বুখারী- মুসলিম শরীফের দুটি জাল হাদীস

হযরত ইবনু মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন- ان الشيطان قد يختار صورة الانسان فياتي الناس و يسمعهم احاديث كذبة

অর্থ- নিশ্চই শয়তান মানুষের আকৃতিতে বিচরন করে এবং সে হাদীসের নামে মানুষের কাছে মিথ‍্যা কথা বলে বেড়ায়।

(ছহীহ মুসলিম শরীফ কিতাবের ১ম খন্ড ৯পৃষ্ঠার মুকাদ্দমায় উল্লেখ রয়েছে)


আরেক বর্ননায় রয়েছে যে,

إن الشيطان ليتمثل في صورة الرجل فيأتي القوم فيحدثهم بالحدث من الكذب فيتفرقون

অর্থ- নিশ্চই শয়তান মানুষের আকৃতি ধারণ করে মানুষদের মধ্যে আগমন করে এবং তাদেরকে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করে। এরপর মিথ্যা হাদীসগুলো শুনে সমবেত মানুষ সমাবেশ ভেঙ্গে চলে যায়।



আরবি ভাষার গ্রামার অনুযায়ি খবর বলা হয় বাক্যের ঐ অংশকে যা সত্য অথবা মিথ্যা হ‌ওয়ার অবকাশ রাখে। কোনোভাবেই শতভাগ সত্য হিসেবে মেনে নেয়া যায়না। ইন্টারেস্টিংলি প্রচলিত হাদিসকে খবর বলা হয়ে থাকে। প্রথম যুগের হাদীসের সকল বিশেষজ্ঞরা হাদীসকে উপরোক্ত অর্থেই ব্যবহার করতেন। বোখারী মুসলিমসহ কোনো সংকলকগণ হাদিসকে অকাট্য ইনফরমেশন হিসেবে বর্ননা করেননি। ওহির মর্যাদা কখনো খবরের মর্যাদার সমপর্যায়ের হতে পারেনা। 



বুখারীর জাল হাদীস


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ:

«كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ يَغْتَسِلُونَ عُرَاةً، يَنْظُرُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ، وَكَانَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ يَغْتَسِلُ وَحْدَهُ... فَذَهَبَ الْحَجَرُ بِثَوْبِهِ، فَخَرَجَ مُوسَى فِي إِثْرِهِ يَقُولُ: ثَوْبِيَ يَا حَجَرُ، ثَوْبِيَ يَا حَجَرُ...»


মুসা (আ.)-এর সম্পর্কে বর্ণিত:

বনী ইসরাইলরা উলঙ্গ হয়ে একসাথে গোসল করত এবং একে অন্যের দিকে তাকাত। কিন্তু মূসা (আ.) একা একা গোসল করতেন। এতে তারা বলতে লাগল, “মূসা একা গোসল করে, নিশ্চয়ই তার শরীরে কোনো ত্রুটি আছে।”

একদিন মূসা (আ.) গোসল করতে গিয়ে তার কাপড় একটি পাথরের ওপর রাখলেন। তখন পাথরটি কাপড় নিয়ে দৌড় দিল!

তখন মূসা (আ.) পাথরের পেছনে দৌড়াতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন:

“হে পাথর! আমার কাপড় দাও, হে পাথর! আমার কাপড় দাও।”

শেষে বনী ইসরাইলরা তাকে দেখে ফেলল এবং বুঝতে পারল তার শরীরে কোনো ত্রুটি নেই। পরে পাথর থেমে গেলে মূসা (আ.) কাপড় নিলেন এবং পাথরটিকে আঘাত করলেন।


বুখারী - হাদীস নং - ২৭৮


=====================================


মুসলিম তাঁর সাহিহ গ্রন্থে (হাদিস নম্বর ২৫০১, ফাজায়িলুস সাহাবা অধ্যায়ের “আবু সুফিয়ানের ফজিলত” শিরোনামের অধ্যায়ে) বর্ণনা করেছেন—


ইকরিমা ইবনু আম্মার → আবু জুমাইল → ইবনু আব্বাস (রাঃ)


ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: মুসলমানরা আবু সুফিয়ান (রাঃ)-এর দিকে তাকাত না, তাঁর সঙ্গে বসত না। তখন তিনি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন—


“হে আল্লাহর নবী! আমি যদি আপনাকে তিনটি অনুরোধ করি, আপনি কি তা মেনে নেবেন?”


নবী (ﷺ) বললেন: “হ্যাঁ।”


(১) তিনি বললেন: “আমার কাছে সমগ্র আরবের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী ও রূপবতী নারী রয়েছে, তিনি হলেন আমার কন্যা উম্মে হাবীবা। আমি কি তাঁকে আপনার সাথে বিবাহ দেব?”


নবী (ﷺ) বললেন: “হ্যাঁ।”


(২) তিনি বললেন: “আমার ছেলে মুয়াবিয়াকে কি আপনি আপনার লেখক বানাবেন?”


নবী (ﷺ) বললেন: “হ্যাঁ।”


(৩) তিনি বললেন: “আপনি কি আমাকে মুসলমানদের আমির নিযুক্ত করবেন, যাতে আমি কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি, যেমন আগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি?”


নবী (ﷺ) বললেন: “হ্যাঁ।”


আবু জুমাইল বলেন: “যদি তিনি (আবু সুফিয়ান) নবী (ﷺ)-এর কাছে এসব দাবি না করতেন, তবে তিনি (নবী) কখনও এসব অনুমোদন দিতেন না। কারণ, আবু সুফিয়ান যখনই কিছু চাইতেন, নবী (ﷺ) তাকে ‘হ্যাঁ’ বলে দিতেন।”


টীকা ও বিশ্লেষণ:


১. হাদিসটি জাল (মওদূ’)

মুহাদ্দিসগণ এই হাদিসকে জাল বা বানোয়াট বলেছেন। ইমাম মুসলিমের সহিহ মুসলিম গ্রন্থে এমন তিনটি জাল হাদিস পাওয়া যায়, এটি তার মধ্যে একটি।


২. হাদিস জাল হওয়ার প্রমাণসমূহ:


উম্মে হাবীবার (রাঃ) বিবাহ অনেক আগে হয়েছিল:

নবী (ﷺ) মক্কা বিজয়ের বহু আগেই উম্মে হাবীবা (রাঃ)-কে বিবাহ করেছিলেন। হাবশায় অবস্থানকালে (যখন আবু সুফিয়ান কাফের ছিলেন) তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তখনই নবী (ﷺ) তাঁর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।


আবু সুফিয়ানের নবীর (ﷺ) শয্যার ঘটনা:

মক্কা বিজয়ের আগে আবু সুফিয়ান (তখনো কাফের ছিলেন) মদিনায় এসে উম্মে হাবীবা (রাঃ)-এর ঘরে ঢোকার চেষ্টা করলে তিনি নবী (ﷺ)-এর শয্যা সরিয়ে দেন, কারণ আবু সুফিয়ান তখনো মুশরিক ছিলেন এবং অপবিত্র (নাজিস) হিসেবে বিবেচিত হতেন।


৩. মুয়াবিয়া (রাঃ) ওহির লেখক ছিলেন না:


এই জাল হাদিসের ওপর ভিত্তি করে কিছু নাসিবি (শিয়াবিরোধী দল) দাবি করে যে, মুয়াবিয়া (রাঃ) ওহির লেখক ছিলেন।


কিন্তু ইমাম ইবনু হাজার (আল-ইসাবাহ) এবং ইমাম যাহাবি (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা) প্রমাণ করেছেন যে, তিনি মূলত রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক কাজের লেখক ছিলেন, ওহির লেখক ছিলেন না।


এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে গ্রন্থ “দাফউ শুবাহিত তাশবিহ” (পৃষ্ঠা ১৮১)-এ।


সারসংক্ষেপ:

এই হাদিস জাল এবং ভিত্তিহীন। এটি মুসলিম শরিফে থাকা জাল হাদিসগুলোর একটি। এতে নবী (ﷺ)-এর জীবনী সংক্রান্ত সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক তথ্যের বিরোধিতা পাওয়া যায়, যা এর জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ।


এই হাদিসকে মুহাদ্দিসগণ জাল (موضوع) বলেছেন মূলত কয়েকটি কারণে:


1. ইকরিমা ইবনু আম্মার দুর্বল (ضعيف) এবং ভুল করার প্রবণতা ছিল।


2. হাদিসটির মাৎন (বিষয়বস্তু) স্পষ্টভাবে ঐতিহাসিক সত্যের বিরোধিতা করে।


3. বিশেষত, উম্মে হাবীবা (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا)-এর বিবাহের সময় সম্পর্কিত তথ্য এবং আবু সুফিয়ানের (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ) চরিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক তথ্য বিদ্যমান।কক{


১. হাদিসের সনদ দুর্বল: ইকরিমা ইবনু আম্মার সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের মতামত


এই হাদিসের মূল বর্ণনাকারী হলেন إكرمة بن عمار। মুহাদ্দিসগণ তাঁর বিষয়ে সমালোচনা করেছেন এবং তাকে দুর্বল (ضعيف) বা সন্দেহজনক (فيه لين) বর্ণনাকারী বলেছেন।


ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল (মৃত. ২৪১ হিজরি):

তিনি বলেন: "إكرمة بن عمار مضطرب الحديث، يحدث بأحاديث مناكير"

অর্থ: "ইকরিমা ইবনু আম্মারের হাদিসে বিশৃঙ্খলা (اضطراب) রয়েছে, তিনি মুনকার (অস্বীকৃত) হাদিস বর্ণনা করেন।"

(সূত্র: العلل ومعرفة الرجال, ইমাম আহমদ, ২/৩৩১, হাদিস ৩৬১৯)


ইমাম আবু দাউদ (মৃত. ২৭৫ হিজরি):

তিনি বলেন: "إكرمة بن عمار في حديثه اضطراب"

অর্থ: "ইকরিমা ইবনু আম্মারের হাদিসে বিশৃঙ্খলা (اضطراب) রয়েছে।"

(সূত্র: سؤالات الآجري لأبي داود, পৃষ্ঠা ২১১)


ইমাম ইবনু মাঈন (মৃত. ২৩৩ হিজরি):

তিনি কখনো বলেছেন "ثقة" (বিশ্বাসযোগ্য), আবার কখনো বলেছেন "فيه ضعف" (তাঁর মধ্যে দুর্বলতা আছে)।

(সূত্র: تاريخ بغداد, ৩/২৯৪)


ইমাম আন-নাসাঈ (মৃত. ৩০৩ হিজরি):

তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন: "ليس بالقوي"

অর্থ: "তিনি শক্তিশালী বর্ণনাকারী নন।"

(সূত্র: الضعفاء والمتروكون للنسائي, পৃষ্ঠা ৭৩, রেওয়ায়েত নং ২৭৪)


সনদের সারসংক্ষেপ:


ইকরিমা ইবনু আম্মার সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ দ্বিধাবিভক্ত হলেও তাঁর বর্ণনায় اضطراب (অবিশ্বাস্য পরিবর্তন), مناكير (অস্বীকৃত বর্ণনা), এবং ضعيف (দুর্বলতা) থাকার কারণে এই হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়।


তিনি এমন ব্যক্তিদের থেকে বর্ণনা করেছেন, যাদের গ্রহণযোগ্যতা সন্দেহযুক্ত।


২. মাৎনের সমস্যা: এই হাদিস ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে


(১) উম্মে হাবীবার বিবাহের সময়কাল


হাদিসে বলা হয়েছে যে, আবু সুফিয়ান নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে উম্মে হাবীবার বিবাহের প্রস্তাব দেন।


কিন্তু উম্মে হাবীবার (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا) বিবাহ হাবশায় ৬-৭ হিজরিতে হয়েছিল, মক্কা বিজয়ের (৮ হিজরি) অনেক আগে।


ইতিহাস অনুসারে, আবু সুফিয়ান তখনও কাফের ছিলেন এবং তিনি এই বিবাহে কোনো ভূমিকা রাখেননি।


বরং নাজাশী (হাবশার রাজা) নিজেই তাঁদের বিবাহের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং নবী (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে দেনমোহরও দেন।


(সূত্র: سيرة ابن هشام, ৪/৩৩৭; الإصابة في تمييز الصحابة, ইবনু হাজার, ৮/৯৫)


(২) আবু সুফিয়ানের নবী (ﷺ)-এর শয্যার ঘটনা


সহিহ সূত্রে পাওয়া যায়: আবু সুফিয়ান (মক্কা বিজয়ের আগে) মদিনায় এসে উম্মে হাবীবা (রাঃ)-এর ঘরে গেলে, তিনি নবীর (ﷺ) শয্যা সরিয়ে দেন।


কারণ, তখন আবু সুফিয়ান ছিলেন মুশরিক এবং তিনি অপবিত্র (نجس) বলে বিবেচিত হতেন।


এটা প্রমাণ করে যে, নবী (ﷺ)-এর সাথে উম্মে হাবীবার বিবাহের ব্যাপারে আবু সুফিয়ানের কোনো ভূমিকা ছিল না।


(সূত্র: سنن أبي داود, হাদিস ২৬৬২; الطبقات الكبرى لابن سعد, ৮/৯৭)


(৩) মুয়াবিয়া (রাঃ) ওহির লেখক ছিলেন না


এই হাদিস থেকে কিছু গোষ্ঠী মুয়াবিয়াকে (রাঃ) ওহির লেখক বলে দাবি করে, যা ভুল।


মুহাদ্দিস ইবনু হাজার (م ৮৫২ হিজরি) বলেন:

"মুয়াবিয়া ওহির লেখক ছিলেন না; বরং তিনি রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক লেখক ছিলেন।"

(সূত্র: الإصابة في تمييز الصحابة, ৬/১২৫; سير أعلام النبلاء للذهبي, ২/৩৭৪)


৩. মুহাদ্দিসগণের সিদ্ধান্ত: এই হাদিস জাল (موضوع)


(১) ইমাম দারকুতনি (মৃত. ৩৮৫ হিজরি):


তিনি বলেন: "هذا حديث موضوع، وإكرمة بن عمار ليس بحجة"

অর্থ: "এই হাদিস জাল এবং ইকরিমা ইবনু আম্মার حجّة (প্রমাণযোগ্য বর্ণনাকারী) নন।"

(সূত্র: العلل للدارقطني, ৫/২৭৮)


(২) ইমাম ইবনুল জাওজি (মৃত. ৫৯৭ হিজরি):


তিনি বলেন: "هذا الحديث لا يصح، وإكرمة بن عمار ضعيف عند أهل العلم"

অর্থ: "এই হাদিস সহিহ নয়, এবং ইকরিমা ইবনু আম্মার মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে দুর্বল।"

(সূত্র: الموضوعات, ১/৪৩৫)


(৩) ইমাম যাহাবি (মৃত. ৭৪৮ হিজরি):


তিনি বলেন: "هذا خبر لا أصل له، ومتن الحديث باطل"

অর্থ: "এই খবরের কোনো ভিত্তি নেই, এবং হাদিসের মাৎন বাতিল।"

(সূত্র: ميزان الاعتدال, ৩/৯২)


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত


এই হাদিসের সনদে ইকরিমা ইবনু আম্মার রয়েছেন, যিনি দুর্বল ও ভুল করার প্রবণতা সম্পন্ন বর্ণনাকারী। মাৎনও স্পষ্টভাবে ভুল ও ঐতিহাসিক সত্যের বিরুদ্ধে। তাই মুহাদ্দিসগণ সর্বসম্মতিক্রমে একে জাল (موضوع) বলেছেন।


প্রধান রেফারেন্সসমূহ:


1. العِلَل ومعرفة الرجال - ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল


2. ميزان الاعتدال - ইমাম যাহাবি


3. الموضوعات - ইমাম ইবনুল জাওজি


4. الضعفاء والمتروكون - ইমাম আন-নাসাঈ


5. الإصابة في تمييز الصحابة - ইমাম ইবনু হাজার

6. سير أعلام النبلاء - ইমাম যাহাবি


7. العِلَل للدارقطني - ইমাম দারকুতনি








মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নির্ভেজাল ইসলামের স্বরুপ সন্ধানে

ইসলাম ও গনতন্ত্র

সাড়ে তিন হাত বডিতে ইসলাম !