মুহাদ্দিস দেহলভী শাহ ওয়াউল্লীলাহ বলেছেনঃ “৪০০ হিজরির পূর্বে মাযহাবের অন্ধ অনুসরন ছিল না”।
মুহাদ্দিস দেহলভী শাহ ওয়াউল্লীলাহ এর উপরক্ত কথা থেকে প্রমানিত হয় যে,
৪০০ হিজরির পূর্বে মাযহাবের নামে গোঁড়ামি করা হত না, মাযহাবের নামে সহীহ
হাদীস অস্বীকার করা হত না। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, মুহাদ্দিস
দেহলভী শাহ ওয়াউল্লীলাহ বলেছেন “মাযহাবের অন্ধ অনুসরন করা হত না” কিন্তু
তিনি এই কথা বলেন নি যে ‘মাযহাবের অনুসরন করা হত না’, এ থেকে স্পষ্ট
প্রমানিত হয় যে, ৪০০ হিজরির পূর্বে মাযহাবের অন্ধ অনুসরন করা হত না কিন্তু
মাযহাবের অনুসরন করা হত।
যারা বলে নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিবঃ
শরীয়ত এ কোন কিছু ওয়াজিব হওয়ার জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের দলিল লাগবে। কেহ কেহ বলে থাকেন যে, ৪ ইমাম মিলে ইজমা করেছেন মাজহাব মানার জন্য, এটি একটি কাল্পনিক কথা। কারণঃ
ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর জন্ম ৮০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৫০ হিজরি তে
ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) এর জন্ম ৯৩ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৭৯ হিজরি তে
ইমাম শাফেঈ(রহ) এর জন্ম ১৫০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২০৪ হিজরি তে
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর জন্ম ১৬৪ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২৪১ হিজরি তে
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে বুঝা যাচ্ছে ইমাম আবু হানিফার সাথে ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ এর দেখাও হয় নি। ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) যখন ইন্তেকাল করেন তখন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর মাত্র ১৫ বছর বয়স।
অর্থাৎ তাদের ইজমা হওয়ার বিষয় তা অবান্তর। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিব নয় বরং মুবাহ অর্থাৎ মানলেও দোষ নেই আবার না মানলেও দোষ নেই, এই বিষয়ে পূর্ববর্তী আলেমদের মতামত সামনে আসবে।(ইন শা আল্লাহ)
যারা বলে ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই ,
ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই এই কথা অবান্তর। কেননা, ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর পরে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার সকল কথাই গ্রহণীয় (ইমাম ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১৪৫)
সাহাবীদেরও ইজতিহাদী বিষয়ে ভুল থাকা স্বাভাবিক। ইমাম আবু হানিফা(রহ) ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) বলেছেনঃ সাহাবীগণ ভুলের উর্ধে না হলেও কোরআন ও হাদীসে বারবার তাদের পরিপূর্ণ মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হয়েছে (আবু বকর সারাখসী,আল-মুহাররার ফী উসুলিল ফিকহ ২/৮১-৯১, আবু হামেদ গাযালী, আল-মুসতাসফা ১/৬১৬-৬২৬, মুহাম্মাদ ইবন হুসাইন আল-জিযানী,মাআলিমু উসুলিল ফিকহি,পৃঃ২২২-২২৭)
যেখানে সাহাবীদের ইজতিহাদে ভুল থাকতে পারে সেখানে ৪ ইমামদের ভুল থাকতে পারে না?
ইমাম আবু হানিফা ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) কোন সালাত আছে বলে মনে করতেন না, কিন্তু সহীহ বোখারী ও সহীহ মুসলিম এ ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত নামে আলাদা অধ্যায়(বা’ব) রয়েছে।
সুনান আবু দাউদ এর ১১৬১,১১৬২,১১৬৩,১১৬৪,১১৬৫,১১৬৬,১১৬৭,১১৬৮,১১৭০,১১৭১,১১৭২,১১৭৩,১১৭৪,১১৭৬ নং হাদীস ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে আমাদের বলছে(এছাড়াও আর অনেক হাদীস রয়েছে)।
তাহলে কি ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর ইজতিহাদ ভুল ছিল না এই ক্ষেত্রে? সম্ভবত ইমাম আবু হানিফার কাছে এসব হাদিস গুল পৌঁছে নি।
ইতিপূর্বে আমি আলোচনা করেছি যে ইমাম মুহাম্মাদ(রহ) ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে মত দিয়েছেন এবং বলেছেন যে ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত ২ রাকাত।
এছাড়াও আমি ইতিপূর্বে আরো আলোচনা করেছি যে, এই ৪ ইমামের অনেক অনুসারী তাদের ইমামের অনেক ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন, এতেই স্পষ্ট হয় যে এই ৪ মুজতাহিদ ইমামদের কিছু ইজতিহাদে ভুল ছিল। তবে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর ইজতিহাদে সবচেয়ে কম ভুল পাওয়া যায়, এর অন্যতম কারণ হল- তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন, তার প্রায় ১০ লক্ষ হাদীস মুখস্ত ছিল। এছাড়াও তিনি ইমাম বোখারী(রহ) এর পণ্ডিত ছিলেন।
ইমামদের(মাজহাব) অনুসরণ করার পদ্ধতিঃ
১. ইমামের ইজতিহাদ সঠিক ও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে এই কথা খেয়াল রেখে তার অনুসরন করা।
২. ইমামের ফতওয়ার পক্ষের দলিল খোজ করা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৩. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে আগে দেখে নেওয়া যে ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল আছে কিনা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৪. ইমামের ফতওয়ার পক্ষে ও বিপক্ষে(অর্থাৎ ২ পক্ষেই) দলিল থাকলে যা উৎকৃষ্ট তা পালন করা আর ২ পক্ষের দলীল সমান পর্যায় এর হলে ইমামের মত অনুসরণ করলে ইমামের অনুসারীদের সাথে ঐক্য থাকবে আর ইমামের মত না মেনে বিপরীত মত মানলেও তা দোষের কিছু নয় (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৫. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে ও ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল না থাকলে ইমামের মতকে বর্জন করা এবং সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে যার ইজতিহাদ রয়েছে(অথবা আলেমকে জিজ্ঞাসা করা) তাকে অনুসরণ করা(সাধারণ মানুষের জন্য) আর তালেবে ইলমদের জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা এবং আলেমদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে কুণ্ঠিত না হওয়া এবং আলেমদের জন্য সরাসরি সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা
উপরোক্ত ৫ টি নিয়ম মেনে চললে কোরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসরণ হবে, অনুসরণ হবে ইমামগণের এবং অনুসরণ হবে পূর্ববর্তি আলেমগণের(ইমাম বোখারী থেকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহাব পর্যন্ত)
কিছু মাসলাতে ২ পক্ষেই সহীহ হাদীস থাকে, সে ক্ষেত্রে যেকোন একটির উপর আমল করলেই চলবে।
নির্দিষ্ট ইমাম(মাজহাব) মানার ক্ষেত্রে ডাঃ জাকির নায়েকের মতঃ
ডাঃ জাকির নায়েক বলেছেনঃ সাধারণের মধ্যে কেউ যদি বিশেষ কোনো ইমামের রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। (লেকচার সমগ্র,ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তি সমূহের জবাব,মুসলিমরা এত দলে বিভক্ত কেন?,পৃঃ-২৩৪) এখানে তিনি মাজহাবকে জাতীয় পরিচয় হিসাবে উল্লেখ্য করতে নিষেধ করেছেন কারণ এতে করে ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
মাজহাব মানা কি বিভক্তি নয়?
আল্লাহ পাক কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমাদের বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন,
যেমনঃ সুরা আনআম এর ১৫৯ নং আয়াত, সুরা রুম এর ৩১-৩২ আয়াত।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন, সুরা আলে ইমরান এর আয়াত ১০৩ নং আয়াতে।
কিন্তু এসব আয়াত ইমামদের সঠিক অনুসরণকারীদের উপর বর্তাবে না। কেননা ইমামদের সঠিক অনুসারীরা কোরআন এবং সুন্নাহ অবশ্যই আঁকড়ে ধরে রাখবে। ইমামদের অনুসরণ করে বলেই একে অপরের সাথে আলাদা হবে না। কারণ মাজহাব দ্বীন নয় বরং মাজহাব হল দ্বীন(ইসলাম) মানার একটি উপায়। আমি আগেই বলেছি যে, কেউ যদি ইজতিহাদ করার ক্ষমতা রাখে তাহলে তার জন্য মাজহাব মানার কোন প্রয়োজন নেই। আবার কোন সাধারণ মানুষ যদি মাজহাব না মানে বরং বর্তমান সময়ের সঠিক আলেমদের অনুসরণ করে তাতেও সমস্যা নেই। তবে বর্তমান সময়ের আলেমগণ কি পূর্ববর্তীদের থেকে বেশী জ্ঞানী?
মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ইমাম বোখারী সহ এত বড় আলেমগণ মাজহাব মানতেন না। মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ডাঃ জাকির নায়েক মাজহাব মানতে নিষেধ করতেন। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে এই পর্যন্ত কোন জ্ঞানী আলেমকে মাজহাবের বিরোধিতা করতে দেখি নি তবে তারা সবাই মাজহাবের অন্ধ ভক্তির(তাকলীদ) বিরোধিতা করেছেন।
কিছু কিছু সময় কিছু কিছু অজ্ঞ মানুষ মাজহাবের মাধ্যমে ইসলামকে বিভক্ত করছেন। যেমনঃ কেউ কেউ বলে থাকেন যে, আমরা হাম্বলীদের জায়গা দেই না। এসব কথা বলা শরীয়াত কখনও সমর্থন করে না,এসব কথার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হবে। আবার কখনো দেখান যায় যে শুধু মাজহাব মানার কারণে লা মাযহাবী ভাইরা তাদের অপছন্দ করে থাকেন,যা কখনও বৈধ নয় তবে যারা তাকলীদ অর্থাৎ অন্ধ অনুসরণ করে তাদের কথা ভিন্ন।
মাযহাব মানা কি ওয়াজিব? এ ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের মতামতঃ
1. Shaykh Al-Islam Imaam Ibn Taymiyyah Says: “it is not obligatory on a layman to follow a Madhab”
অনুবাদঃ শায়খ উল-ইসলাম ইমাম ইবন তায়মিয়্যাহ বলেছেনঃ “সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয়” [Majmu’ah 20/116, 124-126]
2. Ibn al-Humam al-Hanafi says in his Tahrir : “Adhering to a particular Madhab is not obligatory, according to the correct opinion”
অনুবাদঃ ইবন আল-হুমাম আল-হানাফী বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা সঠিক মতামত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়” [Mukhtasar al-Tahrir 103]
3. Ibn Muflih al-Hanbali, in al-Furu’, mentions the difference of opinion amongst the Malikis and Shafi’is, saying: “It not(following a madhab) being obligatory is the most famous opinion”. Al-Mardawi comments: “And this is the correct opinion”.
অনুবাদঃ ইবন মুফলিহ আল-হাম্বলী, মালিকি ও শাফেয়ীদের মধ্যে মতভেদ উল্লেখ করে বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা ওয়াজিব নয়, ইহাই সবচেয়ে বিখ্যাত মতামত”।
এবং তিনি মন্তব্য করেছেনঃ “এবং এটাই সঠিক অভিমত” [আল-ফুরু]
4. Ibn al-Najjar al-Hanbali says: “A layman is not obliged to adhere to a Madhab”
অনুবাদঃ ইবন আন-নাজ্জার আল-হাম্বলী বলেছেনঃ “একজন সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব মানা ওয়াজিব(আবশ্যক) নয়”
5.Ibn Qawan al-Shafi’i says in his al-Tahqiqat, “The truth is that it is not incumbent to adhere to a Madhab; Rather, a person should ask whoever he likes.
অনুবাদঃ ইবন কাওয়ান আল-শাফেয়ী তার আল-তাহকীকাত এ বলেছেনঃ “সত্য হলো মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যক নয়,বরং একজন ব্যাক্তির প্রয়োজন তাকে জিজ্ঞাসা করা, যাকে সে পছন্দ করে” [আল-তাহকীকাত]
6. Mulla ‘Ali al-Qari al-Hanafi says: “It is not obligatory upon anyone from the Ummah to be a Hanafi, or a Maliki, or a Shafi’i, or a Hanbali; rather, it is obligatory upon everyone, if he is not a scholar, to ask someone from Ahl al-Dhikr (people of knowledge), and the four Imams are from amongst the Ahl al-Dhikr.”
অনুবাদঃ মোল্লা আলী আল-কারী আল-হানাফী বলেছেনঃ “এই উম্মাহ(মুসলিম) এর কারো উপর এটি আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয় যে তাকে হানাফী,শাফেয়ী,মালিকী,হাম্বলী হতে হবে; বরং যদি কেউ আলেম না হয়(সাধারন মানুষ) তাহলে তার জন্য আবশ্যক(ওয়াজিব) যে, সে আলেমদের মধ্যে থেকে কাউকে জিজ্ঞাসা করবে, এবং চার ইমাম আলেমদের মধ্য হতেই” [Tuḥfaŧ ‘l-Anām by Muḥammad Ḥayāħ ál-Sindī pg. 33-34,, Dār Ibn Ḥazm Beirut, 1st edition]
উল্লেখ্য যে, উপরের ৬ জন প্রখ্যাত আলেম বলেছেন মাযহাব মানা ওয়াজিব নয়, কিন্তু এটি বলেন নি যে মাযহাব মানা জায়েজ নয় অথবা মাযহাব মানাকে তারা হারাম বলেন নি। অর্থাৎ মাযহাব মানা হালাল তবে ওয়াজিব নয় এবং তারা মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
শেষ কথাঃ
উপরের আলোচনা হতে এটি স্পষ্ট যে, মাজহাব মানা এবং না মানা ২ টাই শরীয়াত সমর্থিত। কাজেই আমরা এই ছোট বিষয়টি নিয়ে একে অপরের প্রতি কোন বিদ্বেষ রাখব না। তবে যারা তাকলীদ(অন্ধ অনুসরণ) করে তাদের বুঝাতে হবে যে তারা ভুল করছে। বর্তমানে শেইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী(রহ) এর তাকলীদ করতেও কাউকে দেখা যায়, এটাও ভুল, এ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। এই বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য আমার একটাই, তা হল মুসলিম উম্মাহ এই ছোট বিষয় নিয়ে বারাবারী করবে না বরং সঠিক ভাবে উভয় পক্ষকে বুঝে নিবে, ইমামদের নামে অন্ধ অনুসরণ বন্ধ করে কোরআন ও সহীহ হাদীসের উপর আমল করবে, ইমামদের পূর্ববর্তী অনুসারীরা যে ভাবে অনুসরণ করেছেন ইমামদের ঠিক সেই ভাবেই অনুসরণ করা। আসুন আমাদের সমাজ থেকে শিরক ও বিদআত দূর করি এবং কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে আমল করি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অধিক জ্ঞাত।
যারা বলে নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিবঃ
শরীয়ত এ কোন কিছু ওয়াজিব হওয়ার জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদিসের দলিল লাগবে। কেহ কেহ বলে থাকেন যে, ৪ ইমাম মিলে ইজমা করেছেন মাজহাব মানার জন্য, এটি একটি কাল্পনিক কথা। কারণঃ
ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর জন্ম ৮০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৫০ হিজরি তে
ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) এর জন্ম ৯৩ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ১৭৯ হিজরি তে
ইমাম শাফেঈ(রহ) এর জন্ম ১৫০ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২০৪ হিজরি তে
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর জন্ম ১৬৪ হিজরি আর তিনি ইন্তেকাল ২৪১ হিজরি তে
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে বুঝা যাচ্ছে ইমাম আবু হানিফার সাথে ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ এর দেখাও হয় নি। ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) যখন ইন্তেকাল করেন তখন ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর মাত্র ১৫ বছর বয়স।
অর্থাৎ তাদের ইজমা হওয়ার বিষয় তা অবান্তর। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন ইমামকে মানা ওয়াজিব নয় বরং মুবাহ অর্থাৎ মানলেও দোষ নেই আবার না মানলেও দোষ নেই, এই বিষয়ে পূর্ববর্তী আলেমদের মতামত সামনে আসবে।(ইন শা আল্লাহ)
যারা বলে ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই ,
ইমামদের ইজতিহাদে ভুল নেই এই কথা অবান্তর। কেননা, ইমাম মালেক ইবন আনাস(রহ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর পরে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার সকল কথাই গ্রহণীয় (ইমাম ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১৪৫)
সাহাবীদেরও ইজতিহাদী বিষয়ে ভুল থাকা স্বাভাবিক। ইমাম আবু হানিফা(রহ) ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) বলেছেনঃ সাহাবীগণ ভুলের উর্ধে না হলেও কোরআন ও হাদীসে বারবার তাদের পরিপূর্ণ মর্যাদার কথা ঘোষণা করা হয়েছে (আবু বকর সারাখসী,আল-মুহাররার ফী উসুলিল ফিকহ ২/৮১-৯১, আবু হামেদ গাযালী, আল-মুসতাসফা ১/৬১৬-৬২৬, মুহাম্মাদ ইবন হুসাইন আল-জিযানী,মাআলিমু উসুলিল ফিকহি,পৃঃ২২২-২২৭)
যেখানে সাহাবীদের ইজতিহাদে ভুল থাকতে পারে সেখানে ৪ ইমামদের ভুল থাকতে পারে না?
ইমাম আবু হানিফা ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) কোন সালাত আছে বলে মনে করতেন না, কিন্তু সহীহ বোখারী ও সহীহ মুসলিম এ ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত নামে আলাদা অধ্যায়(বা’ব) রয়েছে।
সুনান আবু দাউদ এর ১১৬১,১১৬২,১১৬৩,১১৬৪,১১৬৫,১১৬৬,১১৬৭,১১৬৮,১১৭০,১১৭১,১১৭২,১১৭৩,১১৭৪,১১৭৬ নং হাদীস ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে আমাদের বলছে(এছাড়াও আর অনেক হাদীস রয়েছে)।
তাহলে কি ইমাম আবু হানিফা(রহ) এর ইজতিহাদ ভুল ছিল না এই ক্ষেত্রে? সম্ভবত ইমাম আবু হানিফার কাছে এসব হাদিস গুল পৌঁছে নি।
ইতিপূর্বে আমি আলোচনা করেছি যে ইমাম মুহাম্মাদ(রহ) ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত সম্পর্কে মত দিয়েছেন এবং বলেছেন যে ইসতিসকার(বৃষ্টি প্রার্থনার) সালাত ২ রাকাত।
এছাড়াও আমি ইতিপূর্বে আরো আলোচনা করেছি যে, এই ৪ ইমামের অনেক অনুসারী তাদের ইমামের অনেক ফতওয়ার বিরোধিতা করেছেন, এতেই স্পষ্ট হয় যে এই ৪ মুজতাহিদ ইমামদের কিছু ইজতিহাদে ভুল ছিল। তবে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল(রহ) এর ইজতিহাদে সবচেয়ে কম ভুল পাওয়া যায়, এর অন্যতম কারণ হল- তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন, তার প্রায় ১০ লক্ষ হাদীস মুখস্ত ছিল। এছাড়াও তিনি ইমাম বোখারী(রহ) এর পণ্ডিত ছিলেন।
ইমামদের(মাজহাব) অনুসরণ করার পদ্ধতিঃ
১. ইমামের ইজতিহাদ সঠিক ও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে এই কথা খেয়াল রেখে তার অনুসরন করা।
২. ইমামের ফতওয়ার পক্ষের দলিল খোজ করা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৩. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে আগে দেখে নেওয়া যে ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল আছে কিনা (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৪. ইমামের ফতওয়ার পক্ষে ও বিপক্ষে(অর্থাৎ ২ পক্ষেই) দলিল থাকলে যা উৎকৃষ্ট তা পালন করা আর ২ পক্ষের দলীল সমান পর্যায় এর হলে ইমামের মত অনুসরণ করলে ইমামের অনুসারীদের সাথে ঐক্য থাকবে আর ইমামের মত না মেনে বিপরীত মত মানলেও তা দোষের কিছু নয় (তালেবে ইলম ও আলেমদের জন্য)
৫. ইমামের ফতওয়ার বিপক্ষে কোরআন অথবা সহীহ হাদীস থাকলে ও ইমামের ফতওয়ার পক্ষে দলিল না থাকলে ইমামের মতকে বর্জন করা এবং সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে যার ইজতিহাদ রয়েছে(অথবা আলেমকে জিজ্ঞাসা করা) তাকে অনুসরণ করা(সাধারণ মানুষের জন্য) আর তালেবে ইলমদের জন্য কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা এবং আলেমদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে কুণ্ঠিত না হওয়া এবং আলেমদের জন্য সরাসরি সেই কোরআন অথবা সহীহ হাদীসের আলোকে মত গ্রহণ করা
উপরোক্ত ৫ টি নিয়ম মেনে চললে কোরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসরণ হবে, অনুসরণ হবে ইমামগণের এবং অনুসরণ হবে পূর্ববর্তি আলেমগণের(ইমাম বোখারী থেকে ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহাব পর্যন্ত)
কিছু মাসলাতে ২ পক্ষেই সহীহ হাদীস থাকে, সে ক্ষেত্রে যেকোন একটির উপর আমল করলেই চলবে।
নির্দিষ্ট ইমাম(মাজহাব) মানার ক্ষেত্রে ডাঃ জাকির নায়েকের মতঃ
ডাঃ জাকির নায়েক বলেছেনঃ সাধারণের মধ্যে কেউ যদি বিশেষ কোনো ইমামের রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। (লেকচার সমগ্র,ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তি সমূহের জবাব,মুসলিমরা এত দলে বিভক্ত কেন?,পৃঃ-২৩৪) এখানে তিনি মাজহাবকে জাতীয় পরিচয় হিসাবে উল্লেখ্য করতে নিষেধ করেছেন কারণ এতে করে ইসলামে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
মাজহাব মানা কি বিভক্তি নয়?
আল্লাহ পাক কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আমাদের বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন,
যেমনঃ সুরা আনআম এর ১৫৯ নং আয়াত, সুরা রুম এর ৩১-৩২ আয়াত।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন, সুরা আলে ইমরান এর আয়াত ১০৩ নং আয়াতে।
কিন্তু এসব আয়াত ইমামদের সঠিক অনুসরণকারীদের উপর বর্তাবে না। কেননা ইমামদের সঠিক অনুসারীরা কোরআন এবং সুন্নাহ অবশ্যই আঁকড়ে ধরে রাখবে। ইমামদের অনুসরণ করে বলেই একে অপরের সাথে আলাদা হবে না। কারণ মাজহাব দ্বীন নয় বরং মাজহাব হল দ্বীন(ইসলাম) মানার একটি উপায়। আমি আগেই বলেছি যে, কেউ যদি ইজতিহাদ করার ক্ষমতা রাখে তাহলে তার জন্য মাজহাব মানার কোন প্রয়োজন নেই। আবার কোন সাধারণ মানুষ যদি মাজহাব না মানে বরং বর্তমান সময়ের সঠিক আলেমদের অনুসরণ করে তাতেও সমস্যা নেই। তবে বর্তমান সময়ের আলেমগণ কি পূর্ববর্তীদের থেকে বেশী জ্ঞানী?
মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ইমাম বোখারী সহ এত বড় আলেমগণ মাজহাব মানতেন না। মাজহাব মানা যদি বিভক্তি হত তাহলে ডাঃ জাকির নায়েক মাজহাব মানতে নিষেধ করতেন। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে এই পর্যন্ত কোন জ্ঞানী আলেমকে মাজহাবের বিরোধিতা করতে দেখি নি তবে তারা সবাই মাজহাবের অন্ধ ভক্তির(তাকলীদ) বিরোধিতা করেছেন।
কিছু কিছু সময় কিছু কিছু অজ্ঞ মানুষ মাজহাবের মাধ্যমে ইসলামকে বিভক্ত করছেন। যেমনঃ কেউ কেউ বলে থাকেন যে, আমরা হাম্বলীদের জায়গা দেই না। এসব কথা বলা শরীয়াত কখনও সমর্থন করে না,এসব কথার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হবে। আবার কখনো দেখান যায় যে শুধু মাজহাব মানার কারণে লা মাযহাবী ভাইরা তাদের অপছন্দ করে থাকেন,যা কখনও বৈধ নয় তবে যারা তাকলীদ অর্থাৎ অন্ধ অনুসরণ করে তাদের কথা ভিন্ন।
মাযহাব মানা কি ওয়াজিব? এ ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের মতামতঃ
1. Shaykh Al-Islam Imaam Ibn Taymiyyah Says: “it is not obligatory on a layman to follow a Madhab”
অনুবাদঃ শায়খ উল-ইসলাম ইমাম ইবন তায়মিয়্যাহ বলেছেনঃ “সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয়” [Majmu’ah 20/116, 124-126]
2. Ibn al-Humam al-Hanafi says in his Tahrir : “Adhering to a particular Madhab is not obligatory, according to the correct opinion”
অনুবাদঃ ইবন আল-হুমাম আল-হানাফী বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা সঠিক মতামত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়” [Mukhtasar al-Tahrir 103]
3. Ibn Muflih al-Hanbali, in al-Furu’, mentions the difference of opinion amongst the Malikis and Shafi’is, saying: “It not(following a madhab) being obligatory is the most famous opinion”. Al-Mardawi comments: “And this is the correct opinion”.
অনুবাদঃ ইবন মুফলিহ আল-হাম্বলী, মালিকি ও শাফেয়ীদের মধ্যে মতভেদ উল্লেখ করে বলেছেনঃ “একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরন করা ওয়াজিব নয়, ইহাই সবচেয়ে বিখ্যাত মতামত”।
এবং তিনি মন্তব্য করেছেনঃ “এবং এটাই সঠিক অভিমত” [আল-ফুরু]
4. Ibn al-Najjar al-Hanbali says: “A layman is not obliged to adhere to a Madhab”
অনুবাদঃ ইবন আন-নাজ্জার আল-হাম্বলী বলেছেনঃ “একজন সাধারন মানুষের জন্য মাযহাব মানা ওয়াজিব(আবশ্যক) নয়”
5.Ibn Qawan al-Shafi’i says in his al-Tahqiqat, “The truth is that it is not incumbent to adhere to a Madhab; Rather, a person should ask whoever he likes.
অনুবাদঃ ইবন কাওয়ান আল-শাফেয়ী তার আল-তাহকীকাত এ বলেছেনঃ “সত্য হলো মাযহাব অনুসরন করা আবশ্যক নয়,বরং একজন ব্যাক্তির প্রয়োজন তাকে জিজ্ঞাসা করা, যাকে সে পছন্দ করে” [আল-তাহকীকাত]
6. Mulla ‘Ali al-Qari al-Hanafi says: “It is not obligatory upon anyone from the Ummah to be a Hanafi, or a Maliki, or a Shafi’i, or a Hanbali; rather, it is obligatory upon everyone, if he is not a scholar, to ask someone from Ahl al-Dhikr (people of knowledge), and the four Imams are from amongst the Ahl al-Dhikr.”
অনুবাদঃ মোল্লা আলী আল-কারী আল-হানাফী বলেছেনঃ “এই উম্মাহ(মুসলিম) এর কারো উপর এটি আবশ্যিক(ওয়াজিব) নয় যে তাকে হানাফী,শাফেয়ী,মালিকী,হাম্বলী হতে হবে; বরং যদি কেউ আলেম না হয়(সাধারন মানুষ) তাহলে তার জন্য আবশ্যক(ওয়াজিব) যে, সে আলেমদের মধ্যে থেকে কাউকে জিজ্ঞাসা করবে, এবং চার ইমাম আলেমদের মধ্য হতেই” [Tuḥfaŧ ‘l-Anām by Muḥammad Ḥayāħ ál-Sindī pg. 33-34,, Dār Ibn Ḥazm Beirut, 1st edition]
উল্লেখ্য যে, উপরের ৬ জন প্রখ্যাত আলেম বলেছেন মাযহাব মানা ওয়াজিব নয়, কিন্তু এটি বলেন নি যে মাযহাব মানা জায়েজ নয় অথবা মাযহাব মানাকে তারা হারাম বলেন নি। অর্থাৎ মাযহাব মানা হালাল তবে ওয়াজিব নয় এবং তারা মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
শেষ কথাঃ
উপরের আলোচনা হতে এটি স্পষ্ট যে, মাজহাব মানা এবং না মানা ২ টাই শরীয়াত সমর্থিত। কাজেই আমরা এই ছোট বিষয়টি নিয়ে একে অপরের প্রতি কোন বিদ্বেষ রাখব না। তবে যারা তাকলীদ(অন্ধ অনুসরণ) করে তাদের বুঝাতে হবে যে তারা ভুল করছে। বর্তমানে শেইখ নাসীরুদ্দিন আলবানী(রহ) এর তাকলীদ করতেও কাউকে দেখা যায়, এটাও ভুল, এ থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। এই বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য আমার একটাই, তা হল মুসলিম উম্মাহ এই ছোট বিষয় নিয়ে বারাবারী করবে না বরং সঠিক ভাবে উভয় পক্ষকে বুঝে নিবে, ইমামদের নামে অন্ধ অনুসরণ বন্ধ করে কোরআন ও সহীহ হাদীসের উপর আমল করবে, ইমামদের পূর্ববর্তী অনুসারীরা যে ভাবে অনুসরণ করেছেন ইমামদের ঠিক সেই ভাবেই অনুসরণ করা। আসুন আমাদের সমাজ থেকে শিরক ও বিদআত দূর করি এবং কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে আমল করি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অধিক জ্ঞাত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন