শেষ পর্যন্ত সমগ্র ইসলাম জগতে তার আত্মার আগুন ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন গ্ভাৎধপ৩৪;ালীর শিষ্য মুহাম্মদ ইবনে তুমারাত এরম ত, যিনি ছিলেন ইসলামের বার্বার পিউরিটান সংস্কারক, মুসলিম স্পেনের ধ্বংসের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাকে নতুন অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। —————
আবু হানীফাকে সুফিয়ান সাওরী ইসলামের ঐক্য ধ্বংসকারী, বিদাতী বলেছেন। http://aloloomenglish.net/vb/showthread.php?418-The-Severe-Jarh-of-The-Salaf-us-Salih-upon-Abu-Haneefah&s=a212e61076f4f77748110a093d15acd4
মাজহাব মানা ও না মানা। সংশয় নিরসন।
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর। দুরুদ ও সালাম নাজিল হোক প্রিয় নবী(সা) এর উপর।
ইসলামের ৪ মহান ইমাম-
ইমাম আবু হানীফা(রহ), ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ),ইমাম শাফেয়ী(রহ) এবং ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ)
এছাড়াও আরো মুজতাহিদ ইমাম ছিলেন,তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, ইমাম আওযাঈ,ইমাম ইসহাক ইবন রাহ’ওয়া।
বর্তমানে আমাদের মুসলিমদের মধ্যে একটি বড় ব্যাধি হল – মাজহাব মানা ও না মানা নিয়ে ঝগড়া করা।
মাজহাব মানা বলতে বুঝানো হচ্ছে কোন একজন(নির্দিষ্ট) ইমামের(৪ ইমাম হতে) মত ও পথ
অনুসরণ করা (এই অনুসারীদের বলা হয়- মাযহাবী)
আর মাজহাব না মানা বলতে বুঝানো হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট ইমামের পথ অনুসরণ না করা (এদের বলা হয়- লা মাযহাবী)
অপর কথায় বলা যায়ঃ
১.নির্দিষ্ট কোন একজন ইমামের অনুসারী হল- মাজহাবী
২.নির্দিষ্ট কোন একজন ইমামের অনুসারী নয় বরং এই ৪ ইমামের মধ্য হতে যার ইজতিহাদ কোরআন ও সুন্নাহর নিকটবর্তী তার অনুসারীরা হল- লা মাযহাবী
মাযহাবীরা আবার ২ ভাগে বিভক্ত,
১. ইমামের ইজতিহাদের অন্ধ অনুসারী(তাকলীদ করা)
২.ইমামের ইজতিহাদের অনুসারী কিন্তু অন্ধ অনুসারী নয়(তাকলীদ না করা বরং ইত্তেবা করা)
তাকলীদের পারিভাষিক অর্থ- তাক্বলীদ হল শারঈ বিষয়ে কোন মুজতাহিদ বা শরী‘আত গবেষকের কথাকে বিনা দলীল-প্রমাণে চোখ বুজে গ্রহণ করা।
তাকলীদ করার ব্যাপারে বিশিষ্ট আলেমদের মন্তব্যঃ
১. ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেন,
তাক্বলীদ হল রায়-এর অনুসরণ এবং ইত্তেবা হল রেওয়ায়াতের অনুসরণ। ইসলামী শরীআতে ইত্তেবা সিদ্ধ এবং তাক্বলীদ নিষিদ্ধ (শাওকানী, আল-ক্বাওলুল মুফীদ, মিসরী ছাপা ১৩৪০/১৯২১ খৃঃ, পৃঃ ১৪)
২. মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীত্বী (রহঃ) বলেন,
তাকলীদ হল কারো দলীল সম্পর্কে অবহিত না হয়ে তার কথা গ্রহণ করা, যা তার ইজতিহাদ বা গবেষণা ব্যতীত কিছুই নয়। পক্ষান্তরে শারঈ দলীল কারো মাযহাব ও কথা নয়, বরং তা একমাত্র অহী-র বিধান, যার অনুসরণ করা সকলের উপর ওয়াজিব। (ঐ)
৩. হাফিয ইবনে রাজাব হাম্বলী(রহ) বলেছেনঃ ‘যার কাছেই নাবী(সা) এর আদেশ পৌঁছে যায় এবং তিনি তা বুঝতে পারেন তাহলে তার উপর এটাকে উম্মতের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করে দেখা ও তাদের মঙ্গল কামনা করা এবং তার নির্দেশ পালন করার আদেশ প্রদান করা ওয়াজিব যদিও তা উম্মতের বিরাট কোন ব্যক্তিত্বর বিরোধী হয়’(আলবানী-রাসুলুল্লাহ(সা) এর সালাত;৩৫-তাওহীদ পাবলিকেশন্স)
ইমামের অনুসরণের ক্ষেত্রে তাদের অনুসারীরা ইমামদের কিছু কথার বিরদ্ধে অবস্থান করেছেন তার পরও তারা সেই মাজহাবের অন্তর্ভুক্ত হিসাবেই গণ্য হতেনঃ
১. ইমাম মুহাম্মাদ ইবন হাসান ও ইমাম আবু ইউসুফ ছিলেন ইমাম আবু হানিফার অনুসারী। কিন্তু তারা ইমাম আবু হানিফার প্রায় এক তৃতীয়াংশ ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন (ইবন আবিদীন; ১/৬২)
২. ইমাম মুহাম্মাদ তার মুয়াত্তা গ্রন্থের ১৫৮ পৃঃ তে বলেছেন- আবু হানিফা ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) কোন সালাত আছে বলে মনে করতেন না, তবে আমার কথা হচ্ছে (ইসতিসকার সালাত হল) ইমাম লোকজনকে নিয়ে ২ রাকাত সালাত পড়বেন অতঃপর দোয়া করবেন।
[ইমাম মুহাম্মাদ তার এই মুয়াত্তা গ্রন্থে ইমাম আবু হানিফার প্রায় ২০টি ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন, তা যথাক্রমে- ৪২,৪৩,১০৩,১২০,১৫৮,১৬৯,১৭২,১৭৩,২২৮,২৩০,২৪০,২৪৪,২৭৪,২৭৫,২৮৪,৩১৪,৩৩১,৩৩৮,৩৩৫,৩৩৬ পৃঃ রয়েছে]
৩. তাফসীর ইবনে কাসীরের লিখক- ইমাম ইবন কাসীর ছিলেন শাফী মাজহাবের অনুসারী। শাফী মাজহাব অনুসারে মুক্তাদিরা ইমামের পিছনে সর্বাবস্থায় সুরা ফাতিহা পাঠ করবে এবং এটা ওয়াজিব(ইমাম শাফেয়ীর মতে) ইমাম ইবন কাসীর শাফী মাজহাবের অনুসারী হওয়া সর্তেও ইমামের পিছনে মুক্তাদির যেহরী কিরাত বিশিষ্ট সালাতে(যেমনঃ ফজর,মাগরিব) সুরা ফাতিহা পরবে না বলে মত প্রকাশ করেছেন (তাফসীর ইবন কাসীর,সুরা আরাফের ২০৪ নং আয়াতের তাফসীর,৮-১১ খণ্ড)
৪. ইমাম ইবন তাইমিয়াহ ছিলেন হাম্বলী, হাম্বলী মাজহাব মতে ৩ তালাক একত্রে দিলেও ৩ তালাক হিসাবে তা গণ্য হবে কিন্তু ইমাম ইবন তাইমিয়াহ বলেছেন- ৩ তালাক একত্রে দিলে ১ তালাক হিসাবে তা গণ্য হবে। যা হাম্বলী মাজহাবের বিরদ্ধে।
৫. মুহাদ্দিস দেহলভী শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন হানাফী(কেহ কেহ তাকে লা মাযহাবীও বলে থাকেন) তিনি ইমাম আবু হানিফার বিরদ্ধে অবস্থান করে রুকুর আগে ও পরে রাফুল ইয়াদিন(হাত উত্তোলন) করাকে পছন্দ করেছেন (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা;২/১০)
৬. মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী বলেনঃ সালাতে রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে উঠার সময় দু হাত না তোলা সম্পর্কে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো সবই বাতিল হাদীস। তন্মধ্যে একটিও সহীহ নয় (মাওযুআতে কাবীর, পৃ-১১০)
আর অনেক এমন প্রমাণ রয়েছে, এখানে মাত্র ৬ টি প্রমাণ উল্লেখ্য করলাম। এসব অনুসারীরা তাদের ইমামদের বিরোধিতা করার পরও মাজহাবের গণ্ডি থেকে বের হন নি। সুতরাং বর্তমানে কেহ যদি তার মাজহাবের কোন কথা কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের বিরদ্ধে পায় এবং মাজহাবের সেই কথাকে বর্জন করে সঠিক কথা (কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের ভিত্তিক) কে মেনে নেয় তাহলে সে মাজহাব থেকে বের হবে না বরং সে মাজহাবকে সঠিক ভাবে মানলো।
এক্ষেত্রে আমি উল্লেখ্য করছি একজন প্রখ্যাত আলেমের কথা,
শেইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী(রহ) বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি ইমামদের কিছু কথার বিরুদ্ধে গেলেও সকল সুসাব্যস্ত হাদীস আঁকড়ে ধরবেন তিনি ইমামদের মাজহাব বিরোধী হবেন না এবং তাদের তরীকা থেকে বহিস্ক্রিতও হবেন না বরং তিনি হবেন তাদের প্রত্যেকের অনুসারী। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শুধু ইমামদের বিরোধিতা করার কারণে সুসাব্যস্ত হাদীস প্রত্যাখ্যান করে তার অবস্থা এমনটি নয়,বরং সে এর মাধ্যমে তাদের অবাধ্য হল এবং তাদের পূর্বোক্ত কথাগুলর বিরোধিতা করল’ (আলবানী-রাসুলুল্লাহ(সা) এর সালাত;৩৪-তাওহীদ পাবলিকেশন্স)
ইমামদের ইজতিহাদ অনুসরণের কারণঃ
আপনি যদি নিজে ইজতিহাদ করার ক্ষমতা রাখেন তাহলে আপনার জন্য কোন ইমামের অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আপনি যদি ইজতিহাদ করার ক্ষমতা না রাখেন তাহলে আপনাকে ইমামের ইজতিহাদ অনুসরণ করতে হবে। এখানে আমি বিশিষ্ট আলেম- শেইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমিন(রহ) এর বক্তব্য পেশ করলাম,
(শেইখ বলেছেন) এ ব্যাপারে মানুষ ৩ ভাগে বিভক্তঃ
১.আলেম, যাকে আল্লাহ ঈলম ও সমঝ দান করেছেন
২.তালেবে-ইলম, যার ইলম আছে কিন্তু তিনি ঐ বড় আলেমের দরজায় পৌঁছেননি
৩.সাধারণ মানুষ, যার কোন(শরয়ী) ইলম নেই
(তিনি আরো বলেন) প্রথম শ্রেণীর মানুষের ইজতিহাদ করে বলার অধিকার আছে।
দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ,যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন কিন্তু তিনি ঐ বড় আলেমের দরজায় পৌঁছেননি। এমন শ্রেণীর মানুষ যদি শরীয়তের ব্যপক ও সাধারণ এবং তার নিকট যে ইলম পৌঁছেছে তা দ্বারা ফয়সালা দিয়ে থাকেন তাহলে তার জন্য তা দোষের কিছু নয়। তবে তার পক্ষে জরুরী এই যে, তিনি এ ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করবেন এবং তার থেকে বড় আলেমকে জিজ্ঞাসা করে নিতে কুণ্ঠিত হবেন না। কারণ তিনি ভুল বুঝতে পারেন। কখন বা তার ইলম বা সমঝ ব্যাপক কে সীমাবদ্ধ, সাধারণকে নির্দিষ্ট অথবা রহিত আদেশকে বহাল মনে করতে পারেন। অথচ তিনি এ ব্যাপারে কোন টেরই পাবেন না।
পক্ষান্তরে তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ, যাদের নিকট শরীয়তের ইলম নেই, তাদের জন্য আহলে ইলমকে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া ওয়াজিব। [ইবনে উসাইমিন- উলামাদের মতানৈক্য ও আমাদের কর্তব্য;২৬-২৭-তাওহীদ পাবলিকেশন্স]
ইমামদের তাকলীদ করার ব্যাপারে তাদের(৪ ইমামের) নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের অনুসরণের কথাঃ
১- ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
১. যখন ছহীহ হাদীছ পাবে, জেনো সেটাই আমার মাযহাব (হাশিয়াহ ইবনে আবেদীন ১/৬৩)২. আমি যদি আল্লাহর কিতাব (কুরআন) ও রাসূলুললাহ (ছাঃ)-এর কথার (হাদীছ) বিরোধী কোন কথা বলে থাকি, তাহলে আমার কথাকে ছুঁড়ে ফেলে দিও (ছালেহ ফুল্লানী, ইক্বাযু হিমাম, পৃঃ ৫০)
২- ইমাম মালেক (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
আমি একজন মানুষ মাত্র। আমি ভুল করি, আবার ঠিকও করি। অতএব আমার সিদ্ধান্তগুলো তোমরা যাচাই কর। যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূলে হবে সেগুলো গ্রহণ কর। আর যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিকূলে হবে তা প্রত্যাখ্যান কর (ইমাম ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১৪৯)
৩- ইমাম শাফেঈ (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
আমি যেসব কথা বলেছি, তা যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছহীহ হাদীছের বিপরীত হয়, তবে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছই অগ্রগণ্য। অতএব তোমরা আমার তাক্বলীদ কর না (ইবনু আবী হাতেম, পৃঃ ৯৩, সনদ ছহীহ)
৪- ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
তুমি আমার তাক্বলীদ কর না এবং তাক্বলীদ কর না মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ ও ছাওরীর (ইলামুল মুওয়াক্কি’ঈন, ২/৩০২)
৪ ইমামের উপরোক্ত কথা গুল থেকে বুঝা যায় যে তারা তাদের তাকলীদ(অন্ধ অনুসরণ) করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তাদের কথা থেকে এটি প্রমাণিত যে, তখন থেকেই তাদের অনুসরণ করা হত। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেছেনঃ তুমি আমার তাক্বলীদ কর না, কিন্তু তিনি বলেন নি যে তুমি আমার অনুসরণ কর না। অর্থাৎ ইমামদের অনুসরণ সম্পূর্ণ বৈধ।
যারা বলে- নির্দিষ্ট কোন ইমামের(মাজহাব) অনুসরণ করা অনর্থক কাজ অথবা ভুল কাজঃ
১. ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল আল-বোখারী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ২৫৬ হিজরি)
২. ইমাম মুসলিম(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ২৬১ হিজরি)
৩. ইমাম আবু দাউদ(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ২৭৫ হিজরি)
৪. ইমাম নাসাঈ(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৩০৩ হিজরি)
৫. ইমাম ইবন খুজাইমা(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৩১১ হিজরি)
৬. ইমাম তহাবী(রহ) ছিলেন হানাফী (মৃত্যু- ৩২১ হিজরি)
৭. ইমাম আল-হাসান ইবন আলী আল-বারবাহারী(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৩২৯ হিজরি)
৮. ইমাম তাবারানী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৩৬০ হিজরি)
৯. ইমাম বাইহাকী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৪৫৮ হিজরি)
১০. ইমাম ইবনে আকিল(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৪৮৮ হিজরি)
১১. শেইখ আব্দুল কাদের জিলানী(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৫৬১ হিজরি)
১২. ইমাম ইবন কুদামা(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৬২০ হিজরি)
১৩. ইমাম মুহিউদ্দিন ইয়াহইয়া আন-নববী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৬৭৬ হিজরি)
১৪. ইমাম ইবন তাইমিয়াহ(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৭২৮ হিজরি)
১৫. ইমাম যাহাবী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৭৪৮ হিজরি)
১৬. ইমাম ইবন কাইয়ুম(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৭৫১ হিজরি)
১৭. ইমাম ইবন কাসীর(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৭৭৪ হিজরি)
১৮. ইমাম ইবন রাজাব(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৭৯৫ হিজরি)
১৯. হাফেজ ইবন হাজার আল-আস্কালানী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৮৫২ হিজরি)
২০. ইমাম শাখাবী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৯০২ হিজরি)
২১. ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহাব(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ)
এছাড়াও আমরা প্রায় সবাই যাদের সম্মান করি তাদের অনেকেই ছিলেন হাম্বলী। যেমনঃ
১. শেইখ আব্দুল আজিয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ). তিনি সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ছিলেন। তার হম্বলী হওয়ার প্রমানঃ
http://www.hanabilah.com/were-ibn-taymiyyah-ibn-qayyim-ibn-abdulwahab-ibn-baz-and-ibn-uthaymin-hanbalis/
http://www.binbaz.org.sa/mat/8225
http://islamqa.info/en/ref/23280/hanbali
২. শেইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমিন(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ২০০১ খ্রিস্টাব্দ)
তার প্রমানঃ
http://www.hanabilah.com/were-ibn-taymiyyah-ibn-qayyim-ibn-abdulwahab-ibn-baz-and-ibn-uthaymin-hanbalis/
http://en.wikipedia.org/wiki/Muhammad_ibn_al_Uthaymeen
আমি জানি, অনেকেই হয়তো বা বলবেন যে, শেইখ বিন বায এবং ইবন উসাইমীন(রহ) এর অনেক মতামত হাম্বলী মাজহাবের বিরদ্ধে যায়, তাহলে তারা কিভাবে হাম্বলী? হ্যাঁ, আমি মানি তাদের অনেক মত হাম্বলী মাজহাবের বিরদ্ধে যায় কিন্তু আমি আগেই আলোচনা করেছি যে, নিজ ইমামের বিরদ্ধে কিছু মত গেলেই সে তার মাজহাব থেকে বহিষ্কৃত হবেন না, পূর্ববর্তী অনেক আলেমের উদাহরণ আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ্য করেছি। এ ব্যাপারে শেইখ আব্দুল আযিয ইবন বায(রহ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, সেই প্রশ্ন এবং তার উত্তর আমি এখানে উল্লেখ করলাম,
[Question posted to Shaikh AbdulAzīz bin Bāz رحمه ﷲ]
س1: هل لسماحتكم مذهب فقهي خاص وما هو منهجكم في الفتوى والأدلة؟
ج1: مذهبي في الفقه هو مذهب الإمام أحمد بن حنبل رحمه الله وليس على سبيل التقليد ولكن على سبيل الاتباع في الأصول التي سار عليها، أما مسائل الخلاف فمنهجي فيها هو ترجيح ما يقتضي الدليل ترجيحه والفتوى بذلك سواء وافق ذلك مذهب الحنابلة أم خالفه، لأن الحق أحق بالاتباع، وقد قال الله عز وجل
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
Translation:
Question: Do you Esteemed Shaikh follow a specific madh-hab and what is the methodology that you give the fatwa upon and deal with proofs?
Answer: My madh-hab in Fiqh is the madh-hab of Imām Ahmad bin Hanbal رحمه ﷲ, not on the methodology of Taqlīd rather it’s is by following him in his foundations (Usūl) in extracting rulings from fiqh which he took. As for the issues of Fiqh that have differences of opinions, my method in dealing with those is that I choose that which is substantiated with the proof, and then I give rulings based upon that which I’ve selected from that, whether or not it agrees with the opinion of the Hanbalī Madhab or goes against it, That is because the truth is more worthy of being followed, And Allah Says:
“O you who have believed, obey Allah and obey the Messenger and those in authority among you. And If you disagree over anything, refer it to Allah and the Messenger, if you should believe in Allah and the las day. That is the best way and best in result”
Reference: http://www.binbaz.org.sa/mat/8225
যদি নির্দিষ্ট কোন ইমামের অনুসরণ করা অনর্থক কাজ অথবা ভুল কাজ হয়ে থাকে তাহলে কি উপরে বর্ণীত সকল উলামাগন ভুল করেছেন? অনর্থক কাজ করেছেন? না কখনই না।
এখানে আমি বিশেষ আলেমদের কথা উল্লেখ্য করছিঃ
Shaykh al-Islam Ibn Taymiyah said:
No one has to blindly follow any particular man in all that he enjoins or forbids or recommends, apart from the Messenger of Allaah (peace and blessings of Allaah be upon him). The Muslims should always refer their questions to the Muslim scholars, following this one sometimes and that one sometimes. If the follower decides to follow the view of an imam with regard to a particular matter which he thinks is better for his religious commitment or is more correct etc, that is permissible according to the majority of Muslim scholars, and neither Abu Haneefah, Maalik, al-Shaafa’i or Ahmad said that this was forbidden.
Majmoo’ al-Fataawa, 23/382.
Shaykh Sulaymaan ibn ‘Abd-Allaah (may Allaah have mercy on him) said:
Rather what the believer must do, if the Book of Allaah and the Sunnah of His Messenger (peace and blessings of Allaah be upon him) have reached him and he understands them with regard to any matter, is to act in accordance with them, no matter who he may be disagreeing with. This is what our Lord and our Prophet (peace and blessings of Allaah be upon him) have enjoined upon us, and all the scholars are unanimously agreed on that, apart from the ignorant blind followers and the hard-hearted. Such people are not scholars.
Tayseer al-‘Azeez al-Hameed, p. 546
যারা বলে নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিবঃ
শরীয়ত এ কোন কিছু ওয়াজিব হওয়ার জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের দলিল লাগবে। কেহ কেহ বলে থাকেন যে, ৪ ইমাম মিলে ইজমা করেছেন মাজহাব মানার জন্য, এটি একটি কাল্পনিক কথা। কারণঃ
ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর জন্ম ৮০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৫০ হিজরি তে
ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) এর জন্ম ৯৩ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৭৯ হিজরি তে
ইমাম শাফেঈ(রহ) এর জন্ম ১৫০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২০৪ হিজরি তে
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর জন্ম ১৬৪ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২৪১ হিজরি তে
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে বুঝা যাচ্ছে ইমাম আবু হানিফার সাথে ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ এর দেখাও হয় নি। ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) যখন ইন্তেকাল করেন তখন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর মাত্র ১৫ বছর বয়স।
অর্থাৎ তাদের ইজমা হওয়ার বিষয় তা অবান্তর। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিব নয় বরং মুবাহ অর্থাৎ মানলেও দোষ নেই আবার না মানলেও দোষ নেই
যারা বলে ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই,
ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই এই কথা অবান্তর। কেননা, ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর পরে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার সকল কথাই গ্রহণীয় (ইমাম ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১৪৫)
সাহাবীদেরও ইজতিহাদী বিষয়ে ভুল থাকা স্বাভাবিক। ইমাম আবু হানিফা(রহ) ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) বলেছেনঃ সাহাবীগণ ভুলের উর্ধে না হলেও কোরআন ও হাদীসে বারবার তাদের পরিপূর্ণ মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হয়েছে (আবু বকর সারাখসী,আল-মুহাররার ফী উসুলিল ফিকহ ২/৮১-৯১), আবু হামেদ গাযালী, আল-মুসতাসফা ১/৬১৬-৬২৬, মুহাম্মাদ ইবন হুসাইন আল-জিযানী,মাআলিমু উসুলিল ফিকহি,পৃঃ২২২-২২৭)
যেখানে সাহাবীদের ইজতিহাদে ভুল থাকতে পারে সেখানে ৪ ইমামদের ভুল থাকতে পারে না?
ইমাম আবু হানিফা ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) কোন সালাত আছে বলে মনে করতেন না, কিন্তু সহীহ বোখারী ও সহীহ মুসলিম এ ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত নামে আলাদা অধ্যায়(বা’ব) রয়েছে। সুনান আবু দাউদ এর ১১৬১,১১৬২,১১৬৩,১১৬৪,১১৬৫,১১৬৬,১১৬৭,১১৬৮,১১৭০,১১৭১,১১৭২,১১৭৩,১১৭৪,১১৭৬ নং হাদীস ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে আমাদের বলছে(এছাড়াও আর অনেক হাদীস রয়েছে). তাহলে কি ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর ইজতিহাদ ভুল ছিল না এই ক্ষেত্রে? সম্ভবত ইমাম আবু হানিফার কাছে এসব হাদিস গুল পৌঁছে নি।
ইতিপূর্বে আমি আলোচনা করেছি যে ইমাম মুহাম্মাদ(রহ) ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে মত দিয়েছেন এবং বলেছেন যে ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত ২ রাকাত।
এছাড়াও আমি ইতিপূর্বে আরো আলোচনা করেছি যে, এই ৪ ইমামের অনেক অনুসারী তাদের ইমামের অনেক ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন, এতেই স্পষ্ট হয় যে এই ৪ মুজতাহিদ ইমামদের কিছু ইজতিহাদে ভুল ছিল। তবে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর ইজতিহাদে সবচেয়ে কম ভুল পাওয়া যায়, এর অন্যতম কারণ হল- তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন, তার প্রায় ১০ লক্ষ হাদীস মুখস্ত ছিল। এছাড়াও তিনি ইমাম বোখারী(রহ) এর পণ্ডিত ছিলেন।
ইমামদের(মাজহাব) অনুসরণ করার পদ্ধতিঃ
১. ইমামের ইজতিহাদ সঠিক ও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে এই কথা খেয়াল রেখে তার অনুসরন করা।
২. ইমামের ফতওয়ার পক্ষের দলিল খোজ করা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৩. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে আগে দেখে নেওয়া যে ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল আছে কিনা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৪. ইমামের ফতওয়ার পক্ষে ও বিপক্ষে(অর্থাৎ ২ পক্ষেই) দলিল থাকলে যা উৎকৃষ্ট তা পালন করা আর ২ পক্ষের দলীল সমান পর্যায় এর হলে ইমামের মত অনুসরণ করলে ইমামের অনুসারীদের সাথে ঐক্য থাকবে আর ইমামের মত না মেনে বিপরীত মত মানলেও তা দোষের কিছু নয় (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৫. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে ও ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল না থাকলে ইমামের মতকে বর্জন করা এবং সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে যার ইজতিহাদ রয়েছে(অথবা আলেমকে জিজ্ঞাসা করা) তাকে অনুসরণ করা(সাধারণ মানুষের জন্য) আর তালেবে ইলমদের জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা এবং আলেমদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে কুণ্ঠিত না হওয়া এবং আলেমদের জন্য সরাসরি সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা
উপরোক্ত ৫ টি নিয়ম মেনে চললে কোরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসরণ হবে, অনুসরণ হবে ইমামগণের এবং অনুসরণ হবে পূর্ববর্তি আলেমগণের(ইমাম বোখারী থেকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহাব পর্যন্ত)
কিছু মাসলাতে ২ পক্ষেই সহীহ হাদীস থাকে, সে ক্ষেত্রে যেকোন একটির উপর আমল করলেই চলবে।
নির্দিষ্ট ইমাম(মাজহাব) মানার ক্ষেত্রে ডাঃ জাকির নায়েকের মতঃ
ডাঃ জাকির নায়েক বলেছেনঃ সাধারণের মধ্যে কেউ যদি বিশেষ কোনো ইমামের রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। (লেকচার সমগ্র,ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তি সমূহের জবাব,মুসলিমরা এত দলে বিভক্ত কেন?,পৃঃ-২৩৪) এখানে তিনি মাজহাবকে জাতীয় পরিচয় হিসাবে উল্লেখ্য করতে নিষেধ করেছেন কারণ এতে করে ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
মাজহাব মানা কি বিভক্তি নয়?
আল্লাহ পাক কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমাদের বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন,
যেমনঃ সুরা আনআম এর ১৫৯ নং আয়াত, সুরা রুম এর ৩১-৩২ আয়াত।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন, সুরা আলে ইমরান এর আয়াত ১০৩ নং আয়াতে।
কিন্তু এসব আয়াত ইমামদের সঠিক অনুসরণকারীদের উপর বর্তাবে না। কেননা ইমামদের সঠিক অনুসারীরা কোরআন এবং সুন্নাহ অবশ্যই আঁকড়ে ধরে রাখবে। ইমামদের অনুসরণ করে বলেই একে অপরের সাথে আলাদা হবে না। কারণ মাজহাব দ্বীন নয় বরং মাজহাব হল দ্বীন(ইসলাম) মানার একটি উপায়। আমি আগেই বলেছি যে, কেউ যদি ইজতিহাদ করার ক্ষমতা রাখে তাহলে তার জন্য মাজহাব মানার কোন প্রয়োজন নেই। আবার কোন সাধারণ মানুষ যদি মাজহাব না মানে বরং বর্তমান সময়ের সঠিক আলেমদের অনুসরণ করে তাতেও সমস্যা নেই। তবে বর্তমান সময়ের আলেমগণ কি পূর্ববর্তীদের থেকে বেশী জ্ঞানী?
মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ইমাম বোখারী সহ এত বড় আলেমগণ মাজহাব মানতেন না। মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ডাঃ জাকির নায়েক মাজহাব মানতে নিষেধ করতেন। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে এই পর্যন্ত কোন জ্ঞানী আলেমকে মাজহাবের বিরোধিতা করতে দেখি নি তবে তারা সবাই মাজহাবের অন্ধ ভক্তির(তাকলীদ) বিরোধিতা করেছেন।
কিছু কিছু সময় কিছু কিছু অজ্ঞ মানুষ মাজহাবের মাধ্যমে ইসলামকে বিভক্ত করছেন। যেমনঃ কেউ কেউ বলে থাকেন যে, আমরা হাম্বলীদের জায়গা দেই না। এসব কথা বলা শরীয়াত কখনও সমর্থন করে না,এসব কথার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হবে। আবার কখনো দেখান যায় যে শুধু মাজহাব মানার কারণে লা মাযহাবী ভাইরা তাদের অপছন্দ করে থাকেন,যা কখনও বৈধ নয় তবে যারা তাকলীদ অর্থাৎ অন্ধ অনুসরণ করে তাদের কথা ভিন্ন।
শেষ কথাঃ
উপরের আলোচনা হতে এটি স্পষ্ট যে, মাজহাব মানা এবং না মানা ২ টাই শরীয়াত সমর্থিত। কাজেই আমরা এই ছোট বিষয়টি নিয়ে একে অপরের প্রতি কোন বিদ্বেষ রাখব না। তবে যারা তাকলীদ(অন্ধ অনুসরণ) করে তাদের বুঝাতে হবে যে তারা ভুল করছে। বর্তমানে শেইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী(রহ) এর তাকলীদ করতেও কাউকে দেখা যায়, এটাও ভুল, এ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। এই বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য আমার একটাই, তা হল মুসলিম উম্মাহ এই ছোট বিষয় নিয়ে বারাবারী করবে না বরং সঠিক ভাবে উভয় পক্ষকে বুঝে নিবে, ইমামদের নামে অন্ধ অনুসরণ বন্ধ করে কোরআন ও সহীহ হাদীসের উপর আমল করবে, ইমামদের পূর্ববর্তী অনুসারীরা যে ভাবে অনুসরণ করেছেন ইমামদের ঠিক সেই ভাবেই অনুসরণ করা। আসুন আমাদের সমাজ থেকে শিরক ও বিদআত দূর করি এবং কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে আমল করি। এই লেখাতে আমার কোন ভুল হয়ে থাকলে আমাকে জানাবেন। আমি- Mainuddin Ahmed Shuvo.
মূলঃ Mainuddin Ahmed Shuvo
► মাজহাবি ভাইদের কাছে আমার কিছু প্রস্নঃ (প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রমাণাদি-সহ সঠিকভাবে দিলে আমরাও মাজহাব অনুসরণ করবোঃ
১. কুরআন বা, হাদিসে কি মাজহাব মানার কোন কথা আছে?
২. রাসুল (সঃ) কি কোন হাদিসে মাজহাব মানার কথা বলেছিলেন?
৩. রাসুল (সঃ) এর যুগে কি কোন মাজহাব ছিল?
৪. খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগের খলিফারা বা সাহাবিরা কি মাজহাবী ছিলেন অথবা তারা কোন মাজহাব মানতে বলেছিলেন?
৫. ইমাম আবু হানিফা-সহ অন্যান্য ইমামগনেরা কি মাজহাব তৈরি করেছেন?
৬. ইমামগনের ছাত্রবৃন্দরা কি নির্দিষ্ট মাজহাব মানতেন?
৭. মাজহাব মানা যদি ফরজ বা ওয়াজিব হয়, তাহলে এটা কারা করলো? তাদের কি কোন কিছু ফরজ বা ওয়াজিব করার অধিকার আছে?
৮. যাদের নামে মাজহাব তৈরি করা হয়েছে, তারা কি মাজহাবগুলো বানিয়ে নিতে বলেছেন?
৯. ইমাম চারজন কোন মাজহাব মানতেন?
১০. ইমামগনের পিতা-মাতা, ওস্তাদরা কোন মাজহাব মানতেন? সেই মাজহাব কি এখন মানা যায় না?
১১. ঈমানদারি ও কুরান-হাদিসের বিদ্যায় চার ইমাম শ্রেষ্ঠ ছিলেন না চার খলিফা?
১২. যদি খলিফাগন শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকে তাহলে তাদের নামে মাজহাব হলও না কেন? তারা কি ইমামগন অপেক্ষা কম যোগ্য ছিলেন?
১৩. মাজহাব মানার যে ইজমা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, তা কবে, কোথায় এবং কোন দেশে হয়েছিল?
" ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) জন্ম গ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরীতে। তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর যতগুলো হাদিস পেয়েছেন এবং সংরক্ষণ করেছেন সেগুলোর উপর ভিত্তি করেই ফতোয়া দিয়েছিলেন। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, উনার সময় তিনিই ছিলেন ইমামে আজম। তবে যেহেতু তিনি সকল সাহাবাদের হাদিস সংগ্রহ করতে পারেন নাই, সকল সাহাবাদের সাক্ষাত পান নাই এবং যেহেতু হাদিস এর ধারক সাহাবারা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন তাই তিনি যতগুলো হাদিস পেয়েছেন তার উপরেই ফতোয়া দিয়েছেন।
তবে ইমাম আবু হানিফা রহঃ এর মূল কথা ছিলঃ-
"ইযা সহহাল হাদিসু ফা হুয়া মাজহাবা" অর্থ্যাত বিশুদ্ধ হাদিস পেলে সেটাই আমার মাজহাব বা মতামত। (১/৬৩ ইবনু আবিদীন এর হাশিয়া, পৃঃ ৬২ ছালিহ আল-ফাল্লানীর, ১/৪৬ শামী)
ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল হে শায়খ, যদি এমন সময় আসে যখন আপনার কথা কোন সহীহ হাদিসের বিপরীতে যাবে তখন আমরা কি করব?
তিনি উত্তরে বলেছিলেন, তখন তোমরা সেই সহীহ হাদিসের উপরই আমল করবে এবং আমার কথা প্রাচীরে/দেয়ালে নিক্ষেপ করবে।
=> ১৩৫ হিজরিতে জন্মগ্রহন কারী ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এর বক্তব্য হলো,
তোমরা যখন আমার কিতাবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাহ বিরোধী কিছূ পাবে তখন আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত অনুসারে কথা বলবে। আর আমি যা বলেছি তা ছেড়ে দিবে। (৩/৪৭/১ আল হারাবীর, ৮/২ খত্বীব, ১৫/৯/১ ইবনু আসাকির, ২/৩৬৮ ইবনু কাইয়িম, ১০০ পৃঃ ইহসান ইবনু হিব্বান)।
=> ৯৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ কারী ইমাম মালেক রহঃ এর বক্তব্যও একই।
ইমাম মালেক বিন আনাস (রহঃ) বলেছেন, আমি নিছক একজন মানুষ। ভূলও করি শুদ্ধও বলি। তাই তোমরা লক্ষ্য করো আমার অভিমত/মতামত/মাজহাব এর প্রতি। এগুলোর যতটুকু কোরআন ও সুন্নাহ এর সাথে মিলে যায় তা গ্রহণ করো আর যতটুকু এতদুভয়ের সাথে গরমিল হয় তা পরিত্যাগ করো। (ইবনু আবদিল বর গ্রন্থ (২/৩২)।
=> ১৬৪ হিজরীতে জন্মগ্রহনকারী ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ ছিলেন ১০ লক্ষ হাদিসের সংগ্রহ কারী। সবচেয়ে বেশী হাদিস উনার মুখস্থ ছিল এবং উনার সংগ্রহে ছিল। উনার লিখিত গ্রন্থ মুসনাদে আহমাদ এ মাত্র ২৩০০০ এর মতো হাদিস লিপিবদ্ধ আছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সকল ইমামই কোরআন ও সহীহ হাদিস মেতে নিতে বলেছেন।
তাক্বলীদ এবং কোন একটি মাযহাবের অনুসরণঃ বাড়াবাড়ি ও অবহেলার বিপরীতে মধ্যমপন্থী অবস্থান - ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | এপ্রিল ২৬, ২০১৫
ভাষাতাত্ত্বিক সংজ্ঞাঃ১
আরব ভাষাবিদদের মতে, ‘তাক্বলীদ’ শব্দটি এর মূল ‘ক্বালাদা’ থেকে উৎসরিত হয়েছে। ‘ক্বালাদা’ অর্থ হচ্ছে এমন একটি হার যা শক্তভাবে গলায় বেঁধে দেয়া হয়। আর এখান থেকেই এসেছে কোন পথের ‘তাক্বলীদ’ করার ধারণা। ব্যাপারটি অনেকটা এরকম যেন কোন একজন অনুসারী নির্দিষ্ট একজন মুজতাহিদের কোন রায় বা সিদ্ধান্তকে হারের মতই গলায় শক্তভাবে বেঁধে রাখে।
শরঈ সংজ্ঞাঃ
তাক্বলীদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘সাইল আল জাররার’ গ্রন্থে বলেছেন তাক্বলীদ হল প্রমাণ ছাড়া অন্য একজনের কথা অনুযায়ী আমল করা। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলের (সাঃ) হাদীসের উপর আমল করা, ইজমার উপর আমল করা, একজন মুফতীর মতানুযায়ী একজন সাধারণ মানুষের আমল করা, একজন বিচারক কর্তৃক নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য বিবেচনায় নেয়া তাক্বলীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, এগুলোর প্রামাণ্যতা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস এবং ইজমাকে যারা স্বীকার করে নেয় তাদের জন্য উভয়টিই স্পষ্টরূপে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস। একজন সাধারণ মানুষের জন্য কোন মুফতীর রায় অনুযায়ী আমল করা ইজমা দ্বারা স্বীকৃত। আর একজন বিচারকের বিচার প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য গুরুত্বের সাথে নেওয়ার বিষয়টি কোরআন ও সুন্নাহতে সাক্ষী নেয়ার হুকুম এবং ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
হাদীস বর্ণনাকারীদের বর্ণনা অনুসরণ করাও তাক্বলীদের গন্ডি বহির্ভূত কেননা হাদীসের শুদ্ধতা ও বৈধতা যাচাইয়ের পদ্ধতি (তাখরীজ) ইতিমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়া এগুলো কেবল হাদীস বর্ণনাকারীদের উক্তি নয় বরঞ্চ এ বর্ণনাসমূহ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে সম্পর্কিত।
ইবনে আল হুমামের (মৃত্যু ৮৬১ হিজরী) ‘তাহরীর’ গ্রন্থে তাক্বলিদের আরো ভালো সংজ্ঞা পাওয়া যায়ঃ “তাক্বলীদ হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো কথার উপর প্রমাণ ছাড়া আমল করা।” আল কাফফালের (মৃত্যু ৩৬৫ হিজরী) মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে কারো বক্তব্য (ফিক্বহী রায়) গ্রহণ করে নেয়া এটা না জেনেই যে তিনি তা কোথা থেকে পেয়েছেন।” শাইখ আবু হামিদ আল আসফারাইনি (মৃত্যু ৪০৬ হিজরী) এবং উস্তায আবু মানসুর আবদুল ক্বাহির আল বাগদাদী (মৃত্যু ৪২৯ হিজরী) উভয়ের মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো ফিক্বহী রায়কে প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করে নেয়া।”
কোন মাযহাবের তাক্বলীদ করার উপর হুকুমঃ
তাক্বলীদের ব্যাপারে তিনটি মত পাওয়া যায়ঃ
১। যেকোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া
২। তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক হওয়া
৩। যার ইজতিহাদ করার যোগ্যতা নেই তার জন্য তাক্বলীদ জায়েজ হওয়া
প্রথম মতঃ কোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া
প্রথম মত সাধারণ মানুষ-সুযোগ্য আলেম নির্বিশেষে সবার উপর তাক্বলীদ করাকে বাধতামূলক হিসেবে প্রতিপন্ন করে। এ মত অধুনা আলেমদের যেকোন ধরনের বা পর্যায়ের ইজতিহাদ করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ মতানুসারে ইজতিহাদ তাত্ত্বিকভাবে নিষিদ্ধ এবং প্রায়োগিক দিক থেকে অকার্যকর যার দরজা হিজরী তৃতীয় বা চতুর্থ শতক বা এর পূর্বেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে ভাবা হয়।
এ মত অনুযায়ী চার মাযহাবের যেকোন একটির তাক্বলীদ করাকে প্রত্যেক মুসলিমের উপর ধর্মীয়ভাবে আবশ্যক গণ্য করা হয়। এ মতের অনুসারীগণ অধুনা আলেমদের তাদের নিজেদের অনুসৃত মাযহাবের বাইরে কোন মতকে প্রাধান্য দেয়ার অনুমতিও দেন না। চারটি জনপ্রিয় মাযহাবের বাইরে গিয়ে অন্য কোন মাযহাব বা মত (যদিও তা সাহাবা বা তাবেয়ীদের হয়) অনুসরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এ মতের অনুসারীগণ যদি বিদ্যমান মতসমূহের একটিকে আরেকটির উপর প্রাধান্য দেয়ার অনুমতি না দিয়ে থাকেন তবে তো তারা স্বাধীন ইজতিহাদের আরো বেশী বিরোধিতা করে থাকেন যদিও সেটি কিছু বিষয়ের উপর আংশিক ইজতিহাদ হয়ে থাকে। মানুষ জীবনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন চিন্তাধারা ও আদর্শের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তারা স্বাধীন ইজতিহাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। আর এসবই তাদের এই বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত যে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দিতে হবে।
পরবর্তী সময়ের কিছু আলেম চার মাযহাবের যেকোন একটি অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। ইমাম আদ দারদিরের ফিক্বহের উপর গ্রন্থ ‘আশ শারহ আস সাগীর’ ও তাফসীর আল জালালাইন উভয়ের উপর হাশিয়ার রচয়িতা শাইখ আস সাওয়ী আল মালিকি (মৃত্যু ১২৬১ হিজরী) বলেনঃ “চার মাযহাবের বাইরে কোন মতের তাক্বলীদ করা জায়েজ নয় যদিও তা কোন সাহাবার কথা, সহীহ হাদীস ও কোরআনের আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় কেননা, যে চার মাযহাবের বাইরে অবস্থান করে সে নিজে পথভ্রষ্ট এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করে। এটি কাউকে কুফরীর দিকেও নিয়ে যেতে পারে কারণ, কোরআন ও সুন্নাহতে যা ভাসাভাসাভাবে প্রতীয়মান হয় তা থেকে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কুফরীর ভিত্তিতেই গ্রহণ করার নামান্তর।”
আশ-শাওক্বানীর সমসাময়িক এই শাইখের কঠোরতার দিকে লক্ষ্য করুন! দুজনের মতের বৈপরীত্যের দিকেও খেয়াল করুন। তিনি চার মাযহাবের বাইরে কিছুর তাক্বলীদ করতে নিষেধ করেন যদিও তা সাহাবার কোন কথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এর চেয়েও নিকৃষ্ট ব্যাপার এই যে, সহীহ হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সেটার তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি কোরআনের সাথে হলেও।
আরেকটি বাড়াবাড়ি হচ্ছে, চার মাযহাবের বাইরে অবস্থানকারী (এমনকি তা কেবলমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে হলেও) কাউকে পথভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্টকারী মনে করা এবং সেটা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমনটা ভাবা। এসবই হঠকারিতা এবং তা ইজতিহাদী আলেমদের ঐক্যমতের বিরুদ্ধে যায়।
তাক্বলীদ করা আবশ্যক এ মতটি পরবর্তী শতাব্দীতে ধর্মীয় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গৃহীত হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাফ (প্রথম প্রজন্মের) আলেমরা এই রেওয়াজকে খালাফদের (পরবর্তী প্রজন্মের আলেমদের) কাছে পৌঁছে দেন যারা আবার তাদের ছাত্রদের মনে বদ্ধমূল করে দেন যেঃ “যে ব্যক্তি কোন আলেমের তাক্বলীদ করে, সে সালেম (নিরাপদ) অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হয়।”
আমার মনে আছে, আল আযহারের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উলুমুত তাওহীদ ক্লাসে আমি এটি শিখেছিলাম। আমাকে আল ক্বারনীর জাওহারাহ এবং আল বাজুরী কর্তৃক এর ব্যাখ্যা পড়তে হয়েছিল। সেখানে লেখক বলেন,
“মালিক এবং বাকি ইমামগণের
যেমনটি আবুল কাসিমের মত উম্মাহর পথপ্রদর্শক বলেন,
জ্ঞানীদেরও যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রয়োজন
কেননা মানুষ যে শব্দ বুঝে তাতেই বর্ণনা করে”
আবুল কাসিম বলতে এ ছত্রে বিখ্যাত সূফী আল জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে (মৃত্যু ২৯৭ হিজরী) বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুক। এটি এদিকেই ইঙ্গিত করে যে, ফিক্বহের চার মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর বাধ্যতামূলক।
এখানে ইমাম মালিককে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ লেখক একজন মালিকী। লেখকের মতে, তারবিয়্যাতের (আত্মশুদ্ধি) ক্ষেত্রে যেমনটি সূফী ইমামদের অনুসরণ করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে ফিক্বহের ইমামদেরকেও অনুসরণ করতে হবে। আলেমদের প্রতি জুনাইদ এমনই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন – তরীক্বার (পদ্ধতি) নিষ্ঠা, তাঁর দিক-নির্দেশনার গভীরতা, চরমপন্থা ও বিদা’আত থেকে তাঁর সুদূর অবস্থান।
কিছু আলেম আবার আক্বীদার ব্যাপারেও আবুল হাসান আল আশ’আরী বা আবুল মানসুর আল মাতুরিদীর মত সুপরিচিত যেকোন ইমামের অনুসরণ করার কথা বলেন।
মাগরেবে (লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া) আমাদের ইলমী ভাই এবং যায়তুনা, কায়রাওয়ান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বহুল প্রচলিত প্রথা হচ্ছে আক্বীদায় আশ’আরী মাযহাব, ফিক্বহে মালিকী মাযহাব ও আদাবের ক্ষেত্রে জুনাইদের মাযহাব বা সূফী তরীক্বা অনুসরণ করা। আল্লাহ তাঁদের সবার উপর সন্তুষ্ট হন।
এ মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ
১। সবার উপর এমনকি আলেমদের উপরও তাক্বলীদ আবশ্যক হওয়া
২। কেবলমাত্র চার মাযহাবের ইমামদের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। চার মাযহাবের বাইরে অন্য কোন ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হওয়া।
৩। এই চার ইমামের মধ্যে কেবলমাত্র যেকোন একজনের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। তাই এই চার মাযহাবের মধ্যে কোন একটি মাযহাবের কিছু মত সুস্পষ্টভাবে দুর্বল প্রতিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও চার মাজহাবেরই অন্য কোন একটি মাযহাব থেকে মত গ্রহণ করা জায়েজ না হওয়া।
৪। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ রাখা এবং ইজতিহাদের দিকে আহবানের পথ রুখে দাঁড়ানো যদিও তা আংশিক ইজতিহাদ হয়।
৫। নিজের মাযহাবকে অন্য মাযহাব থেকে উত্তম মনে করা আর এভাবে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মনমানসিকতার কাঠামোতে আটকে যাওয়া।
তাক্বলিদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গীকে অনেক আলেম খন্ডন করেছেন যেমনঃ ইবনে আবদুল বার, ইবনে হাযম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনিল ক্বায়্যিম, আস-সান’আনি, আশ-শাওক্বানী, আদ দেহলভী প্রমুখ।
দ্বিতীয় মতঃ তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক
দ্বিতীয় মতটি প্রথম মতের ঠিক উল্টোঃ সকলের জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ করা বাধ্যতামূলক। এ মতের অনুসারীগণ প্রত্যেক মুসলিমের উপর সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহ থেকে ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক মনে করেন। তাঁরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে চার মাযহাবের অনুসরণকে বাতিল গণ্য করেন এবং যারা চার মাযহাব অনুসরণ করার পক্ষে তাদেরকেও প্রচন্ডভাবে আক্রমণ করেন। সম্ভবত তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তাক্বলীদের উপর আক্রমণ করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে থাকেন যেহেতু তাঁরা মাযহাবগুলোকেই আক্রমণ করে থাকেন। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদেরকেই আক্রমণ করে বসে থাকেন।
ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ মতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রস্তাবক হচ্ছেন বিখ্যাত যাহেরী ফক্বীহ আবু মুহাম্মাদ ইবনে হাযম। তিনি ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর ‘আল ইহকাম ফি উসূল আল-আহকাম’, তুলনামূলক ফিক্বহের উপর ‘আল মুহাল্লা’, বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় ফেরকার ইতিহাসের উপর ‘আল ফাসল ফিল মিলাল ওয়ান নিহাল’ সহ বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।
পরবর্তী সময়ের আরেকজন বিখ্যাত আলেম ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘ইরশাদ আল ফুহুল’, ‘আস সাইল আল জাররার’ এবং তাঁর রিসালা ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’ সহ অনেক লেখনীতে এ মতের প্রচার ও প্রসার করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে তাক্বলীদের ধারণাকে প্রত্যাখান করেন যদিও তা ইবনে হাযমের তুলনায় কম আক্রামণাত্মক ছিল।
আমাদের সময়ে আহলে হাদীসদের থেকে একটি দল এ মতের সমর্থক যাদের সম্মুখভাগে রয়েছেন শাইখ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী ও তাঁর অনুসারীগণ।
এই মতানুসারীদের প্রতিপক্ষগণ তাঁদের নাম দিয়েছেন ‘আল লা-মাযহাবিয়্যুন’ তথা লা-মাযহাবী, কেননা এ মতের অনুসারীগণ আলেম-সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সবার জন্য কোন মাযহাব অনুসরণের বিরোধিতা করে থাকেন। এ মতের প্রতিপক্ষগণ বহু প্রবন্ধ ও গ্রন্থের মাধ্যমে এই মতের খন্ডন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ তুরস্কের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ যাহিদ আল কাওছারীর প্রবন্ধ ‘আল লা মাযহাবিয়া ক্বেনতারা ইল্লা আল-লা দ্বীনিয়্যাহ’, হামাওয়ী আলেম শাইখ মুহাম্মাদ আল হামিদের লেখা ও শাইখ মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল বুতীর বই ‘আল লা মাযহাবিয়াহ আখতার বিদা’আহ তাহাদ্দাছ আশ-শারীয়াহ আল ইসলামিয়্যাহ’ প্রভৃতির কথা বলা যেতে পারে।
এই আরেকটি প্রান্তিক মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ
১। সবার জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি সাধারণ মানুষের জন্যও যাদের কাছে ইজতিহাদের কোন জ্ঞান নেই।
২। তরুণদের এমন প্রাচুর্য (যারা জ্ঞানে ভাসা ভাসা এবং আচরণে রুক্ষ) যারা মুজতাহিদের পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করে থাকে।
৩। তরুণদের দ্বারা পূর্বযুগের বিখ্যাত আলেম ও মুজতাহিদগণকে বাতিল বলে গণ্য করার ধৃষ্টতা।
৪। উম্মাহর ফিক্বহী মাযহাবগুলোর প্রতি অবজ্ঞাভাব যদিও এই মাযহাবগুলো প্রচুর পরিমাণ উপকারী জ্ঞানের উৎস।
৫। এ মতের কিছু কিছু অনুসারীদের মাযহাবসমূহ এবং এগুলোর ইমামদের নিন্দায় সীমা অতিক্রম করা।
৬। এ মতের অনুসারীদের মধ্যে যাহেরী (আক্ষরিক) ধারা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে কেউ কেউ তাদের ‘নব্য-যাহেরী’ হিসেবেও নামকরণ করেছেন।
৭। ফিক্বহের ছোটখাটো মতপার্থক্য নিয়ে উম্মাহর তর্কে-বিতর্কে লিপ্ত থাকা যা অনেক অন্তর্বিরোধের জন্ম দিয়েছে।
৮। এ মতের অনুসারীগণ তাদের সাথে মতভিন্নতা পোষণকারীদের বাতিল হিসেবে গণ্য করে। তারা এ দাবী করে যে, একমাত্র তারাই কোরআন ও সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণ করে থাকে।
ইমাম আশ-শাওক্বানী এবং তাক্বলীদঃ
ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আলী আশ শাওক্বানী (মৃত্যু ১২৫০ হিজরী) ছিলেন হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পুনর্জাগরণ এবং ইজতিহাদের প্রাণপুরুষ যা তাঁর ইজতিহাদের উপর লেখা গ্রন্থসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ‘আস সাইল আল জাররার’ গ্রন্থটির কথা বলা যেতে পারে যা ‘আল আযহার’ (যায়েদী বা হাদুয়ী ফিক্বহের মৌলিক বই) বইয়ের ব্যাখ্যা যেখানে তিনি স্বাধীন ইজতিহাদের পথে হেঁটেছেন। তিনি কোরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে নিজের ফিক্বহী রায় ব্যক্ত করেন যেগুলো তাঁর সময়কার চার অথবা আট মাযহাবের পরিধির বাইরে ছিল। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে তাঁর ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থটি যেখানে তিনি ইবনে তাইমিয়াহর ‘মুনতাক্বাল আখবার মিন আহাদীস সায়্যিদ আল আখবার’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা করেছেন। এ বইটি সুন্নী এবং অসুন্নী উভয় মাযহাবের জন্য আধুনিক ফিক্বহের উপর গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদে পরিণত হয়েছে। আরেকটি উদাহারণ হচ্ছে তাঁর গ্রন্থ ‘আল দারারী আল মুদিয়্যাহ’ (‘আল দুরার আল বাহিয়্যাহ’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা) যেখানে তিনি তাঁর স্বাধীন ফিক্বহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।
প্রকৃতপক্ষে ইমাম শাওক্বানী তাঁর একের বেশী গ্রন্থে তাক্বলীদের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং স্বাধীন ইজতিহাদের দিকে আহবান করেন। এগুলো হচ্ছেঃ
১। ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর তাঁর বিখ্যাত বই ‘ইরশাদ আল ফুহুল’
২। তাঁর বিখ্যাত রিসালাহ ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’
৩। তাঁর বই ‘আদাব আল তালিব ওয়া মুনতাহা’ল আরাব’
৪। তাঁর সুবিস্তারিত বই ‘আল সাইল আল জাররার’
তাক্বলীদের সমর্থকগণ তাক্বলীদের সমর্থনে যেসব দলিল পেশ করেন আশ শাওক্বানী এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দান করেন যেসব দলিলের মধ্যে রয়েছে কোরআনের আয়াতঃ “তোমরা যদি না জেনে থাকো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর।” (১৬:৪৩) আর রাসূলের (সাঃ) হাদীছঃ “তারা যদি না জেনে থাকে তবে কি তারা জিজ্ঞাসা করে না? ভ্রান্তির প্রতিষেধক হচ্ছে জিজ্ঞাসা করা”। আশ শাওক্বানী এটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, এসব দলিল সব বিষয়ে কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাক্বলীদ করার কথা বলে না বরং জ্ঞানীদের মধ্যে যার কাছেই যাওয়ার সুযোগ আছে তাকেই জিজ্ঞাসা করার দিকে ইঙ্গিত করে। এটাই নবী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের সময়ের চর্চা ছিল।
আশ-শাওক্বানী ইবনিল কায়্যিম, ইমাম ইবনি আবদিল বার, ইবনে হাযম এবং তাঁর আগের অন্যান্য আলেমদের লেখা থেকে উপকৃত হন যারা তাক্বলীদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে নিন্দনীয় বিদা’আত হিসেবে গণ্য করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহর নেয়ামত সুবিস্তৃত এবং এ নেয়ামতকে কোন নির্দিষ্ট যুগের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না বা নির্দিষ্ট এক দল মানুষও এর একচেটিয়া অধিকারী নয়। বরং আল্লাহ যাদেরকেই এ যোগ্যতা দান করেছেন তাদের সবার জন্য এটি উন্মুক্ত।
আশ-শাওক্বানী ইজতিহাদের ডাক দেন এবং নিজেও পুরোপুরিভাবে স্বাধীন ইজতিহাদের চর্চা করেন। তিনি সুপরিচিত কোন মাযহাবেরই অনুসরণ করেন নি – না ফিক্বহের উসূলী মূলনীতিতে না মূল ফিক্বহে – যদিও তিনি শুরুতে ছিলেন একজন যায়েদী। তিনি এমনকি তাঁর নিজের ফিক্বহী মূলনীতি প্রণয়ন করেন যা তিনি ‘ইরশাদ আল ফুহুল ইলা তাহক্বীক আল হাক্ব মিন আল ইলমি আল উসূল’ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি ফিক্বহের ক্ষেত্রে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মতের (রায়) ব্যবহারের বিরোধিতা করেন এবং আহলুর রায় এর ফিক্বাহকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরিবর্তে তিনি পরিপূর্ণভাবে ওহীর উপর নির্ভরতার ব্যাপারে জোর দেন এই ভিত্তিতে যে দ্বীন ইমামদের মতের ভিত্তিতে নির্মিত হয়নি বরং এটি দ্বীনের মোহর (Seal of the Religion) আল্লাহর রাসূল (সা) এর বর্ণনার ভিত্তিতেই গঠিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন সাধারণ মানুষ যে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা রাখে না তাকে অবশ্যই আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে যারা কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করবেন, নিজেদের মতের ভিত্তিতে নয়।
আমি শাওক্বানীর সাথে কিছু ব্যাপারে একমত আর কিছু ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করি। যে সব বিষয়ে আমি তাঁর সাথে একমত পোষণ করি সেগুলো হচ্ছেঃ
১। আলেমদের প্রতি তাঁর স্বাধীন ইজতিহাদের আহবান
২। উম্মাহর সকলের উপর যারা তাক্বলীদ চাপিয়ে দিতে চান তাদের প্রত্যাখ্যান করা
৩। যারা প্রত্যেকটি বিষয়েই যেকোন একটি মাযহাবের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকাকে প্রয়োজনীয় মনে করে তাদের বিরোধিতা করা
৪। তাদের বিরোধিতা করা যারা কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট মাযহাবকে কঠোরভাবে অনুসরণ করেন এমনকি সে মাযহাবের কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে ঐ মাযহাবের উৎসসমূহের দুর্বলতা তাদের সামনে পরিস্কারভাবে তুলে ধরার পরেও
৫। দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর পর ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এমন ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা
৬। মানুষের মতের উপর কোরআন ও সুন্নাহকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য উম্মাহ্র প্রতি তাঁর আহবান
যাহোক, সাধারণ মানুষের উপর তাক্বলীদ ও যেকোন একটি মাযহাব অনুসরণ করার উপর তাঁর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে আমার দ্বিমত রয়েছে। সাধারণ মানুষের আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ, আহমেদ, যাইদ, আল হাদি, জাফর, জাবির এবং অন্যান্য যেকোন একজন ইমামকে অনুসরণ করা ও তাঁর মাযহাব আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে আমি কোন সমস্যা দেখি না। শরীয়াহ অনুসারে তা বৈধ কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণ মানুষের কোন মাযহাব নেই- এ মতটিই অগ্রাধিকার পায়। বরং আলেমদের মধ্য থেকে যার কাছ থেকে সে জিজ্ঞাসা করছে সে আলেমের মাযহাবই তার মাযহাব। এভাবে সে তার মাযহাব থেকে অন্য মাযহাবে যেতে পারে এবং আলেমদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা তাকেই যেকোন প্রয়োজনীয় বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারে। এমনকি সে ক্ষেত্রবিশেষে নিজের মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবও অনুসরণ করতে পারে যদি সে বিশ্বাস করে অন্য মাযহাবের আরো শক্ত দলিল রয়েছে।
ফিক্বহে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মত (রায়) ব্যবহারকে শারীয়াহ বিরোধী প্রতিপন্ন করে ইমাম শাওক্বানী যে অবস্থান নিয়েছেন সে ব্যাপারেও আমার দ্বিমত রয়েছে। প্রকৃত বাস্তবতা এটাই যে, মত বা রায় ছাড়া কোন ফিক্বহ নেই। নিন্দনীয় রায় হচ্ছে সেটিই যা সুস্পষ্টভাবে নুসুসের (কোরআন ও সুন্নাহ) বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু যে সকল বিষয়ে নুসুসের কোন বক্তব্য নেই সে সকল বিষয় বুঝতে এবং নুসুসকে এর বুনিয়াদী ভিত্তি ও মাক্বাসিদ আশ-শারীয়াহর আলোকে অনুধাবন করতে রায় অপরিহার্য। এছাড়াও রায় আবশ্যক যেখানে আইনী প্রশস্ততা বিদ্যমান থাকার দরুণ কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যায় অথবা যেসব বিষয়ে অবশ্য পালনীয় এমন পরিষ্কার নির্দেশনামূলক (কাতঈ) আয়াত ও হাদীস বিদ্যমান নেই। আর এই রায় গঠিত হয় নিম্নরূপেঃ
১। কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তি করে ক্বিয়াসের (সাদৃশ্যতার উপর ভিত্তি করে যুক্তিতর্কের একটি পদ্ধতি) মাধ্যমে অথবা
২। ইসতিহসানের (আইনী অগ্রাধিকার) মাধ্যমে যা হচ্ছে একটি শক্তিশালী কিন্তু অস্পষ্ট ক্বিয়াসের জন্য দুর্বল কিন্তু স্পষ্ট ক্বিয়াসকে এড়িয়ে যাওয়া অথবা
৩। ইসতিসলাহের (বৃহত্তর কল্যাণের খোঁজ করা) মাধ্যমে যা হচ্ছে আইনী শর্তসমূহ মাথায় রেখে সার্বজনীন কল্যাণের জন্য কাজ করা বা
৪। ‘উরফের (প্রচলিত প্রথা) মাধ্যমে, একে নিজের স্থানে রেখে অথবা
৫। সাদ আল-জারাঈ (খারাপের দিকে ধাবিত করে এমন পথ রুদ্ধ করা) অথবা
৬। ইসতিসহাবের মাধ্যমে (ধারবাহিকতার অনুমতি) ইত্যাদি।
এ সবগুলোর প্রয়োগে রায়ের ব্যবহার জড়িত। ফক্বীহগণ কি আসলেই এটি ব্যবহারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন? একইভাবে উমর, উসমান, আলী, ইবনে মাস’উদ, যায়েদ, ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্যদের ফিক্বহ কি রায় থেকে মুক্ত?
এমনকি রায় ছাড়া কি কোরআন-সুন্নাহ সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব? রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীরা বনু কুরাইজার পথে আসরের সালাত আদায় করার সময় কি রায়ের ব্যবহার করেন নি? ইবনে তাইমিয়্যাহ এর মতে, তারা তাদের চাইতে বেশী সঠিক ছিলেন যারা সালাতের সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পর গন্তব্যে পৌঁছে সালাত আদায় করেছিলেন।
মাক্বাসিদ আস শারীয়াহ কি কোরআন-সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে রায় ব্যবহারের উদাহারণ নয়?
দুর্ভিক্ষের সময় উমর (রাঃ) কর্তৃক চুরির হদ্দের সাময়িক রহিতকরণ কি রায়ের উদাহরণ নয়? রক্তপণের দায়িত্ব গোত্র থেকে রাষ্ট্রের উপর স্থানান্তরের তাঁর যে সিদ্ধান্ত তা কি রায়ের উদাহরণ নয়? ইরাকের কিছু বিজিত এলাকা মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে বন্টন করার বিরুদ্ধে উমরের সিদ্ধান্ত কি রায়ের নমুনা নয়? মুসলিম নারীদের উপর প্রভাবের ভয়ে তাঁর কর্তৃক আহলে কিতাবের নারীদের বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা কি রায় ছিল না? বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেয়ার পরও উত্তরাধিকার আইনে আপন ভাইদের সাথে মায়ের দিক থেকে সৎ ভাইদের অন্তর্ভুক্তিকরণ কি রায়ের একটি নমুনা ছিল না?২
স্বামীর মৃতপ্রায় মুমূর্ষ অবস্থায় দেয়া তালাক কার্যকর হয় না- উছমান (রাঃ) এর এই মত কি রায়ের উদাহারণ ছিল না?৩ এ বর্ণনা কি পাওয়া যায় না যে, আবু বকর ও অন্যান্য সাহাবীরা বলতেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ফতোয়া দেই। যদি তা সঠিক হয় তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যদি তা ভুল হয় তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সকল ত্রুটির ঊর্ধ্বে।”
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কি মুয়াযকে (রাঃ) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় তাঁর জবাব গ্রহণ করেন নি? তিনি (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি দ্বারা বিচারকর্ম সম্পাদন করবে?” মুয়ায (রাঃ) জবাব দিলেন যে, তিনি আল্লাহর কিতাব দ্বারা বিচার করবেন, অতপর রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ দ্বারা বিচার করবেন। যদি আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহতে সমাধান পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে তিনি বলেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ইজতিহাদ করবো।”
সাহাবারা কি নিজেদের রায় এবং বোঝাপড়ার ভিন্নতার কারণে কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন নি?
তৃতীয় মতঃ যারা ইজতিহাদ করার যোগ্যতায় পৌঁছেনি তাদের জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয়া
এই মতটি এর অনুসারীদের উপর প্রথম মতের মত তাক্বলীদ চাপিয়ে দেয় না আবার দ্বিতীয় মতের মত একে নিষিদ্ধও গণ্য করে না। বরং, এটি কারো কারো জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয় এবং অন্যদের জন্য তা নিষিদ্ধ করে। ইমাম হাসান আল বান্না এ বিষয়টি তাঁর ‘বিশটি মূলনীতি’ প্রবন্ধের একটি মূলনীতির আলোচনায় আলোকপাত করেছেনঃ
“ফিক্বহ ও ফিক্বহী রায় আহরণ করার পেছনের যুক্তি বোঝার যোগ্যতা অর্জন করে নি এমন প্রত্যেক মুসলিমের উচিত ইসলামী ফিক্বহের মহান ইমামদের অনুসরণ করা। একজন ইমামকে অনুসরণ করার সময় তাঁর যুক্তিতর্ককে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। একবার যখন সে ইমামের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, তখন সে ইমামের যথার্থ যুক্তির ভিত্তিতে দেওয়া যেকোন পথনির্দেশ মেনে চলা উচিত। একইসাথে একজন মুসলিমের উচিত ফিক্বহ ও ফতোয়া আহরণের যুক্তিতর্ক বোঝার পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য দরকারী চেষ্টাসাধনা করা।”
এভাবে হাসান আল বান্না তাক্বলীদ বা মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক করেন নি আবার একে নিষিদ্ধও করেন নি। বরঞ্চ তিনি এর অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু তা সবার জন্য নয়। এটি বৈধ “এমন সব মুসলিমদের জন্য যারা ফিক্বহী রায় আহরণ করার পর্যায়ে পৌঁছে নি” তথা সাধারণ মানুষ এবং তাদের মত লোকদের জন্য যারা কোরআন ও সুন্নাহ থেকে হুকুম আহরণের যোগ্য নয় অথবা ইজমা, ক্বিয়াস এবং মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য পদ্ধতি যেমন ইসতিসলাহ, উরফ, ইসতিসহাব ও পূর্ববতী সময়ের শরীয়াহ এসব সম্পর্কে জানার যোগ্যতা রাখে না।
অনুসরণ (ইত্তেবা) বনাম অন্ধ অনুকরণ (তাক্বলীদ)
উস্তায হাসান আল বান্না প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে তাঁর “মূলনীতি” প্রবন্ধে ‘তাক্বলীদ’ শব্দটির জায়গায় ‘ইত্তিবা’ শব্দটির প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুসলিমরা ফিক্বহের মহান ইমামদের যেকোন একজনকে অনুসরণ (ইয়াত্তাবি’উ) করবে।” কোরআনও নানা প্রসঙ্গে ‘ইত্তিবা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে যা একে প্রশংসনীয় ও আইনগতভাবে বৈধ করে তুলেছে।
এটি ইব্রাহীম (আঃ) এর উদ্ধৃতিতেও দেখা যায়ঃ “হে আমার পিতা, নিশ্চয়ই আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসে নি। অতএব আমাকে অনুসরণ করুন। আমি আপনাকে সোজাপথের দিকে ধাবিত করবো।” (কোরআন ১৯:৪৩)। এই আয়াত কোন নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে জ্ঞানহীন একজনকে আহবান করছে অন্য এমন একজনকে অনুসরণ করতে যে ঐ বিষয়ে জ্ঞানী।
আমরা মূসা (আঃ) এবং আল্লাহর বিখ্যাত সৎকর্মশীল বান্দা খিযির এর কাহিনীতেও দেখিঃ “তাঁরা আমার বান্দাদের মধ্য থেকে একজনকে খুঁজে পেল যাঁকে আমি নিজের অনুগ্রহ দান করেছিলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলাম। মূসা তাঁকে বলল, “আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি যাতে আপনাকে হিদায়াতের যা কিছু শেখানো হয়েছে তা থেকে আমাকেও কিছু শেখাবেন?” (কোরআন ১৮:৬৫-৬৬)
মূসা (আঃ) খিযিরকে অনুসরণ করার (ইত্তিবা’ইহি) অনুমতি চাইলেন যাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে যে জ্ঞান দিয়েছেন তা থেকে শিখতে পারেন। এটা প্রমাণ করে, ক্ষেত্র বিশেষে জ্ঞানীকে অনুসরণ করা নিন্দনীয় নয়।
ইমাম আবু উমার ইবনে আবদুল বার বলেন, “জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিষ্কার ধারণা অর্জন; কোন জিনিসকে এর প্রকৃতরূপে অনুধাবন করা। যখন কোন জিনিসকে কারো সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়, সে তা জানতে পারে। আলেমরা বলেন, যারা তাক্বলীদ করে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই।”
আবু আবদুল্লাহ বিন খুয়াইজ মিনদাদ আল বাসরী আল মালিকী বলেন, “তাক্বলীদ হচ্ছে এমন কোন মতকে অনুসরণ করা যা কোন দলিল দ্বারা সমর্থিত নয়। কিন্তু ইত্তিবা’ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে এই মতটি আইনী ন্যায্যতার ভিত্তিতে গৃহীত। দ্বীনে ইত্তিবা অনুমোদিত কিন্তু তাক্বলীদ অনুমোদিত নয়।”
তথ্যসূত্রঃ
১। প্রবন্ধটি মূলত ‘কাইফা নাতা’আমাল মা’আত তুরাছ ওয়াল তামাযুব ওয়াল ইখতিলাফ’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে (পৃষ্ঠা ৬২-৭৩)
২। এটি ইসলামী উত্তরাধিকারী আইনের একটি বিশেষ পরিস্থিতি (আল মাসলাহা আল হিমারিয়াহ)
৩। এটিকে তালাক্ব আল ফার্ (এড়ানোর জন্য তালাক্ব) বলে যেখানে কেউ স্বীয় উত্তরাধিকার থেকে তার স্ত্রীর অংশ লাভের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যেতে চায়
প্রসঙ্গ: মুহাম্মদ বিন আল-হাসান আশ-শায়বানী যার উপর হানাফী মাযহাবের সনদ নিহিত। আসুন দেখি তার সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মন্তব্য কি?
