জামায়াত শিবির বিরোধিতার নোংরা স্বরুপঃ প্রসঙ্গ জাতীয়তাবাদ




সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেখেছি জামায়াত শিবিরের বিরোধিতা। বিরোধীতার জন্য মানুষ কত নোংরামী করতে পারে! গতকাল আবার গালি খেলাম জাতীয়তাবাদী বলে! কি আর কমু! যারা আমাদের গনতন্ত্রীপন্থি এবং জাতীয়াতাবাদী বলে গালি দাও তাদের বলছি--- তোমরা যেই স্কুলের ছাত্র জামায়াত শিবির সেই স্কুলের শিক্ষক। স্কুল বললাম এইকারনে যে তোমরা এর বেশী যাবার যোগ্য নও।

জাতি গঠনের মৌলিক উপাদানঃ

বংশের ঐক্যঃ এর ভিত্তিতে বংশীয় জাতীয়তা গঠিত হয়।

স্বদেশের ঐক্যঃ এর ভিত্তিতে অঞ্চল ভিত্তিক জাতীয়তা গড়ে উঠে। যেমন বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ। তবে মুখে বললেও আসলে কিন্তু একথা নিজেরাই মানেনা। বাংলাদেশে বসবাসরত সব ধর্মের লোক নিজেদেরকে একই জাতিভুক্ত মানেনা।

ভাষার ঐক্যঃ এটা চিন্তা ও মতের ঐক্য বিধানের এক বলিষ্ঠ উপায় হওয়ার কারণে জাতি প্রতিষ্ঠার এর বিরাট প্রভাব রয়েছে। এটাও ঐ একই ব্যাপার। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষী লোক আর বাংলাদেশের বাংলাভাষী লোক কি কখনই নিজেদের একই জাতি ভাবে? ভাবতে পারে?

বর্ণের ঐক্যঃ এটা একই বর্ণ বিশিষ্ট লোকদের মধ্যে আত্মীয়তার অনুভূতি জাগিয়ে দেয় এবং এ অনুভূতিই অধিকতর উন্নতি লাভ করে অন্যান্য বর্ণ বিশিষ্ট লোকদের থেকে স্বাতন্ত্র থাকার জন্যে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করে।

অর্থনৈতিক স্বার্থসাম্যঃ এটা এক ধরণের অর্থব্যবস্থার সাথে সংশিষ্ট লোকদেরকে অন্য প্রকার অর্থব্যবস্থার ধারক লোকদের সাথে পৃথক করে দেয়। এর ভিত্তিতে একে অপরের প্রতিকূলে স্বীয় অর্থনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ লাভের জন্যে সংগ্রাম করে।

শাসন ব্যবস্থার ঐক্যঃ এটা একই রাজ্যের অধিবাসী প্রজাগণকে একই প্রকার শাসন-শৃংখলার সম্পর্ক সূত্রে সংযোজিত করে এবং অন্য রাষ্ট্রের প্রজা সাধারণের প্রতিকূলে দূরত্বের সীমা নির্ধারণ করে।

ধর্মঃ এটাই মূল। এই কারনেই আমরা বিশ্বের সমস্ত মুসলিম এক জাতি। জাতি গঠনের এই একটি উপাদানই ইসলাম স্বীকৃত। ইসলামী জাতীয়তাবাদ।

ইসলামী জাতীয়তা কিভাবে গঠিত হলো?

ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে রক্ত, মাটি, বর্ণ ও ভাষার মধ্যে কোনোই বৈষম্য ছিল না। ইরানের সালমান ছিলেন এ জাতির একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। তাঁর বংশ পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, “সালমান বিন ইসলাম”-ইসলামের পুত্র ইসলাম। হযরত আলী (রা.) তাঁর সম্পর্কে বলেতেন, -“সালমান আমাদেরই ঘরের লোক।” বাযান বিন্ সাসান এবং তাঁর ছেলে শাহার বিন্ বাযানও সেই সমাজে বাস করতেন। এরা ছিলেন বাহরামগোর-এর বংশধর। হযরত নবী করীম (সা.) বাযানকে ইয়ামানের এবং তাঁর পুত্রকে ছানয়া’র শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। আবিসিনিয়ার নিগ্রো বিলালও ছিলেন এ জামায়াতেরই একজন। হযরত উমর ফারুক (রা.) তাঁর সম্পর্কে বলতেন-ইনি ‘নেতা’র দাস এবং আমাদেরও নেতা।” রোমের ছোহাইব-ও এ জাতিরই একজন ছিলেন। হযরত উমর (রা.) তাঁকে নিজের স্থানে সালাতের ইমামতি করার জন্যে নিযুক্ত করতেন। হযরত আবু হোযাইফার ক্রীতদাস সালিম সম্পর্কে হযরত উমর জীবনের শেষ মুহূর্তে বলেছেন-“আজও সালিম যদি বেঁচে থাকতো, তাহলে আমার পরবর্তী খলিফার জন্যে আমি তাঁর নাম প্রস্তাব করতাম। যায়েদ বিন হারেসা ছিলেন একজন ক্রীতদাস, (কিন্তু তিনিও ইসলামী জাতির অন্তর্ভূক্ত ছিলেন বলে) হযরত নবী করীম (সা.) তাঁর ফুফাতো ভগ্নি উম্মুল মু’মিনীন হযরত যয়নবকে তাঁর কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। যায়েদের পুত্র উসামাও এ জামায়াতের একজন ‘সদস্য’ ছিলেন-হযরত নবী করীম (সা.) তাঁকে সৈন্যবাহিনীর ‘নেতা’ নিযুক্ত করেছিলেন এবং তাতে হযরত আবু বকর, উমর ফারুক, আবু উবায়দা বিন র্জারাহ্ প্রমুখ শ্রেষ্ঠ সাহাবায়ে কিরাম সাধারণ সৈনিক হিসাবে শরীক ছিলেন। এ উসামা সম্পর্কেই হযরত উমর (রা.) তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহর নিকট বলেছিলেন-“উসামার পিতা তোমার পিতা অপেক্ষা উত্তম ছিলেন এবং উসামা তোমার অপেক্ষা উত্তম।”

মুহাজিরদের আদর্শঃ

ইসলামী আদর্শে গঠিত জাতি বা (জামায়াত) ইসলামের শাণিত তরবারির আঘাতে বংশ, স্বদেশ, বর্ণ ও ভাষা প্রভৃতি নামে অভিহিত সকল দেবতা এবং আবহমানকাল থেকে চলে আসা হিংসা-বিদ্বেষের ভিত্তিসমূহ চূর্ণ করেছে। রাসূলে করীম (সা.) নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করলেন এবং সংগী-সাথীদের নিয়ে মদীনায় হিজরত করলেন। এর অর্থ এই নয় যে, হযরত (সা.) এবং তাঁর সংগী-সাথীদের মনে জন্মভূমির প্রতি কোনো টান-স্বাভাবিক দরদও ছিল না। মক্কা ত্যাগ করার সময় তিনি বলেছিলেনঃ “হে মক্কা, তুমি আমার কাছে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রিয়। কিন্তু কি করবো, তোমার অধিবাসীগণ এদেশে আমাকে থাকতে দিলে না।” হযরত বিলাল (রা.) মদীনায় গিয়ে যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন তিনি মক্কার এক ব্যক্তি একটি জিনিস স্মরণ করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সকল মহান ব্যক্তি একমাত্র ইসলামের জন্যেই হিজরত করেছিলেন এবং সে জন্যে তাঁরে মনে কখনো কোন ক্ষোভ জাগ্রত হয়নি।

আনসারদের কর্মর্নীতিঃ

অন্যদিকে মদীনাবাসীগণ রাসূলে করীম (সা.) এবং অন্যান্য মুহাজিরীনকে বিপুল সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন। তাদের জন্যে নিজেদের জান ও মাল পর্যন্ত অকাতরে উৎসর্গ করেছিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) এ কারণেই বলেছিলেনঃ “মদীনা কুরআনের দ্বারা জয় করা হয়েছে।” হযরত নবী করীম (সা.) আনসার ও মুহাজিরীনকে পরস্পর ভ্রাতৃবন্ধনে বেঁধে দিয়েছিলেন। আর তাঁরাও এমন গভীর ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন যে, দীর্ঘকাল যাবত একে অপরের উত্তরাধিকার (মীরাস) পেয়ে আসছিলেন। অতপর, আল্লাহকে এ আয়াত নাযিল করেই এ কাজ বন্ধ করেছিলেনঃ وَاُولُو الارحام بَعضَهُم اَولى بِبَعضٍ মীরাসের ব্যাপারে রক্ত সম্পর্কই বেশী হকদার। আনসারগণ নিজেদের জমি-তে আধাআধি ভাগ করে মুহাজির ভাইদের মধ্যে বন্টন করেছিলেন। পরে বনী নযীরের ভূমিসহ যখন অধিকার করা হয়, তখন এ জমিগুলোকেও মুহাজির ভাইদের দান করার জন্য আনসারগণ নবী করীম (সা.) এর নিকট দাবী জানিয়েছিলেন। এ আত্মদানের প্রশংসা করে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেনঃ وَيُؤثرونَ على اَنْفُسِهِم وَلو كان بِهِم خِصَاصةٌ -

“তারা নিজেদের অভাব ও কষ্ট থাকা সত্ত্বেও নিজেদের উপর মুহাজিরদেরকে অধিক প্রাধান্য দিচ্ছে।”

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আওফ ও হযরত সা’দ বিন রবী আনসারী পরস্পর ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। অতপর হযরত সা’দ তাঁর এ দ্বীনি ভাইকে অর্ধেক সম্পত্তি দিলেন এবং তাঁর একাধিক স্ত্রীদের মধ্যে থেকে একজনকে তালাক দিয়ে তাঁর নিকট বিবাহ দিতে প্রস্তুত হলেন। নবী করীম (সা.)-এর যুগের মুহাজিরগণই যখন ক্রমাগত খলীফা নিযুক্ত হতে লাগলেন, তখন মদীনার কোনো এক ব্যক্তিও তাদেরকে একথা বলেননি যে, তোমরা বিদেশী লোক, আমাদের দেশে কর্তৃত্ব করার তোমাদের কি অধিকার আছে। রাসূলে করীম (সা.) এবং হযরত উমর ফারুক (রা.) মদীনার অদূরে মুহাজিরদেরকে ভূমি দান করেছিলেন; কিন্তু কোনো আনসার সে সম্পর্কে ‘টু’ শব্দ পর্যন্ত করেননি।

هَل يَجتَمِعًا مَعًا ؟ ألَيْسَ مِنْكُم رَجُلٌ رَشِيْدٌ ؟

অতএব একথা পরিষ্কাররূপে বুঝে নিতে হবে যে, মুসলমানদের মধ্যে ভারতীয়, তুর্কী, আফগানী, আরবী, ইরানী, পাকিস্তানী ও বাংলাদেশী প্রভৃতি হওয়ার অনুভূতি জাগ্রত হওয়া ইসলামী জাতীয়তার চেতনা এবং ইসলামী ঐক্যবোধের পক্ষে অত্যন্ত মারাত্মক এবং ক্ষতিকারক। এটা কেবল বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার ফলই নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও এটা বরাবর অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। মুসলমানদের মধ্যে যখন আঞ্চলিক বা বংশীয় জাতীয়তার হিংসা-বিদ্বেষ জাগ্রত হয়েছে, তখনি মুসলমান মুসলমানদের গলায় ছুরি চালিয়েছে, এবং لاَ تَرجعوا بعدى كَفَّارًا يَضْرِبُ بعضكم رِقاَبَ بَعْضٍ “আমার পরে তোমরা কাফেল হয়ে গিয়ে পরস্পরের গলা কাটতে শুরু করো না।”-নবী করীম (সা.)-এ আশংকাকে বাস্তব করেই ছেড়েছে! কাজেই ইসলামী জাতীয়তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনোরূপ জাতীয়তা-ভৌগলিক, গোত্রীয় বা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার প্রচার যদি করতেই হয়, তা ভাল করেই জেনে শুনেই করা আবশ্যক-জেনে নেয়া আবশ্যক যে, এ ধরণের জাতীয়তার মতবাদ শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রচারিত জাতীয়তার সম্পূর্ণ বিপরীত। (চলবে)


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নির্ভেজাল ইসলামের স্বরুপ সন্ধানে

ইসলাম ও গনতন্ত্র

সাড়ে তিন হাত বডিতে ইসলাম !