ভূমিকা: কোন প্রতিষ্ঠিত ইমামদের সম্পর্কে সমালোচনা তুলে ধরতে ভাল লাগে না। কিন্তু নিজেদের মাযহাবকে শ্রেষ্ঠ বানাতে গিয়ে কোন ইমাম সম্পর্কে অতিরঞ্জণ করা হয়, যা সঠিক নয়। আমাদের নবী (সা
-ও
তার নিজের সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করতে মানা করেছেন। আমাদের মূল দলীল হলো কুরআন
ও হাদীস। সাথে সাহাবী ও তাবেয়ীদের মতামত সহ ইমামদের সঠিক ইজতিহাদ।
মুহাম্মদ বিন আল-হাসান আশ-শায়বানী সম্পর্কে রিজাল শাস্ত্রবিদদের মন্তব্য:
১. ইমাম যাহাবী (র) বলেছেন,
محمد بن الحسن الشيباني أبو عبدالله أحد الفقهاء، لينه النسائي وغيره من قبل حفظه، يروى عن مالك بن أنس وغيره كان من بحور العلم والفقه، قوياً فى مالك"
[[ميزان الاعتدال: ج٣ ص٥١٣ت٧٣٧٤
“মুহাম্মাদ বিন হাসান আল শায়বানি ছিলেন (আহুলুর রায়দের মধ্যকার) ফকীহ। ইমাম নাসাঈ এবং অন্যান্যরা তাকে তার (দূর্বল) স্মৃতিশক্তির কারনে দুর্বল বলেছেন। তিনি ইমাম মালিক এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে বর্ণনা করতেন, এবং তিনি (যাহাবীর মতে) ছিলেন জ্ঞান ও ফীকহের সমূদ্র। (শুধু) (ইমাম) মালিক থেকে তার বর্ণনাগুলো শক্তিশালী” (মীযানুল ই’তিদাল)
-> ইমাম যাহাবীর এই বক্তব্য অনুসারে, তিনি শুধু ইমাম মালিক থেকে বর্ণনার ক্ষেতে শক্তিশালী। ইমাম আবূ হানিফা (র) সহ অন্যন্যা মুহাদ্দীসদের থেকে বর্ণিত তার রেওয়াত দূর্বল।
২. ইমাম আবূ হানিফা (র) এর ছাত্রদের সম্পর্কে ইমাম নাসাঈ (র) বলেন,
والضعفاء من أصحابه: يوسف بن خالد السمتي كذاب، والحسن بن زياد اللؤلؤي كذاب خبيث ومحمد بن الحسن ضعيف
"এবং তাঁর দুর্বল ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেঃ ইউসুফ বিন খালিড আল-সামতি - কাজ্জাব (মিথ্যুক), আল-হাসান বিন যাইয়াদ আল-লু'লুই - কাজ্জাব (মিথ্যুক), খবীস, এবং
মুহাম্মদ বিন আল-হাসান - যঈফ (দুর্বল)।"
[জুয ফি আখির কিতাব আল-দু'আফা ওয়াল মাতরুকীন, পৃ:২৬৬]
>> ইমাম নাসাঈ (র) এর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় মুহাম্মদ শায়বনী সার্বিকভাবেই দুর্বল - তার বর্ণনা ইমাম মালিক (র) থেকেই হোক আর যার থেকেই হোক। শাওয়াহিদ ও মুতা’বিয়াত ছাড়া তার বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।
৩. ইমাম শাফেয়ী (র.) মুহাম্মাদ শায়বানীর (র.) নিকট অধ্যয়ন করেছেন বলে যে কথা প্রচলিত রয়েছে সেটা সঠিক নয়। কারন এটা বর্ণনা করেছেন এক রাফেযী এবং ইমাম তাইমিয়াহ তাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন: এটা সত্য নয়, বরং (ইমাম শাফেয়ী) তার সাথে বসেছেন, তার তরীকাহ জেনেছেন, এবং তার সাথে ডিবেট করেছেন; তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মুহাম্মাদ ইবনে হাসান শায়বানীর সাথে দ্বিমত করেছেন এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন.....[দেখুন আল-সুন্নাহ আল-নবাবিয়্যাহ, ৪/১৪৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ,লেবানন থেকে প্রকাশিত)
৪. ইবনে আদী বলেন:
قال ابن عدي: ومحمد لم تكن له عناية بالحديث وقد استعنى أهل الحديث عن تخريج حديثه
মুহাম্মদ (বিন আল হাসান) হাদীসের প্রতি মনযোগ দিত না (অর্থাৎ কিয়াস ও মতমতের উপর মনযোগ দিত) এবং আহলে-হাদীসগণ তার বর্ণিত হাদীস উপর নির্ভরতা থেকে মূক্ত থাকতেন।
(আসকালানী, লিসানুল মিযান; আল-কামীল (ইবনে আদী), ৬/২১৮৪)
৫. ইমাম তিরমিযি র. বলেন,
وقال أبو إسمعيل الترمذي: سمعت أحمد بن حنبل يقول: كان محمد بن الحسن في الأول يذهب مذهب جهم
আমি আহমদ বিন হানবল র. থেকে শুনেছি যে, শুরুতে মুহাম্মদ বিন আল-হাসান জাহমিয়াদের মাযহাব অনুসরণ করতেন।
(লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ, ২/১৭৯, এর সনদ হাসান লিযাতিহী)
৬. ইমাম আহমদ বিন হানবল থেকে হান্বল বিন ইসহাক্ব বর্ণনা করেছেন যে:
وقال حنبل بن إسحاق عن أحمد: كان ابو يوسف مضعفاً في الحديث وأما محمد بن الحسن وشيخه فكانا مخالفين للأثر
“আবূ ইউসূফ হাদীসে দুর্বল ছিলেন, কিন্তু মুহাম্মদ বিন আল-হাসান এবং তার শিক্ষক উভয়েই হাদীস ও আসারের বিরোধিতাকারী ছিলেন।”
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৭৯, সনদ সহীহ]
৭. ইমাম যুরাহ আর-রাযী র. বলেন,
وقال سعيد بن عمرو البرذعي: سمعت أبا زرعة الرازي يقول: كان محمد بن الحسن جهمياً وكذا شيخه وكان أبو يوسف بعيداً من التجهم
“মুহাম্মদ বিন আল-হাসান এবং তার শিক্ষক, উভয়েই জাহমী ছিলেন, কিন্তু আবূ ইউসূফ জাহেম থেকে দূরে ছিলেন।”
[লিসানুল মিযান; কিতাব আদ-দুয়াফা (আবী যুরআ আর-রাযী) ৫৭০ পৃ:, সনদ সহীহ]
৮. যিকরিয়াহ আস-সাজি বলেন:
وقال زكريا الساجي: كان مرجئاً
মুহাম্মদ (বিন আল হাসান) মুর্জিয়া ছিলেন।
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৭৯]
৯. মুহাম্মদ বিন সা’দ আস-সুফী বলেন:
وقال محمد بن سعد الصوفي: سمعت يحي بن معين يرميه بالكذب
আমি ইবনে মাঈন থেকে শুনেছি, তিনি তাকে কাযযাব/মিথ্যাবাদী বলতেন।
[লিসানুল মিযান]
১০. আল-আহওয়াস বিন আল-ফাদাল আল-আ’ই, তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে:
وقال الأحوص بن الفضل العلائي عن أبيه حسن اللؤلؤي ومحمد بن الحسن ضعيفان
হাসান আল-লু’লুই এবং মুহাম্মাদ বিন আল হাসান উভয়েই যঈফ।
وكذا قال معاوية بن صالح عن بن معين
অনুরূপ কথা মু’আবিয়াহ বিন সালিহ, ইবনে মাঈন থেকে বর্ণনা করেছেন।
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৮০]
১১. ইবনে আবি মারইয়াম, ইবনে মাঈন থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
وقال بن أبي مريم عنه ليس بشيء ولا يكتب حديثه
“সে (মুহাম্মাদ বিন হাসান) কিছুই নয়, তার হাদীস লেখা উচিত নয়।”
[লিসানুল মিযান, তারীখে বাগদাদ ২/১৮০,১৮১. সনদ হাসান]
১২. উমরো বিন আলী (আল-ফালাস) বলেন,
وقال عمرو بن علي ضعيف
‘‘সে দুর্বল”
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৮১, সনদ সহীহ]
১৩. ইমাম আবূ দাউদ র. বলেন,
قال أبو داود لا يستحق الترك وقال عبد الله بن علي المديني عن أبيه صدوق
‘‘সে কিছুই নয়, তার হাদীস লেখা যাবে না”
১৪. ইমাম আল-উকাইলী কিতাব আদ-দু’য়াফা তে তাকে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন:
وذكره العقيلي في الضعفاء وقال حدثنا أحمد بن محمد بن صدقة سمعت العباس الدوري يقول سمعت
يحيى بن معين يقول جهمي كذاب
আহমদ বিন মুহাম্মাদ বিন সাদক্বাহ আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন; তিনি আব্বাস আদ-দাউরী থেকে শুনেছেন; তিনি ইয়াহহিয়া বিন মাঈন থেকে বর্ণনা করেছেন; বিন মাঈন বলেছেন: (মুহাম্মদ বিন আল-হাসান) একজন জাহমী ও কাযযাব।
[লিসানুল মিযান; কিতাব আদ-দু’য়াফা (আল উকাইলী); ৪/৫২, সনদ সহীহ]
এবং আল-উকাইলী, আসাদ বিন উমরো এর সনদে বলেছেন:
ومن طريق أسد بن عمر وقال هو كذاب
(মুহাম্মদ বিন আল-হাসান) হল কাযযাব।
১৫. ইমাম আল-উকাইলী ইমাম আব্দুর রহমান বিন মাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন,
من طريق عبد الرحمن بن مهدي دخلت عليه فرأيت عنده كتابا فنظرت فيه فإذا هو قد أخطأ في حديث وقاس على الخطأ فوقفته على الخطأ فرجع وقطع من كتابه بالمقراض عدة أوراق
لسان الميزان: ١٢٢/٥
ইমাম আল-উকাইলী ইমাম আব্দুর রহমান বিন মাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি তার (মুহাম্মদ বিন আল হাসান) নিকট গেলাম, এবং তার নিকট একটি বই দেখতে পেলাম। আমি দেখলাম যে তিনি হাদীসে একটি ভুল করেছেন, এবং তিনি ঐ ভুল হাদীসের উপর কিয়াস করছেন। তাই আমি তাকে তার ভুল সম্পর্কে বললাম, ফলে তিনি তার ভুল থেকে ফিরে এলেন, এবং কাঁচি দিয়ে বইয়ের বহু পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেললেন।
[লিসানুল মিযান; কিতাব আদ-দু’য়াফা ৪/৫৪; সনদ সহীহ]
উপরে লিসানুল মিযানে উল্লেখিত জারাহ গুলোর সাথে আরো কিছু জারহ বর্ণনা করা হলো -
১৬. আহলে সুন্নাতের ইমাম - আহমদ ইবনে হানবল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“ليس بشئ ولا يكتب حديثه”
“সে কিছুই না, তার হাদীস লেখা ঠিক নয়।”
[আল-কামিল (ইবনে আদী) ৬/২১৮৩; সনদ সহীহ]
১৭. ইমাম আহমদ র. আরো বলেন,
“لا أروي عنه شيئاً”
“আমি তার নিকট থেকে কিছুই বর্ণনা করি না”
[কিতাব আল-ইলাল ওয়া মা’রিফাত আর-রিজাল (ইমাম আহমদ) ২/২৫৮]
১৮. ইমাম উকাইলী র. মুহাম্মদ বিন আল-হাসান কে তার ‘কিতাব আদ-দু’আফা আল-কাবীর, ৪/৫৫-৫৬’ তে উল্লেখ করেছেন কিন্তু তাকে সত্যায়ন করেন নি।
১৯. হাফিয ইবনে হিব্বান র. বলেন,
محمد بن الحسن الشيباني، صاحب الرأي...... وكان مرجئاً داعياً إليه، وهو أول من رد أهل المدينه ونصر صاحبه يعنى النعمان، وكان عاقلاً ليس في الحديث بشئ كان يروى عن الثقات ويهم فيها فلما فحش ذالك منه استحق تركه من أجل كثرة خطئه لأنه كان داعيةً إلى مذهبهم
“মুহাম্মাদ বিন আল-হাসান আল-শাইবানী, সাহিব আর-রায়, এবং তিনি ছিলেন একজন মুর্জিয়াহ, এবং এর দিকে আহবান করতেন। তিনি ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি মদীনার অধিবাসীদের অসত্য প্রতিপন্ন করতেন, এবং তার সাথী অর্থাৎ আল-নু’মান র. এর পক্ষালম্বন করতেন, সে ছিল বুদ্ধিমান কিন্তু হাদীসে ক্ষেত্রে কিছুই ছিলেন না, তিনি সিকাহ বর্ণনাকারীদের থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন কিন্তু তাতে ভুল করতেন। যখন তার আওহাম (ভুল) বৃদ্ধি পেল, এবং অসংখ্য ভুলের কারনে তিনি পরিত্যক্ত (মাতরূক) ব্যক্তিতে পরিগণ্য হলেন। এবং তিনি তার মাযহাবের (ইরজা) প্রতি আহবানকারী ছিলেন।”
[কিতাব আল-মাজরহীন, ২/২৭৫-২৭৬]
২০. ইমাম জুযজানি বলেন,
أسد بن عمرو و أبو يوسف و محمد بن الحسن و اللؤلؤي قد فرغ الله منهم
“আল্লাহ আসাদ বিন আমর, মুহাম্মদ বিন আল হাসান এবং (হাসান বিন যিয়াদ) আল-লু’লুঈ সহ ধ্বংস করে দিয়েছেন।”
[আহওয়া উর-রিজাল: পৃ: ৭৬, ৭৭]
২১. ইবনে শাহীন তাকে (মুহাম্মদ বিন আল হাসান) তার কিতাব “তারীখ আসমা আদ-দু’য়াফা ওয়াল কাজ্জাবীন’ (পৃ: ১৬৩) অন্তুর্ভূক্ত করেছেন।
সারাংশ:
সুস্টষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে মুহাম্মাদ বিন আল হাসান আশ শায়বানী কে যারা যঈফ ও মাজরূহ বলেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন -
১. ইয়াইহিয়া ইবনে মাঈন র.
২. আহমাদ ইবনে হানবল র.
৩. ইমাম নাসাঈ র.
৪. আবূ যু’রাহ আর-রাযি র.
৫. উমরো বিন আলী আল ফালাস র.
৬. ইবনে হিব্বান র.
৭. আল-উকাইলী র.
৮. ইমাম জযজানী র.
৯. ইবনে শাহীন র.
সুতরাং এই রকম রাবীর উপর যে মাযহাব গঠিত সে মাযহাব কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।।
হানাফী ফিকহ কমিটিতে প্রথম যার নাম আসবে তিনি হলেন আসাদ বিন আমর আবুল মুনযির আল বাজালী।তিনি আবু হানীফা রহ.- এর শাগরিদ। তার বিষয়ে ইমামদের মতামতঃ ১. ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বলেন, তিনি সত্যবাদী। তবে আবু হানীফার ছাত্রদের হতে হাদীছ বর্ণনা করা উচিৎ নয়।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪ } ২. তিনি আবু হানীফার মাযহাবের পক্ষে্য হাদীছ বানাতেন। { আল মাজরুহীন,রাবী নং- ১১৭} ৩. ইমাম ইবনে আবু শাইবাহ বলেন, তিনি আর বাতাস সমান। { যিকরু মান ইখতালাফাল উলামা,১/ ৪১} তার মানে তিনি হাদীছ বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য নয়। ৪. ইয়াহইয়া ইবনে মাইন বলেছেন, তার হাদীছ বর্ণনায় সমস্যা নেই।{ তারীখে ইবনে মাইন, রাবী নং-১৭৬২} ৫. অন্যত্র ইবনে মাইন তাকে মহামিথু্যক বলেছেন।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪} ইবনে মাইনের মিথু্যক বলাই গ্রহণযোগ্য। কারণ এটা জারহ মুফাস্সার। ৬. তার হাদীছ লেখা যাবে না। { ঐ} ৭. তিনি কিছুই নন।{ ঐ} ৮. তিনি যইফুল হাদীছ। { আল জারহু ওয়াত তাদীল, ইবনে আবী হাতিম, রাবী নং- ১২৭৯} ৯. ইমাম বুখারী তাকে যইফ বলেছেন। { তারীখে কাবীর, রাবী নং- ১৬৪৬; আয যুয়াফাউল কাবীর, রাবী নং- ৩৪} ১০. ইমাম নাসাই তাকে শক্তিশালী নন বলেছেন। { আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, রাবী নং- ৫৩} ফিকহ কমিটি যখন প্রতিষ্ঠা হয় তখন তিনি দুনিয়ায় জন্ম নিয়েছিলেন কি না তা আল্লাহই জানেন। তার মৃঃ ১৯০ হিজরীতে। জন্ম সাল জানতে পারি নি।
১। মাযহাবী আর লা-মাযহাবীদের মাঝামাঝি - http://www.bdface.net/blog/blogdetail/detail/4803/TrueIslam/70451#.WCQeBTVuh_k
২। বইঃ হানাফী কেল্লার পোষ্ট মর্টেম (প্রথম খণ্ড) - http://www.mediafire.com/view/af1oh4qx34s3443/Hanafi_Kellar_Post_Mortem_1.pdf
৩। বইঃ আহলেহাদিছ একটি বৈশিষ্টগত নাম
https://ia601500.us.archive.org/10/items/AhlehadeethEktiBoishishtogotoNamByZubairAliZai/ahlehadeeth_ekti_%20boishishtogoto_nam_%E0%A6%86%E0%A6%B9%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%9B_%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF_%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%97%E0%A6%A4_%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE_%20by_Zubair_Ali_Zai.pdf
৪। সুন্নাহর সামগ্রিক ও ভারসাম্যময় উপলব্ধিঃ
http://www.bdfirst.net/blog/blogdetail/detail/7762/alsabanow13/71566#.Vl8n-q_mjVJ
https://www.facebook.com/Aarif.Muslim/videos/904886826231083/?pnref=story
.
[১১/১১] জাবির ইবনু আবদুল্লাহ(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী(সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত থাকা অবস্থায় তিনি একটি সরল রেখা টানলেন এবং তাঁর ডান দিকে দুটি সরল রেখা টানলেন এবং বাম দিকেও দুটি সরল রেখা টানলেন। অতঃপর তিনি মধ্যবর্তী রেখার উপর তাঁর হাত রেখে বলেনঃ এটা আল্লাহ্র রাস্তা। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং "এ পথই আমার সরল পথ। অতএব তোমরা এ পথেরই অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, অন্যথায় তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে" [সূরা আনআম ৬: ১৫৪]
সুনানে ইবনে মাজাহ, অধ্যায়ঃ ভূমিকা পর্ব, হাদিস নম্বরঃ ১১। তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: আহমাদ ১৪৮৫৩ তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ।
.
পৃথিবীতে যে চারটি মাসহাব হবে এ হাদীস তার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। হাদীসটি খেয়াল করুন, 'ডানে দুটি দাগ ও বামে দুটি দাগ' অর্থাৎ, হানাফী ও শাফেঈ একদিকে আর অন্যদিকে মালেকী ও হাম্বলী মাজহাব। আর আজকের এই ফেৎনাময় বিশ্বে মুসলিমরা যত দল, মতবাদ, ফির্কা, তরিকায় বিভক্ত হোক না কেন তবুও সবার মাঝে উক্ত ৪ মাজহাব হল কমন ফির্কা। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে চিন্তা করুন, এদেশে দেওবন্দী ও ব্রেরলিভী ফির্কা আছে। উভয়ে নিজেদের মাঝে 'কুফরী' ফতোয়া পর্যন্তও দিয়েছে, তারপরও তারা একই 'হানাফী' মাজহাব ফির্কায় বন্দী। অনুরূপ তাবলিগী, জামাতী, হেফাজতে ইসলাম প্রায় সবাই নিজেদের মাঝে দ্বন্ধ, তবে হানাফী মাজহাব ফির্কায় বন্দী। এদেশের প্রত্যেক পীর ও পীরের তরিকা ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু চরমুনাই, হাটহাজারী পীর, দেওয়ানবাগী, শর্শিনাপীর, চন্দ্রপুরী, রাজারবাগী, ফুলতুলী, আটরশি, মাইজভান্ডারী ইত্যাদি যত পীর তরিকা আছে সবাই এক ফির্কা তথা 'হানাফী' মাজহাব ফির্কায় বন্দী। এখন যদি প্রশ্ন করি, 'হানাফী' মাজহাব ঠিক হলে সেই মাজহাবে এত দল ও উপদল কেন? এখন প্রত্যেক উপদল ভাবছে তার দল ঠিক, সবাই তো ঠিক না। অর্থাৎ, বাতিলের ভিতরেও আরও বাতিল। অন্ধকারের উপর আরও ঘন অন্ধকার। নবীজী হাদীসের মাধ্যমে এটায় প্রমাণ করলেন, পৃথিবীতে কমন চারটি বড় দল তৈরী হবে। বাস্তবতা দেখুন,প্রত্যেক দল উক্ত চারটি মাজহাবের কোনও না কোনও মাজহাবের তাক্বলিদকারী। হাদীসে নবীজী মধ্যে অন্য একটি রেখা টেনে বললেন, এটায় আল্লাহর পথ। অর্থাৎ, চার মাজহাব অনুসরণ করতে গিয়ে এই চিরাচরিত শ্বাশত আল্লাহ্ ও রাসূলের পথ ও মাজহাব হতে সরে যাবে অনেকে। আর সেসব মানুষকে সতর্ক করতেই রাসূল সতর্ক করছেন। এভাবে এখন হতে ১৪শ বছর পূর্বেই নবী(সাঃ) বর্তমানে বড় ফিৎনা ৪ মাজহাব নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। যা আজ বাস্তব ও চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতেছি।
হানাফীদের কথিত ফিকহ কমিটি :
৪০ সদস্যর ফিকহ কমিটি তৈরীর তারীখ নিয়ে এখতেলাফ। নীচে তারীখ নিয়ে কিছু তথ্য দেয়া হল।
১. ১২০ হিজরী। { মুকাদ্দামা আনওয়ার,২/ ১৮}
২. ১২১ হিজরী।{ তারীখুল ফিকহ,পৃঃ ৬৫}
৩. ১৩২ হিজরী।{ লামাহাত,৩/ ৪২৫}
হায়রে! তারীখ নিয়েও ইখতেলাফ।
যাই হোক ৪০ জন সদস্য তেইশ বছরে ১৩ লাখ মাসলা লিপিবদ্ধ করেছেন।{ তারীখুল ফিকহ,পৃঃ ৭০}
যদি তাই হয় তবে প্রতিদিন ১২২ টা মাসলা লেখতে হয়েছে। কিন্তু বলা হয়েছে, কিছু কিছু মাসলা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দিনের পর দিন ব্যায় করতে হয়েছে।
পাঠক বুইজ্জা লন।
৪০ জন কারাঃ
১. শিবলী নুমানি আফসোস করে বলেনঃ আমি কেবল কতিপয়ের নাম জানতে পেরেছি।{ সীরাতে নুমান,পৃঃ ৩৯০}
২. আনওয়ার কিতাবের রচয়িতা বলেনঃ আমি সবার কথাই জানতে পেরেছি।{ মুকাদ্দামা আনওয়ার,১/ ১৬০}
তিনি যে ৪০ জনের নাম জানতে পেরেছেন তাদের হাল হাকীকত পরে আরেকদিন বর্ণনা করা হবে।
হানাফী ফিকহ কমিটিতে প্রথম যার নাম আসবে তিনি হলেন আসাদ বিন আমর আবুল মুনযির আল বাজালী।তিনি আবু হানীফা রহ.- এর শাগরিদ। তার বিষয়ে ইমামদের মতামতঃ
১. ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বলেন, তিনি সত্যবাদী। তবে আবু হানীফার ছাত্রদের হতে হাদীছ বর্ণনা করা উচিৎ নয়।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪ }
২. তিনি আবু হানীফার মাযহাবের পক্ষে্য হাদীছ বানাতেন। { আল মাজরুহীন,রাবী নং- ১১৭}
৩. ইমাম ইবনে আবু শাইবাহ বলেন, তিনি আর বাতাস সমান। { যিকরু মান ইখতালাফাল উলামা,১/ ৪১}
তার মানে তিনি হাদীছ বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. ইয়াহইয়া ইবনে মাইন বলেছেন, তার হাদীছ বর্ণনায় সমস্যা নেই।{ তারীখে ইবনে মাইন, রাবী নং-১৭৬২}
৫. অন্যত্র ইবনে মাইন তাকে মহামিথু্যক বলেছেন।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪}
ইবনে মাইনের মিথু্যক বলাই গ্রহণযোগ্য। কারণ এটা জারহ মুফাস্সার।
৬. তার হাদীছ লেখা যাবে না। { ঐ}
৭. তিনি কিছুই নন।{ ঐ}
৮. তিনি যইফুল হাদীছ। { আল জারহু ওয়াত তাদীল, ইবনে আবী হাতিম, রাবী নং- ১২৭৯}
৯. ইমাম বুখারী তাকে যইফ বলেছেন। { তারীখে কাবীর, রাবী নং- ১৬৪৬; আয যুয়াফাউল কাবীর, রাবী নং- ৩৪}
১০. ইমাম নাসাই তাকে শক্তিশালী নন বলেছেন। { আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, রাবী নং- ৫৩}
ফিকহ কমিটি যখন প্রতিষ্ঠা হয় তখন তিনি দুনিয়ায় জন্ম নিয়েছিলেন কি না তা আল্লাহই জানেন। তার মৃঃ ১৯০ হিজরীতে। জন্ম সাল জানতে পারি নি।
ফিকহ কমিটির তৃতীয় ব্যাক্তি হলেন। হিব্বান বিন আলী আনাযী। তার জন্মঃ ১১১ হিজরীতে। আর মৃঃ ১৭২ হিজরীতে। তার মানে আনুমানিক দশ বারো বছর বয়সেই তিনি ফিকহ কমিটির অন্যতম ফকীহ হয়ে গিয়েছিলেন।
নীচে তার সম্পরকে ইমামদের কথা তুলে ধরলামঃ
১. তিনি হাদীছ বর্ণনায় যঈফ। { তাবাকাতুল কুবরা, রাবী নং- ২৬৬৮}
২. মুহাদ্দিছদের নিকটে তিনি শক্তিশালী নন। { তারীখে কাবীর, ইমাম বুখারী, রাবী নং- ৩০৭}
৩. তিনি সত্যবাদী। তার হাদীছ বিধিসম্মত। { আছ ছিকাত, ইজলী, রাবী নং- ২৪২}
৪. তিনি যঈফ।{ আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, ইমাম নাসাই, রাবী নং- ১৬৩}
৫. ইবনে মাইন বলেন, তার বর্ণিত হাদীছ কিছুই না। { আল জারহু ওয়াত তাদীল, রাবী নং- ১২০৮}
৬. ইমাম আবু যুরয়াহ তাকে দুর্বল বলেছেন। { ঐ}
৭. তার হাদীছ লেখা যাবে। তবে দলীল হিসেবে মানা যাবে না।{ ঐ}
৮. তার মাঝে দুর্বলতা বিদ্যমান। { আল কামিল, রাবী নং- ৫৪৩}
৯. তিনি যঈফ। { আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, ইমাম দারাকুতনী, রাবী নং- ১৭৪}
১০. তিনি যইফুল হাদীছ। {আল মুতালাফ ওয়াল মুখতালাফ, ১/ ৪২০}
১১. ইবনুল মাদিনী বলেন, আমি তার হাদীছ লিখি না। { আয যুয়াফাউল মাতরুকীন, ইমাম ইবনুল জাওযী, রাবী নং- ৭৪৪}
হাসান বিন যিয়াদঃ ( ১১৬- ২০৪)
১. ইবনে মাইন তাকে কাযযাব বলেছেন। ইবনু নুমায়ের বলেন, তিনি ইবনে জুরাইজের উপরে মিথ্যা বলতেন। আবু দাউদ তাকে কাযযাব এবং ছেক্বাহ নন বলেছেন। মুহাম্মাদ বিন রাফে' বলেন, এই লোক ইমামের আগেই রুকু হতে মাথা উঠাতেন এবং ইমামের আগেই সিজদায় যেতেন।
আবু সাওর বলেন, আমি তার চাইতে বড় কাযযাব আর দেখিনি। উসামা তাকে খবীছ বলেছেন। উকায়লী এবং সাজী তাকে কাযযাব বলেছেন। { লিসানুল মীযানের,২/ ২০৮,২০৯; নুরুল আইনাইন, এর বরাতে, পৃঃ ৩৯}
২. তার সাথে একজন সাধারণ লোকের কথোপথন হয় যা নীচে তুলে ধরলাঃ
প্রশ্নকারীঃ নামাজে জোরে হাসি দিলে তার নামাজের হুকুম কি হবে?
হাসান বিন যিয়াদঃ নামাজ বাতিল।
প্রশ্নকর্তাঃ ওযুর কি হবে?
হাসানঃ ওযু ভি গ্যায়া।
প্রশ্নকারীঃ যে নামাজে থাকাবস্থায় কোন সতী নারীকে যেনার অপবাদ দেয় তার হুকুম কি হবে?
হাসানঃ তার নামাজ বাতিল।
প্রশ্নকারীঃ ওযু?
হাসানঃ ওযু ভাংগবে না বরং ঠিক থাকবে।
প্রশ্নকর্তাঃ তার মানে আপনার নিকটে, নামাজে জোরে হাসা যেনার অপবাদ দেবার চাইতেও বেশী খারাপ কাজ?
হাসানঃ জুতা হাতে নিলেন এবং...... (বুইজ্জা লন) { আল কামিল, ২/ ৭৩২; মীযান, পৃঃ ২৯১; দাস্তান ই হানফী- এর বরাতে, পৃঃ ৯৩-৯৪}
৩. তিনি ছেক্বাহ নন। নির্ভর্যোগ্য নন। { আয- যুআফা ওয়াল মাতরুকীন, ইমাম নাসাই, রাবী নং- ১৫৬}
{ চলমান..... ইনশা আল্লাহ}
★★মাযহাব মানা কি ওয়াজিব? এ ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের মতামতঃ
(1.))##Shaykh Al-Islam Imaam Ibn Taymiyyah Says: “it is not obligatory on a layman to follow a Madhab”
#শায়খ উল-ইসলাম ইমাম ইবন তায়মিয়্যাহ বলেছেনঃ “সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয়” [Majmu’ah 20/116, 124-126]
(2. ))##Ibn al-Humam al-Hanafi says in his Tahrir : “Adhering to a particular Madhab is not obligatory, according to the correct opinion”
#ইবন আল-হুমাম আল-হানাফী বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা সঠিক মতামত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়” [Mukhtasar al-Tahrir 103]
(3.))##Ibn Muflih al-Hanbali, in al-Furu’, mentions the difference of opinion amongst the Malikis and Shafi’is, saying: “It not(following a madhab) being obligatory is the most famous opinion”. Al-Mardawi comments: “And this is the correct opinion”.
#ইবন মুফলিহ আল-হাম্বলী, মালিকি ও শাফেয়ীদের মধ্যে মতভেদ উল্লেখ করে বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা ওয়াজিব নয়, ইহাই সবচেয়ে বিখ্যাত মতামত”।
এবং তিনি মন্তব্য করেছেনঃ “এবং এটাই সঠিক অভিমত” [আল-ফুরু]
(4.))##Ibn al-Najjar al-Hanbali says: “A layman is not obliged to adhere to a Madhab”
#ইবন আন-নাজ্জার আল-হাম্বলী বলেছেনঃ “একজন সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব মানা ওয়াজিব(আবশ্যক) নয়”
(5.))##Ibn Qawan al-Shafi’i says in his al-Tahqiqat, “The truth is that it is not incumbent to adhere to a Madhab; Rather, a person should ask whoever he likes.
#ইবন কাওয়ান আল-শাফেয়ী তার আল-তাহকীকাত এ বলেছেনঃ “সত্য হলো মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যক নয়,বরং একজন ব্যাক্তির প্রয়োজন তাকে জিজ্ঞাসা করা, যাকে সে পছন্দ করে” [আল-তাহকীকাত]
(6. ))##Mulla ‘Ali al-Qari al-Hanafi says: “It is not obligatory upon anyone from the Ummah to be a Hanafi, or a Maliki, or a Shafi’i, or a Hanbali; rather, it is obligatory upon everyone, if he is not a scholar, to ask someone from Ahl al-Dhikr (people of knowledge), and the four Imams are from amongst the Ahl al-Dhikr.”
#মোল্লা আলী আল-কারী আল-হানাফী বলেছেনঃ “এই উম্মাহ(মুসলিম) এর কারো উপর এটি আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয় যে তাকে হানাফী,শাফেয়ী,মালিকী,হাম্বলী হতে হবে; বরং যদি কেউ আলেম না হয়(সাধারন মানুষ) তাহলে তার জন্য আবশ্যক(ওয়াজিব) যে, সে আলেমদের মধ্যে থেকে কাউকে জিজ্ঞাসা করবে, এবং চার ইমাম আলেমদের মধ্য হতেই” [ by Muhammad hayath al-Sindī pg. 33-34,, Dar Ibn hazm Beirut, 1st edition]
★নির্দিষ্ট ইমাম(মাজহাব) মানার ক্ষেত্রে ডাঃ জাকির নায়েকের মতঃ--
সাধারণের মধ্যে কেউ যদি বিশেষ কোনো ইমামের রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। (লেকচার সমগ্র,ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তি সমূহের জবাব,মুসলিমরা এত দলে বিভক্ত কেন?,পৃঃ-২৩৪) এখানে তিনি মাজহাবকে জাতীয় পরিচয় হিসাবে উল্লেখ্য করতে নিষেধ করেছেন কারণ এতে করে ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
অতএব আপনার নিকট প্রশ্ন মাজহাব মানা ফরজ??/সুন্নত??/ওয়াজিব??/না অন্য কিছু বোঝায় বা এর গুরুত্তইবা কতটুকো যা নিয়ে আজ আমরা মুসলীম শ্রেনী এতদলে উপদলে বিভক্ত???
তথাকথিত হানাফী মাযহাব নামধারী এক শ্রেনীর আলেম এবং তাদের মোকাল্লেদদের কাছে আমার প্রশ্ন,
যারা বলতেছেন- চার মাযহাবের যেকোনো একটি মাযহাব মানা ফরজ কিংবা ওয়াজিব ।এটা মানার নাকি ইজমা হইছে । আপনারা আরোও বলে থাকেন যে, চারটা মাযহাবের মতামত সঠিক, চার ইমামই হক্ব (সত্য) ।
তাহলে, আপনি কেন আহলে হাদিস বা সালাফী মতের অনুসারী লোকদের সমালোচনা করেন । যেমন-
√√ ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা পাঠ বিষয়-
1. ইমাম আবু হানাফী (রহঃ)এর মতে ইমামের পিছুনে মোক্তাদির সূরা ফাতেহা পাঠ করা নাজায়েজ ।
2. ইমাম শাফেঈ (রহ
3. ইমাম মালেক (রহ
>> "এখন আহলে হাদীসগন ইমাম শাফেঈ (রহ
╔╗ এখন হানাফী মাযহাব নামধারী এক শ্রেনীর আলেম এবং তাদের মোকাল্লেদদের কাছে আমার প্রশ্ন -
◘ আহলে হাদীসগন ইমাম শাফেঈ (রহ
যদি তাদের মতকে ভীত্তিহীন (ভুল) মত বলে দাবি করেন তাহলে ইমাম শাফেঈ (রহ
◘ আর যদি ইমাম শাফেঈ (রহ
আপনারা কেন এই দ্বী'মুখী আচারণ করেন?
♀ আর যদি চার ইমামই হক্ব (সত্য) হন । তাহলে আপনি কোন আহলে হাদিস বা সালাফী মতের বিরুদ্ধে কথা বলবেন না । কারণ আহলে হাদিস বা সালাফী মতেরর সাথে হাম্বলী মাযহাবের প্রায় ৯০% বেশি মতের মিল রয়েছে । বাকীটা অন্য মাযহাবের সাথে মিল রয়েছে ।
√√ এখানে শুধু একটি মত আলোচনা করা হয়েছে, আর যারা হাদীস পড়েন তারা জানেন এরকম আরো অসংখ্য মত আছে যেগুলো পরস্পর বিরোধী । এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে সহী হাদীসের অনুসারী হওয়া ।
√√ আর একটা কথা চার মাযহাবের যেকোনো একটি মাযহাব মানা ফরজ কিংবা ওয়াজিব, এটার পক্ষে ইজমা হওয়ার এপর্যন্ত কোনো দলিল পাই না ।
√√ আর যদি ইজমা হয়ে থাকে তাহলে কোন শহরে হইছে? আর কখন ইজমা হইছিল? কে কে পক্ষে ছিল? আর কে কে বিপক্ষে ছিল? তার বিস্তারিত দলিল দিবেন । শুধু মুখে দাবি করলেই ইজমা হয় না । কে কে পক্ষে ছিল? কে কে বিপক্ষে ছিল?
√√ আমি এমন অনেক হানাফী বড় বড় আলেমদের নাম বলতে পারব এবং তাদের কিতাবের পৃষ্ঠা নম্বর দিতে পারব, যারা কোনো একটি মাযহাবে তাকলীদ (অন্ধ অনুসরণ) করাকে হারাম বলেছেন ।
যেমন - হানাফী আলেমদের তাকলীদ বিরোধী ফতোয়া - তাকলীদ
+আল্লামা ইবনুল (হোম্মাম হানাফী - ফতহুল কাদীর ৩/২৪৭ পৃঃ
+শাহ অলীউল্লাহ এর বাংলায় অনুবাদ শির্ক ও বিদাআ বই তে ,
+ আবদুল আজিজ হানাফী এর ফতওয়াফে আজীজীয়ায়
+ আশরাফ আলী থানবী হানাফী তার আল এখতেছারে ২/২৪৭ পৃঃর পর থেকে ও ফতওয়াফে এমদাদীয়ার ভিতরে
+ মওঃ রুমী এর উপর দুই শত লানত করেছেন
⊙ ইমাম আবু হানীফা (রহ
1. "হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব" [আল হাশিয়া ১ম খন্ড ৬৩ পৃ: , রাসমুল মুফতী ১ম খন্ড ৪র্থ পৃ:]
2. "আমরা কোথা থেকে মাসআলা গ্রহণ করেছি , তা জানার আগ পর্যন্ত আমাদের বক্তব্য গ্রহণ করা কারুর জন্য জায়েয নয়" [ইবনু আবদিল বার - ১৪৫ পৃ: , ইবনু আবেদীন ৬ষ্ঠ খন্ড ২৯৩ পৃ: , আশ শা'রানী ১ম খন্ড ৫৫ পৃ: , ইবনুল কাইয়েম ২য় খন্ড ৩০৯ পৃ:]
⊙ ইমাম মালেক (রহ
1. "আমি মানুষ, ভুল-শুদ্ধ দুটোই করি। আমার রায় দেখ, যা কোরআন ও সুন্নাহর মোতাবেক তা গ্রহন কর এবং যা তার বিপরীত তা প্রত্যাখ্যান কর" [আল ফোলানী - ৭২ পৃ: , আল জামে- ইবনু আবদিল বার ২য় খন্ড ৩২ পৃ: , উসুলুল আহকাম- ইবনে হাযম ৬ষ্ঠ খন্ড ১৪৯ পৃ:]
2. "রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পর এমন কোনো ব্যক্তি নেই, যার কথা ও কাজ সমালোচনার ঊর্ধে । একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সমালোচনার ঊর্ধে" [আল জামে- ইবনু আবদিল বার ২য় খন্ড ৯১ পৃ: , উসুলুল আহকাম- ইবনে হাযম ৬ষ্ঠ খন্ড ১৪৫-১৭৯ পৃ: , ইরশাদুস সালেক- ইবনু আবদিল হাদী ১ম খন্ড ২২৭ পৃ:]
⊙ ইমাম শাফেঈ (রহ
1. "তোমাদের কারোর কাছ থেকে যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সুন্নাহ ছুটে না যায় । আমি যতো কিছুই বলে থাকি তা যদি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাদীসের পরিপন্থী হয়, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কথাই আমার কথা" [ইলামুল মোকেঈন ২য় খন্ড ৩৬৩-৩৬৪ পৃ: , তারীখে দিমাশ্ক- ইবনে আসাকির ইকায- ১০০ পৃ:]
2. "আমি যা বলছি তার বিপরীত যদি
রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কোনো হাদীস কারো নিকট বিদ্যমান থাকে, তাহলে আমি আমার জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থাতেই ঐ হাদীসের দিকে ফিরে আসবো" [হিলইয়া- আবু নাঈম ৯ম খন্ড ১০৭ পৃ: , আর হারওয়াবী - ৪৭ পৃ: , আল ফোলানী - ১০৪ পৃ: , ইলামুল মোকেঈন ২য় খন্ড ৩৬৩ পৃ:]
⊙ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ
1. "তোমরা আমার, ইমাম মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ এবং সুফিয়ান ছাওরীর তাকলীদ (অন্ধ আনুগত্য) করবে না । বরং তারা যে উৎস থেকে গ্রহণ করেছেন তুমিও সেই উৎস থেকে গ্রহণ কর" [আল ফোলানী - ১০৪ পৃ: , ই'লাম- ইবনুল কাইয়েম ২য় খন্ড ৩০২ পৃ:]
2. "আওযাঈ, ইমাম মালেক ও ইমাম আবু হানীফার রায় তাদের নিজস্ব রায় বা ইসতিহাদ । আমার কাছে এসবই সমান । তবে দলীল হল আছার অর্থাৎ সাহাবী ও তাবেঈগনের কথা" [আল জামে- ইবনু আবদিল বার ২য় খন্ড ১৪৯ পৃ:]
⊙ ইবনুল কাসেম (রহঃ) বলেছেন-
"আমি ইমাম মালেক এবং ইমাম লাইসকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্যের বিষয়ে আলোচনা করতে শুনেছি । তাঁরা বলেন, লোকেরা বলে, তাতে প্রশস্ততা ও উদারতা রয়েছে । আসলে সে রকম নয় । আসলে তা ছিল ভুল ও শুদ্ধ কাজ । [জামে বায়ানিল ইলম ২য় খন্ড ৮১-৮২ পৃ:]
✔✔ যঈফ (দূর্বল) হাদীস থেকে সাবধান, কারণ যঈফ (দূর্বল) হাদীস থেকে শুধু ধারণা পাওয়া যায় । যঈফ (দূর্বল) হাদীস সত্যি হতেও পারে আবার মিথ্যাও হতে পারে । সুতরাং যঈফ (দূর্বল) হাদীস বাদ দিয়ে সহীহ হাদীস মানতে চেষ্টা করুণ । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-
⊙ "তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক । শুধুমাত্ত ধারণার ভিত্তিতে কথা বলা সবচেয়ে বড় মিথ্যা" [বুখরী ও মুসলিম]
আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে বলেছেন-
⊙ "ধারণা সত্যের ব্যাপারে কোনো কাজে আসে না"
[সূরা আন নাজম-৫৩: ২৮]
✔✔ আমি একজন অতি সাধারন নিরপেক্ষ মনোভাবের মানুষ ।
আমার প্রথম পরিচয়, আমি একজন মুসলিম । কেবল মাত্র আল্লাহর কথা এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর থেকে সহীহ হাদীস অন্ধ ভাবে অনুসরণ করি । এছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা ইমামদের তাকলীদ (অন্ধ অনুসরন) করি না । তবে তাদের মধ্যে মতবিরোধ থাকা সত্তেও তাদের সকলকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করি ।
✔✔ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যদি কোনো সহীহ সুন্নাহ জানতে পারি যা আমার এতদিনের কর্মকান্ডের বিপরীত, তখনই আমি তা সংশোধন করে নিব, ইন-শা-আল্লাহ । কারণ আমি আল্লাহকে ভালোবেসে এবং ভয় করে এটা করব । এতে লজ্জার কিছু নাই
:মাযহাব থেকে এই ইমামদের সময়ের পার্থক্য হল ============================ ইন্নাল হামদাইল্লাহ, ওয়াস সলাতু ওয়াস সালামু আলা রসুলিহিল কারিম।
#মাযহাবের ইমামদের এবং #সিহাহ সিত্তার ইমামদের জন্ম ও মৃত্যুর সন ¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤ #ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর জন্ম ৮০ হিজরী। মৃত্যু-১৫০ হিজরী। ¤¤¤¤ #ইমাম মালিক রহঃ এর জন্ম-৯৩ হিজরী। মৃত্যু-১৭৯। ¤¤¤¤ #ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর জন্ম-১৫০ হিজরী। মৃত্যু-২০৪ হিজরী। ¤¤¤¤ #ইমাম আহমাদ বিন বিন হাম্বল রহঃ এর জন্ম-১৬৪, মৃত্যু-২৪১ হিজরী। ¤¤¤¤ [_ইমাম_আবু _হানীফা_রহঃ_এর_ছাত্র_ইমাম_আবু_ইউসুফ_রহঃ_এর_জন্ম_১১৩_হিজরী_এবং_মৃত্যু_১৮২_হিজরী_এবং_ইমাম_মুহাম্মদ_রহঃ_এর_জন্ম_১৩১_হিজরী_এবং_মৃত্যু_১৮৯_হিজরী_ ¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤ ¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤¤ #মুহাদ্দিসীনদের_জন্ম_ও_মৃত্যু ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী রহঃ এর জন্ম-১৯৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৫৬ হিজরী। ¤¤¤¤ #মুসলিম বিন হাজ্জাজ ইমাম মুসলিম রহঃ এর জন্ম ২০৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৬১ হিজরী। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ঈসা বিন সাওরা ইমাম তিরমিজী রহঃ জন্ম-২১০ হিজরী এবং মৃত্যু ২৭৯ হিজরী। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ ইমাম ইবনে মাজাহ রহঃ এর জন্ম-২০৯ হিজরী এবং মৃত্যু-২৭৩ হিজরী। ¤¤¤¤ #সুলাইমান বিন আসআস ইমাম আবু দাউদ রহঃ এর জন্ম- ২০২ হিজরী এবং মৃত্যু-২৭৫ হিজরী। ¤¤¤¤ #আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইমাম নাসায়ী রহঃ এর জন্ম ২১৫ হিজরী এবং মৃত্যু ৩০৩ হিজরী। #এই হল সিহাহ সিত্তার জন্ম ও মৃত্যুর সন। ##লক্ষ্য করুন যে, #আর_মাযহাব_প্রতিষ্ঠা_হয়_৪০০_হি:_এখন_যে_মুর্খ_বলবে_যে সিহাহ_সিত্তার ইমামরা_মাযহাব মানতেন_তার_মাথার_গরুর_গোবর_ছাড়া_কি_আছে???
মাযহাব থেকে এই ইমামদের সময়ের পার্থক্য হল #ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর মৃত্যুর ১৫০-৪০০=২৫০ বছর পর জন্ম লাভ করেছে হানাফি মাযহাবের ¤¤¤¤ #ইমাম মালিক রহঃ এর মৃত্যু ১৭৯-৪০০=২২১ বছর পর জন্ম লাভ করেছে মালেকি মাযহাবের ¤¤¤¤ #ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর মৃত্যু ২০৪-৪০০=১৯৬ বছর পর জন্ম লাভ করেছে শাফি মাযহাবের ¤¤¤¤ #ইমাম আহমাদ বিন বিন হাম্বল রহঃ এর মৃত্যু ২৪১-৪০০=১৫৯ বছর পর জন্ম লাভ করেছে হাম্বলী মাযহাবের ¤¤¤¤ #মুহাদ্দিসীনদের_মৃত্যু কত পরে মাযহাবের জন্ম হয় তা নিচে #মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী রহঃ এর মৃত্যু ২৫৬-৪০০=১৪৪ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #মুসলিম বিন হাজ্জাজ ইমাম মুসলিম রহঃ এর মৃত্যু ২৬১-৪০০=১৩৯ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ঈসা বিন সাওরা ইমাম তিরমিজী রহঃ এর মৃত্যু ২৭৯-৪০০=১২১ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #মুহাম্মদ বিন ইয়াজিদ ইমাম ইবনে মাজাহ রহঃ এর মৃত্যু ২৭৩-৪০০=১২৭ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #সুলাইমান বিন আসআস ইমাম আবু দাউদ রহঃ এর মৃত্যু ২৭৫-৪০০=১২৫ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ #আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইমাম নাসায়ী রহঃ এর মৃত্যু ৩০৩-৪০০=৯৭ বছর পার প্রচলিত মাযহাব গুলো জন্ম হয়। ¤¤¤¤ [অতিরিক্ত তথ্য_ #ইমাম ইবন খুজাইমা(রহ) (মৃত্যু- ৩১১ হিজরি) ¤¤¤ #ইমাম তহাবী(রহ) (মৃত্যু- ৩২১ হিজরি) ¤¤¤ #ইমাম তাবারানী(রহ) (মৃত্যু- ৩৬০ হিজরি) ]
ইমাম বুখারী নাকি শাফেয়ী মাযহাব মানতেন !!!! এ কথা ইমাম বুখারী তার কোন কিতাবে লিখে গেছেন ? ইমাম বুখারির কতিপয় অমুল্য ও অদ্বিতীয় কিতাবের নাম দিলাম যার কোথাও তিনি মাযহাব মানার কথা বলেন নি--: ১. আল জামে আস সহিহ তথা বুখারি শরীফ। ২.রফউল ইদাইন। ১৯৮ টা হাদিস এনেছেন রফউল ইদাইনের পক্ষ্যে। ৩.খালকু আফআলিল ইবাদ। ৪.যুজউ কিরাতে খলফাল ইমাম।ইমামের পিছনে সুরা ফাতিহা পড়ার পক্ষ্যে বিষদ আলোচনা করেছেন এই বইতে। ৫. কিতাবুয যুআফা ওয়াল মাতরকিন। ৬. তারিখুল কাবীর। ৭. তাফসিরুল কাবীর। ৮. কিতাবুল কুনা । ৯. কিতাবুল ওয়াহদান । ১০.কিতাবুল মাবসুত। ১১. কাযাইয়া সাহাবা। ১২. কিতাবুল হিবাহ। ১৩. আসামিস সাহাবা। ১৪. আল মাশীখাহ। ১৫. কিতাবুল ইলাল। ১৬. বির্রুল ওয়ালিদাইন। ১৭. কিতাবুর রিকাক। ১৮. বাদউল মাখলুকাত। ১৯. কিতাবুল ফাওয়াইদ। ২০. কিতাবুল আশরিবাহ। ২১. তারিখুস সাগীর। ২২. আদাবুল মুফরাদ।]
হানাফী মাযহাবের ভাইয়েরা আহলে হাদীসদের বিরোধীতা করতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই অন্যান্য মাযহাবের বিরোধীতা করছেন তা তাদের মগজে ঢুকে না। আহলে হাদীসরা যেসব আমল করেন তা কোন না কোন মাযহাবের আমলের সাথে অবশ্যই মিল আছে।
যেমনঃ জুরে আমিন বলা, বুকে হাত বাঁধা, রাফউল ইয়াদাইন করা, ইমামের পিছনে সুরা ফাতেহা পড়া ইত্যাদি বেশির ভাগ মাস'আলার সাথে হানাফী মাযহাব বাদে বাকী তিন মাযহাব অর্থাৎ মালিকি, শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাবের মাস'আলার সাথে বেশির ভাগ মিল আছে। তাহলে কেন বিরোধীতা করেন? না কি আপনাদের মনের ভিতর ঐসব মাযহাবের প্রতি হিংসা আছে কিন্তু সরাসরী বলতে পারেন না তাই আহলে হাদীসের কাঁধে বন্দুক রখে শিকার করতে চান?
অনেক গজে উঠা হুজুরদের দেখা যায় তারা বড় বড় ফুটপাতের ডাক্তারের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন। জুরে আমিনের, বুকে হাত বাঁধার, রাফউল ইয়াদাইন করার এগুলি রাসুল(সাঃ) এর সুন্নত নয়। আহলে হাদীসরা কোথায় পেল ইত্যাদী বলে বেড়ান। আর তাদের জাহিল অনুসারীরা একবার ও চিন্তা করেন না যে, যেসব হুজুর বলতেছেন চার মাযহাব হক বা সঠিক কিন্তু আবার আহলে হাদীসদের আমল কোন না কোন মাযহাবের আমলের সাথে মিল আছে তার পরও হুজুরগণ বিরোধিতা করেন কেন? এটা তো আহলে হাদীসদের বিরোধিতা হচ্ছে না। এটা তো ঘুরে ফিরে অন্যান্য হক মাযহাবের বিরোধিতা হয়ে যাচ্ছে।
জুরে আমিন বললে, রাফউল ইয়াদাইন করলে, বুকে হাত বাঁধলে অন্যান্য মাযহাবের দোষ হয় না কিন্তু আহলে হাদীসরা করলে দোষ হয়ে যায় তা ইনসাফের কথা হলো কি করে?
এই সব আমল করা যদি সুন্নত হয় তাহলে আহলে হাদীসরা করলে সমস্যা কি? আর যদি সুন্নত না হয় তাহলে অন্যান্য মাযহাব কি সুন্নত বিরোধি আমল করতেছে? তাহলে চার মাযহাব সঠিক নয় কি?
মাযহাব বড়, নাকি সুন্নত বড়?
=====================
►হানাফী মাযহাব মতে মেয়েরা তাদের ‘ওয়ালী’ ছাড়া বিয়ে করলে বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বালি – এই ৩ মাযহাব মতে মেয়েদের ওয়ালী ছাড়া বিয়ে বাতিল। তাদেরকে নতুন করে মেয়ের ওয়ালী নিয়ে বিয়ে করতে হবে, নয়তো তারা স্বামী স্ত্রী হিসেবে বসবাস করতে পারবেনা।
► হানাফী মাযহাব মতে রাতের শেষ বিতির নামায ৩ রাকাত, এর কম বা বেশি কোনোটাই পড়া যাবেনা এবং তাদের মতে ১ রাকাত কোন নামায-ই শুদ্ধ নয় অথচ অন্য মাযহাব অনুযায়ী বিতির নামায ১, ৩, ৫, ৭ রাকাত পড়া যাবে।
► হানাফী মাযহাব মতে মাগরিবের ফরয নামাযের আগে দুই রাকাত নামায পড়া যাবেনা, এই নামায পড়লে কোন সওয়াব পাওয়া যাবেনা। অন্য মাযহাব অনুযায়ী মাগরিবের ফরয নামাযের আগে ২ রাকাত নামায পড়া যাবে।
► হানাফী মাযহাব মতে জামায়াতে ফজরের ফরজ সালাত আরম্ভ হয়ে গেলেও আগে সুন্নাত পড়েত হবে, অথচ সহীহ হাদীসে আছে ইকামত হয়ে গেলে কোন সালাত নাই।
► হানাফী মাযহাব মতে জামায়াতে সালাতের সময় সুরা ফাতেহা পড়তে হবে না, অথচ অন্য মাযহাব ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী সুরা ফাতেহা ছাড়া সালাত হয় না।
► হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নারীরা ঈদের দুই রাকাত নামাজ পড়তে পারবেনা, তাদের জন্য ঈদের মাঠে যাওয়া ঠিকনা। সহীহ হাদীস ও অন্য মাযহাব মতে নারীদেরকে ঈদের মাঠে নিতে হবে, তাদের মতে নারীদেরকে ঈদের মাঠে নিয়ে যাওয়া ‘ওয়াজিব’!
► হানাফী মাযহাব মতে কোন লোক মৃত স্ত্রী লোকের অথবা চতুষ্পদ জন্তুর স্ত্রী অঙ্গে বা অন্য কোন ভাবে সিয়ামরত অবসন্থায় ধর্ষণ করে তাহেল তার সিয়াম নষ্ট হবে না, অথচ সহীহ হাদীসে আছে যেকোন প্রকারে বীর্য বের হলেই সিয়াম ভেঙ্গে যায়।
► হানাফী মাযহাব মতে বাদশাহ যদি যিনা করে তার কোন হদ বা শাস্তি নেই অথচ সহীহ হাদীসে জিনার সাস্তির অধ্যায়ে বাদশাহ এর জন্য কোন ছাড় দেওয়া হয় নাই!
মাযহাবের প্রায় ৯৫টি সহীহ হাদীস বিরোধী ফতোয়া থেকে আমি উপরে ৭টি মাত্র উল্লেখ করলাম। এখন জ্ঞানী ভাই ও বোনদের কাছে আজকে আমাদের প্রশ্নঃ
উপরের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আপনারা কার কথা মানবেন? মাযহাবের নাকি সহীহ হাদীসের?
আর যারা বলছেন ৪ মাযহাবই ঠিক, তাহলে কিভাবে ৪টা মাযহাবই এক সাথে ঠিক হয়?
এখানে একদল আরেকদলের ফতোয়াই মানছেন না। হানাফীরা বলতেছে ওয়ালী ছাড়া বিয়ে হবে, বাকি ৩ মাযহাব বলতেছে বিয়ে হবেনা, সেটা জিনা-ব্যভিচার হবে। হানাফীরা বলেছে ১ রাকআত কোন সালাত জায়েজ নাই, অথচ অন্য মাযহাবীরা দেদারছে ১ রাক’আত বিতর আদায় করছেন। মেয়েদের মসজিদে যাওয়া হানাফীরা নাজায়েজ বলেন, অথচ অন্য মাযহাবীরা মেয়েদের জন্য আলাদা ফ্লোর পর্যন্ত তৈরী করছেন, ইত্যাদি কত উল্টা চিত্র এক মাযহাবের সাথে আর এক মাযহাবের!
এসকল ক্ষেত্রে কি করে ৪ মাযহাব-ই কে সাথে ঠিক থাকলো?
এইরকম আরও বহু বিষয় আছে, এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ। চিন্তাশীলদের জন্য আমি কয়েকটি তুলে ধরলাম মাত্র।
এরপরও আপনারা চিন্তাভাবনা না করেই যদি বলেন,
“এইটা ঠিক, ঐটাও ঠিক” -তাহলে তা হবে ইসলামী শরীয়ত নিয়ে ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়!
মাজহাব মানা কি ফরজ?
হানাফ এর মত অনুযায়ী: - “মাজহাব মানা ওয়াজিব বা ফরজ।”
-- যাক আসুন মূল কথায় যাই।
=> আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর সাথে সব সময় সব সাহাবী থাকতেন
না। কেউ নবীর (সাঃ) থেকে একটা হাদিসের
বাণী শুনলে সেটা পৌছে দিতেন অন্যের নিকট। যেমন আবু
হুরাইরা (রাঃ)নবীজি (সাঃ) এর অনেক বাণী পৌছে দিয়েছেন অন্যান্য
সাহাবীদের নিকট। যেমন বিদায় হজ্বের সময় ১ লাখেরও
বেশী সাহাবী ভাষন শ্রবণ করেছেন। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন
দেশে ছড়িয়ে গিয়েছেন।
=> ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) জন্ম গ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরীতে।
তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর যতগুলো হাদিস পেয়েছেন [ইমাম আবু
হানিফা (রহ
সংগ্রহকারী ছিলেন]এবং সংরক্ষণ করেছেন সেগুলোর উপর
ভিত্তি করেই ফতোয়া দিয়েছিলেন। অধিকন্তু বলা যায় যে, যেহেতু
তিনি সকল সাহাবাদের হাদিস সংগ্রহ করতে পারেন নাই, সকল
সাহাবাদের সাক্ষাত পান নাই এবং যেহেতু হাদিস এর ধারক
সাহাবারা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন তাই
তিনি যতগুলো হাদিস পেয়েছেন তার উপরেই ফতোয়া দিয়েছেন।
তাই এরই প্রেক্ষাপটে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মূল কথা ছিলঃ-
"ইযা সহহাল হাদিসু ফা হুয়া মাজহাবা" অর্থ্যাৎ বিশুদ্ধ হাদিস
পেলে সেটাই আমার মাজহাব বা মতামত।
(তথ্যসূত্র: ১/৬৩ ইবনু আবিদীন এর হাশিয়া, পৃঃ ৬২ ছালিহ আল-
ফাল্লানীর, ১/৪৬ শামী)।
ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল হে শায়খ, যদি এমন
সময় আসে যখন আপনার কথা কোন সহীহ হাদিসের
বিপরীতে যাবে তখন আমরা কি করব?
তিনি উত্তরে বলেছিলেন, তখন তোমরা সেই সহীহ হাদিসের উপরই
আমল করবে এবং আমার কথা প্রাচীরে/দেয়ালে নিক্ষেপ করবে।
=> ১৩৫ হিজরিতে জন্মগ্রহন কারী ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এর
বক্তব্য হলো,
তোমরা যখন আমার কিতাবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাহ
বিরোধী কিছূ পাবে তখন আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত
অনুসারে কথা বলবে। আর আমি যা বলেছি তা ছেড়ে দিবে। (৩/৪৭/১
আল হারাবীর, ৮/২ খত্বীব, ১৫/৯/১ ইবনু আসাকির, ২/৩৬৮ ইবনু
কাইয়িম, ১০০ পৃঃ ইহসান ইবনু হিব্বান)।
=> ৯৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ কারী ইমাম মালেক রহঃ এর বক্তব্যও
একই।
ইমাম মালেক বিন আনাস (রহঃ) বলেছেন, আমি নিছক একজন মানুষ।
ভূলও করি শুদ্ধও বলি। তাই তোমরা লক্ষ্য করো আমার অভিমত/
মতামত/মাজহাব এর প্রতি। এগুলোর যতটুকু কোরআন ও সুন্নাহ এর
সাথে মিলে যায় তা গ্রহণ করো আর যতটুকু এতদুভয়ের সাথে গরমিল
হয় তা পরিত্যাগ করো। (ইবনু আবদিল বর গ্রন্থ (২/৩২)।
=> ১৬৪ হিজরীতে জন্মগ্রহনকারী ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল
রহঃ ছিলেন ১০ লক্ষ হাদিসের সংগ্রহ কারী। সবচেয়ে বেশী হাদিস
উনার মুখস্থ ছিল এবং উনার সংগ্রহে ছিল। উনার লিখিত গ্রন্থ
মুসনাদে আহমাদ এ মাত্র ২৩০০০ এর মতো হাদিস লিপিবদ্ধ আছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সকল ইমামই কোরআন ও সহীহ হাদিস
মেতে নিতে বলেছেন। কিন্তু কেউ যদি বলেন মাজহাব
মানতে তাহলে এই মুসলিম জাতি কখনো এক হতে পারবে না।
সকলে দলে দলে বিভক্ত হয়ে যাবে যেমন হানাফী, শাফেঈ, হাম্বলী,
মালেকী, শিয়া, সুন্নী, কুর্দি, দেওবন্দী, বেরলভী ইত্যাদি।
উপরের যতগুলো গ্রুপে মুসলিমরা ভাগ হয়েছেন তার একটাই কারণ
মাজহাব বা মতামতকে তাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণ করা। প্রত্যেক
গ্রুপই তাদের ইমামদের, বুজুর্গদের মাজহাব বা মতামতকে প্রাধান্য
দিয়ে গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়েছে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দল
নিয়ে সন্তুষ্ট।
এখন দেখেন যারা ইমামদের তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণ করে নিজ নিজ
দল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে যেমন হানাফী, শাফেঈ, আহলে হাদিস
ইত্যাদি এবং কোরআন ও সহীহ হাদিস ত্যাগ করে, তাদের ব্যাপার
আল্লাহ কি বলেছেনঃ-
(হে নবী) আপনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হবেন না যারা দ্বীনের
মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ে যায়,
যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে সন্তুষ্ট। [সূরা রুম-৩১-৩২]
এই আয়াতে আল্লাহ তাদের মুশরিক বলে আখ্যায়িত করেছেন
যারা কোরআন ও সহীহ হাদিস ছেড়ে ইমামদের আলেমদের
বুজুর্গদের তাকলীদ করে তাদের। যেমন শীয়ারা। এক্ষেত্রে বলা যায়
যে, অনেকেই আবার আহলে হাদীসদেরকে শিয়া বলে অভিহিত করেন
কিন্তু এটা নিতান্তই ভুল। যাই হোক, শিয়ারা তাদের বুজুর্গদের
মাজহাব বা মতামতকে কঠোরভাবে মানে। বুঝতে চায়
না কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। এ কারনেই মহান আল্লাহ
সুবহানুতালা পবিত্র করআনে বলেছেনঃ-“যারা দ্বীনকে খন্ড বিখন্ড
করে, দলে দলে বিভক্ত হয় তাদের সাথে (হে নবী) আপনার কোন
সম্পর্ক নাই। [সূরা আনআম-১৫৯]”
এই আয়াতে যারা দলে দলে বিভক্ত হয় তাদের সাথে নবীর সম্পর্ক
না থাকার কথা বলা হয়েছে। যাদের সাথে নবীজি (সাঃ)এর সম্পর্ক
নাই তাদের সাথে আমাদের মুসলিমদেরও কোন সম্পর্ক নাই।
মুসলিম উম্মাহর মধ্যেও কেউ কেউ যদি দলে দলে বিভক্ত হন,
ইমামদের তাকলীদ করেন, তাহলে তাদের সাথেও নবীজি (সাঃ) এর
সম্পর্ক থাকবে না। আর যার সাথে নবীজি (সাঃ) এর সম্পর্ক নাই,
তার সাথে আমাদের সম্পর্কের তো প্রশ্নই উঠে না।
যারা কোরআন ও সহীহ হাদিস মেনে নিতে রাজি আছেন
তারা আমাদের মুসলিমদের দ্বীনি ভাই। আর যদি কেউ না মেনে নেন
তাহলে এই আয়াতটা তাদের জন্য –
যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ (কোরআন ও হাদিস অমান্যের
মাধ্যমে) করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব
মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব
যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।
আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। [সূরা নিসা-৪:১১৫]
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ্ পাকের। আসুন আমরা মাজহাবের
নামে বিভক্ত না হয়ে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ
করি যাতে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করতে পারি।
>>>> ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) কি সত্যিই তাবেঈ ছিলেন? <<<<
>>>> “অথবা” চার ইমাম কি সাহাবায়ে কিরামকে দর্শন করেছেন?
<<<<
দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে আমাদের সমাজে অনেক আলেম-উলামা -
সাধারন অসাধারন ব্যক্তিগন ইমামদের নামে অনেক
মিথ্যা রচনা করে থাকেন। ঠিক তেমনি একটি বহুল প্রচারিত
মিথ্যা কথা “চার ইমামের অনেকে সাহাবায়ে কিরামকে দর্শন
করে ধন্য হয়েছিলেন।“কথাটা সম্পূর্ন মিথ্যা। চার ইমাম হলেন ইমাম
আবূ হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহ্মাদ বিন
হাম্বল। ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম মালেক সমকালীন। কিন্তু কেউ
সাহাবাদের মধ্য হতে কাউকে দেখেন নাই, কারো সাথে সাহাবার
সাক্ষাত হয় নাই।
ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আল খতীব বলেন -
১।. ইমাম আবু হানীফা জীবিত অবস্থায় চার জন
সাহাবা বেঁচে ছিলেন।
(ক) আনাস বিন মালিক (রাঃ) (মৃত্যুঃ ৯১ হিজরী) বসরাতে।
(খ) আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা (রাঃ) (মৃত্যুঃ ৮৭ হিজরী) কুফাতে।
(গ) সাহাল বিন সায়াদ সায়েদী (রাঃ) (মৃত্যুঃ ৯১ হিজরী) মদীনাতে।
(ঘ) আবু তোফায়েল আমের বিন অসেলা (রাঃ) (মৃত্যুঃ ১১০ হিজরী)
মক্কাতে।
ইমাম আবূ হানীফা কারো সাথে সাক্ষাত করেন নাই
এবং কারো নিকট হতে হাদীসও শিক্ষা করেন নাই। (আল আক্মাল
ফি আসমাউর রেজাল মায়া মেশকাত পৃঃ ৬২৪)
ইমাম আবু হানীফার জন্ম ৮০ হিজরী মৃত্যু ১৫০ হিজরীতে।
(ক) আনাস বিন মালিক (রাঃ) যখন মারা যান তখন ইমাম আবু
হানিফার বয়স (৯১-৮০)= ১১ বৎসর। এই ১১ বৎসর সাহাবা আনাস বিন
মালিকের (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাতের প্রশ্নই উঠে না।
(খ) আব্দুল্লাহহ বিন আবী আওফা (রাঃ) যখন মারা যান তখন ইমাম
আবু হানিফার বয়স (৯৮৭-৮০)= ৭ বৎসর। সাক্ষাতের প্রশ্নই
উঠে না।
(গ) সাহাল বিন সায়াদ সায়েদী (রাঃ) যখন মারা যান তখন ইমাম আবু
হানিফার বয়স (৯১-৮০) = ১১ বৎসর।
(ঘ) আবু তোফায়েল আমের বিন অসেলা (রাঃ) যখন মারা যান তখন
ইমাম আবু হানিফার বয়স (১১০-৮০) = ৩০ বৎসর। আবু তোফায়েল
(রাঃ) সাথে সাক্ষাত হতে পারত, কিন্তু তিনি ইমাম আবু
হানিফা সাক্ষাত করেন নাই।
২। ইমাম মালেকের (রহঃ) কর্মময় সময় বেঁচেছিলেন মাত্র একজন
সাহাবী, যার নাম আবু তোফায়েল (রাঃ)।. তিনি মক্কায় বসবাস
করতেন। তিনি যখন মারা যান তখন ইমাম মালেকের বয়স (১১০-৯৫)
= ১৫ বৎসর। ইমাম মালেক মদীনা হতে হজ্জের কাফেলার
সাথে রওনা করেন এ সাহাবার সাথে সাক্ষাত ও হজ্জের উদ্দেশ্যে।
তারা পথিমধ্যে থাকা অবস্থায় আবু তোফায়েল (রাঃ) মারা যান।
ইমামের সাথে আবু তোফায়েল (রাঃ) সাথে সাক্ষাত হয় নাই।
৩। ইয়ামা শাফেয়ীর জন্ম ১৫০ হিজরীতে। অতএব, সকল সাহাবাগণ
তার জন্মের পূর্বে মারা যান।
৪। ইমাম আহ্মাদ বিন হাম্বল জন্ম গ্রহণ করেন ১৬১ হিজরীতে।
তার সকল সাহাবাগণ তার জন্মের পূর্বে মারা যান।
আশা করি বিষয়টি সবার কাছে তুলে ধরতে পেরেছি এবং সবাই
বুঝতে পেরেছেন।
>>>> কোন ইমামের ব্যক্তিগত ফতোয়ার
করনে ইসলামকে খাটো করে দেখবেন না। <<<<
আজ আমরা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে পবিত্র ইসলামকে কলুষিত
করছি। অমুসলিম ভাইরা ভাবছে, এই নাকি ইসলাম? তারা হাসছে,
ধিক্কার দিচ্ছে আর রাসূল (সঃ) কে জঘন্য ভাষায় গালি গালাজ করছে,
কুরআনকে অবমাননা করছে। আপনাদের
সামনে একটি বিষয়ে তুলে ধরছি যাহা ইসলামে জঘন্য হারাম কাজ।
অথচ আমরা না জেনে না বুঝে ইসলামকে কত ছোট করি!
কয়েকটা উদাহরন নিম্নে তুলে ধরলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার
হবে ইনশাল্লাহ।
এক মজলিসে প্রদত্ত তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে হালালার
নামে গোপন যিনাঃ
“হালালা’ আল্লাহ তা’আলার নাফরমানিমূলক অপকর্ম- যাকে শরীয়ত
সিদ্ধ বলে বিশ্বাস করা একটি শয়তানি উত্তেজনা এবং লাঞ্ছনামূলক
আচরণ। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সঃ)
হালালাকারী ব্যক্তিকে “ভাড়াটিয়া পাঁঠা” বলে আখ্যায়িত করেছেন
এবং হালালা বিবাহকে আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের হাদীসের
সাথে উপহাস ও বিদ্রুপ বলে মন্তব্য করেছেন। ইবনু মাজাহ
শরীফে একটি হাদীস বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেন-
“আমি কি তোমাদের ভাড়াটিয়া পাঁঠা সম্বন্ধে অবহিত করব না?
সাহাবগণ আরজ করলেন, জি হাঁ আল্লাহর রাসূল। রাসূল (সাঃ)
বললেন, যারা শুধু তিন তালাক দাতা স্বামীর জন্য তার তিন তালাক
প্রদত্ত স্ত্রীকে হালালা করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্ষণিকের জন্য
বিবাহ করে।”
আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে হালালাকারী ব্যক্তিগণ
সম্বন্ধে জিজ্ঞেসা করা হলে তিনি বলেন, “উভয়ই জিনাকার”। ওমর
ফারুক (রাঃ) বলতেন, “হালালাকারী এবং যার জন্য হালালা করা হয়
এমন ব্যক্তিদ্বয়কে আমার সামনে উপস্থিত করা হলে আমি তাদের
উভয়কে রজম তথা প্রস্তর খন্ড ছুড়ে মেরে খতম করে দিব।
(বিস্তারিত দেখুন ইগাসাতুল লাহফান)
তাই গভীর দুঃখ বেদনা নিয়ে- মুহাদ্দিস গুরু প্রখ্যাত ইমাম জনাব
ইবনে কুতায়বা (রহঃ) স্বীয় কিতাবুল মায়ারিফ
গ্রন্থে যা সন্নিবেশিত করেছেন- তার শেষ ছত্রটি এই আবূ হানিফার
ফতওয়ার ভিত্তিতে কতনা সতী সাধ্বীর হারাম গুপ্তাঙ্গ হালাল
করা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। (দেখুন আল মায়ারিফ মিসর মুদ্রিত ও
হাকিকাতুল ফিকাহ ১৭০ পৃঃ, বিস্তারিত দেখুন তালাকের নিয়ম বিধান-
শায়খ আবূ নুমান আঃ মান্নান)
>>>> সহীহ দলীল ছাড়া ফতওয়া গ্রহণ করা হারাম তার প্রমাণ
<<<<
মহান আল্লাহপাক তাঁর পবিত্র কোরআনে বলেন, “আপনার পূর্বেও
আমি প্রত্যাদেশসহ মানবকেই তাদের প্রতি প্রেরণ করেছিলাম।
অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেসা কর, যদি তোমাদের জানা না থাকে;
প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে নির্দেশাবলী ও অবতীর্ণ গ্রন্থসহ
এবং আপনার কাছে আমি স্মরণিকা অবতীর্ণ করেছি,
যাতে আপনি লোকদের সামনে ঐসব বিষয় বিবৃত করেন,
যেগুলো তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা-
ভাবনা করে।” (সূরা নাহাল ৪৩-৪৪)
ইয়াহুদি ও নাসারগণ তাদের আলেম ও দরবেশগণকে আল্লাহ
বানিয়ে নিয়েছে- (সূরা আত-তওবাহ ৩১ আঃ)। অর্থাৎ তাদের আলেম
ও দরবেশগণ যাই বলে তা-ই তারা অন্ধভাবে গ্রহণ করে।
তারা জানতে চায়না যে উল্লেখিত বিষয়ে আল্লাহর কি হুকুম
এবং তার রাসূলের কি হুকুম।
ইমাম ইবনে হযম (রহঃ) লিখেছেন, তাকলীদ অর্থাৎ অন্ধ অনুসরণ
হারাম- (নজবুল কাফিয়াহ গ্রন্থে দেখুন)। ইমাম মালিক (রহঃ)
বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) ব্যতীত অন্য সকলের
কথা সম্বন্ধে জিজ্ঞেসাবাদ করা যাবে।
বিনা বিচারে দলিলে কারো উক্তি গ্রহণীয় হবে না- (হুজ্জাতুল্লাহ)।
ইমাম আবূ ইউসুফ, যোফার ও আকিয়াহ বিন যয়দ হতে বর্ণিত-
তারা বলতেন যে, কোন লোকের জন্য
আমাদে কথা দ্বারা ফতোয়া দেয়া হালাল নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত
আমরা কোথা হতে বলেছি তা তারা অবগত না হবে। (ইকদুল ফরিদ
গ্রন্থের ৫৬ পৃষ্ঠা)।
এখানে একটু আলোচনা না করলে পাঠকগণ হয়তো ভাবতে পারেন
আমি ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর ফতওয়াকে ছোট করে দেখছি।
আসুন দেখি ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) সকল মাসায়ালা সঠিক ছিল
কি-না।
০১) যে কোন ভাষায় নামাযের সূরা (কেরআত) পড়লে ইমাম আবু
হানিফার মতে উত্তম যদিও সে ব্যক্তি আরবী ভাষা জানে। কিন্তু
ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে তা নাজায়েয।(হিদায়ার
১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ১০২ পৃষ্ঠা)।
০২) আল্লাহ তা’আলা কুরআনে যে সকল মেয়েদেরকে বিবাহ
করা হারাম করেছেন সে সকল মেয়েদেরকে কেউ বিবাহ করলে ও
যৌন ুধা মিটালে ইমাম আবূ হানিফার মতে কোন হদ (শাস্তির)
প্রয়োজন নাই। কিন্তু ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের
মতে হদ দিতে হবে। (হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম
খন্ডের ৫১৬ পৃষ্ঠা)।
০৩) রোগ মুক্তির জন্য হারাম জানোয়ারের প্রস্রাব পান
করা ইমাম আবূ হানিফার মতে হারাম কিন্তু ইমাম আবূ ইউসুফ ও
ইমাম মুহাম্মাদের মতে হালাল।(হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ
ছাপার ১ম খন্ডের ৪২ পৃষ্ঠা)।
০৪) কুয়ার ভিতর ইঁদুর পড়ে মরে গেলে ঐ কুয়ার পানি দ্বারা অযু
করে নামায পড়লে ইমাম আবু হানিফার মতে নামা হবে কিন্তু
শাগরেদদ্বয়ের মতে নামায হবে না।(হিদায়ার ১৪০১
হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ৪৩ পৃষ্ঠা)।
০৫) কোন ব্যক্তি যদি কো স্ত্রীর মল দ্বারে যৌন ুধা মিটায়
তবে ইমাম আবূ হানিফার মতে কোন কাফফারার (শাস্তির)
প্রয়োজন নেই। কিন্তু ইমাম মুহাম্মাদের মতে কাফফারা দিতে হবে।
(হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ৫১৬ পৃষ্ঠা)।
০৬) ইমাম আবূ হানিফার মতে ছায়া দ্বিগুণ হওয়ার পর হতে আসরের
নামাযের সময় আরম্ভ হয় কিন্তু ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম
মুহাম্মাদের মতে ছায়া একগুণ হওয়ার পর হতেই আসরের সময়
আরম্ভ হয়।(হিদায়ার ১২৯৯ হিঃ৯মোস্তফায়ী ছাপার ১ম খন্ডের ৬৪
পৃষ্ঠা)।
০৭) ফারসি ভাষায় তাকবীর বলে নামায পড়া ইমাম আবূ হানিফা ও
আবূ ইউসূফের মতে জায়েয, কিন্ত ইমাম মুহাম্মাদের মতে নাজায়েয।
(হিদায়ার ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ ছাপার ১ম খন্ডের ১০১ পৃষ্ঠা)।
০৮) খেজুর ভিজানো পানি যাতে ফেনা ধরে গেছে এরূপ পানিতে অযু
করা ইমাম আবূ হানিফার মতে জায়েজ কিন্তু ইউসুফের মতে হালাল
নয়।(হিদায়ার ১২৯৯ হিঃ মোস্তফায়ী ছাপার ১ম খন্ডের ৩০ পৃষ্ঠা)।
০৯) ইমাম আবূ হানিফার মতে নামাযে সিজদার সময় নাক
অথবা কপাল যে কোন একটি মাটিতে ঠেকালেই নামায হবে। কিন্তু
মুহাম্মাদের মতে জায়েয হবে না। নাক কপাল দুটোকেই ঠেকাতে হবে।
(হিদায়ার ১২৯৯ হিঃ মোস্তফায়ী ছাপার ১ম খন্ডের ৯০ পৃষ্ঠা)।
পাঠকগণ এমন ৬১ টি মতবিরোধ হিদায়া কেতাবে রয়েছে যাহা সব
সময়ের অভাবে টাইপ করতে পারলাম না। এই মতবিরোধ
থেকে বোঝা যায় ইমাম আবু হানিফা ভুলের উর্দ্ধে ছিলেন না।
ওনাদের সময় সহীহ হাদীস সংকলন করা ছিল না তাই বেশীর ভাগ
সমস্যাই ইজমা-কেয়াস আর যুক্তি দ্বারা সমাধান করতেন।
অবশেষে এ সংকটময় অবস্থায় চার ইমাম সাহেবই নিজ নিজ
অনুসারীদেরকে বলে যান,
“আমি যে ফয়সালা দিয়েছি ভবিষ্যতে যদি সহীহ হাদীস সংকলিত হয়
এবং আমার ফয়সালা সহীহ হাদীসের পরিপন্থী হয়, তা হলে আমার
ফয়সালা পরিত্যাগ করে সহীহ হাদীসের অনুসরণ করবে।”
এর পরেও যদি কেউ অন্ধ গোঁড়া স্বভাবের হয় তাহলে আবু হানিফার
নিম্ন ফতোয়াগুলিও অবশ্যই মানবেন। কারণ এগুলো বিখ্যাত
হিদায়া ও অন্যান্য ফতোয়ার বই হতে সংকলিত। এখানে ভুল হবার
কোন আশংকা নাই। যদি এই ফতোয়াগুলো অস্বীকার করেন
তাহলে হিদায়াকেই অস্বীকার করতে হবে অথচ হিদায়া সম্পর্কে এমন
কথা বলা আছেঃ “নিশ্চয় হিদায়া কিতাবখানা নির্ভুল পবিত্র
কুরআনের মত। নিশ্চয় এটা তার পূর্ববর্তী রচিত শরিয়তের সকল
গ্রন্থরাজিকে রহিত (বাতিল) করে ফেলেছে।” (হিদায়া মোকাদ্দমা-
আখেরাইন ৩য় পৃঃ, হিদায়া ৩য় খন্ড ২য় ভলিউম ৪পৃঃ আরবী,
মাদ্রাসার ফাজেল কাসের পাঠ্য হিদায়া ভুমিকা পৃষ্ঠা ৬, আরাফাত
পাবলিবেশন্স)।
আসুন তাহলে এর পবিত্রতা যাচাই করিঃ
রাসূল (সাঃ)-এর হাদীস অনুযায়ী স্বামী ও স্ত্রী সঙ্গম করার
উদ্দেশ্যে উভয়ের লিঙ্গ একত্র করে সামান্য অং প্রবেশ করলেও
উভয়ের উপর গোসল ফরজ হয়, তাতে বীর্যপাত হোক বা না হোক।
(সহীহ তিরমিযী) সহী হাদীসের বিপরীতমুখি যে সকল জঘন্যতম
ফতওয়া এখনও মাযহাবীগণ চালু রেখেছেন তার
কিছুটা নমুনা নিচে তুলে ধরলামঃ
নিশ্চিত হিদায়া কিতাবখানা পবিত্র কুরআনের মত। (নাউযুবিল্লাহ)ন
িশ্চয় এটা তার পূর্ববর্তী রচিত শরীয়তের সকল গ্রন্থরাজিকে রহিত
(বাতিল) করে ফেলেছে। (হিদায়া মোকাদ্দমা-আখেরাইন ৩য় পৃঃ,
হিদায়া ৩য় খন্ড ২য় ভলিউম পৃঃ ৪ আরবী, মাদ্রাসার ফাজেল কাসের
পাঠ্য হিদায়া ভ’মিকা পৃঃ ৬, আরাফাত পাবলিকেশনন্স)।
০১) ইমাম আবূ হানিফার তরীকা অনুযায়ী চতুষ্পদ জন্তু, মৃতদেহ
অথবা নাবালিকা মেয়ের সঙ্গে সঙ্গম করার উদ্দেশ্যে উভয়ের লিঙ্গ
একত্র হয়ে কিছু অংশ প্রবেশ করলেও অযু নষ্ট হবে না। শুধু
পুং লিঙ্গ ধৌত করতে হবে। (দুররে মুখতার অযুর অধ্যায়)।
০২) যদি কোন লোক মৃত স্ত্রী লোকের অথবা চতুষ্পদ জন্তুর
স্ত্রী অংগে বা অন্য কোন দ্বারে রোযার অবস্থায় বালৎকার
করে তাহলে তার রোযা নষ্ট হবে না। (শারহে বিকায়া, লক্ষৌভি-
এরইউসুফী ছাপার ১ম জেলদের ২৩৮পৃষ্ঠা)।
০৩) আল্লাহ তা’আলা কুরআনে যে সকল মেয়েদেরকে বিবাহ
করা হারাম করেছেন। যথা- মাতা, ভগ্নি, নিজের কন্যা, খালা, ফুফু
ইত্যাদি স্ত্রী লোককে যদি কোন ব্যক্তি বিবাহ করে ও তার
সংগে যৌন সঙ্গম করে তাহলে ইমাম আবু হানিফার মতে তার উপর
কোন হদ (শাস্তি) নেই। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ
ছাপা ৫১৬ পৃষ্ঠা, আলমগিরী মিসরী ছাপা ২য় খন্ড ১৬৫ পৃষ্ঠা, বাবুল
ওয়াতী ৪৯৫ পৃষ্ঠা)।
০৪) বাদশাহ যদি কারো সাথে জোর পূর্বক জিনা করে তাহলে আবূ
হানিফার মতে সেই ব্যক্তির উপর কোন শাস্তির প্রয়োজন নাই।
কিন্তু বাদশাহ ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি যদি জোর পূর্বক
কারো সাথে জিনা করে তবে আবূ হানিফার মতে সেই ব্যক্তির উপর
হদ জারী করতে হবে। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম
খন্ড ৫১৯ পৃষ্ঠা)
০৫) কোন ব্যক্তি যদি কারো সাথে জিনা (যৌন সঙ্গম)
করতে থাকে এবঙ জিনার অবস্থায় যদি অন্য কেহ দেখে ফেলে আর
জিনাকারী ব্যক্তি যদি মিথ্যা করে বলে এই মেয়েটি আমার
স্ত্রী তাহলে উভয় জিনাকারীর উপরই হদের (শাস্তির) প্রয়োজন
নেই। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম খন্ড ৫১৯ পৃষ্ঠা)
০৬) রমযান মাসে রোযার অবস্থায় যদি কেউ মল দ্বারে সঙ্গম
করে তবে ইমাম আবূ হানিফার মতে কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না।
(হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম খন্ড ২১৯ পৃষ্ঠা)
০৭) কেউ যদি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কুকুর যবেহ করে তার মাংস
বাজারে বিক্রয় করে তবে অবশ্যই তা জায়েয হবে।
(শারহে বেকায়া ১ম খন্ড)।
০৮) গম, যব, মধু, জোয়ার হতে যে মদ প্রস্তুত করা হয় তা ইমাম
আবূ হানিফা’র মতে পান করা হালাল এবং এই সকল মদ
পানকারী লোকের নেশা হলেও হদ (শাস্তি) দেয়া হবে না। (হিদায়ার
মোস্তফায়ী ছাপা ২য় খন্ড ৪৮১ পৃষ্ঠা)।
০৯) আঙ্গুলি ও স্ত্রীলোকের স্তন মল-মূত্র দ্বারা নাপাক
হয়ে গেলে, তিনবার জিবদিয়ে চেটে দিলেই পাক হয়ে যাবে।
(দুররে মোখতারের ৩৬ পৃষ্ঠায় বাবুল আনজাসে দেখুন)
১০) যদি কেউ তার পিতার কৃতদাসীর সাথে সহবাস (যৌন মিলন)
করে তবে কোন শাস্তি নাই। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ
চাপা ১ম খন্ড ৫১৫ পৃষ্ঠা)।
১১) কোন স্ত্রীর স্বামী মারা গেলে এবং মারা যাওয়ার দুই বৎসর
পর সেই স্ত্রীর সন্তান হলে, তবে সেই সন্তান তার মৃত স্বামীরই
হবে। (হিদায়া ১৪০১ হিঃ আশরাফী হিন্দ চাপা ১ম খন্ড ৩৩১
পৃষ্ঠা)।
১২) স্বামী প্রবাসে রয়েছে, সুদীর্ঘকাল অতীত হয়েছে বহু বছর
ধরে স্বামী ফিরেনি এই দিকে স্ত্রীর পুত্র সন্তান জন্ম
হয়েছে তাহলেও এই ছেলে হারামী বা জারজ হবে না সেই স্বামীরই
ঔরসজাত হবে। (বেহেস্তি জেওর ৪র্থ খন্ড ৪৪পৃষ্ঠা)
১৩) আবূ বকর বিন ইসকান বলেন, যদি কোন ব্যক্তি কারো মাল
চুরি ডাকাতি করে নিয়ে এসে চিবিয়ে চিবিয়ে খায় তাহলে ইমাম আবূ
হানিফার মতে হালাল হবে। (কাজি খাঁ ৪র্থ খন্ড ৩৪৩ পৃষ্ঠা)।
১৪) পিতার পে পুত্রের দাসীর সঙ্গে যৌন মিলন করা সর্বাবস্থায়
হালাল। আরো যুক্তি দর্শান হয়েছে দাসী হচ্ছে পূত্রের সম্পদ আর
পুত্রের সম্পদে পিতা পূত্র উভয় ব্যক্তিরই হক আছে। ফলে একই
নারী দ্বারা উভয় নরের যৌন ুধা মিটানো হালাল। (নুরুল আনওয়ার
৩০৪পৃষ্ঠা)।
১৫) কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট বিরোধী মাসআলাহ- চার
মাযহাব চার ফরয। হানাফী, শাফেঈ, মালেকী ও হাম্বলী এই চার
মাযহাব। (বেহেস্তি জেওর স্ত্রী শিা ১০৪ পৃঃ দ্রঃ, আলহাজ্জ
মৌলভী আব্দুর রহীম। কুরআন মঞ্জিল লাইব্রেরী-বরিশাল)
১৬) যদি কোন ব্যক্তি পয়সরা বিনিময়ে কোন নারীর
সাথে জিনা করে তবে আবূ হানিফার বিধান মতে কোনই হদ (শাস্তি)
নেই। (অর্থাঃ সারা পৃথিবীতে যত বেশ্যাখানা রয়েছে সবই বৈধ।)
(জাখীরাতুল উকবাও শারহে বিকায়ার হাশিয়া চাল্পিতে আছে।
(বিস্তারিত দেখুন ‘আসায়ে মুহাম্মাদী’)
১৭) কুরআন ও সহীহ হাদীসকে পদাঘাত করে হানাফী মাযহাবের
বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাবে চুরি, ডাকাতি, মাস্তানি, লুট, খুন
বা হত্যা করাকে বৈধ করা হয়েছে। (দেখুন হিদায়া ২য় খন্ড ৫২৭ পৃঃ,
৫৩৭ পৃঃ, ৫৪০-৫৪২ পৃঃ, ৫৪৬ পৃঃ, ৫৫৭ পৃঃ, ৫৫৮ পৃঃ, হিদায়া ৩য় খন্ড
৩৫৬ পৃঃ, ৩৬৪-৩৬৫পৃঃ। হিদায়া ৪র্থ খন্ড ৫৪৭ পৃঃ, ৫৫০ পৃঃ)
১৮) পবিত্রতম সূরায়ে হৃদের ৮৪-৮৫ অর বিশিষ্ট ৪৪ নম্বর আয়াত
পবিত্রতম সূরা মূলকের প্রায় ৪০ অর বিশিষ্ট পবিত্র শেষ
আয়াতে কারীমাটি তাবীজরূরে ধারণ করলে শীঘ্র বীর্যপাত হবে না।
(বেহেস্তি জেওর ৯ম খন্ডের ১৫৪পৃঃ) …. এই হচ্ছে আমাদের ফেকাহর
কিতাব!?
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এখনও কি আমরা বলব যে,
মাজহাব মানা ফরয? আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ অনুসরণ করার
তৌফিক দান করুন।
এবার আমি শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী র. এর আল-ইনসাফ কিতাব থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি -
হাদীস বিশারদগণের ফিকাহর প্রতি মনোযোগ
এ সময় আরো যারা হাদীস শাস্ত্রে যারা অবদান রাখেন, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের ছিলেনঃ আবদুর রাহমান ইবনে মাহদী, ইয়াহিয়া ইবনে সায়ীদ কাতান, ইয়াযীদ ইবনে হারূন, আবদুর রাযযাক, আবু বকর ইবনে আবী শাইবা, মুসাদ্দাদ, হান্নাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুইয়া, ফদল ইবনে দুকাইন, আলী ইবনে আলমাদানী এবং তাঁদের সমপর্যায়ের আরো কতিপয় মুহাদ্দিস। এটা হাদীস বিশারদহণের সেই তবকা যা ছিলো সকল তবকার চাইতে সেরা। গবেষণ পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে হাদীসশাস্ত্রকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পর এ শাস্ত্রে মুহাক্কিকগণ কিকাহর প্রতি মনোনিবেশ করেন। তাঁদের পূর্বেকার ফিকাহর ইমামদের কোনো একজনের তাকলীদ করার ব্যাপারে একমত হওয়া তাদের জন্যে সম্ভব হয়নি। কারণ, তাঁরা দেখলেন, প্রত্যেকটি মাযহাবের এমন অনেক মতামত রয়েছে যা বহুসংখ্যক হাদীস এবং আছারের৪১ সাথে সাংঘর্ষিক।
৮. সঠিক পন্থা ও সুষম নীতি
সঠিক পন্থা হলো মধ্যমপন্থা
উপরে যে দুটি পন্থার কথা আলোচনা করে এলাম, অর্থাৎ (১) হাদীসের শব্দের হুবহু অনুসরণ এবং (২) ফকীহদের বক্তব্য থেকে মাসয়ালা তাখরীজ করা –এই উভয় পন্থারই দ্বীনি ভিত্তি রয়েছে। সকল যুগের মহাক্কি আলিমগন দু’টি পন্থাই অনুসরন করে আসছেন। তবে (পার্থক্য ছিলো কেবল উভয় পন্থার মধ্যে সাওঞ্জস্য বিধানের)। অর্থাৎ তাদের কেউ তাখরীজের তরীকার প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়েন আবার কেউ অধিক ঝুঁকে পড়েন হাদীসের শব্দ অনুসরণ নীতির প্রতি। (উভয় নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের প্রতি তাঁরা কেউই মনোযোগ দেননি।) আসলে, এই দুটি পন্থার কোনো একটিকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করা যেতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত উভয় পন্থার (অর্থাৎ আহলে হাদীস ও আহলে ফিকাহর) লোকেরাই এই কাজটী করেছেন। তাঁরা একটিকে পরিত্যা করে অপরটির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু সঠিক পন্থা ছিলো এর চাইতে ভিন্নতর। উচিত ছিলো, উভয় তরীকাকে একত্র করে একটিকে আরেকটির সাথে তুলনা করে দেখা এবং একটিতে কোন ভুল ক্রুটি থাকলে অপরটির দ্বারা তা নিরসন করা। এ কথাটিই বলেছেন হাসান বসরী তার নিম্নোক্ত বক্তব্যেঃ
“কসম সেই আল্লাহর, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তোমাদের পথ হচ্ছে গালী (সীমালংঘনকারী) এবং জাফী (অপরিহার্য সীমার নিচে অবস্থানকারী) এর মাঝখান দিয়ে।”
অতএব আহলে হাদীসের উচিত, তাদের অনুসৃত ও অবলম্বিত যাবতীয় মাসয়ালা এবং মাযহাবকে তাবেয়ী এবং পরবররীকালের মুজতাহিদ ইমামগণের রায়ের সাথে তুলনা করে দেখা এবং তাদের ইজতিহাদ থেকে ফায়দা হাসিল করা। আর আহলে ফিকাহর লোকদেরও উচিত সাধ্যানুযায়ী হাদীসের ভান্ডারে চিন্তা ও গবেষণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা, যাতে করে সরীহ ও সহীহ হাদীসের বিপরীত মত প্রদান থেকে বাঁচতে পারেন এবং যেসব বিষয়ে হাদীস কিংবা আছার বর্তমার রয়েছে, সেসব বিষয়ে মত প্রদান থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
কখন নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করা ওয়াজিব
একজন ইমামের তাকলীদ করার বিষয়টি ও এই মূলনীতির আলোকেই কিয়াস করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট ইমামের তাকলীদ করাটা কখনো ওয়াজিব থাকে। আবার কখনো ওয়াজিব থাকে না। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবেঃ ভারতবর্ষ কিংবা ইউরোপ বা আমেরিকায় যদি কোনো জাহিল মুসলমান বর্তমান থাকে আর সেখানে মালেকী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবে কোনো আলিম বা গ্রন্থ না থাকে, তবে এ ব্যাক্তির জন্যে আবু হানীফার মাযহাবের তাকলীদ করা ওয়াজীব এবং এ মাযহাবের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া বৈধ নয়। কারণ, এমতাবস্থায় সে এই মাযহাবের বন্ধন থেকে বেরিয়ে পড়লে, ইসলামের বন্ধন থেকেই মুক্ত হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে কোনো ব্যাক্তি যদি মক্কা বা মদীনায় অবস্থানকারী হয়, তবে তার জন্যে নির্দিষ্ট এক ইমামের তাকলীদ করা ওয়াজিব নয়। কেননা সেখানে সকল মাযহাব সম্পর্কে অবগত হওয়া তার পক্ষে খুবই সহজ।
চার মাযহাবের ইজতিহাদের ইতিহাস
১. তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর পর আবু হানীফার মাযহাবে ‘মুজতাহিদ মতলক মুনতাসিব’ আবির্ভাব হবার ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায় কারণ, হানাফী আলিমরা আগে পরে সবসময়ই হাদীসশাস্ত্রের সাথে খুব কমই সম্পর্ক রাখতেন ও রাখছেন। আর হাদীসশাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী হওয়া ছাড়া একজন আলিম কোনো অবস্থাতেই ‘মুজতাহিদ মতলক মনতাসিব’ হতে পারে না।
৪. বাকী থাকলো শাফেয়ীর মাযহাব। মূলত এ মাযহাবেই সর্বাধিক ‘মুজতাহিদ মতলক মুনতাসিব’ ও মুজতাহিদ ফীল মাযহাবের আবির্ভাব ঘটে। এখানেই সর্বাধিক আবির্ভাব ঘটে উসূল ও ইলমে কালাম বিশেষজ্ঞদের। কুরআনের মুফাসসির এবং হাদীসে ব্যাখ্যাদাতাদেরও আবির্ভাব ঘটে এখানে সর্বাধিক। এ মাযহাবের রেওয়ায়েত ও সনদসমূহও অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় সর্বাধিক মজবুত। এর ইমামের মতামতসমূহ সর্বাধিক মজবুতভাবে সংরক্ষিত। ইমামের এবং আসহাবুল উজুহ’র বক্তব্য এখানে সুস্পষ্টভাবে পৃথক রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মত ও বক্তব্যের একটিকে আরেকটির উপর অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বাধিক মনযোগ দেয়া হয়েছে।
এই কথাগুলো সেইসব লোকদের অজানা নয়, যারা উপরোক্ত মাযহাবসমূহ সম্পর্লে বিশ্লেষণমূলক অধ্যয়ন করেছেন এবং একটা দীর্ঘসময় এর পিছে লেগে থেকেছেন।
শাফেয়ীর প্রথম দিককার ছাত্ররা সবাই মুজতাহিদ মতলক (মুনতাসিব) ছিলেন। তাদের মধ্যে এমন কেউই ছিলেন না, যিনি তাঁর (শাফেয়ীর) সকল ইজতিহাদের তাকলীদ করতেন। অতঃপর ইবনে সুরাইজের যামানা এলো। তিনি তাকলীদ ও তাখরীজের নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর তাঁর শিষ্যরা তাঁর দেখানো পথে চলতে থাকে। এ হিসেবেই তাঁকে সেই মুজতাহিদদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয় , প্রতি শতাব্দীর মাথায় যাদের আগমনের সংবাদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
যে ব্যাক্তি দীর্ঘ সময়কাল ধরে মাযহাবসমূহের বিশ্লেষণমূলক অধ্যায়ন করেছেন, তাঁর কাছে একথাও গোপন থাকতে পারে না যে, যেসব হাদীস ও আছারের উপর শাফেয়ীর মাযহাবের বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত সেগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংকলিত ও সম্পাদিত। এ কথাগুলো সকল আহলে ইলমেরই জানা। এবং এগুলো থেকে তারা উপকৃত ও হয়েছেন। এটা এই মাযহাবের এমন একটা মর্যাদা, যা আর কোনো মাযহাবই লাভ করতে পারেনি।
১১. চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর পর ফিকহী মতপার্থক্য
ফিতনার যুগ এলো
এ যাবত যাদের কথা আলোচনা করলাম, অরপর তাদের সময়কাল অতীতের কোলে পাড়ি জমায়। তাঁদের আবির্ভাব ঘটে মুসলমানদের নতুন প্রজন্মের। এই নতুন প্রজন্ম ডানে বামে যেতে থাকে। (তাদের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের বিপ্লব ঘটে। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে যেসব ধ্বংসাত্মক রোগ তাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে, সেগুলোর কয়েকটি নিম্নরূপঃ
৩. ফিকহী মতামতের তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞতা
আমি দেখতে পেয়েছি, এদের (হানাফীদের) কিছু লোক মনে করে ফিকাহ ও ফতোয়ার গ্রন্থাবলীতে যতো টিকা টিপ্পনী ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে সবই আবু হানীফা কিংবা সাহিবাইনের মতামত। মূল জিনিস আর তার তাখরীজের মধ্যে তারা কোনো পার্থক্য করে না। ‘কারখীর ফতোয়া অনুযায়ী বিষয়টি এরূপ’ এবং ‘তোহাবীর ফতোয়া অনুযায়ী এরূপ’—তারা যেনো এ ধরনের বাক্যগুলোকে অর্থহীন মনে করে। ‘আবু হানীফা এরূপ বলেছেন’ এবং ‘এটি আবু হানীফার মাযহাবের মত’ তাদের দৃষ্টি তে এ দু’টি কথার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
আমি আরো দেখেছি, কিছুলোক মনে করে, আবু হানীফার মাযহাব সারাখসী প্রণীত মাবসূত এবং হিদায়া ও তিবঈন প্রভৃতি গ্রন্থাবলীতে ছড়িয়ে থাকা বিবাদমূলক বাহাছসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত। অথচ তারা জানে না যে, তার্কিক বাহাছের ভিত্তির উপর তাঁর মাযহাব প্রতিষ্ঠিত নয়। তাদের মধ্যে এরূপ বাহাছের সূত্রপাত করে আসলে মুতাযিলারা। ফলে পরবর্তী লোকেরা ধারণা করে বসে, ফিকহী আলোচনার মধ্যে হয়তো এরূপ কথাবার্তার অবকাশ রয়েছে। তাছাড়া এর ফলে শিক্ষার্থীদের মনমস্তিষ্কেও তর্কবাহাছের তীক্ষ্মতা স্থান করে নিয়েছে।
৫. অন্ধ অনুকরনের প্রাধান্য
আরেকটি প্রধান বিপর্যয় হলো, এ সময় লোকেরা চরমভাবে অন্ধ অনুকরণে (তাকলীদে) নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এতোটা নিশ্চিন্তে তারা এ পথে অগ্রসর হয় যে, তারা তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে যায়। এর পিছনে নিম্নোক্ত কারণগুলো কাজ করেছিলঃ
একটি কারণ ছিলো ফকীহদের মধ্যে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ। ফলে, একজন ফকীহ যখন কোথাও কোনো ফতোয়া দিলেন, সাথে সাথে আরেকজন ফকীহ তা খন্ডন করে, আরেকটি ফতোয়া দিয়ে বসেন। সে কারণে প্রত্যেকেই স্বীয় ফতোয়াকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে মুজতাহিদ ইমামদের (মতামতের) প্রতি প্রত্যাবর্তন করেন।
এ সময় শাসকদের যুলুমের কারণে মুসলমানগণ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে, তাদের নিয়োগকৃত কাজীদের প্রতিও জনগণ আস্থাশীল ছিল না। তাই, তারা বাধ্য হয়েই নিজেদের ফতোয়া ফায়সালার পক্ষে ইমাম মুজতাহিদ্গণের মতামত দলিল হিসেবে পেশ করতো।
আরেকটি কারণ এই ছিলো যযে, এ সময় সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকেরা দ্বীনি জ্ঞান লাভ থেকে ছিলেন অনেক দূরে। ফলে, লোকেরা ফতোয়া নেয়ার জন্যে এমনসব লোকদের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাদের না হাদীসের জ্ঞান ছিলো আর না তাখরীজ এবং ইস্তিম্বাতের যোগ্যতা ছিলো। পরবর্তীকালের আলিমদের মধ্যে এ অবস্থা তোমরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছো। ইমাম ইবনে হুমাম প্রমুখ এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করেছেন। এ সময় মুজতাহিদ নয় এমন লোকদেরও ফকীহ বলা হতে থাকে।
. শাস্ত্রীয় গবেষণার অপ্রয়োজনীয় হিড়িক
এ সময় আরেকটি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তা হলো, শরীয়তের আসল উৎসকে উপেক্ষা করে অধিকাংশ লোক বিভিন শাস্ত্রীয় গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে কেউ কেউ আসমাউল রিজাল এবং জারাহ ও তা’দীলের ক্ষেত্রে গবেষণায় অবতীর্ণ হয়ে ধারণা করে বসে আমি এ বিষয়ের ভিত্তি মযবুত করছি। কেউ নিমজ্জিত হয় প্রাচীন ও সমকালীন ইতিহাস গবেষণায়। কেউ নিমজ্জিত হয় বিরল, গরীব এমনকি মওদু’ হাদীসসমূহের যাচাই বাছাইর কাজে।
কেউ কেউ তাঁর গবেষণার ঘোড়া দৌড়ান উসূলে ফিকাহর ক্ষেত্রে। স্বীয় অনুসারীদের জন্যে আবিষ্কার করেন বিবাদ করার নিয়ম কানুন। অতঃপর অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের তুফান ছুটান। বীরদর্পে জবাব্দেন অন্যদের অভিযোগের। প্রতিটি জিনিসের সংজ্ঞা প্রদান করেন। মাসয়ালা এবং বাহাছকে শ্রেণী বিভক্ত করেন। এভাবে এসব বিষয়ে দীর্ঘ হ্রস্ব গ্রন্থাদি রচনা করে যান।
অনেকে আবার এমনসব ধরে নেয়া বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা গবেষণা চালান, যেগুলো ছিলো নিতান্তই অনর্থক এবং কোনো জ্ঞানবান ও বুদ্ধিমান ব্যাক্তি যেগুলোকে তাকিয়ে দেখারও যোগ্য মনে করে না। এসব মতবিরোধ ঝগড়া বিবাদ ও বাহুল্য গবেষণার ফিতনা ছিলো প্রায় সেই ফিতনার মতো, যারশিকার হয়েছিল মুসলমানরা তাদের প্রাথমিক যুগে। যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হ্য আর প্রত্যেকেই নিজ নেতাকে ক্ষমতাসীন করা বা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কাজে আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছিল। এর ফলে তখন যেমন মুসলমানদের উপর যালিম অত্যাচারী একনায়ক শাসকরা সওয়ার হয়ে বসেছিল এবং ইসলামের ইতিহাসের সবচাইতে ন্যাক্কারজনক ঘটনাবলো সংঘটিত হয়েছিল, ঠিক তেমনি এই নব ফিতনাও মুসলিম সমাজে অজ্ঞতা, অন্ধতা, সন্দেয়-সংশয় ও ধারণা কল্পনার চরম ধ্বংসকারী ঝড় তুফান বইয়ে দেয়।
অতঃপর আসে এদের পরবর্তী জেনারেশন। এই জেনারেশন তাদের পূর্বসূরীদের অন্ধ অনুকরণ করে সম্মুখে ধাবিত হয়। ফলে, তারা সত্য মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যার্থ হয়। ঝগড়া বাহাছ এবং সঠিক ইস্তিম্বাতের মধ্যে পার্থক্য করার চেতনাই তারা লাভা করেনি। এখন সেই ব্যাক্তিই ফকীহ উপাধি পেতে থেকে যে বেশী বকবক করতে এবং মিথ্যা জটিলতা পাকাতে পারে, যে কোনো বিষয়ে নীরব থাকতে এবং সত্য মিথ্যা যাচাই করতে জানে না এবং ফকীহদের দুর্বল ও মযবুত বক্তব্যের পার্তক্য নির্ণয় করতে পারে না। একইভাবে এমনসব লোকদেরকে মুহাদ্দিস বলা হতে হাকে, যারা সঠিক ও ভ্রান্ত হাদীসের মধ্যে পার্থক্য করতে জানে না এবং সঠিক ও ভ্রান্ত হাদীসকে সমানভাবে চালিয়ে দেয়।
সকলেরই এরূপ অবস্থা ছিলো, সে কথা আমি বলি না। আল্লাহর একদল বান্দাহ সব সময়ি তাঁর সন্তুষ্টির পথে কাজ করেছেন, কোনো শত্রুতা তাদেরকে এপথ থেকে ফিরাতে পারেনি। পৃথিবীতে এরাই আল্লাহর হুজ্জত।
অতঃপর এদের পরে যে জেনারেশনের আগমন ঘটে, তারা এদের চাইতেও বড় ফিতনাবাজ প্রমাণিত হয়। তারা বিদ্বেষমূলক তাকলীদের দিক থেকেও ছিলো অগ্রগামী। তাদের অন্তরে না ছিলো জ্ঞানের আলো আর না ছিলো অন্তরদৃষ্টি। তারা দ্বীনি বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করাকে ‘বিদআত’ বলে আখ্যায়িত করে সদর্পে ঘোষণা দিয়েছেঃ
“আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এভাবেই চলতে দেখেছি আর আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরন করতে থাকবো।”
এখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই এ বিষয়ে অভিযোগ করা যায়! তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তিনিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য সত্ত্বা আর তাঁর উপরই ভরসা করা যেতে পারে।
তাদের জন্যেও তাকলীদ করা নিষেধ, যারা সুস্পষ্টভাবে জানেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) অমুক কাজের হুকুম দিয়েছেন, অমুক কাজ নিষেধ করেছেন এবং অমুক হুকুম রহিত।’ এ জ্ঞান তারা সরাসরি হাদীস অদ্যায় করে অর্জন করুক কিংবা অর্জন করুক দ্বীনের সেরা আলিমদের আমল দেখে, তাতে কিছু যায় আসে না। এ সত্যের প্রতিই ইংগিত করেছেন শাইখ ইযযুদ্দীন আবদুস সালাম। তিনি বলেছেনঃ
“ঐসব ফকীহদের অবস্থা দেখে আমি বিস্মিত হচ্ছি, যারা স্বীয় ইমামদের ইজতিহাদী ভ্রান্তি সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্বেও সেই ভ্রান্তিকে আঁকড়ে ধরে থাকে এবং তা ত্যাগ করে কিতাব, সুন্নাহ ও কিয়াসের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিশুদ্ধ মতকে গ্রহণ করে না। বরং এসব অজ্ঞ অন্ধরা তাদের অন্ধ তাকলীদের ভ্রান্ত জজবায় অনেক সময় বাস্তবে কুরআন সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে যায় এবং স্বীয় ইমামকে ক্রুটিহীন প্রমাণ করার জন্যে কুরআন সুন্নাহর এমন ভ্রান্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে যা কালামের তাহরীফ ছাড়া আর কিছু নয়।”
তিনি অন্যত্র লিখেছেনঃ
“প্রথম যুগের লোকেরা যে আলিমকেই সামনে পেতেন, তাঁর কাছেই ফতোয়া জেনে নিতেন। তিনি কোন খেয়াল ও মসলকের লোক, তা জানার চেষ্টা করতেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। চার মাযহাবের আবির্ভাব ঘটে। সেগুলোর অন্ধ অনুকরণকারীদের আগমন ঘটে। লোকেরা হিদায়াতের আসল উৎস থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল ইমামদের বক্তব্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাদের কোনো বক্তব্য যতোই দুর্বল ও দলিলবিহীন হোক না কেন। ভাবটা যেন এমন যে, মুজতাহিদরা মুজতাহিদ নন বরং আল্লাহর রাসূল, মাসূম এবং তাদের কাছে ওহী নাযিল হয়! এটা সত্য ও হকের পথ নয়। বরঞ্চ নির্ঘাত অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির পথ।”
এ প্রসঙ্গে ইমাম আবু শামাহ বলেনঃ
কেউ যদি ফিকাহর প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন, তিনি যেনো কোনো একটি মাযহাবেকে যথেষ্ট মনে না করেন। বরঞ্চ প্রত্যেক মুজতাহিদের মতামত যেনো মনোযোগ দিয়ে দেখেন। প্রত্যেকের মধ্যে ডুব দিয়ে সত্যের বাতি জ্বালিয়ে দেখা উচিত। অতঃপর যে মতটিকে কুরআন সুন্নাহর অধিকতর মনে কাছাকাছি মনে করবেন সেটাই যেনো গ্রহন করেন। প্রাচীন আলিমগণের জ্ঞান ভান্ডারের প্রয়োজনীয় অংশগুলোর প্রতি যদি তিনি নযর দেন, তবে ইনশাল্লাহ যাচাই বাছাইর এ শক্তি অর্জন করা তার জন্যে সহজ হয়ে যাবে এবং সহজেই শরীয়তের সত্যিকার রাজপথের সন্ধান পেয়ে যাবেন। এরূপ লোকদের কর্তব্য হলো গোষ্ঠীগত গোঁড়ামী থেকে নিজেদের মন মস্তিষ্ককে পবিত্র রাখা। বিবাদ বসম্বাদের ময়দানে একটি কদমও না ফেলা। কারণ সেখানে সময় নষ্ট করা এবং স্বভাব ও আচরণে বিকৃতি লাভ করা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। ইমাম শাফেয়ী তাঁর এবং অন্যদের তাকলীদ করতে লোকদের নিষধ করে গেছেন। একথা বলেছেন শাফেয়ীর ছাত্র আল মুযনী তাঁর গ্রন্থ মুখতাসার এর সূচনায়। ইবনে হাযমের মন্তব্য এমন সাধারণ ব্যাক্তির ব্যাপারেও প্রযোজ্য যে দ্বীনি ইলম সম্পর্কে পূর্ণাংগ না থাকার তাকলীদ করে বটে, কিন্তু কোনো একজন ফকীহর তাকলীদ এই দৃষ্টিভঙ্গিতে করে যে, তিনি ভুল করে না, তিনি যা বলেন সবই সঠিক। তাছাড়া দলিল প্রমাণের দিক থেকে তাঁর মত যতোই ভুল এবং বিপরীত মত যতোই বিশুদ্ধ হোক না কেন, সর্বাবস্থায়ই সে তাঁর তাকলীদের উপর জমে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত এ নীতি সেই ইহুদীবাদেরই অনুরূপ যা তাওহীদী আদর্শকে শিরকে রূপান্তরিত করে দিয়েছিল। এ প্রসংগে একতি হাদীস উল্লেখযোগ্য। হাদীসটি মুসলিম শরীফে আদী ইবনে হাতিম থেকে বর্ণিত হয়েছে।
“রাসূলুল্লাহ (সা) ‘ইত্তাখাযু আহবারাহুম ওয়া রুহবানাহুম আরবাবাম মিন দুনিল্লাহ—তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা মাশায়েখদের রব বানিয়ে নিয়েছে।’৮১
[৮১. সূরা তাওবা আয়াতঃ ৩১]
আয়াত পড়ে বলেছেনঃ ইহুদীরা তাদের উলামা মাশায়েখদের ইবাদাত করতো না বটে, কিন্তু তারা যখন কোনো জিনিসকে বৈধ বলতো। তারা সেটাকেই (নির্বিচারে) বৈধ বলে গ্রহণ করতো আর তারা তাদের জন্যে যেটাকে নিষিদ্ধ করতো, সেটাকেই অবৈধ বলে মেনে নিতো।”
সুতরাং এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো একজন মাত্র ইমাম এর তাকলীদ করা যে, তিনি শরীয়তের নির্ভুল মুখপাত্র—তার পূজা করারই সমতুল্য।
ঐ ব্যাক্তির ব্যাপারেও ইবনে হাযমের ফতোয়া প্রযোজ্য যে মনে করে, কোনো হানাফীর জন্যে শাফেয়ী ফকীহর কাছে এবং কোনো শাফেয়ীর জন্যে হানাফী ফিকাহর নিকট ফতোয়া চাওয়া বৈধ নয়, কিংবা হানাফীর জন্যে শাফেয়ী ইমামের পিছে এবং শাফেয়ীর জন্যে হানাফী ইমামের পিছে (নামাযে) ইক্তেদা করা বৈধ নয়। এটা সাহাবী, তাবেয়ী ও উলামায়ে সলফের কর্মনীতির সুস্পষ্ট বিরোধিতা। এরূপ চিন্তা ও কর্ম কোনো অবস্থাতেই বৈধ হতে পারে না।
মূলত এই হল ইবনে হাযমের মন্তব্যের সঠিক তাৎপর্য। যেখানে অবস্থা এরূপ নয়, সেই ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যও প্রযোজ্য নয়। যেমন, এক ব্যাক্তি কেবল রাসূলুল্লাহর (সা) বক্তব্যের ভিত্ততেই দ্বীনকে দ্বীন মনে করে, আল্লাহ ও রাসূল যা হালাল করেছেন, সেটাকেই হালাল মনে করে, আল্লাহ ও রাসূল যা হারাম করেছেন সেটাকেই অবৈধ মনে করে এবং কনো অবস্থাতেই কোনো মানুষের বক্তব্যকে বৈধ ও অবৈধতার মানদন্ড বানায় না।
কিন্তু এরূপ বিশুদ্ধ ঈমান আকীদার অধিকারী হওয়া সত্বেও যেহেতু সে কুরআন হাদীস সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেনা, বিরোধপূর্ণ হাদীসসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের যোগ্যতা রাখেনা এবং কুরআন হাদীসের ভিত্তিতে মাসায়েল ইস্তিম্বাতের যোগ্যতা রাখে না, সেহেতু সে যদি তার দৃষ্টিতে সুন্নাতের রাসূলের ভিত্তিতে ফতোয়াদেবার উপযুক্ত নির্ভরযোগ্য কোনো আলিমের ইক্তেদা-অনুসরণ করে এবং মনে এই চিন্তা রাখে যে, যখনই সে আলিমের কোনো ফতোয়া কুরআন সুন্নাহর প্রমাণিত দলিলের বিপরীত দেখতে পাবে, তখনই তা ত্যাগ করবে, কোনো প্রকার গোঁড়ামী করবে না, এরূপ ব্যাক্তির জন্যে তাকলীদকে কিছুতেই অবৈধ বলা যেতে পারে না। কারণ, রাসূলুল্লাহর সে যুগ থেক এ নিয়ে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে ফতোয়া চাওয়া এবং ফতোয়া দেয়ার এ নিয়মই অবিচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। সুতরাং এই নীতিতে আমল করার পর এক ব্যাক্তির কাছে সবসময় ফতোয়া কিংবা বিভিন্ন ফকীহর নিকট বিভিন্ন সময় ফতোয়া চাওয়া উভয়টাই বৈধ। এটা কেমন করে অবৈধ হতে পারে? কারণ আমি তো কোনো ফকীহর ব্যাপারে এরূপ ঈমান পোষণ করি না যে, তাঁর নিকট আল্লাহ তায়ালা ফিকাহ সংক্রান্ত ওহী নাযিল করেন, তাঁর ইতায়াত করা আমার জন্যে ফরয এবং তিনি নিষ্পাপ। আমি যখন কোনো ফকীহর ইক্তেদা করি, তখন তার সম্পর্কে এ ধারণা নিয়েই তাঁর ইক্তেদা করি যে, তিনি কুরআন ও সুন্নাতে রাসূলের একজন আলিম। সুতরাং তাঁর বক্তব্য কুরআন সুন্নাহ মুতানিকই হবে। হয় সরাসরি কুরআন হাদীস দিয়েই কথা বলবেন, কিংবা কুরাআন হাদীসের ভিত্তিতে ইস্তিম্বাত করে কথা বলবেন।……এরূপ না হতে তো কোনো মুমিনই কোনো মুজতাহিদের তাকলীদ করতো না। কোনো বিশুদ্ধ নির্ভরযোগ্য সুত্রে যদি আল্লাহর সেই মাসুম রাসূলের (সা) কোনো হাদীস আমার নিকট পৌছে, যাঁর আনুগত্য করা আমার জন্যে ফরয, সেই হাদীসটি যদি আমার ইমাম এর (বা মাযহাবের) মতের বিরোধী হয়, তখন যদি আমি হাদীসটিকে ত্যাগ করে ইমাম এর মতকে আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে গোঁড়ামী প্রদর্শন করি, তাহলে আমার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে? এক্ষেত্রে কিয়ামতের দিন রাব্বুল আলামীনের দরবারে আমি কি জবাব দেবো?
২. তাকলীদের পর মুসলমানদের মধ্যে সবচাইতে বড় সমস্যার কারণ হয়েছে কুরআন হাদীসের শাব্দিক অনুসরণ এবং ইস্তেখরাজ।
এখানে দু’টি নিয়ম রয়েছে। একটি হলো, হাদীসের শাব্দিক অনুসরণ। আর দ্বিতীয়টি হলো, মুজতাহিদ ইমামদের প্রণীত উসূলের ভিত্তিতে মাসায়েল ইস্তিম্বাত করা। শরয়ী দিক থেকে এই দু’টি নিয়মই সর্বস্বীকৃত। সকল যুগের বিজ্ঞ ফকীহগণ দু’টি বিষয়ের প্রতিই গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তবে কেউ একটির প্রতি অধিক মনোনিবেশ করেন, আবা কেউ অপরটির প্রতি বেশী যত্মবান হন। কিন্তু কোনো একটিকে সম্পুর্ণ পরিত্যাগ কেউ করেননি। সুতরাং হক পথের কোনো পথিকেরই কেবল একটি মাত্র পন্থার প্রতি সম্পূর্ণ ঝূঁকে পড়া উচিত নয়। অথচ দুঃখের বিষয়, বর্তমানকালে এই প্রবণতাই তাদের গোমরাহীর জন্যে দায়ী। এই দু’টি পন্থার একটিকে বাদ দিয়ে বাকো একটি দ্বারা হিদায়াএর রাজপথের সন্ধান পাওয়া খুবই দুষ্কর। সঠিক নীতি হচ্ছে, উবয় পন্থাকে প্ররথক করে না দিয়ে উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা। একটি দ্বারা আরেকটির কাঠামোকে আঘাত না করে একটির সাহায্যে আরেকটিকে ক্রুটিমুক্ত করা। কেবল এভাবেই অটল মজবুত ভিতের উপর দ্বীনী বিধানের এক দুর্ভেদ্য প্রাসাদ নির্মিত গতে পারে। এভাবেই তাতে কোনো ভ্রান্তির প্রবেশ পথ বন্ধ হতে পারে। এ নীতির প্রতিই আমাদেরকে অংগুলি নির্দেশ করে দেখিয়েছেন হাসান বসরীঃ
“আল্লাহর কসম, তোমাদের পথ হচ্ছ, সীমা থেকে দূরে অবস্থান এবং সীমাতিক্রম—এ দূটির মাঝখানে।”
গ. দুই বলয়ে অবস্থিত উপরোক্ত দু’টি পন্থার মধ্যবর্তী ও সঠিক পন্থা হচ্ছে কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে এতোটা অবগত থাকা, যাতে করে ফিকাহর উসূল ও মৌলিক মাসায়েলসমূহ এবং সেগুলোর দলিল প্রমাণ সংক্রান্ত জ্ঞান অতি সহজের অর্জন করা যায়। তাছাড়া এরূপ ব্যাক্তিকে কিছু কিছু ইজতিহাদী মাসয়ালা, সেগুলোর দলিল-আদিল্লা ও একটিকে আরেকটির উপর অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। অন্যদের তাখরীজের ক্রুটি নির্দেশ এবং খাঁটি ও মেকীর মধ্যে পার্থক্য করার মতো যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। তবে একজন মুজতাহিদ মতলককে যতোটা ব্যাপক ও সমুদ্রসম জ্ঞান, দূরদৃষ্টি ও অন্তরদৃষ্টির অধিকারী হতে হয়, তার মধ্যে সেসব শর্ত পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান না থাকলেও চলবে। এ পর্যায়ে পৌছার পর বিভিন্ন মাযহাবের ক্রুটিপূর্ণ মতসমূহের সমালোচনা করা তাঁর জন্যে বৈধ। তবে সমালোচনা করার পূর্বে তাঁকে অবশ্য সেগুলোর পক্ষে তাদের যেসব দলিল প্রমাণ আছে, সেগুলো অবহিত হতে হবে। এ পর্যায়ে পৌছে বিভিন্ন মাযহাবের মতামতের দলিল প্রমাণ পর্যালোভনার পর তিনি যদি এই মাযহাবের কিছু এবং ঐ মাযহাবের কিছু মত গ্রহণ করেন এবং তাঁর গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হওয়ায় সব মাযহাবেরই কিছু মতের সমালোচনা করেন এবং বর্ণনা করেন, যদিও প্রাচীনরা তা গ্রহণ করেছেন, তবে এমনটি করাও তাঁর জন্যে বৈধ।
এ কারণের দেখা যায়, যেসব আলমরা নিজেদেরকে মুজতাহিদ মতলক বলে দাবী করতেন না, তাঁরা ফিকহী গ্রন্থাবলী রচনা করেছেন, মাসয়ালা সংকলন করেছেন, তাখরীজ করেছেন এবং পূর্ববর্তী আলিমগণের একটি মতকে আরেকটি মতের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন, কারণ ইজতিহাদ আর তাখরীজ তো মুলত একই জিনিসের দু’টি অন্ধ। আর উভয়টিরই উদ্দেশ্য কোনো বিষয়ে সত্যের কাছাকাছি পৌছা বা সত্যিকার ধারণা লাভ করা।
এবার ওইসব লোকদের কথায় আসা যাক, যারা মাসায়েল যাচাই বাছাই করার মতো দ্বীনি জ্ঞানের অধিকারী নয়। তাদের উচিত প্রচলিত যাবতীয় বিষয়ে নিজেদের পূর্বপুরষ ও স্থানীয় মুসলমানদের অনুসরণ করা, আর যখন কোনো নতুন বিষয় তাদের সামনে আসবে, সে বষয়ে নিষ্ঠাবান মুফতীগণের নিকট ফতোয়া চাওয়া আর মামলা মুকদ্দমার ক্ষেত্রে কাযীগণের ফায়সালা অনুসরণ করা। এটাই তাদের জন্যে সরল সঠিক ও উত্তম পন্থা।
প্রত্যেক মাযহাবের প্রাচীন ও আধুনিক মুহাক্কিক আলিমগণকে এইরূপ চিন্তা চেতনার অধিকারীই পেয়েছি। সকল মাযহাবের ইমামগণ তাঁদের সাথী ও ছাত্রদেরকে এই ধারণার অনুসরণেরই অসীয়ত করেছেন। ‘ইয়াকুত ও জাওয়াহেরে’ উল্লেখ আছে যে, আবু হানীফা (রহ) বলতেনঃ
আমার মতের পক্ষে গৃহীত দলিলসমূহ যার জানা নেই আমার মতানুযায়ী ফতোয়া দেয়া তার উচিত নয়। আবু হানীফা স্বয়ং কোনো ফতোয়া দেয়ার সময় বলতেনঃ “এটা নুমান বিন সাবিতের (অর্থাৎ আমার) মত। আমার নিজের বুঝ জ্ঞান আনুযায়ী আমি এটাকেই উত্তম মনে করি।”
ইমাম মালিক (রহ) বুতেঃ
“রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া এমন কোনো মানুষ নেই, যার পুরো বক্তব্য গ্রহযোগ্য হতে পারে। তিনি ছাড়া আর সকলের বক্তব্যের কিছু অংশ গ্রহণযোগ্য এবং কিছু অংশ বর্জনীয়।”
হাকিম ও বায়হাকীতে বর্ণিত হয়েছে, শাফেয়ী ( রহ) বলতেনঃ
“কোনোঃ বিষয়ে সহীহ-বিশুদ্ধ হাদীস পাওয়া গেলে সে বিষ্যে সেটাই আমার মত।” অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে, শাফেয়ী (রহ) বলেছেনঃ
“তোমরা যখন আমার কোনো মতকে হাদীসের সাথে বিরোধপূর্ণ দেখতে পাবে, তখন তোমরা হাদীসের ভিত্তিতে আমল করবে এবং আমার মতকে দেয়ালের ওপাশে নিক্ষেপ করবে।”
শাফেয়ী (রহ) একদিন ইমাম মুযনীকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “হে আবু ইব্রাহীম! আমার প্রতিটি কথার অন্ধ অনুকরণ (তাকলীদ) করো না। বরঞ্চ সে বিষয়ে নিজেও চিন্তা গবেষণা করা উচিত। কারণ, এটা যা-তা ব্যাপার নয়, দ্বীনের ব্যাপার।”
তিন আরও বলতেনঃ
“রাসূলুল্লাহ (স) ছাড়া আর কারো কথার মধ্যে কোনো হুজ্জত নেই, তাদের সংখ্যা যদি বিরাটও হয়।”
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) বলতেনঃ
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার সাথে বিরোধপূর্ণ হলে কোনো ব্যাক্তির কথাই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি এক ব্যাক্তি কে বলেছিলেনঃ
“আমার তাকলীদ করো না। মালিক, আওযায়ী, ইব্রাহীম নখয়ী প্রভৃতি কারই তাকলীদ করো না। তারা যেমন কিতাব ও সুন্নাহ থেকে মাসয়ালা গ্রহণ করেছেন, তোমরাও অনুরূপভাবে কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই মাসয়ালা গ্রহণ করো। সকল ইমামের মাযহাব ও মতামত সম্পর্কে অবগত হওয়া ছাড়া কারোই ফতোয়া দেয়া উচিত নয়। কারো নিকট যদি এমন কোনো মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করা হয়, যেটির বিষয়ে স্বীকৃত ইমামগণ একমত পোষণ করেছেন সেটির সেই সর্বসম্মত জবাবটি বলে দেয়াতে কোনো দোষ নেই। কারণ এরূপ ক্ষেত্রে সেটা তার নিজস্ব মতামত নয়, বরঞ্চ ইমামা মুজতাহিদ্গণের মতেরই ভাষ্য বলে গণ্য হবে। তার নিকট যদি কেউ কোনো মতবিরোধপূর্ণ মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করে, সেক্ষেত্রে এটা অমুকের মতে জায়েজ আর অমুকের মতে নাজায়েজ জবাব দেয়াতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু এরূপ ক্ষেত্রে এক পক্ষের মত বলে দেয়া উচিত নয়।”
আবু ইউসুফ ও যুফার (রহ) প্রমুখ বলেছেনঃ
“এমন কোনো ব্যাক্তির আমাদের মত অনুযায়ী ফতোয়া দেয়া উচিত নয়, যিনি আমাদের মতের ভিত্তি সম্পর্কে অবগত নন।”
ইমাম আবু ইউসুফকে বলা হয়ঃ ‘আবু হানীফার সাথে আপনার ব্যাপক মতপার্থক্য লক্ষ্য করছি।‘ তিনি তাকে জবাবে বলেনঃ “এর কারণ, আবু হানীফাকে যতোটা বুঝ জ্ঞান দেয়া হয়েছে, ততোটা আমাদেরকে দেয়া হয়নি। তিনি তাঁর বুঝ জ্ঞানের মাধ্যমে যা অনুধাবন করেছেন, তার সবটা বুঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর তাঁর যে বক্তব্য আমরা উপলদ্ধি করতে পারি না, তা দিয়ে ফতোয়া দেয়া আমাদের জন্যে বৈধ হতে পারে না।”
মুহাম্মদ ইবনুল হাসানকে জিজ্ঞসা করা হয়, কখন একজন লোক ফতোয়া দেয়ার বৈধতা অর্জন করে? জবাবে তিনি বলেনঃ “ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করলে।” জিজ্ঞাসা করা হয়ঃ ‘কিভাবে ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন হয়?’ জবাব তিনি বলেনঃ “যখন কোনো ব্যাক্তি কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে মাসায়েলের সকল দিকের উপর নজর দিতে পারেন এবং তার মতের বিরোধিতা করা হলে যুক্তিসঙ্গত জবাব দিতে পারেন, তখন তিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করেন।”
কেউ কেউ বলেছেনঃ “ইজতিহাদের নুন্যতম শর্ত হলো ‘মাবসূত’ গ্রন্থ মুখস্থ থাকা” ইবনুস সিলাহ বলেছেনঃ “শাফেয়ী মাযহাবের কোনো ব্যাক্তির নজরে যদি এমন কোনো হাদীস পড়ে, যেটি শাফেয়ীর মতের সাথে সাংঘর্ষিক, এরূপ ক্ষেত্রে তিনি যদি ইজতিহাদের মতলকের অধিকারী হন কিংবা সেই বিষয় বা মাসয়ালাটি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হন, তবে বিষয়টি সম্পর্কে গবেষোণা করার পর হাদীসটি বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে, সেক্ষেত্রে হাদীসটির উপর আমল করা এবং তাকলীদ পরিহার করা তাঁর জন্যে জরুরী। আর তিনি যদি এরূপ যোগ্যতার অধিকারী না হন আর দেখেন যে, অপর কোনো ইমাম এর মত হাদীসটির অনুরূপ। সে ক্ষেত্রেও হাদীসটির উপরই আমল করা তাঁর জন্য জরুরী। কারণ, এতে করে তাঁর কোনো না কোনো ইমামের তাকলীদ করা হয়ে যাচ্ছে।”—ইমাম নববীও এ মতই পোষণ করেন।
৪. চতুর্থ সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে ফকীহদের পারস্পরিক মতপার্থক্য কে কেন্দ্র করে। অথচ ফকীহদের মধ্যে তো মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব বিষয়ে, যেসব বিষয়ে স্বয়ং সাহাবায়ে কিরামের (রা) নিকট থেকেই পার্থক্যপূর্ণ মত (ইখতেলাফ) পাওয়া গেছে। যেমনঃ তাশরীক ও দুই ঈদের তাকবীর, মুহরেমের (যিনি ইহরাম বেধেছেন) বিয়ে, ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদের (রা) তাশাহুদ, বিসমিল্লাহ এবং আমীন সশব্দে কিংবা নিঃশব্দে পড়া প্রভৃতি বিষয়ে। এসব ক্ষেত্রে তাঁরা একটি মতকে আরেকটি মতের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন মাত্র।
অতীত আলিমগণের মতপার্থক্য মূল শরীয়তের ব্যাপারে ছিলোনা। মতপার্থক্য হয়েছে আনুসঙ্গিক বিষয়াদিতে। আর সেসব মতপর্থক্যও ছিলো নেহতই সাধারণ ধরণের। মতপার্থক্য ছিলো দু’টি বিষয়ের মধ্যে কোনটি উত্তম, তাই নিয়ে। কেউ মনে করেছেন এটি উত্তম, আবার কেউ মনে করেছেন ওটি উত্তম। যেমন, কারীগণের কিরআতের পার্থক্য। বিভিন্ন কারী বিভিন্ন দৃষ্টিভংগিতে তিলাওয়াত করেন। একই শব্দ বা আয়াত এর তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তুমি তাদের মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখতে পাবে। ফকীহদের মতপার্থক্যের ধরনও অনুরূপ। ফকীহগণ তাঁদের মতপার্থক্যের কারণ হিসেবে বলেছেন, এই মতও সাহাবীদের থেকে পাওয়া গেছে, ঐ মতও সাহাবীগণের (রা) নিকট থেকে পাওয়া। অর্থাৎ তাদের মধ্যেও পারস্পরিক মতপার্থক্য ছিলো এবং তা সত্বেও তাঁরা সকলেই হিদায়াতের উপর ছিলেন। এ কারণে হকপন্থী আলিমগণ ইজতিহাদী মাসায়েলের ক্ষেত্রে সকল মুজতাহিদের ফতোয়াকেই জায়েজ মনে করেন, সকল কাযীর ফায়সালাকেই স্বীকার করেন এবং অনেক সময় নিজ মাযহাবের বিপরীত মতের উপরও আমল করেন। এ কারণেই তুমি দেখতে পাচ্ছো, তারা মাসয়ালার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং ইখতেলাফী দিকসমূহ আলোচনার পর বলে দেন, ‘আমার মতে এটাই উত্তম’, ‘আমার মতে এটা গ্রহণ করা ভালো’। আবার কখনো বলেনঃ ‘আমি কেবল এতোটুকুই জানতে পেরেছি।‘ ‘আল মাসবূত’ আছারে মুহাম্মাদ এবং শাফেয়ীর বক্তব্যের মধ্যে এ কথাগুলোর সাক্ষ্য তুমি দেখতে পাবে।
অতঃপর শুভবুদ্ধির অধিকারী দ্বীনের সেই মহান খাদিমদের কাল অতিক্রান্ত হয়। তাদের পরে এমনসব লোকের আগমন ঘটে, যারা সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগির অধিকারী হবার কারণে হিংসা বিদ্বেষ ও বিবাদের ঝড় বইয়ে দেয়। মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়গুলোর কোনো একটিকে আঁকড়ে ধরে। এ মতের অধিকারীদের এক পক্ষ আর ঐমতের অধিকারীদের আরেক পক্ষ হিসেবেভাবএ থেকে। এভাবেই শুরু হয় ফিরকা-পুরস্তী। এতে করে মানুষের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে তাহকীক ও চিন্তা গবেষণার জজবা। তারা নিজ নিজ ইমামের মাযহাবকে আকড়ে ধরে অন্ধভাবে। আফসোস তাদের এই বস্থার জন্যে!
অথচ এইসব মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়ে সাহাবী, তাবেয়ী ও তাদের পরবর্তী মহান আলিমগণের অবস্থা দেখো! তাঁরা (নামাজে) কেউ বিসমিল্লাহ পড়তেন, আবার কেউ পড়তেন না। কেউ তা সশব্দে পড়তেন, আবার কেউ নিঃশব্দে পড়তেন। কেউ ফজরে দোয়ায়ে কুনুত পড়তেন, আবার কেউ তা পড়তেন না। কেউ নকসীর, বমি ও ক্ষৌরকার্য করার পর অযু করতেন, আবার কেউ করতেন না। কেউ কামনা সাথে স্বীয় লিংগ এবং স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অযু করতেন, আবার কেউ করতেন না। কেউ রান্না করা খাদ্য খেলে অযু করতেন আবার কেউ করতেন না। তাদের কেউ উটের গোশত খেলে অযু করতেন আবার কেউ করতেন না।
এতদসত্বেও তাঁদের একজন অপরজনের পিছনে নামাজ পড়তেন। যেমন, আবু হানীফা ও তাঁর সাথীরা এবং শাফেয়ী প্রমুখ মদীনার ইমামদের পিছনে নামাজ পড়তেন। অথচ তাঁরা ছিলেন মালিকী অন্যান্য মতের লোক এবং তাঁরা সশব্দে কিংবা নিঃশব্দে বিসমিল্লাহও পড়তেন না। ইমাম আবু ইউসুফ হারুনুর রশীদের পিছে নামাজ পড়েছেন। অথচ হারুনুর রশীদ ক্ষৌরকার্য করার পর নতুন করে অযু করতেন না। কারণ ইমাম মালিক (রহ) ফতোয়া দিয়েছেন, ক্ষৌরকার্য করার পর অযু করার প্রয়োজন নেই। আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) ক্ষৌরকার্য এবং নকসীর৮২ এর জন্যে অযু করার কথা বলেছেন।
[৮২. গরমের প্রকোপে নাক দিয়ে যে রক্ত বের হয়, তাকে নকসীর বলে। –অনুবাদক]
কিন্তু যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলোঃ “যদি ইমামের শিরীর থেকে রক্ত বের হয় আর তিনি অযু না করেন, তিবে কি আপনি তার পিছে নামাজ পড়বেন?” জবাবে তিনি বললেনঃ ‘কেমন করে আমি মালিক ও সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যেবের পিছে নামাজ না পড়ে থাকতে পারি?’৮৩
[৮৩. এ দু’জনের মতে এটা অযু ভঙ্গের কারণ নয়। –অনুবাদক]
বর্ণিত আছে, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ উভয়েই ঈদে ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত আকবীরের অনুসরণ করতেন। হারুনুর রশীদের পছন্দের কারণে তাঁরা এটা করতেন। অথচ তাঁরা ইবনে মাসউদ বর্ণিত তাকবীরের অনুসারী।
একবার শাফেয়ী আবু হানীফার কবরের কাছাকাছি স্থানে ফজরের নামাজ আদায় করেন। এ সময় আবু হানীফার সম্মানার্থে তিনি ফজরের নামাজে দোয়ায়ে কুনুত পড়েননি। তিনি বলতেন, আমি অনেক সময় ইরাকবাসীদের (আবু হানীফার) মাযহাবের উপর আমল করি।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মালিক (রহ) মানসুর এবং হারুনুর রশীদকে কি বলেছিলেন, এর আগে এ গ্রন্থে আমরা সে কথা উল্লেখ করেছি।
‘আল বাযাযিয়া’ গ্রন্থে ইমাম সানী অর্থাৎ আবু ইউসুফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, একবার তিনি হাম্মাম থেকে গোসল করে এসে জুমার নামাজ পড়ান। নামাজ শেষে লোকেরা চলে যাবার পর তাঁকে জানানো হয়, তিনি যে কুয়োর পানি দিয়ে গোসল করেছিলেন, তাতে মরা ইঁদুর পাওয়া গেছে। খবরটি শুনে তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে, এ বিষয়ীখন মাওরা মাদের মদীনার ভাইদের (মালিকী মাযহাবে) মতের অনুসরণ করলাম যে, দুই কুল্লা পরিমাণ পানি থাকলে তা অপবিত্র হয় না। কারণ, এ পরিমাণ পানির বিধান ‘অধিক পানির’ বিধানের মতো।”
ইমাম খানজাদীকে শাফেয়ী মাযহাবের এমন এক ব্যাক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, যে ব্যাক্তি এক বা দুই বছরের নামাজ ছেড়ে দিয়েছিল, অতঃপর আবু হানীফার মাযহাব গ্রহণ করে। এখন সে কোন মাযহাবের রীতিতে নামাজগুলো কাযা করবে? শাফেয়ী মাযহাবের রীতিতে নাকি হানাফী মাযহাবের রীতিতে? জবাবে ইমাম খানজাদী বলেনঃ “সে বৈধ মনে করে, এমন যে কোনো মাযহাবের রীতিতে পড়লেই নামাজ আদায় হয়ে যাবে।”
কোনো হানাফী মাযহাবের লোক যদি শপথ করে যে, ‘আমি যদি অমুক মহিলাকে বিয়ে করি, তবে তাকে তিনি তালাক দিলাম।’৮৪
[৮৪. উল্লেখ্য, হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এভাবে শপথ করলে সেই মহিলাকে বিয়ে করার সাথে সাথে তার উপর তিন তালাক প্রযোজ্য হয়ে যাবে। –অনুবাদক]
অতঃপর কোনো শাফেয়ী আলিমের নিকট ফতোয়া চাইলে তিনি যদি বলেনঃ ‘তালাক হয়নি, তোমার শপথ বাতিল, সেটা ছিলো একটা বাহুল্য কথা।’ এমতাবস্থায় এ ব্যাপারে সে যদি শাফেয়ী মাযহাবের অনুসরণ করে, তবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ, এর পক্ষে বিরাট সংখ্যক সাহাবীর মত রয়েছে। এ কথাগুলো উল্লেখ হয়েছে ‘জামিউল ফাতাওয়া’ গ্রন্থে।
ইমাম মুহাম্মাদ (রহ) তাঁর ‘আমালী’ গ্রন্থে বলেছেনঃ “কোনো ফকীহ যদি তার স্ত্রীকে বলে, ‘তোমাকে তালাক দিয়ে দিলাম’ এবং তার মাযহাব অনুযায়ী সে যদি এটাকে তিন তালাক বা বায়েন তালাক মনে করে, কিন্তু সমকালীন কাযী যদি সেটাকে তালাকে রিজয়ী (ফেরতযোগ্য) বলে ফায়সালা দেয়, তবে তার স্ত্রীর সাথে ঘর করার অবকাশ তার রয়েছে।”
একইভাবে হালাল হারাম, লেনদেন ও পারস্পরিক সম্পর্কের সেইসব বিষয়ে, যেগুলোর ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, প্রত্যেক ফকীহর উচিত সেসব বিষয়ে ইসলামী আদালত তার মাযহাবের বিপরীত রায় দিলেও সে রায়ের উপর আমল করা এবং সেসব ক্ষেত্রে স্বীয় মাযহাবের উপর আমল না করা।
আলোচনাকে অন্যন্ত দীর্ঘায়িত করলাম। যেসব কারণে বিভিন্ন মাযহাব ও দল উপদলের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদ লেগে আছে, সেগুলোর কারণ উদ্ঘাটিত করা এবং সত্য ও সঠিক পথের দিশা দেয়াই এ দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য। কেউ যদি বিদ্বেষী এবং অতি সংকীর্ণ ও অতি উদার মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে ন্যায় ও সত্যানুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে এ কথাগুলোর প্রতি দৃষ্ট দেয়, তবে সত্য ও সঠিক পথের অনুসরণের জন্যে এ কথাগুলোই তার জন্যে যথেষ্ট। আর প্রকৃত সত্য সম্পর্কে তো আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
আল্লামা ইকবাল ইসলামকে চারমাযহাবে বন্দী করে স্থবির করার তীব্র নিন্দা করেন। এবং আব্দুল ওহাব নজদীর মাযহাব বিরোধী অবদানের ভুয়োশী প্রশংসা করেন। আমি তার বই “ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনগর্ঠন“ এর ১০৬ পৃষ্ঠা থেকে ১২৭ পৃষ্ঠার কতিপয় অংশ তুলে ধরছি।
১. “ ———- আমাদের প্রাচীন আরবীয় এবং অনারবীয় আইন পন্ডিতগণ সংগৃহীত আইনগুলোর সংস্কার করেছিলেন যতক্ষণ না তারা আমাদের অনুমোদিত আইন গোষ্ঠীসমূহের স্বীকৃতি পেয়েছিল। এই আইন গোষ্ঠী ইজতিহাদের তিনটি স্তরের কথা বলে :
১. আইনের উপর পূর্ণ কর্তৃত¦ যা প্রকৃতপক্ষে সীমাবদ্ধ ছিল আইন গোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাতাদেও মধ্যে।
২. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যা একটি বিশেষ গোষ্ঠির জন্য কাজ করবে।
৩. বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নকারী, যেসব ক্ষেত্রে আইন গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতাগণ কোন নির্দেশ দিয়ে যান নি।
এই বক্তব্যে আমি ইজতিহাদের প্রথম স্তর নিয়ে আলোচনা করব। ইজতিহাদের এই স্তরে তাত্ত্বিক সম্ভাবনার কথা সুন্নীগণ স্বীকার করেছিল। কিন্তু এই গোষ্ঠীসমূহ প্রতিষ্ঠা করার পূর্ব পর্যন্ত এর বাস্তব প্রয়োগকে অস্বীকার করেছিল, এই কারণে যে পূর্ণ ইজতিহাদ একটিমাত্র ব্যাক্তির পক্ষ্যে অসম্ভব। যে আইন পদ্ধতির ভিত্তিমূল কোরআন তার এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি অদ্ভ’ত। আমরা সম্মুখে অগ্রসর হবার পূর্বে এই বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করব যা ইসলামী আইনকে প্রকৃতপক্ষে স্থির অবস্থায় এনেছে।———————-। “
২. “————- ত্রয়োদশ শতক এবং তার পরে ইসলামি আইনে অতীত ইতিহাসের প্রতি অন্ধ শ্রদ্ধার জন্য যে অতি সংগঠনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, যা ছিল ইসলামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের বিরোধী; পরিণতিতে আহ্বান করেছিল ইবনে তাইমিয়ার প্রতিক্রিয়া, ইসলামের অক্লান্ত লেখক এবং ধর্মপ্রচারক, যার জন্ম হয়েছিল ১২৬৩ খৃ: বাগদাদের পতনের পাচ বছর পর। ইবনে তাইমিয়া নিজের জন্য ইজতিহাদের স্বাধীনতা দাবি করে এই গোষ্ঠীসমূহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উত্থাপন করেন, এবং নতুন করে শুরু করার উদ্দেশ্যে প্রথম নীতিতে ফিরে গিয়েছিলেন, ইবনে হাজামের মত যিনি জাহিরি আইনের প্রতিষ্ঠাতা হানাফি মাযহাব এর উদাহরণ এবং ইজমার দ্বারা বিচার পদ্ধতি বাতিল করেছিলেন। কারণ তিনি ভেবেছিলেন চু্িংঁঢ়৩; কুসংস্কারের ভিত্তি এবং নি:সন্দেহে তার সময়ের জরাজীর্ণ নৈতিক এবং বৌদ্ধিক পরিস্থিতি বিচার করে তিনি ঠিকই করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সুয়ূতী ইজতিহাদের একই একই সুবিধা দাবি করেন যার সাথে তিনি যুক্ত করেছিলেন প্রত্যেক শতাব্দীর শুরুতে নবীয়কারকের ধারণা। ইবনে তাইমিয়ার শিক্ষার মূলকথা প্রকাশ পায় বিশাল সম্ভাবনায্ংুঁঢ়৩; এক বিপ্লবে যার শুরু হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে নজদেও বালুকা থেকে; ম্যাকডোনাল্ড বর্ণনা করেছিলেন, “ক্ষয়শীল ইসলাম জগতে পরিচ্ছন্নতম স্থান” এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে আধুনিক ইসলাম জীবনে প্রথম হৃদস্পন্দন, এই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুপ্রেরণা ছিল এশিয়া এবং আফ্রিকায় সমস্ত বৃহৎ মুসলিম বিপ্লব যেমন, সেনুসী বিপ্লব, প্যান-ইসলামিক বিপ্লব, কবি বিপ্লব, যা কেবলমাত্র আরবীয় প্রগতিবাদের পার্সি পতিক্রিয়া। বিখ্যাত পিউরিটান সংস্কারক মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী, যিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৭০০ খৃ: শিক্ষা লাভ করেছিলেন মদীনায় এবং ভ্রমন করেছিলেন পার্সিয়াতে, শেষ পর্যন্ত সমগ্র ইসলাম জগতে তার আত্মার আগুন ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন গ্ভাৎধপ৩৪;ালীর শিষ্য মুহাম্মদ ইবনে তুমারাত এরম ত, যিনি ছিলেন ইসলামের বার্বার পিউরিটান সংস্কারক, মুসলিম স্পেনের ধ্বংসের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাকে নতুন অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। —————
আবু হানীফাকে সুফিয়ান সাওরী ইসলামের ঐক্য ধ্বংসকারী, বিদাতী বলেছেন। http://aloloomenglish.net/vb/showthread.php?418-The-Severe-Jarh-of-The-Salaf-us-Salih-upon-Abu-Haneefah&s=a212e61076f4f77748110a093d15acd4
মাজহাব মানা ও না মানা। সংশয় নিরসন।
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর। দুরুদ ও সালাম নাজিল হোক প্রিয় নবী(সা) এর উপর।
ইসলামের ৪ মহান ইমাম-
ইমাম আবু হানীফা(রহ), ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ),ইমাম শাফেয়ী(রহ) এবং ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ)
এছাড়াও আরো মুজতাহিদ ইমাম ছিলেন,তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, ইমাম আওযাঈ,ইমাম ইসহাক ইবন রাহ’ওয়া।
বর্তমানে আমাদের মুসলিমদের মধ্যে একটি বড় ব্যাধি হল – মাজহাব মানা ও না মানা নিয়ে ঝগড়া করা।
মাজহাব মানা বলতে বুঝানো হচ্ছে কোন একজন(নির্দিষ্ট) ইমামের(৪ ইমাম হতে) মত ও পথ
অনুসরণ করা (এই অনুসারীদের বলা হয়- মাযহাবী)
আর মাজহাব না মানা বলতে বুঝানো হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট ইমামের পথ অনুসরণ না করা (এদের বলা হয়- লা মাযহাবী)
অপর কথায় বলা যায়ঃ
১.নির্দিষ্ট কোন একজন ইমামের অনুসারী হল- মাজহাবী
২.নির্দিষ্ট কোন একজন ইমামের অনুসারী নয় বরং এই ৪ ইমামের মধ্য হতে যার ইজতিহাদ কোরআন ও সুন্নাহর নিকটবর্তী তার অনুসারীরা হল- লা মাযহাবী
মাযহাবীরা আবার ২ ভাগে বিভক্ত,
১. ইমামের ইজতিহাদের অন্ধ অনুসারী(তাকলীদ করা)
২.ইমামের ইজতিহাদের অনুসারী কিন্তু অন্ধ অনুসারী নয়(তাকলীদ না করা বরং ইত্তেবা করা)
তাকলীদের পারিভাষিক অর্থ- তাক্বলীদ হল শারঈ বিষয়ে কোন মুজতাহিদ বা শরী‘আত গবেষকের কথাকে বিনা দলীল-প্রমাণে চোখ বুজে গ্রহণ করা।
তাকলীদ করার ব্যাপারে বিশিষ্ট আলেমদের মন্তব্যঃ
১. ইমাম শাওকানী (রহঃ) বলেন,
তাক্বলীদ হল রায়-এর অনুসরণ এবং ইত্তেবা হল রেওয়ায়াতের অনুসরণ। ইসলামী শরীআতে ইত্তেবা সিদ্ধ এবং তাক্বলীদ নিষিদ্ধ (শাওকানী, আল-ক্বাওলুল মুফীদ, মিসরী ছাপা ১৩৪০/১৯২১ খৃঃ, পৃঃ ১৪)
২. মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীত্বী (রহঃ) বলেন,
তাকলীদ হল কারো দলীল সম্পর্কে অবহিত না হয়ে তার কথা গ্রহণ করা, যা তার ইজতিহাদ বা গবেষণা ব্যতীত কিছুই নয়। পক্ষান্তরে শারঈ দলীল কারো মাযহাব ও কথা নয়, বরং তা একমাত্র অহী-র বিধান, যার অনুসরণ করা সকলের উপর ওয়াজিব। (ঐ)
৩. হাফিয ইবনে রাজাব হাম্বলী(রহ) বলেছেনঃ ‘যার কাছেই নাবী(সা) এর আদেশ পৌঁছে যায় এবং তিনি তা বুঝতে পারেন তাহলে তার উপর এটাকে উম্মতের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করে দেখা ও তাদের মঙ্গল কামনা করা এবং তার নির্দেশ পালন করার আদেশ প্রদান করা ওয়াজিব যদিও তা উম্মতের বিরাট কোন ব্যক্তিত্বর বিরোধী হয়’(আলবানী-রাসুলুল্লাহ(সা) এর সালাত;৩৫-তাওহীদ পাবলিকেশন্স)
ইমামের অনুসরণের ক্ষেত্রে তাদের অনুসারীরা ইমামদের কিছু কথার বিরদ্ধে অবস্থান করেছেন তার পরও তারা সেই মাজহাবের অন্তর্ভুক্ত হিসাবেই গণ্য হতেনঃ
১. ইমাম মুহাম্মাদ ইবন হাসান ও ইমাম আবু ইউসুফ ছিলেন ইমাম আবু হানিফার অনুসারী। কিন্তু তারা ইমাম আবু হানিফার প্রায় এক তৃতীয়াংশ ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন (ইবন আবিদীন; ১/৬২)
২. ইমাম মুহাম্মাদ তার মুয়াত্তা গ্রন্থের ১৫৮ পৃঃ তে বলেছেন- আবু হানিফা ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) কোন সালাত আছে বলে মনে করতেন না, তবে আমার কথা হচ্ছে (ইসতিসকার সালাত হল) ইমাম লোকজনকে নিয়ে ২ রাকাত সালাত পড়বেন অতঃপর দোয়া করবেন।
[ইমাম মুহাম্মাদ তার এই মুয়াত্তা গ্রন্থে ইমাম আবু হানিফার প্রায় ২০টি ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন, তা যথাক্রমে- ৪২,৪৩,১০৩,১২০,১৫৮,১৬৯,১৭২,১৭৩,২২৮,২৩০,২৪০,২৪৪,২৭৪,২৭৫,২৮৪,৩১৪,৩৩১,৩৩৮,৩৩৫,৩৩৬ পৃঃ রয়েছে]
৩. তাফসীর ইবনে কাসীরের লিখক- ইমাম ইবন কাসীর ছিলেন শাফী মাজহাবের অনুসারী। শাফী মাজহাব অনুসারে মুক্তাদিরা ইমামের পিছনে সর্বাবস্থায় সুরা ফাতিহা পাঠ করবে এবং এটা ওয়াজিব(ইমাম শাফেয়ীর মতে) ইমাম ইবন কাসীর শাফী মাজহাবের অনুসারী হওয়া সর্তেও ইমামের পিছনে মুক্তাদির যেহরী কিরাত বিশিষ্ট সালাতে(যেমনঃ ফজর,মাগরিব) সুরা ফাতিহা পরবে না বলে মত প্রকাশ করেছেন (তাফসীর ইবন কাসীর,সুরা আরাফের ২০৪ নং আয়াতের তাফসীর,৮-১১ খণ্ড)
৪. ইমাম ইবন তাইমিয়াহ ছিলেন হাম্বলী, হাম্বলী মাজহাব মতে ৩ তালাক একত্রে দিলেও ৩ তালাক হিসাবে তা গণ্য হবে কিন্তু ইমাম ইবন তাইমিয়াহ বলেছেন- ৩ তালাক একত্রে দিলে ১ তালাক হিসাবে তা গণ্য হবে। যা হাম্বলী মাজহাবের বিরদ্ধে।
৫. মুহাদ্দিস দেহলভী শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন হানাফী(কেহ কেহ তাকে লা মাযহাবীও বলে থাকেন) তিনি ইমাম আবু হানিফার বিরদ্ধে অবস্থান করে রুকুর আগে ও পরে রাফুল ইয়াদিন(হাত উত্তোলন) করাকে পছন্দ করেছেন (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা;২/১০)
৬. মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী বলেনঃ সালাতে রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে উঠার সময় দু হাত না তোলা সম্পর্কে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো সবই বাতিল হাদীস। তন্মধ্যে একটিও সহীহ নয় (মাওযুআতে কাবীর, পৃ-১১০)
আর অনেক এমন প্রমাণ রয়েছে, এখানে মাত্র ৬ টি প্রমাণ উল্লেখ্য করলাম। এসব অনুসারীরা তাদের ইমামদের বিরোধিতা করার পরও মাজহাবের গণ্ডি থেকে বের হন নি। সুতরাং বর্তমানে কেহ যদি তার মাজহাবের কোন কথা কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের বিরদ্ধে পায় এবং মাজহাবের সেই কথাকে বর্জন করে সঠিক কথা (কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের ভিত্তিক) কে মেনে নেয় তাহলে সে মাজহাব থেকে বের হবে না বরং সে মাজহাবকে সঠিক ভাবে মানলো।
এক্ষেত্রে আমি উল্লেখ্য করছি একজন প্রখ্যাত আলেমের কথা,
শেইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী(রহ) বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি ইমামদের কিছু কথার বিরুদ্ধে গেলেও সকল সুসাব্যস্ত হাদীস আঁকড়ে ধরবেন তিনি ইমামদের মাজহাব বিরোধী হবেন না এবং তাদের তরীকা থেকে বহিস্ক্রিতও হবেন না বরং তিনি হবেন তাদের প্রত্যেকের অনুসারী। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শুধু ইমামদের বিরোধিতা করার কারণে সুসাব্যস্ত হাদীস প্রত্যাখ্যান করে তার অবস্থা এমনটি নয়,বরং সে এর মাধ্যমে তাদের অবাধ্য হল এবং তাদের পূর্বোক্ত কথাগুলর বিরোধিতা করল’ (আলবানী-রাসুলুল্লাহ(সা) এর সালাত;৩৪-তাওহীদ পাবলিকেশন্স)
ইমামদের ইজতিহাদ অনুসরণের কারণঃ
আপনি যদি নিজে ইজতিহাদ করার ক্ষমতা রাখেন তাহলে আপনার জন্য কোন ইমামের অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আপনি যদি ইজতিহাদ করার ক্ষমতা না রাখেন তাহলে আপনাকে ইমামের ইজতিহাদ অনুসরণ করতে হবে। এখানে আমি বিশিষ্ট আলেম- শেইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমিন(রহ) এর বক্তব্য পেশ করলাম,
(শেইখ বলেছেন) এ ব্যাপারে মানুষ ৩ ভাগে বিভক্তঃ
১.আলেম, যাকে আল্লাহ ঈলম ও সমঝ দান করেছেন
২.তালেবে-ইলম, যার ইলম আছে কিন্তু তিনি ঐ বড় আলেমের দরজায় পৌঁছেননি
৩.সাধারণ মানুষ, যার কোন(শরয়ী) ইলম নেই
(তিনি আরো বলেন) প্রথম শ্রেণীর মানুষের ইজতিহাদ করে বলার অধিকার আছে।
দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ,যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন কিন্তু তিনি ঐ বড় আলেমের দরজায় পৌঁছেননি। এমন শ্রেণীর মানুষ যদি শরীয়তের ব্যপক ও সাধারণ এবং তার নিকট যে ইলম পৌঁছেছে তা দ্বারা ফয়সালা দিয়ে থাকেন তাহলে তার জন্য তা দোষের কিছু নয়। তবে তার পক্ষে জরুরী এই যে, তিনি এ ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করবেন এবং তার থেকে বড় আলেমকে জিজ্ঞাসা করে নিতে কুণ্ঠিত হবেন না। কারণ তিনি ভুল বুঝতে পারেন। কখন বা তার ইলম বা সমঝ ব্যাপক কে সীমাবদ্ধ, সাধারণকে নির্দিষ্ট অথবা রহিত আদেশকে বহাল মনে করতে পারেন। অথচ তিনি এ ব্যাপারে কোন টেরই পাবেন না।
পক্ষান্তরে তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ, যাদের নিকট শরীয়তের ইলম নেই, তাদের জন্য আহলে ইলমকে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া ওয়াজিব। [ইবনে উসাইমিন- উলামাদের মতানৈক্য ও আমাদের কর্তব্য;২৬-২৭-তাওহীদ পাবলিকেশন্স]
ইমামদের তাকলীদ করার ব্যাপারে তাদের(৪ ইমামের) নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের অনুসরণের কথাঃ
১- ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
১. যখন ছহীহ হাদীছ পাবে, জেনো সেটাই আমার মাযহাব (হাশিয়াহ ইবনে আবেদীন ১/৬৩)২. আমি যদি আল্লাহর কিতাব (কুরআন) ও রাসূলুললাহ (ছাঃ)-এর কথার (হাদীছ) বিরোধী কোন কথা বলে থাকি, তাহলে আমার কথাকে ছুঁড়ে ফেলে দিও (ছালেহ ফুল্লানী, ইক্বাযু হিমাম, পৃঃ ৫০)
২- ইমাম মালেক (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
আমি একজন মানুষ মাত্র। আমি ভুল করি, আবার ঠিকও করি। অতএব আমার সিদ্ধান্তগুলো তোমরা যাচাই কর। যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূলে হবে সেগুলো গ্রহণ কর। আর যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর প্রতিকূলে হবে তা প্রত্যাখ্যান কর (ইমাম ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১৪৯)
৩- ইমাম শাফেঈ (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
আমি যেসব কথা বলেছি, তা যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছহীহ হাদীছের বিপরীত হয়, তবে রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছই অগ্রগণ্য। অতএব তোমরা আমার তাক্বলীদ কর না (ইবনু আবী হাতেম, পৃঃ ৯৩, সনদ ছহীহ)
৪- ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা :
তুমি আমার তাক্বলীদ কর না এবং তাক্বলীদ কর না মালেক, শাফেঈ, আওযাঈ ও ছাওরীর (ইলামুল মুওয়াক্কি’ঈন, ২/৩০২)
৪ ইমামের উপরোক্ত কথা গুল থেকে বুঝা যায় যে তারা তাদের তাকলীদ(অন্ধ অনুসরণ) করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তাদের কথা থেকে এটি প্রমাণিত যে, তখন থেকেই তাদের অনুসরণ করা হত। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেছেনঃ তুমি আমার তাক্বলীদ কর না, কিন্তু তিনি বলেন নি যে তুমি আমার অনুসরণ কর না। অর্থাৎ ইমামদের অনুসরণ সম্পূর্ণ বৈধ।
যারা বলে- নির্দিষ্ট কোন ইমামের(মাজহাব) অনুসরণ করা অনর্থক কাজ অথবা ভুল কাজঃ
১. ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল আল-বোখারী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ২৫৬ হিজরি)
২. ইমাম মুসলিম(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ২৬১ হিজরি)
৩. ইমাম আবু দাউদ(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ২৭৫ হিজরি)
৪. ইমাম নাসাঈ(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৩০৩ হিজরি)
৫. ইমাম ইবন খুজাইমা(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৩১১ হিজরি)
৬. ইমাম তহাবী(রহ) ছিলেন হানাফী (মৃত্যু- ৩২১ হিজরি)
৭. ইমাম আল-হাসান ইবন আলী আল-বারবাহারী(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৩২৯ হিজরি)
৮. ইমাম তাবারানী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৩৬০ হিজরি)
৯. ইমাম বাইহাকী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৪৫৮ হিজরি)
১০. ইমাম ইবনে আকিল(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৪৮৮ হিজরি)
১১. শেইখ আব্দুল কাদের জিলানী(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৫৬১ হিজরি)
১২. ইমাম ইবন কুদামা(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৬২০ হিজরি)
১৩. ইমাম মুহিউদ্দিন ইয়াহইয়া আন-নববী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৬৭৬ হিজরি)
১৪. ইমাম ইবন তাইমিয়াহ(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৭২৮ হিজরি)
১৫. ইমাম যাহাবী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৭৪৮ হিজরি)
১৬. ইমাম ইবন কাইয়ুম(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৭৫১ হিজরি)
১৭. ইমাম ইবন কাসীর(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৭৭৪ হিজরি)
১৮. ইমাম ইবন রাজাব(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ৭৯৫ হিজরি)
১৯. হাফেজ ইবন হাজার আল-আস্কালানী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৮৫২ হিজরি)
২০. ইমাম শাখাবী(রহ) ছিলেন শাফী (মৃত্যু- ৯০২ হিজরি)
২১. ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহাব(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ)
এছাড়াও আমরা প্রায় সবাই যাদের সম্মান করি তাদের অনেকেই ছিলেন হাম্বলী। যেমনঃ
১. শেইখ আব্দুল আজিয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ). তিনি সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ছিলেন। তার হম্বলী হওয়ার প্রমানঃ
http://www.hanabilah.com/were-ibn-taymiyyah-ibn-qayyim-ibn-abdulwahab-ibn-baz-and-ibn-uthaymin-hanbalis/
http://www.binbaz.org.sa/mat/8225
http://islamqa.info/en/ref/23280/hanbali
২. শেইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমিন(রহ) ছিলেন হাম্বলী (মৃত্যু- ২০০১ খ্রিস্টাব্দ)
তার প্রমানঃ
http://www.hanabilah.com/were-ibn-taymiyyah-ibn-qayyim-ibn-abdulwahab-ibn-baz-and-ibn-uthaymin-hanbalis/
http://en.wikipedia.org/wiki/Muhammad_ibn_al_Uthaymeen
আমি জানি, অনেকেই হয়তো বা বলবেন যে, শেইখ বিন বায এবং ইবন উসাইমীন(রহ) এর অনেক মতামত হাম্বলী মাজহাবের বিরদ্ধে যায়, তাহলে তারা কিভাবে হাম্বলী? হ্যাঁ, আমি মানি তাদের অনেক মত হাম্বলী মাজহাবের বিরদ্ধে যায় কিন্তু আমি আগেই আলোচনা করেছি যে, নিজ ইমামের বিরদ্ধে কিছু মত গেলেই সে তার মাজহাব থেকে বহিষ্কৃত হবেন না, পূর্ববর্তী অনেক আলেমের উদাহরণ আমি ইতিপূর্বে উল্লেখ্য করেছি। এ ব্যাপারে শেইখ আব্দুল আযিয ইবন বায(রহ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, সেই প্রশ্ন এবং তার উত্তর আমি এখানে উল্লেখ করলাম,
[Question posted to Shaikh AbdulAzīz bin Bāz رحمه ﷲ]
س1: هل لسماحتكم مذهب فقهي خاص وما هو منهجكم في الفتوى والأدلة؟
ج1: مذهبي في الفقه هو مذهب الإمام أحمد بن حنبل رحمه الله وليس على سبيل التقليد ولكن على سبيل الاتباع في الأصول التي سار عليها، أما مسائل الخلاف فمنهجي فيها هو ترجيح ما يقتضي الدليل ترجيحه والفتوى بذلك سواء وافق ذلك مذهب الحنابلة أم خالفه، لأن الحق أحق بالاتباع، وقد قال الله عز وجل
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
Translation:
Question: Do you Esteemed Shaikh follow a specific madh-hab and what is the methodology that you give the fatwa upon and deal with proofs?
Answer: My madh-hab in Fiqh is the madh-hab of Imām Ahmad bin Hanbal رحمه ﷲ, not on the methodology of Taqlīd rather it’s is by following him in his foundations (Usūl) in extracting rulings from fiqh which he took. As for the issues of Fiqh that have differences of opinions, my method in dealing with those is that I choose that which is substantiated with the proof, and then I give rulings based upon that which I’ve selected from that, whether or not it agrees with the opinion of the Hanbalī Madhab or goes against it, That is because the truth is more worthy of being followed, And Allah Says:
“O you who have believed, obey Allah and obey the Messenger and those in authority among you. And If you disagree over anything, refer it to Allah and the Messenger, if you should believe in Allah and the las day. That is the best way and best in result”
Reference: http://www.binbaz.org.sa/mat/8225
যদি নির্দিষ্ট কোন ইমামের অনুসরণ করা অনর্থক কাজ অথবা ভুল কাজ হয়ে থাকে তাহলে কি উপরে বর্ণীত সকল উলামাগন ভুল করেছেন? অনর্থক কাজ করেছেন? না কখনই না।
এখানে আমি বিশেষ আলেমদের কথা উল্লেখ্য করছিঃ
Shaykh al-Islam Ibn Taymiyah said:
No one has to blindly follow any particular man in all that he enjoins or forbids or recommends, apart from the Messenger of Allaah (peace and blessings of Allaah be upon him). The Muslims should always refer their questions to the Muslim scholars, following this one sometimes and that one sometimes. If the follower decides to follow the view of an imam with regard to a particular matter which he thinks is better for his religious commitment or is more correct etc, that is permissible according to the majority of Muslim scholars, and neither Abu Haneefah, Maalik, al-Shaafa’i or Ahmad said that this was forbidden.
Majmoo’ al-Fataawa, 23/382.
Shaykh Sulaymaan ibn ‘Abd-Allaah (may Allaah have mercy on him) said:
Rather what the believer must do, if the Book of Allaah and the Sunnah of His Messenger (peace and blessings of Allaah be upon him) have reached him and he understands them with regard to any matter, is to act in accordance with them, no matter who he may be disagreeing with. This is what our Lord and our Prophet (peace and blessings of Allaah be upon him) have enjoined upon us, and all the scholars are unanimously agreed on that, apart from the ignorant blind followers and the hard-hearted. Such people are not scholars.
Tayseer al-‘Azeez al-Hameed, p. 546
যারা বলে নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিবঃ
শরীয়ত এ কোন কিছু ওয়াজিব হওয়ার জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের দলিল লাগবে। কেহ কেহ বলে থাকেন যে, ৪ ইমাম মিলে ইজমা করেছেন মাজহাব মানার জন্য, এটি একটি কাল্পনিক কথা। কারণঃ
ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর জন্ম ৮০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৫০ হিজরি তে
ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) এর জন্ম ৯৩ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৭৯ হিজরি তে
ইমাম শাফেঈ(রহ) এর জন্ম ১৫০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২০৪ হিজরি তে
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর জন্ম ১৬৪ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২৪১ হিজরি তে
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে বুঝা যাচ্ছে ইমাম আবু হানিফার সাথে ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ এর দেখাও হয় নি। ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) যখন ইন্তেকাল করেন তখন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর মাত্র ১৫ বছর বয়স।
অর্থাৎ তাদের ইজমা হওয়ার বিষয় তা অবান্তর। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিব নয় বরং মুবাহ অর্থাৎ মানলেও দোষ নেই আবার না মানলেও দোষ নেই
যারা বলে ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই,
ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই এই কথা অবান্তর। কেননা, ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর পরে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার সকল কথাই গ্রহণীয় (ইমাম ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১৪৫)
সাহাবীদেরও ইজতিহাদী বিষয়ে ভুল থাকা স্বাভাবিক। ইমাম আবু হানিফা(রহ) ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) বলেছেনঃ সাহাবীগণ ভুলের উর্ধে না হলেও কোরআন ও হাদীসে বারবার তাদের পরিপূর্ণ মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হয়েছে (আবু বকর সারাখসী,আল-মুহাররার ফী উসুলিল ফিকহ ২/৮১-৯১), আবু হামেদ গাযালী, আল-মুসতাসফা ১/৬১৬-৬২৬, মুহাম্মাদ ইবন হুসাইন আল-জিযানী,মাআলিমু উসুলিল ফিকহি,পৃঃ২২২-২২৭)
যেখানে সাহাবীদের ইজতিহাদে ভুল থাকতে পারে সেখানে ৪ ইমামদের ভুল থাকতে পারে না?
ইমাম আবু হানিফা ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) কোন সালাত আছে বলে মনে করতেন না, কিন্তু সহীহ বোখারী ও সহীহ মুসলিম এ ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত নামে আলাদা অধ্যায়(বা’ব) রয়েছে। সুনান আবু দাউদ এর ১১৬১,১১৬২,১১৬৩,১১৬৪,১১৬৫,১১৬৬,১১৬৭,১১৬৮,১১৭০,১১৭১,১১৭২,১১৭৩,১১৭৪,১১৭৬ নং হাদীস ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে আমাদের বলছে(এছাড়াও আর অনেক হাদীস রয়েছে). তাহলে কি ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর ইজতিহাদ ভুল ছিল না এই ক্ষেত্রে? সম্ভবত ইমাম আবু হানিফার কাছে এসব হাদিস গুল পৌঁছে নি।
ইতিপূর্বে আমি আলোচনা করেছি যে ইমাম মুহাম্মাদ(রহ) ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে মত দিয়েছেন এবং বলেছেন যে ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত ২ রাকাত।
এছাড়াও আমি ইতিপূর্বে আরো আলোচনা করেছি যে, এই ৪ ইমামের অনেক অনুসারী তাদের ইমামের অনেক ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন, এতেই স্পষ্ট হয় যে এই ৪ মুজতাহিদ ইমামদের কিছু ইজতিহাদে ভুল ছিল। তবে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর ইজতিহাদে সবচেয়ে কম ভুল পাওয়া যায়, এর অন্যতম কারণ হল- তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন, তার প্রায় ১০ লক্ষ হাদীস মুখস্ত ছিল। এছাড়াও তিনি ইমাম বোখারী(রহ) এর পণ্ডিত ছিলেন।
ইমামদের(মাজহাব) অনুসরণ করার পদ্ধতিঃ
১. ইমামের ইজতিহাদ সঠিক ও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে এই কথা খেয়াল রেখে তার অনুসরন করা।
২. ইমামের ফতওয়ার পক্ষের দলিল খোজ করা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৩. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে আগে দেখে নেওয়া যে ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল আছে কিনা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৪. ইমামের ফতওয়ার পক্ষে ও বিপক্ষে(অর্থাৎ ২ পক্ষেই) দলিল থাকলে যা উৎকৃষ্ট তা পালন করা আর ২ পক্ষের দলীল সমান পর্যায় এর হলে ইমামের মত অনুসরণ করলে ইমামের অনুসারীদের সাথে ঐক্য থাকবে আর ইমামের মত না মেনে বিপরীত মত মানলেও তা দোষের কিছু নয় (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৫. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে ও ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল না থাকলে ইমামের মতকে বর্জন করা এবং সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে যার ইজতিহাদ রয়েছে(অথবা আলেমকে জিজ্ঞাসা করা) তাকে অনুসরণ করা(সাধারণ মানুষের জন্য) আর তালেবে ইলমদের জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা এবং আলেমদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে কুণ্ঠিত না হওয়া এবং আলেমদের জন্য সরাসরি সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা
উপরোক্ত ৫ টি নিয়ম মেনে চললে কোরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসরণ হবে, অনুসরণ হবে ইমামগণের এবং অনুসরণ হবে পূর্ববর্তি আলেমগণের(ইমাম বোখারী থেকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহাব পর্যন্ত)
কিছু মাসলাতে ২ পক্ষেই সহীহ হাদীস থাকে, সে ক্ষেত্রে যেকোন একটির উপর আমল করলেই চলবে।
নির্দিষ্ট ইমাম(মাজহাব) মানার ক্ষেত্রে ডাঃ জাকির নায়েকের মতঃ
ডাঃ জাকির নায়েক বলেছেনঃ সাধারণের মধ্যে কেউ যদি বিশেষ কোনো ইমামের রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। (লেকচার সমগ্র,ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তি সমূহের জবাব,মুসলিমরা এত দলে বিভক্ত কেন?,পৃঃ-২৩৪) এখানে তিনি মাজহাবকে জাতীয় পরিচয় হিসাবে উল্লেখ্য করতে নিষেধ করেছেন কারণ এতে করে ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
মাজহাব মানা কি বিভক্তি নয়?
আল্লাহ পাক কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমাদের বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন,
যেমনঃ সুরা আনআম এর ১৫৯ নং আয়াত, সুরা রুম এর ৩১-৩২ আয়াত।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন, সুরা আলে ইমরান এর আয়াত ১০৩ নং আয়াতে।
কিন্তু এসব আয়াত ইমামদের সঠিক অনুসরণকারীদের উপর বর্তাবে না। কেননা ইমামদের সঠিক অনুসারীরা কোরআন এবং সুন্নাহ অবশ্যই আঁকড়ে ধরে রাখবে। ইমামদের অনুসরণ করে বলেই একে অপরের সাথে আলাদা হবে না। কারণ মাজহাব দ্বীন নয় বরং মাজহাব হল দ্বীন(ইসলাম) মানার একটি উপায়। আমি আগেই বলেছি যে, কেউ যদি ইজতিহাদ করার ক্ষমতা রাখে তাহলে তার জন্য মাজহাব মানার কোন প্রয়োজন নেই। আবার কোন সাধারণ মানুষ যদি মাজহাব না মানে বরং বর্তমান সময়ের সঠিক আলেমদের অনুসরণ করে তাতেও সমস্যা নেই। তবে বর্তমান সময়ের আলেমগণ কি পূর্ববর্তীদের থেকে বেশী জ্ঞানী?
মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ইমাম বোখারী সহ এত বড় আলেমগণ মাজহাব মানতেন না। মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ডাঃ জাকির নায়েক মাজহাব মানতে নিষেধ করতেন। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে এই পর্যন্ত কোন জ্ঞানী আলেমকে মাজহাবের বিরোধিতা করতে দেখি নি তবে তারা সবাই মাজহাবের অন্ধ ভক্তির(তাকলীদ) বিরোধিতা করেছেন।
কিছু কিছু সময় কিছু কিছু অজ্ঞ মানুষ মাজহাবের মাধ্যমে ইসলামকে বিভক্ত করছেন। যেমনঃ কেউ কেউ বলে থাকেন যে, আমরা হাম্বলীদের জায়গা দেই না। এসব কথা বলা শরীয়াত কখনও সমর্থন করে না,এসব কথার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হবে। আবার কখনো দেখান যায় যে শুধু মাজহাব মানার কারণে লা মাযহাবী ভাইরা তাদের অপছন্দ করে থাকেন,যা কখনও বৈধ নয় তবে যারা তাকলীদ অর্থাৎ অন্ধ অনুসরণ করে তাদের কথা ভিন্ন।
শেষ কথাঃ
উপরের আলোচনা হতে এটি স্পষ্ট যে, মাজহাব মানা এবং না মানা ২ টাই শরীয়াত সমর্থিত। কাজেই আমরা এই ছোট বিষয়টি নিয়ে একে অপরের প্রতি কোন বিদ্বেষ রাখব না। তবে যারা তাকলীদ(অন্ধ অনুসরণ) করে তাদের বুঝাতে হবে যে তারা ভুল করছে। বর্তমানে শেইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী(রহ) এর তাকলীদ করতেও কাউকে দেখা যায়, এটাও ভুল, এ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। এই বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য আমার একটাই, তা হল মুসলিম উম্মাহ এই ছোট বিষয় নিয়ে বারাবারী করবে না বরং সঠিক ভাবে উভয় পক্ষকে বুঝে নিবে, ইমামদের নামে অন্ধ অনুসরণ বন্ধ করে কোরআন ও সহীহ হাদীসের উপর আমল করবে, ইমামদের পূর্ববর্তী অনুসারীরা যে ভাবে অনুসরণ করেছেন ইমামদের ঠিক সেই ভাবেই অনুসরণ করা। আসুন আমাদের সমাজ থেকে শিরক ও বিদআত দূর করি এবং কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে আমল করি। এই লেখাতে আমার কোন ভুল হয়ে থাকলে আমাকে জানাবেন। আমি- Mainuddin Ahmed Shuvo.
মূলঃ Mainuddin Ahmed Shuvo
► মাজহাবি ভাইদের কাছে আমার কিছু প্রস্নঃ (প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রমাণাদি-সহ সঠিকভাবে দিলে আমরাও মাজহাব অনুসরণ করবোঃ
১. কুরআন বা, হাদিসে কি মাজহাব মানার কোন কথা আছে?
২. রাসুল (সঃ) কি কোন হাদিসে মাজহাব মানার কথা বলেছিলেন?
৩. রাসুল (সঃ) এর যুগে কি কোন মাজহাব ছিল?
৪. খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগের খলিফারা বা সাহাবিরা কি মাজহাবী ছিলেন অথবা তারা কোন মাজহাব মানতে বলেছিলেন?
৫. ইমাম আবু হানিফা-সহ অন্যান্য ইমামগনেরা কি মাজহাব তৈরি করেছেন?
৬. ইমামগনের ছাত্রবৃন্দরা কি নির্দিষ্ট মাজহাব মানতেন?
৭. মাজহাব মানা যদি ফরজ বা ওয়াজিব হয়, তাহলে এটা কারা করলো? তাদের কি কোন কিছু ফরজ বা ওয়াজিব করার অধিকার আছে?
৮. যাদের নামে মাজহাব তৈরি করা হয়েছে, তারা কি মাজহাবগুলো বানিয়ে নিতে বলেছেন?
৯. ইমাম চারজন কোন মাজহাব মানতেন?
১০. ইমামগনের পিতা-মাতা, ওস্তাদরা কোন মাজহাব মানতেন? সেই মাজহাব কি এখন মানা যায় না?
১১. ঈমানদারি ও কুরান-হাদিসের বিদ্যায় চার ইমাম শ্রেষ্ঠ ছিলেন না চার খলিফা?
১২. যদি খলিফাগন শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকে তাহলে তাদের নামে মাজহাব হলও না কেন? তারা কি ইমামগন অপেক্ষা কম যোগ্য ছিলেন?
১৩. মাজহাব মানার যে ইজমা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, তা কবে, কোথায় এবং কোন দেশে হয়েছিল?
" ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) জন্ম গ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরীতে। তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর যতগুলো হাদিস পেয়েছেন এবং সংরক্ষণ করেছেন সেগুলোর উপর ভিত্তি করেই ফতোয়া দিয়েছিলেন। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, উনার সময় তিনিই ছিলেন ইমামে আজম। তবে যেহেতু তিনি সকল সাহাবাদের হাদিস সংগ্রহ করতে পারেন নাই, সকল সাহাবাদের সাক্ষাত পান নাই এবং যেহেতু হাদিস এর ধারক সাহাবারা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন তাই তিনি যতগুলো হাদিস পেয়েছেন তার উপরেই ফতোয়া দিয়েছেন।
তবে ইমাম আবু হানিফা রহঃ এর মূল কথা ছিলঃ-
"ইযা সহহাল হাদিসু ফা হুয়া মাজহাবা" অর্থ্যাত বিশুদ্ধ হাদিস পেলে সেটাই আমার মাজহাব বা মতামত। (১/৬৩ ইবনু আবিদীন এর হাশিয়া, পৃঃ ৬২ ছালিহ আল-ফাল্লানীর, ১/৪৬ শামী)
ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল হে শায়খ, যদি এমন সময় আসে যখন আপনার কথা কোন সহীহ হাদিসের বিপরীতে যাবে তখন আমরা কি করব?
তিনি উত্তরে বলেছিলেন, তখন তোমরা সেই সহীহ হাদিসের উপরই আমল করবে এবং আমার কথা প্রাচীরে/দেয়ালে নিক্ষেপ করবে।
=> ১৩৫ হিজরিতে জন্মগ্রহন কারী ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এর বক্তব্য হলো,
তোমরা যখন আমার কিতাবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাহ বিরোধী কিছূ পাবে তখন আল্লাহর রাসুলের সুন্নাত অনুসারে কথা বলবে। আর আমি যা বলেছি তা ছেড়ে দিবে। (৩/৪৭/১ আল হারাবীর, ৮/২ খত্বীব, ১৫/৯/১ ইবনু আসাকির, ২/৩৬৮ ইবনু কাইয়িম, ১০০ পৃঃ ইহসান ইবনু হিব্বান)।
=> ৯৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ কারী ইমাম মালেক রহঃ এর বক্তব্যও একই।
ইমাম মালেক বিন আনাস (রহঃ) বলেছেন, আমি নিছক একজন মানুষ। ভূলও করি শুদ্ধও বলি। তাই তোমরা লক্ষ্য করো আমার অভিমত/মতামত/মাজহাব এর প্রতি। এগুলোর যতটুকু কোরআন ও সুন্নাহ এর সাথে মিলে যায় তা গ্রহণ করো আর যতটুকু এতদুভয়ের সাথে গরমিল হয় তা পরিত্যাগ করো। (ইবনু আবদিল বর গ্রন্থ (২/৩২)।
=> ১৬৪ হিজরীতে জন্মগ্রহনকারী ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ ছিলেন ১০ লক্ষ হাদিসের সংগ্রহ কারী। সবচেয়ে বেশী হাদিস উনার মুখস্থ ছিল এবং উনার সংগ্রহে ছিল। উনার লিখিত গ্রন্থ মুসনাদে আহমাদ এ মাত্র ২৩০০০ এর মতো হাদিস লিপিবদ্ধ আছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সকল ইমামই কোরআন ও সহীহ হাদিস মেতে নিতে বলেছেন।
তাক্বলীদ এবং কোন একটি মাযহাবের অনুসরণঃ বাড়াবাড়ি ও অবহেলার বিপরীতে মধ্যমপন্থী অবস্থান - ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ী | এপ্রিল ২৬, ২০১৫
ভাষাতাত্ত্বিক সংজ্ঞাঃ১
আরব ভাষাবিদদের মতে, ‘তাক্বলীদ’ শব্দটি এর মূল ‘ক্বালাদা’ থেকে উৎসরিত হয়েছে। ‘ক্বালাদা’ অর্থ হচ্ছে এমন একটি হার যা শক্তভাবে গলায় বেঁধে দেয়া হয়। আর এখান থেকেই এসেছে কোন পথের ‘তাক্বলীদ’ করার ধারণা। ব্যাপারটি অনেকটা এরকম যেন কোন একজন অনুসারী নির্দিষ্ট একজন মুজতাহিদের কোন রায় বা সিদ্ধান্তকে হারের মতই গলায় শক্তভাবে বেঁধে রাখে।
শরঈ সংজ্ঞাঃ
তাক্বলীদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘সাইল আল জাররার’ গ্রন্থে বলেছেন তাক্বলীদ হল প্রমাণ ছাড়া অন্য একজনের কথা অনুযায়ী আমল করা। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, রাসূলের (সাঃ) হাদীসের উপর আমল করা, ইজমার উপর আমল করা, একজন মুফতীর মতানুযায়ী একজন সাধারণ মানুষের আমল করা, একজন বিচারক কর্তৃক নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য বিবেচনায় নেয়া তাক্বলীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, এগুলোর প্রামাণ্যতা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস এবং ইজমাকে যারা স্বীকার করে নেয় তাদের জন্য উভয়টিই স্পষ্টরূপে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস। একজন সাধারণ মানুষের জন্য কোন মুফতীর রায় অনুযায়ী আমল করা ইজমা দ্বারা স্বীকৃত। আর একজন বিচারকের বিচার প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য গুরুত্বের সাথে নেওয়ার বিষয়টি কোরআন ও সুন্নাহতে সাক্ষী নেয়ার হুকুম এবং ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
হাদীস বর্ণনাকারীদের বর্ণনা অনুসরণ করাও তাক্বলীদের গন্ডি বহির্ভূত কেননা হাদীসের শুদ্ধতা ও বৈধতা যাচাইয়ের পদ্ধতি (তাখরীজ) ইতিমধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়া এগুলো কেবল হাদীস বর্ণনাকারীদের উক্তি নয় বরঞ্চ এ বর্ণনাসমূহ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে সম্পর্কিত।
ইবনে আল হুমামের (মৃত্যু ৮৬১ হিজরী) ‘তাহরীর’ গ্রন্থে তাক্বলিদের আরো ভালো সংজ্ঞা পাওয়া যায়ঃ “তাক্বলীদ হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো কথার উপর প্রমাণ ছাড়া আমল করা।” আল কাফফালের (মৃত্যু ৩৬৫ হিজরী) মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে কারো বক্তব্য (ফিক্বহী রায়) গ্রহণ করে নেয়া এটা না জেনেই যে তিনি তা কোথা থেকে পেয়েছেন।” শাইখ আবু হামিদ আল আসফারাইনি (মৃত্যু ৪০৬ হিজরী) এবং উস্তায আবু মানসুর আবদুল ক্বাহির আল বাগদাদী (মৃত্যু ৪২৯ হিজরী) উভয়ের মতে, “এটি (তাক্বলীদ) হচ্ছে শরঈ বাধ্যবাধকতার উৎস হিসেবে স্বীকৃত নয় এমন কারো ফিক্বহী রায়কে প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করে নেয়া।”
কোন মাযহাবের তাক্বলীদ করার উপর হুকুমঃ
তাক্বলীদের ব্যাপারে তিনটি মত পাওয়া যায়ঃ
১। যেকোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া
২। তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক হওয়া
৩। যার ইজতিহাদ করার যোগ্যতা নেই তার জন্য তাক্বলীদ জায়েজ হওয়া
প্রথম মতঃ কোন একটি মাযহাবের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া
প্রথম মত সাধারণ মানুষ-সুযোগ্য আলেম নির্বিশেষে সবার উপর তাক্বলীদ করাকে বাধতামূলক হিসেবে প্রতিপন্ন করে। এ মত অধুনা আলেমদের যেকোন ধরনের বা পর্যায়ের ইজতিহাদ করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ মতানুসারে ইজতিহাদ তাত্ত্বিকভাবে নিষিদ্ধ এবং প্রায়োগিক দিক থেকে অকার্যকর যার দরজা হিজরী তৃতীয় বা চতুর্থ শতক বা এর পূর্বেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে ভাবা হয়।
এ মত অনুযায়ী চার মাযহাবের যেকোন একটির তাক্বলীদ করাকে প্রত্যেক মুসলিমের উপর ধর্মীয়ভাবে আবশ্যক গণ্য করা হয়। এ মতের অনুসারীগণ অধুনা আলেমদের তাদের নিজেদের অনুসৃত মাযহাবের বাইরে কোন মতকে প্রাধান্য দেয়ার অনুমতিও দেন না। চারটি জনপ্রিয় মাযহাবের বাইরে গিয়ে অন্য কোন মাযহাব বা মত (যদিও তা সাহাবা বা তাবেয়ীদের হয়) অনুসরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এ মতের অনুসারীগণ যদি বিদ্যমান মতসমূহের একটিকে আরেকটির উপর প্রাধান্য দেয়ার অনুমতি না দিয়ে থাকেন তবে তো তারা স্বাধীন ইজতিহাদের আরো বেশী বিরোধিতা করে থাকেন যদিও সেটি কিছু বিষয়ের উপর আংশিক ইজতিহাদ হয়ে থাকে। মানুষ জীবনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন চিন্তাধারা ও আদর্শের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তারা স্বাধীন ইজতিহাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। আর এসবই তাদের এই বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত যে, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে দিতে হবে।
পরবর্তী সময়ের কিছু আলেম চার মাযহাবের যেকোন একটি অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন। ইমাম আদ দারদিরের ফিক্বহের উপর গ্রন্থ ‘আশ শারহ আস সাগীর’ ও তাফসীর আল জালালাইন উভয়ের উপর হাশিয়ার রচয়িতা শাইখ আস সাওয়ী আল মালিকি (মৃত্যু ১২৬১ হিজরী) বলেনঃ “চার মাযহাবের বাইরে কোন মতের তাক্বলীদ করা জায়েজ নয় যদিও তা কোন সাহাবার কথা, সহীহ হাদীস ও কোরআনের আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় কেননা, যে চার মাযহাবের বাইরে অবস্থান করে সে নিজে পথভ্রষ্ট এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করে। এটি কাউকে কুফরীর দিকেও নিয়ে যেতে পারে কারণ, কোরআন ও সুন্নাহতে যা ভাসাভাসাভাবে প্রতীয়মান হয় তা থেকে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কুফরীর ভিত্তিতেই গ্রহণ করার নামান্তর।”
আশ-শাওক্বানীর সমসাময়িক এই শাইখের কঠোরতার দিকে লক্ষ্য করুন! দুজনের মতের বৈপরীত্যের দিকেও খেয়াল করুন। তিনি চার মাযহাবের বাইরে কিছুর তাক্বলীদ করতে নিষেধ করেন যদিও তা সাহাবার কোন কথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। এর চেয়েও নিকৃষ্ট ব্যাপার এই যে, সহীহ হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সেটার তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি কোরআনের সাথে হলেও।
আরেকটি বাড়াবাড়ি হচ্ছে, চার মাযহাবের বাইরে অবস্থানকারী (এমনকি তা কেবলমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে হলেও) কাউকে পথভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্টকারী মনে করা এবং সেটা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমনটা ভাবা। এসবই হঠকারিতা এবং তা ইজতিহাদী আলেমদের ঐক্যমতের বিরুদ্ধে যায়।
তাক্বলীদ করা আবশ্যক এ মতটি পরবর্তী শতাব্দীতে ধর্মীয় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গৃহীত হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাফ (প্রথম প্রজন্মের) আলেমরা এই রেওয়াজকে খালাফদের (পরবর্তী প্রজন্মের আলেমদের) কাছে পৌঁছে দেন যারা আবার তাদের ছাত্রদের মনে বদ্ধমূল করে দেন যেঃ “যে ব্যক্তি কোন আলেমের তাক্বলীদ করে, সে সালেম (নিরাপদ) অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হয়।”
আমার মনে আছে, আল আযহারের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উলুমুত তাওহীদ ক্লাসে আমি এটি শিখেছিলাম। আমাকে আল ক্বারনীর জাওহারাহ এবং আল বাজুরী কর্তৃক এর ব্যাখ্যা পড়তে হয়েছিল। সেখানে লেখক বলেন,
“মালিক এবং বাকি ইমামগণের
যেমনটি আবুল কাসিমের মত উম্মাহর পথপ্রদর্শক বলেন,
জ্ঞানীদেরও যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রয়োজন
কেননা মানুষ যে শব্দ বুঝে তাতেই বর্ণনা করে”
আবুল কাসিম বলতে এ ছত্রে বিখ্যাত সূফী আল জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে (মৃত্যু ২৯৭ হিজরী) বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুক। এটি এদিকেই ইঙ্গিত করে যে, ফিক্বহের চার মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে যেকোন একজনের তাক্বলীদ করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর বাধ্যতামূলক।
এখানে ইমাম মালিককে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ লেখক একজন মালিকী। লেখকের মতে, তারবিয়্যাতের (আত্মশুদ্ধি) ক্ষেত্রে যেমনটি সূফী ইমামদের অনুসরণ করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে ফিক্বহের ইমামদেরকেও অনুসরণ করতে হবে। আলেমদের প্রতি জুনাইদ এমনই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন – তরীক্বার (পদ্ধতি) নিষ্ঠা, তাঁর দিক-নির্দেশনার গভীরতা, চরমপন্থা ও বিদা’আত থেকে তাঁর সুদূর অবস্থান।
কিছু আলেম আবার আক্বীদার ব্যাপারেও আবুল হাসান আল আশ’আরী বা আবুল মানসুর আল মাতুরিদীর মত সুপরিচিত যেকোন ইমামের অনুসরণ করার কথা বলেন।
মাগরেবে (লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া) আমাদের ইলমী ভাই এবং যায়তুনা, কায়রাওয়ান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বহুল প্রচলিত প্রথা হচ্ছে আক্বীদায় আশ’আরী মাযহাব, ফিক্বহে মালিকী মাযহাব ও আদাবের ক্ষেত্রে জুনাইদের মাযহাব বা সূফী তরীক্বা অনুসরণ করা। আল্লাহ তাঁদের সবার উপর সন্তুষ্ট হন।
এ মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ
১। সবার উপর এমনকি আলেমদের উপরও তাক্বলীদ আবশ্যক হওয়া
২। কেবলমাত্র চার মাযহাবের ইমামদের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। চার মাযহাবের বাইরে অন্য কোন ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হওয়া।
৩। এই চার ইমামের মধ্যে কেবলমাত্র যেকোন একজনের তাক্বলীদ বাধ্যতামূলক হওয়া। তাই এই চার মাযহাবের মধ্যে কোন একটি মাযহাবের কিছু মত সুস্পষ্টভাবে দুর্বল প্রতিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও চার মাজহাবেরই অন্য কোন একটি মাযহাব থেকে মত গ্রহণ করা জায়েজ না হওয়া।
৪। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ রাখা এবং ইজতিহাদের দিকে আহবানের পথ রুখে দাঁড়ানো যদিও তা আংশিক ইজতিহাদ হয়।
৫। নিজের মাযহাবকে অন্য মাযহাব থেকে উত্তম মনে করা আর এভাবে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক মনমানসিকতার কাঠামোতে আটকে যাওয়া।
তাক্বলিদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গীকে অনেক আলেম খন্ডন করেছেন যেমনঃ ইবনে আবদুল বার, ইবনে হাযম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনিল ক্বায়্যিম, আস-সান’আনি, আশ-শাওক্বানী, আদ দেহলভী প্রমুখ।
দ্বিতীয় মতঃ তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ বাধ্যতামূলক
দ্বিতীয় মতটি প্রথম মতের ঠিক উল্টোঃ সকলের জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এবং ইজতিহাদ করা বাধ্যতামূলক। এ মতের অনুসারীগণ প্রত্যেক মুসলিমের উপর সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহ থেকে ফিক্বহী রায় গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক মনে করেন। তাঁরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে চার মাযহাবের অনুসরণকে বাতিল গণ্য করেন এবং যারা চার মাযহাব অনুসরণ করার পক্ষে তাদেরকেও প্রচন্ডভাবে আক্রমণ করেন। সম্ভবত তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তাক্বলীদের উপর আক্রমণ করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে থাকেন যেহেতু তাঁরা মাযহাবগুলোকেই আক্রমণ করে থাকেন। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাদেরকেই আক্রমণ করে বসে থাকেন।
ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ মতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রস্তাবক হচ্ছেন বিখ্যাত যাহেরী ফক্বীহ আবু মুহাম্মাদ ইবনে হাযম। তিনি ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর ‘আল ইহকাম ফি উসূল আল-আহকাম’, তুলনামূলক ফিক্বহের উপর ‘আল মুহাল্লা’, বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মীয় ফেরকার ইতিহাসের উপর ‘আল ফাসল ফিল মিলাল ওয়ান নিহাল’ সহ বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন।
পরবর্তী সময়ের আরেকজন বিখ্যাত আলেম ইমাম শাওক্বানী তাঁর ‘ইরশাদ আল ফুহুল’, ‘আস সাইল আল জাররার’ এবং তাঁর রিসালা ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’ সহ অনেক লেখনীতে এ মতের প্রচার ও প্রসার করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে তাক্বলীদের ধারণাকে প্রত্যাখান করেন যদিও তা ইবনে হাযমের তুলনায় কম আক্রামণাত্মক ছিল।
আমাদের সময়ে আহলে হাদীসদের থেকে একটি দল এ মতের সমর্থক যাদের সম্মুখভাগে রয়েছেন শাইখ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী ও তাঁর অনুসারীগণ।
এই মতানুসারীদের প্রতিপক্ষগণ তাঁদের নাম দিয়েছেন ‘আল লা-মাযহাবিয়্যুন’ তথা লা-মাযহাবী, কেননা এ মতের অনুসারীগণ আলেম-সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সবার জন্য কোন মাযহাব অনুসরণের বিরোধিতা করে থাকেন। এ মতের প্রতিপক্ষগণ বহু প্রবন্ধ ও গ্রন্থের মাধ্যমে এই মতের খন্ডন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ তুরস্কের বিখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ যাহিদ আল কাওছারীর প্রবন্ধ ‘আল লা মাযহাবিয়া ক্বেনতারা ইল্লা আল-লা দ্বীনিয়্যাহ’, হামাওয়ী আলেম শাইখ মুহাম্মাদ আল হামিদের লেখা ও শাইখ মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল বুতীর বই ‘আল লা মাযহাবিয়াহ আখতার বিদা’আহ তাহাদ্দাছ আশ-শারীয়াহ আল ইসলামিয়্যাহ’ প্রভৃতির কথা বলা যেতে পারে।
এই আরেকটি প্রান্তিক মতের খুঁটিনাটি ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ
১। সবার জন্য তাক্বলীদ নিষিদ্ধ এমনকি সাধারণ মানুষের জন্যও যাদের কাছে ইজতিহাদের কোন জ্ঞান নেই।
২। তরুণদের এমন প্রাচুর্য (যারা জ্ঞানে ভাসা ভাসা এবং আচরণে রুক্ষ) যারা মুজতাহিদের পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার দাবী করে থাকে।
৩। তরুণদের দ্বারা পূর্বযুগের বিখ্যাত আলেম ও মুজতাহিদগণকে বাতিল বলে গণ্য করার ধৃষ্টতা।
৪। উম্মাহর ফিক্বহী মাযহাবগুলোর প্রতি অবজ্ঞাভাব যদিও এই মাযহাবগুলো প্রচুর পরিমাণ উপকারী জ্ঞানের উৎস।
৫। এ মতের কিছু কিছু অনুসারীদের মাযহাবসমূহ এবং এগুলোর ইমামদের নিন্দায় সীমা অতিক্রম করা।
৬। এ মতের অনুসারীদের মধ্যে যাহেরী (আক্ষরিক) ধারা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে কেউ কেউ তাদের ‘নব্য-যাহেরী’ হিসেবেও নামকরণ করেছেন।
৭। ফিক্বহের ছোটখাটো মতপার্থক্য নিয়ে উম্মাহর তর্কে-বিতর্কে লিপ্ত থাকা যা অনেক অন্তর্বিরোধের জন্ম দিয়েছে।
৮। এ মতের অনুসারীগণ তাদের সাথে মতভিন্নতা পোষণকারীদের বাতিল হিসেবে গণ্য করে। তারা এ দাবী করে যে, একমাত্র তারাই কোরআন ও সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণ করে থাকে।
ইমাম আশ-শাওক্বানী এবং তাক্বলীদঃ
ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আলী আশ শাওক্বানী (মৃত্যু ১২৫০ হিজরী) ছিলেন হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পুনর্জাগরণ এবং ইজতিহাদের প্রাণপুরুষ যা তাঁর ইজতিহাদের উপর লেখা গ্রন্থসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর ‘আস সাইল আল জাররার’ গ্রন্থটির কথা বলা যেতে পারে যা ‘আল আযহার’ (যায়েদী বা হাদুয়ী ফিক্বহের মৌলিক বই) বইয়ের ব্যাখ্যা যেখানে তিনি স্বাধীন ইজতিহাদের পথে হেঁটেছেন। তিনি কোরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে নিজের ফিক্বহী রায় ব্যক্ত করেন যেগুলো তাঁর সময়কার চার অথবা আট মাযহাবের পরিধির বাইরে ছিল। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে তাঁর ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থটি যেখানে তিনি ইবনে তাইমিয়াহর ‘মুনতাক্বাল আখবার মিন আহাদীস সায়্যিদ আল আখবার’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা করেছেন। এ বইটি সুন্নী এবং অসুন্নী উভয় মাযহাবের জন্য আধুনিক ফিক্বহের উপর গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদে পরিণত হয়েছে। আরেকটি উদাহারণ হচ্ছে তাঁর গ্রন্থ ‘আল দারারী আল মুদিয়্যাহ’ (‘আল দুরার আল বাহিয়্যাহ’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা) যেখানে তিনি তাঁর স্বাধীন ফিক্বহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।
প্রকৃতপক্ষে ইমাম শাওক্বানী তাঁর একের বেশী গ্রন্থে তাক্বলীদের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং স্বাধীন ইজতিহাদের দিকে আহবান করেন। এগুলো হচ্ছেঃ
১। ফিক্বহের উসূলী মূলনীতির উপর তাঁর বিখ্যাত বই ‘ইরশাদ আল ফুহুল’
২। তাঁর বিখ্যাত রিসালাহ ‘আল ক্বাওল আল মুফিদ ফি আদিল্লাতিল ইজতিহাদ ওয়াত তাক্বলীদ’
৩। তাঁর বই ‘আদাব আল তালিব ওয়া মুনতাহা’ল আরাব’
৪। তাঁর সুবিস্তারিত বই ‘আল সাইল আল জাররার’
তাক্বলীদের সমর্থকগণ তাক্বলীদের সমর্থনে যেসব দলিল পেশ করেন আশ শাওক্বানী এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দান করেন যেসব দলিলের মধ্যে রয়েছে কোরআনের আয়াতঃ “তোমরা যদি না জেনে থাকো তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর।” (১৬:৪৩) আর রাসূলের (সাঃ) হাদীছঃ “তারা যদি না জেনে থাকে তবে কি তারা জিজ্ঞাসা করে না? ভ্রান্তির প্রতিষেধক হচ্ছে জিজ্ঞাসা করা”। আশ শাওক্বানী এটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, এসব দলিল সব বিষয়ে কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাক্বলীদ করার কথা বলে না বরং জ্ঞানীদের মধ্যে যার কাছেই যাওয়ার সুযোগ আছে তাকেই জিজ্ঞাসা করার দিকে ইঙ্গিত করে। এটাই নবী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীদের সময়ের চর্চা ছিল।
আশ-শাওক্বানী ইবনিল কায়্যিম, ইমাম ইবনি আবদিল বার, ইবনে হাযম এবং তাঁর আগের অন্যান্য আলেমদের লেখা থেকে উপকৃত হন যারা তাক্বলীদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে নিন্দনীয় বিদা’আত হিসেবে গণ্য করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহর নেয়ামত সুবিস্তৃত এবং এ নেয়ামতকে কোন নির্দিষ্ট যুগের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না বা নির্দিষ্ট এক দল মানুষও এর একচেটিয়া অধিকারী নয়। বরং আল্লাহ যাদেরকেই এ যোগ্যতা দান করেছেন তাদের সবার জন্য এটি উন্মুক্ত।
আশ-শাওক্বানী ইজতিহাদের ডাক দেন এবং নিজেও পুরোপুরিভাবে স্বাধীন ইজতিহাদের চর্চা করেন। তিনি সুপরিচিত কোন মাযহাবেরই অনুসরণ করেন নি – না ফিক্বহের উসূলী মূলনীতিতে না মূল ফিক্বহে – যদিও তিনি শুরুতে ছিলেন একজন যায়েদী। তিনি এমনকি তাঁর নিজের ফিক্বহী মূলনীতি প্রণয়ন করেন যা তিনি ‘ইরশাদ আল ফুহুল ইলা তাহক্বীক আল হাক্ব মিন আল ইলমি আল উসূল’ গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি ফিক্বহের ক্ষেত্রে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মতের (রায়) ব্যবহারের বিরোধিতা করেন এবং আহলুর রায় এর ফিক্বাহকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরিবর্তে তিনি পরিপূর্ণভাবে ওহীর উপর নির্ভরতার ব্যাপারে জোর দেন এই ভিত্তিতে যে দ্বীন ইমামদের মতের ভিত্তিতে নির্মিত হয়নি বরং এটি দ্বীনের মোহর (Seal of the Religion) আল্লাহর রাসূল (সা) এর বর্ণনার ভিত্তিতেই গঠিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন সাধারণ মানুষ যে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা রাখে না তাকে অবশ্যই আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে যারা কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করবেন, নিজেদের মতের ভিত্তিতে নয়।
আমি শাওক্বানীর সাথে কিছু ব্যাপারে একমত আর কিছু ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করি। যে সব বিষয়ে আমি তাঁর সাথে একমত পোষণ করি সেগুলো হচ্ছেঃ
১। আলেমদের প্রতি তাঁর স্বাধীন ইজতিহাদের আহবান
২। উম্মাহর সকলের উপর যারা তাক্বলীদ চাপিয়ে দিতে চান তাদের প্রত্যাখ্যান করা
৩। যারা প্রত্যেকটি বিষয়েই যেকোন একটি মাযহাবের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকাকে প্রয়োজনীয় মনে করে তাদের বিরোধিতা করা
৪। তাদের বিরোধিতা করা যারা কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট মাযহাবকে কঠোরভাবে অনুসরণ করেন এমনকি সে মাযহাবের কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে ঐ মাযহাবের উৎসসমূহের দুর্বলতা তাদের সামনে পরিস্কারভাবে তুলে ধরার পরেও
৫। দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর পর ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে এমন ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা
৬। মানুষের মতের উপর কোরআন ও সুন্নাহকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য উম্মাহ্র প্রতি তাঁর আহবান
যাহোক, সাধারণ মানুষের উপর তাক্বলীদ ও যেকোন একটি মাযহাব অনুসরণ করার উপর তাঁর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে আমার দ্বিমত রয়েছে। সাধারণ মানুষের আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ, আহমেদ, যাইদ, আল হাদি, জাফর, জাবির এবং অন্যান্য যেকোন একজন ইমামকে অনুসরণ করা ও তাঁর মাযহাব আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে আমি কোন সমস্যা দেখি না। শরীয়াহ অনুসারে তা বৈধ কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণ মানুষের কোন মাযহাব নেই- এ মতটিই অগ্রাধিকার পায়। বরং আলেমদের মধ্য থেকে যার কাছ থেকে সে জিজ্ঞাসা করছে সে আলেমের মাযহাবই তার মাযহাব। এভাবে সে তার মাযহাব থেকে অন্য মাযহাবে যেতে পারে এবং আলেমদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা তাকেই যেকোন প্রয়োজনীয় বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারে। এমনকি সে ক্ষেত্রবিশেষে নিজের মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবও অনুসরণ করতে পারে যদি সে বিশ্বাস করে অন্য মাযহাবের আরো শক্ত দলিল রয়েছে।
ফিক্বহে স্বাধীন আইনী যুক্তিতর্ক (legal reasoning) এবং মত (রায়) ব্যবহারকে শারীয়াহ বিরোধী প্রতিপন্ন করে ইমাম শাওক্বানী যে অবস্থান নিয়েছেন সে ব্যাপারেও আমার দ্বিমত রয়েছে। প্রকৃত বাস্তবতা এটাই যে, মত বা রায় ছাড়া কোন ফিক্বহ নেই। নিন্দনীয় রায় হচ্ছে সেটিই যা সুস্পষ্টভাবে নুসুসের (কোরআন ও সুন্নাহ) বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু যে সকল বিষয়ে নুসুসের কোন বক্তব্য নেই সে সকল বিষয় বুঝতে এবং নুসুসকে এর বুনিয়াদী ভিত্তি ও মাক্বাসিদ আশ-শারীয়াহর আলোকে অনুধাবন করতে রায় অপরিহার্য। এছাড়াও রায় আবশ্যক যেখানে আইনী প্রশস্ততা বিদ্যমান থাকার দরুণ কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যায় অথবা যেসব বিষয়ে অবশ্য পালনীয় এমন পরিষ্কার নির্দেশনামূলক (কাতঈ) আয়াত ও হাদীস বিদ্যমান নেই। আর এই রায় গঠিত হয় নিম্নরূপেঃ
১। কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তি করে ক্বিয়াসের (সাদৃশ্যতার উপর ভিত্তি করে যুক্তিতর্কের একটি পদ্ধতি) মাধ্যমে অথবা
২। ইসতিহসানের (আইনী অগ্রাধিকার) মাধ্যমে যা হচ্ছে একটি শক্তিশালী কিন্তু অস্পষ্ট ক্বিয়াসের জন্য দুর্বল কিন্তু স্পষ্ট ক্বিয়াসকে এড়িয়ে যাওয়া অথবা
৩। ইসতিসলাহের (বৃহত্তর কল্যাণের খোঁজ করা) মাধ্যমে যা হচ্ছে আইনী শর্তসমূহ মাথায় রেখে সার্বজনীন কল্যাণের জন্য কাজ করা বা
৪। ‘উরফের (প্রচলিত প্রথা) মাধ্যমে, একে নিজের স্থানে রেখে অথবা
৫। সাদ আল-জারাঈ (খারাপের দিকে ধাবিত করে এমন পথ রুদ্ধ করা) অথবা
৬। ইসতিসহাবের মাধ্যমে (ধারবাহিকতার অনুমতি) ইত্যাদি।
এ সবগুলোর প্রয়োগে রায়ের ব্যবহার জড়িত। ফক্বীহগণ কি আসলেই এটি ব্যবহারের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন? একইভাবে উমর, উসমান, আলী, ইবনে মাস’উদ, যায়েদ, ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্যদের ফিক্বহ কি রায় থেকে মুক্ত?
এমনকি রায় ছাড়া কি কোরআন-সুন্নাহ সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব? রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীরা বনু কুরাইজার পথে আসরের সালাত আদায় করার সময় কি রায়ের ব্যবহার করেন নি? ইবনে তাইমিয়্যাহ এর মতে, তারা তাদের চাইতে বেশী সঠিক ছিলেন যারা সালাতের সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পর গন্তব্যে পৌঁছে সালাত আদায় করেছিলেন।
মাক্বাসিদ আস শারীয়াহ কি কোরআন-সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে রায় ব্যবহারের উদাহারণ নয়?
দুর্ভিক্ষের সময় উমর (রাঃ) কর্তৃক চুরির হদ্দের সাময়িক রহিতকরণ কি রায়ের উদাহরণ নয়? রক্তপণের দায়িত্ব গোত্র থেকে রাষ্ট্রের উপর স্থানান্তরের তাঁর যে সিদ্ধান্ত তা কি রায়ের উদাহরণ নয়? ইরাকের কিছু বিজিত এলাকা মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে বন্টন করার বিরুদ্ধে উমরের সিদ্ধান্ত কি রায়ের নমুনা নয়? মুসলিম নারীদের উপর প্রভাবের ভয়ে তাঁর কর্তৃক আহলে কিতাবের নারীদের বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা কি রায় ছিল না? বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত দেয়ার পরও উত্তরাধিকার আইনে আপন ভাইদের সাথে মায়ের দিক থেকে সৎ ভাইদের অন্তর্ভুক্তিকরণ কি রায়ের একটি নমুনা ছিল না?২
স্বামীর মৃতপ্রায় মুমূর্ষ অবস্থায় দেয়া তালাক কার্যকর হয় না- উছমান (রাঃ) এর এই মত কি রায়ের উদাহারণ ছিল না?৩ এ বর্ণনা কি পাওয়া যায় না যে, আবু বকর ও অন্যান্য সাহাবীরা বলতেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ফতোয়া দেই। যদি তা সঠিক হয় তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যদি তা ভুল হয় তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সকল ত্রুটির ঊর্ধ্বে।”
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কি মুয়াযকে (রাঃ) ইয়েমেনে পাঠানোর সময় তাঁর জবাব গ্রহণ করেন নি? তিনি (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি দ্বারা বিচারকর্ম সম্পাদন করবে?” মুয়ায (রাঃ) জবাব দিলেন যে, তিনি আল্লাহর কিতাব দ্বারা বিচার করবেন, অতপর রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ দ্বারা বিচার করবেন। যদি আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহতে সমাধান পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে তিনি বলেন, “আমি আমার রায় দ্বারা ইজতিহাদ করবো।”
সাহাবারা কি নিজেদের রায় এবং বোঝাপড়ার ভিন্নতার কারণে কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন নি?
তৃতীয় মতঃ যারা ইজতিহাদ করার যোগ্যতায় পৌঁছেনি তাদের জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয়া
এই মতটি এর অনুসারীদের উপর প্রথম মতের মত তাক্বলীদ চাপিয়ে দেয় না আবার দ্বিতীয় মতের মত একে নিষিদ্ধও গণ্য করে না। বরং, এটি কারো কারো জন্য তাক্বলীদের অনুমতি দেয় এবং অন্যদের জন্য তা নিষিদ্ধ করে। ইমাম হাসান আল বান্না এ বিষয়টি তাঁর ‘বিশটি মূলনীতি’ প্রবন্ধের একটি মূলনীতির আলোচনায় আলোকপাত করেছেনঃ
“ফিক্বহ ও ফিক্বহী রায় আহরণ করার পেছনের যুক্তি বোঝার যোগ্যতা অর্জন করে নি এমন প্রত্যেক মুসলিমের উচিত ইসলামী ফিক্বহের মহান ইমামদের অনুসরণ করা। একজন ইমামকে অনুসরণ করার সময় তাঁর যুক্তিতর্ককে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। একবার যখন সে ইমামের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, তখন সে ইমামের যথার্থ যুক্তির ভিত্তিতে দেওয়া যেকোন পথনির্দেশ মেনে চলা উচিত। একইসাথে একজন মুসলিমের উচিত ফিক্বহ ও ফতোয়া আহরণের যুক্তিতর্ক বোঝার পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য দরকারী চেষ্টাসাধনা করা।”
এভাবে হাসান আল বান্না তাক্বলীদ বা মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক করেন নি আবার একে নিষিদ্ধও করেন নি। বরঞ্চ তিনি এর অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু তা সবার জন্য নয়। এটি বৈধ “এমন সব মুসলিমদের জন্য যারা ফিক্বহী রায় আহরণ করার পর্যায়ে পৌঁছে নি” তথা সাধারণ মানুষ এবং তাদের মত লোকদের জন্য যারা কোরআন ও সুন্নাহ থেকে হুকুম আহরণের যোগ্য নয় অথবা ইজমা, ক্বিয়াস এবং মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য পদ্ধতি যেমন ইসতিসলাহ, উরফ, ইসতিসহাব ও পূর্ববতী সময়ের শরীয়াহ এসব সম্পর্কে জানার যোগ্যতা রাখে না।
অনুসরণ (ইত্তেবা) বনাম অন্ধ অনুকরণ (তাক্বলীদ)
উস্তায হাসান আল বান্না প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে তাঁর “মূলনীতি” প্রবন্ধে ‘তাক্বলীদ’ শব্দটির জায়গায় ‘ইত্তিবা’ শব্দটির প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুসলিমরা ফিক্বহের মহান ইমামদের যেকোন একজনকে অনুসরণ (ইয়াত্তাবি’উ) করবে।” কোরআনও নানা প্রসঙ্গে ‘ইত্তিবা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে যা একে প্রশংসনীয় ও আইনগতভাবে বৈধ করে তুলেছে।
এটি ইব্রাহীম (আঃ) এর উদ্ধৃতিতেও দেখা যায়ঃ “হে আমার পিতা, নিশ্চয়ই আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসে নি। অতএব আমাকে অনুসরণ করুন। আমি আপনাকে সোজাপথের দিকে ধাবিত করবো।” (কোরআন ১৯:৪৩)। এই আয়াত কোন নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে জ্ঞানহীন একজনকে আহবান করছে অন্য এমন একজনকে অনুসরণ করতে যে ঐ বিষয়ে জ্ঞানী।
আমরা মূসা (আঃ) এবং আল্লাহর বিখ্যাত সৎকর্মশীল বান্দা খিযির এর কাহিনীতেও দেখিঃ “তাঁরা আমার বান্দাদের মধ্য থেকে একজনকে খুঁজে পেল যাঁকে আমি নিজের অনুগ্রহ দান করেছিলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলাম। মূসা তাঁকে বলল, “আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি যাতে আপনাকে হিদায়াতের যা কিছু শেখানো হয়েছে তা থেকে আমাকেও কিছু শেখাবেন?” (কোরআন ১৮:৬৫-৬৬)
মূসা (আঃ) খিযিরকে অনুসরণ করার (ইত্তিবা’ইহি) অনুমতি চাইলেন যাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে যে জ্ঞান দিয়েছেন তা থেকে শিখতে পারেন। এটা প্রমাণ করে, ক্ষেত্র বিশেষে জ্ঞানীকে অনুসরণ করা নিন্দনীয় নয়।
ইমাম আবু উমার ইবনে আবদুল বার বলেন, “জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিষ্কার ধারণা অর্জন; কোন জিনিসকে এর প্রকৃতরূপে অনুধাবন করা। যখন কোন জিনিসকে কারো সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়, সে তা জানতে পারে। আলেমরা বলেন, যারা তাক্বলীদ করে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই।”
আবু আবদুল্লাহ বিন খুয়াইজ মিনদাদ আল বাসরী আল মালিকী বলেন, “তাক্বলীদ হচ্ছে এমন কোন মতকে অনুসরণ করা যা কোন দলিল দ্বারা সমর্থিত নয়। কিন্তু ইত্তিবা’ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে এই মতটি আইনী ন্যায্যতার ভিত্তিতে গৃহীত। দ্বীনে ইত্তিবা অনুমোদিত কিন্তু তাক্বলীদ অনুমোদিত নয়।”
তথ্যসূত্রঃ
১। প্রবন্ধটি মূলত ‘কাইফা নাতা’আমাল মা’আত তুরাছ ওয়াল তামাযুব ওয়াল ইখতিলাফ’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে (পৃষ্ঠা ৬২-৭৩)
২। এটি ইসলামী উত্তরাধিকারী আইনের একটি বিশেষ পরিস্থিতি (আল মাসলাহা আল হিমারিয়াহ)
৩। এটিকে তালাক্ব আল ফার্ (এড়ানোর জন্য তালাক্ব) বলে যেখানে কেউ স্বীয় উত্তরাধিকার থেকে তার স্ত্রীর অংশ লাভের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যেতে চায়
প্রসঙ্গ: মুহাম্মদ বিন আল-হাসান আশ-শায়বানী যার উপর হানাফী মাযহাবের সনদ নিহিত। আসুন দেখি তার সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মন্তব্য কি?
ভূমিকা: কোন প্রতিষ্ঠিত ইমামদের সম্পর্কে সমালোচনা তুলে ধরতে ভাল লাগে না। কিন্তু নিজেদের মাযহাবকে শ্রেষ্ঠ বানাতে গিয়ে কোন ইমাম সম্পর্কে অতিরঞ্জণ করা হয়, যা সঠিক নয়। আমাদের নবী (সা
মুহাম্মদ বিন আল-হাসান আশ-শায়বানী সম্পর্কে রিজাল শাস্ত্রবিদদের মন্তব্য:
১. ইমাম যাহাবী (র) বলেছেন,
محمد بن الحسن الشيباني أبو عبدالله أحد الفقهاء، لينه النسائي وغيره من قبل حفظه، يروى عن مالك بن أنس وغيره كان من بحور العلم والفقه، قوياً فى مالك"
[[ميزان الاعتدال: ج٣ ص٥١٣ت٧٣٧٤
“মুহাম্মাদ বিন হাসান আল শায়বানি ছিলেন (আহুলুর রায়দের মধ্যকার) ফকীহ। ইমাম নাসাঈ এবং অন্যান্যরা তাকে তার (দূর্বল) স্মৃতিশক্তির কারনে দুর্বল বলেছেন। তিনি ইমাম মালিক এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে বর্ণনা করতেন, এবং তিনি (যাহাবীর মতে) ছিলেন জ্ঞান ও ফীকহের সমূদ্র। (শুধু) (ইমাম) মালিক থেকে তার বর্ণনাগুলো শক্তিশালী” (মীযানুল ই’তিদাল)
-> ইমাম যাহাবীর এই বক্তব্য অনুসারে, তিনি শুধু ইমাম মালিক থেকে বর্ণনার ক্ষেতে শক্তিশালী। ইমাম আবূ হানিফা (র) সহ অন্যন্যা মুহাদ্দীসদের থেকে বর্ণিত তার রেওয়াত দূর্বল।
২. ইমাম আবূ হানিফা (র) এর ছাত্রদের সম্পর্কে ইমাম নাসাঈ (র) বলেন,
والضعفاء من أصحابه: يوسف بن خالد السمتي كذاب، والحسن بن زياد اللؤلؤي كذاب خبيث ومحمد بن الحسن ضعيف
"এবং তাঁর দুর্বল ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেঃ ইউসুফ বিন খালিড আল-সামতি - কাজ্জাব (মিথ্যুক), আল-হাসান বিন যাইয়াদ আল-লু'লুই - কাজ্জাব (মিথ্যুক), খবীস, এবং
মুহাম্মদ বিন আল-হাসান - যঈফ (দুর্বল)।"
[জুয ফি আখির কিতাব আল-দু'আফা ওয়াল মাতরুকীন, পৃ:২৬৬]
>> ইমাম নাসাঈ (র) এর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় মুহাম্মদ শায়বনী সার্বিকভাবেই দুর্বল - তার বর্ণনা ইমাম মালিক (র) থেকেই হোক আর যার থেকেই হোক। শাওয়াহিদ ও মুতা’বিয়াত ছাড়া তার বর্ণনা গ্রহণ করা যাবে না।
৩. ইমাম শাফেয়ী (র.) মুহাম্মাদ শায়বানীর (র.) নিকট অধ্যয়ন করেছেন বলে যে কথা প্রচলিত রয়েছে সেটা সঠিক নয়। কারন এটা বর্ণনা করেছেন এক রাফেযী এবং ইমাম তাইমিয়াহ তাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন: এটা সত্য নয়, বরং (ইমাম শাফেয়ী) তার সাথে বসেছেন, তার তরীকাহ জেনেছেন, এবং তার সাথে ডিবেট করেছেন; তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মুহাম্মাদ ইবনে হাসান শায়বানীর সাথে দ্বিমত করেছেন এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন.....[দেখুন আল-সুন্নাহ আল-নবাবিয়্যাহ, ৪/১৪৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ,লেবানন থেকে প্রকাশিত)
৪. ইবনে আদী বলেন:
قال ابن عدي: ومحمد لم تكن له عناية بالحديث وقد استعنى أهل الحديث عن تخريج حديثه
মুহাম্মদ (বিন আল হাসান) হাদীসের প্রতি মনযোগ দিত না (অর্থাৎ কিয়াস ও মতমতের উপর মনযোগ দিত) এবং আহলে-হাদীসগণ তার বর্ণিত হাদীস উপর নির্ভরতা থেকে মূক্ত থাকতেন।
(আসকালানী, লিসানুল মিযান; আল-কামীল (ইবনে আদী), ৬/২১৮৪)
৫. ইমাম তিরমিযি র. বলেন,
وقال أبو إسمعيل الترمذي: سمعت أحمد بن حنبل يقول: كان محمد بن الحسن في الأول يذهب مذهب جهم
আমি আহমদ বিন হানবল র. থেকে শুনেছি যে, শুরুতে মুহাম্মদ বিন আল-হাসান জাহমিয়াদের মাযহাব অনুসরণ করতেন।
(লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ, ২/১৭৯, এর সনদ হাসান লিযাতিহী)
৬. ইমাম আহমদ বিন হানবল থেকে হান্বল বিন ইসহাক্ব বর্ণনা করেছেন যে:
وقال حنبل بن إسحاق عن أحمد: كان ابو يوسف مضعفاً في الحديث وأما محمد بن الحسن وشيخه فكانا مخالفين للأثر
“আবূ ইউসূফ হাদীসে দুর্বল ছিলেন, কিন্তু মুহাম্মদ বিন আল-হাসান এবং তার শিক্ষক উভয়েই হাদীস ও আসারের বিরোধিতাকারী ছিলেন।”
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৭৯, সনদ সহীহ]
৭. ইমাম যুরাহ আর-রাযী র. বলেন,
وقال سعيد بن عمرو البرذعي: سمعت أبا زرعة الرازي يقول: كان محمد بن الحسن جهمياً وكذا شيخه وكان أبو يوسف بعيداً من التجهم
“মুহাম্মদ বিন আল-হাসান এবং তার শিক্ষক, উভয়েই জাহমী ছিলেন, কিন্তু আবূ ইউসূফ জাহেম থেকে দূরে ছিলেন।”
[লিসানুল মিযান; কিতাব আদ-দুয়াফা (আবী যুরআ আর-রাযী) ৫৭০ পৃ:, সনদ সহীহ]
৮. যিকরিয়াহ আস-সাজি বলেন:
وقال زكريا الساجي: كان مرجئاً
মুহাম্মদ (বিন আল হাসান) মুর্জিয়া ছিলেন।
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৭৯]
৯. মুহাম্মদ বিন সা’দ আস-সুফী বলেন:
وقال محمد بن سعد الصوفي: سمعت يحي بن معين يرميه بالكذب
আমি ইবনে মাঈন থেকে শুনেছি, তিনি তাকে কাযযাব/মিথ্যাবাদী বলতেন।
[লিসানুল মিযান]
১০. আল-আহওয়াস বিন আল-ফাদাল আল-আ’ই, তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে:
وقال الأحوص بن الفضل العلائي عن أبيه حسن اللؤلؤي ومحمد بن الحسن ضعيفان
হাসান আল-লু’লুই এবং মুহাম্মাদ বিন আল হাসান উভয়েই যঈফ।
وكذا قال معاوية بن صالح عن بن معين
অনুরূপ কথা মু’আবিয়াহ বিন সালিহ, ইবনে মাঈন থেকে বর্ণনা করেছেন।
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৮০]
১১. ইবনে আবি মারইয়াম, ইবনে মাঈন থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
وقال بن أبي مريم عنه ليس بشيء ولا يكتب حديثه
“সে (মুহাম্মাদ বিন হাসান) কিছুই নয়, তার হাদীস লেখা উচিত নয়।”
[লিসানুল মিযান, তারীখে বাগদাদ ২/১৮০,১৮১. সনদ হাসান]
১২. উমরো বিন আলী (আল-ফালাস) বলেন,
وقال عمرو بن علي ضعيف
‘‘সে দুর্বল”
[লিসানুল মিযান; তারীখে বাগদাদ ২/১৮১, সনদ সহীহ]
১৩. ইমাম আবূ দাউদ র. বলেন,
قال أبو داود لا يستحق الترك وقال عبد الله بن علي المديني عن أبيه صدوق
‘‘সে কিছুই নয়, তার হাদীস লেখা যাবে না”
১৪. ইমাম আল-উকাইলী কিতাব আদ-দু’য়াফা তে তাকে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন:
وذكره العقيلي في الضعفاء وقال حدثنا أحمد بن محمد بن صدقة سمعت العباس الدوري يقول سمعت
يحيى بن معين يقول جهمي كذاب
আহমদ বিন মুহাম্মাদ বিন সাদক্বাহ আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন; তিনি আব্বাস আদ-দাউরী থেকে শুনেছেন; তিনি ইয়াহহিয়া বিন মাঈন থেকে বর্ণনা করেছেন; বিন মাঈন বলেছেন: (মুহাম্মদ বিন আল-হাসান) একজন জাহমী ও কাযযাব।
[লিসানুল মিযান; কিতাব আদ-দু’য়াফা (আল উকাইলী); ৪/৫২, সনদ সহীহ]
এবং আল-উকাইলী, আসাদ বিন উমরো এর সনদে বলেছেন:
ومن طريق أسد بن عمر وقال هو كذاب
(মুহাম্মদ বিন আল-হাসান) হল কাযযাব।
১৫. ইমাম আল-উকাইলী ইমাম আব্দুর রহমান বিন মাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন,
من طريق عبد الرحمن بن مهدي دخلت عليه فرأيت عنده كتابا فنظرت فيه فإذا هو قد أخطأ في حديث وقاس على الخطأ فوقفته على الخطأ فرجع وقطع من كتابه بالمقراض عدة أوراق
لسان الميزان: ١٢٢/٥
ইমাম আল-উকাইলী ইমাম আব্দুর রহমান বিন মাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি তার (মুহাম্মদ বিন আল হাসান) নিকট গেলাম, এবং তার নিকট একটি বই দেখতে পেলাম। আমি দেখলাম যে তিনি হাদীসে একটি ভুল করেছেন, এবং তিনি ঐ ভুল হাদীসের উপর কিয়াস করছেন। তাই আমি তাকে তার ভুল সম্পর্কে বললাম, ফলে তিনি তার ভুল থেকে ফিরে এলেন, এবং কাঁচি দিয়ে বইয়ের বহু পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেললেন।
[লিসানুল মিযান; কিতাব আদ-দু’য়াফা ৪/৫৪; সনদ সহীহ]
উপরে লিসানুল মিযানে উল্লেখিত জারাহ গুলোর সাথে আরো কিছু জারহ বর্ণনা করা হলো -
১৬. আহলে সুন্নাতের ইমাম - আহমদ ইবনে হানবল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“ليس بشئ ولا يكتب حديثه”
“সে কিছুই না, তার হাদীস লেখা ঠিক নয়।”
[আল-কামিল (ইবনে আদী) ৬/২১৮৩; সনদ সহীহ]
১৭. ইমাম আহমদ র. আরো বলেন,
“لا أروي عنه شيئاً”
“আমি তার নিকট থেকে কিছুই বর্ণনা করি না”
[কিতাব আল-ইলাল ওয়া মা’রিফাত আর-রিজাল (ইমাম আহমদ) ২/২৫৮]
১৮. ইমাম উকাইলী র. মুহাম্মদ বিন আল-হাসান কে তার ‘কিতাব আদ-দু’আফা আল-কাবীর, ৪/৫৫-৫৬’ তে উল্লেখ করেছেন কিন্তু তাকে সত্যায়ন করেন নি।
১৯. হাফিয ইবনে হিব্বান র. বলেন,
محمد بن الحسن الشيباني، صاحب الرأي...... وكان مرجئاً داعياً إليه، وهو أول من رد أهل المدينه ونصر صاحبه يعنى النعمان، وكان عاقلاً ليس في الحديث بشئ كان يروى عن الثقات ويهم فيها فلما فحش ذالك منه استحق تركه من أجل كثرة خطئه لأنه كان داعيةً إلى مذهبهم
“মুহাম্মাদ বিন আল-হাসান আল-শাইবানী, সাহিব আর-রায়, এবং তিনি ছিলেন একজন মুর্জিয়াহ, এবং এর দিকে আহবান করতেন। তিনি ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি মদীনার অধিবাসীদের অসত্য প্রতিপন্ন করতেন, এবং তার সাথী অর্থাৎ আল-নু’মান র. এর পক্ষালম্বন করতেন, সে ছিল বুদ্ধিমান কিন্তু হাদীসে ক্ষেত্রে কিছুই ছিলেন না, তিনি সিকাহ বর্ণনাকারীদের থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন কিন্তু তাতে ভুল করতেন। যখন তার আওহাম (ভুল) বৃদ্ধি পেল, এবং অসংখ্য ভুলের কারনে তিনি পরিত্যক্ত (মাতরূক) ব্যক্তিতে পরিগণ্য হলেন। এবং তিনি তার মাযহাবের (ইরজা) প্রতি আহবানকারী ছিলেন।”
[কিতাব আল-মাজরহীন, ২/২৭৫-২৭৬]
২০. ইমাম জুযজানি বলেন,
أسد بن عمرو و أبو يوسف و محمد بن الحسن و اللؤلؤي قد فرغ الله منهم
“আল্লাহ আসাদ বিন আমর, মুহাম্মদ বিন আল হাসান এবং (হাসান বিন যিয়াদ) আল-লু’লুঈ সহ ধ্বংস করে দিয়েছেন।”
[আহওয়া উর-রিজাল: পৃ: ৭৬, ৭৭]
২১. ইবনে শাহীন তাকে (মুহাম্মদ বিন আল হাসান) তার কিতাব “তারীখ আসমা আদ-দু’য়াফা ওয়াল কাজ্জাবীন’ (পৃ: ১৬৩) অন্তুর্ভূক্ত করেছেন।
সারাংশ:
সুস্টষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে মুহাম্মাদ বিন আল হাসান আশ শায়বানী কে যারা যঈফ ও মাজরূহ বলেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন -
১. ইয়াইহিয়া ইবনে মাঈন র.
২. আহমাদ ইবনে হানবল র.
৩. ইমাম নাসাঈ র.
৪. আবূ যু’রাহ আর-রাযি র.
৫. উমরো বিন আলী আল ফালাস র.
৬. ইবনে হিব্বান র.
৭. আল-উকাইলী র.
৮. ইমাম জযজানী র.
৯. ইবনে শাহীন র.
সুতরাং এই রকম রাবীর উপর যে মাযহাব গঠিত সে মাযহাব কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।।
হানাফী ফিকহ কমিটিতে প্রথম যার নাম আসবে তিনি হলেন আসাদ বিন আমর আবুল মুনযির আল বাজালী।তিনি আবু হানীফা রহ.- এর শাগরিদ। তার বিষয়ে ইমামদের মতামতঃ ১. ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বলেন, তিনি সত্যবাদী। তবে আবু হানীফার ছাত্রদের হতে হাদীছ বর্ণনা করা উচিৎ নয়।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪ } ২. তিনি আবু হানীফার মাযহাবের পক্ষে্য হাদীছ বানাতেন। { আল মাজরুহীন,রাবী নং- ১১৭} ৩. ইমাম ইবনে আবু শাইবাহ বলেন, তিনি আর বাতাস সমান। { যিকরু মান ইখতালাফাল উলামা,১/ ৪১} তার মানে তিনি হাদীছ বর্ণনায় গ্রহণযোগ্য নয়। ৪. ইয়াহইয়া ইবনে মাইন বলেছেন, তার হাদীছ বর্ণনায় সমস্যা নেই।{ তারীখে ইবনে মাইন, রাবী নং-১৭৬২} ৫. অন্যত্র ইবনে মাইন তাকে মহামিথু্যক বলেছেন।{ আল কামিল, রাবী নং- ২১৪} ইবনে মাইনের মিথু্যক বলাই গ্রহণযোগ্য। কারণ এটা জারহ মুফাস্সার। ৬. তার হাদীছ লেখা যাবে না। { ঐ} ৭. তিনি কিছুই নন।{ ঐ} ৮. তিনি যইফুল হাদীছ। { আল জারহু ওয়াত তাদীল, ইবনে আবী হাতিম, রাবী নং- ১২৭৯} ৯. ইমাম বুখারী তাকে যইফ বলেছেন। { তারীখে কাবীর, রাবী নং- ১৬৪৬; আয যুয়াফাউল কাবীর, রাবী নং- ৩৪} ১০. ইমাম নাসাই তাকে শক্তিশালী নন বলেছেন। { আয যুয়াফা ওয়াল মাতরুকীন, রাবী নং- ৫৩} ফিকহ কমিটি যখন প্রতিষ্ঠা হয় তখন তিনি দুনিয়ায় জন্ম নিয়েছিলেন কি না তা আল্লাহই জানেন। তার মৃঃ ১৯০ হিজরীতে। জন্ম সাল জানতে পারি নি।
১। মাযহাবী আর লা-মাযহাবীদের মাঝামাঝি - http://www.bdface.net/blog/blogdetail/detail/4803/TrueIslam/70451#.WCQeBTVuh_k
২। বইঃ হানাফী কেল্লার পোষ্ট মর্টেম (প্রথম খণ্ড) - http://www.mediafire.com/view/af1oh4qx34s3443/Hanafi_Kellar_Post_Mortem_1.pdf
৩। বইঃ আহলেহাদিছ একটি বৈশিষ্টগত নাম
https://ia601500.us.archive.org/10/items/AhlehadeethEktiBoishishtogotoNamByZubairAliZai/ahlehadeeth_ekti_%20boishishtogoto_nam_%E0%A6%86%E0%A6%B9%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%9B_%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF_%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%97%E0%A6%A4_%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE_%20by_Zubair_Ali_Zai.pdf
৪। সুন্নাহর সামগ্রিক ও ভারসাম্যময় উপলব্ধিঃ
http://www.bdfirst.net/blog/blogdetail/detail/7762/alsabanow13/71566#.Vl8n-q_mjVJ
https://www.facebook.com/Aarif.Muslim/videos/904886826231083/?pnref=story
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন