নারী নেতৃত্ত হারাম নয়

 

ইসলামে নারী নেতৃত্ত ১০০% হালাল



ভিডিও ৩ টি দেখুন


https://youtube.com/playlist?list=PLo-2VxJrnWwZ3MKsJu-hO0voTqsqRQyeI&si=Byfls1JSyNWgj-V-


ইসলামে কি নারী নেতৃত্ব হারাম?


মুসলিমদের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ইসলামে নারী নেতৃত্ব সম্পূর্ণ হারাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মনে করা হয়, ইসলাম বিষয়টি অনুমোদন করে না। নারী নেতৃত্বের বিরোধিতায় সাধারণত সুরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতটি দলিল হিসেবে পেশ করা হয়, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বকারী। 


এই আয়াতটিকে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যবহার করা ভুল। আয়াতটি মূলত পারিবারিক কাঠামোর জন্য নাজিল হয়েছে। একটি পরিবার গঠনের জন্য নারী ও পুরুষের সমন্বয় প্রয়োজন এবং সেখানে একজন প্রধান থাকা আবশ্যক। আল্লাহ পুরুষকে সেই দায়িত্ব দিয়েছেন দুটি কারণে: এক. তাদের পারস্পরিক কিছু শ্রেষ্ঠত্ব বা গুণাবলী এবং দুই. পুরুষরা তাদের সম্পদ থেকে পরিবারের জন্য ব্যয় করে। অর্থাৎ, পরিবারের আর্থিক ও সার্বিক ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেওয়ায় পুরুষকে পরিবারের কর্তা করা হয়েছে। এই পারিবারিক বিধানকে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে টেনে এনে ‘নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবে না’—এমন কথা বলা অযৌক্তিক।


নারী নেতৃত্বের বিপক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবে সহিহ বুখারির ৪৪২৫ নম্বর  হাদিসটি ব্যবহার করা হয়। হাদিসটি হলো—হজরত আবু বাকরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, “সেই জাতি কখনোই সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার একজন নারীর হাতে অর্পণ করেছে।”


এই হাদিসটির একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ঘটনাটি ছিল পারস্য সাম্রাজ্যকে কেন্দ্র করে। পারস্যের সম্রাট খসরু পারভেজ রাসুল (সা.)-এর পাঠানো ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছিলেন এবং মুসলিম দূতদের হত্যা করেছিলেন। এই ধৃষ্টতার কারণে রাসুল (সা.) বদদোয়া করেছিলেন যে, আল্লাহ যেন তাদের রাজত্বকে অনুরূপভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেন।


পরবর্তীকালে খসরু মারা গেলে পারস্যবাসী তার কন্যা বোরানকে সিংহাসনে বসায়। এই সংবাদ যখন মদিনায় পৌঁছায়, তখন রাসুল (সা.) এ মন্তব্যটি করেছিলেন। রাসুল (সা.)-এর এই উক্তিটি ছিল সেই নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে—একটি আল্লাহদ্রোহী, পতনোন্মুখ সাম্রাজ্য, যারা একজন রাসুলের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের শাসনভার একজন নারীর হাতে অর্পণ করলেই তারা রক্ষা পাবে না; বরং তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এ কথা বুঝাতেই রাসুল (সা.) এই মন্তব্যটি করেছিলেন। সবসময়ের জন্য নারীদের রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বকে ‘হারাম’ বা ‘নাজায়েজ’ ঘোষণা করা রাসুল (সা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না।   


কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় করা একটি মন্তব্য থেকে প্রেক্ষাপট না দেখে এভাবে শরিয়তের বিধান গ্রহণ করা সম্পূর্ণ ভুল। কোনো বিষয় শরিয়তের বিধান হতে হলে অবশ্যই তা কুরআনে সরাসরি বিধান হিসেবে বর্ণিত হতে হবে। কুরআন বা হাদিসে এমন কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই যা সরাসরি নারীকে প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হতে বাধা দেয়। প্রচলিত ধারণাটি মূলত আয়াত ও হাদিসকে সঠিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে সরলীকরণের ফল। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে কুরআনের আয়াত বা হাদিসকে যথাযথ প্রেক্ষাপট ও কারণসহ অনুধাবন করা জরুরি।


নারী নেতৃত্ব :


১.নারীদের মধ্যেই নারী নেতৃত্ব বেশি উপযোগী:


(ক)নারীরা নারী অঙ্গনে ভালোভাবেই নেতৃত্ব দিতে পারে।


(খ)শুধু মহিলাদের মধ্যে একজন মহিলাকে ইমামও (বা নেতাও) নিযুক্ত করা যায়।


(গ)তবে সার্বিক পরিসরে পুরুষেরই নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, নেতৃত্বগুণ, শক্তি, দূরদর্শিতা, ঋতুস্রাব না হওয়া, গর্ভধারণ না করা, স্তন্যপান না করানোসহ বেশ কিছু প্রাকৃতিক ও বাস্তব বিষয়ে পুরুষেরা নারীদের তুলনায় কিছুটা (বা অনেকটা) সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে- যা বিচারবোধসম্পন্ন সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য।


(ঘ)ইসলামের দৃষ্টিতে (পুরুষ ও নারীর সম্মিলিত ক্ষেত্রে) নারী নেতৃত্ব কাম্য নয়। কারণ, (বিজ্ঞান, বিবেক ও গবেষণাসহ) সার্বিক বিচারে (আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে) সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি (সাধারণত) পুরুষই হয়ে থাকে।


(ঙ)এ বিষয়ে কুরআনের ঘোষণা হলো: “পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল (কাউয়াম, কর্তা, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক) এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে একজনকে (বা পুরুষকে) অপরের (অর্থাৎ নারীর) উপর (গুণগত) বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। (৪/সূরা আন নিসা:৩৪)।


২.স্ত্রী বা কণ্যা হবার কারণে নেতৃত্ব প্রাপ্য হওয়া উচিত নয়:


(ক)পিতার পরে কণ্যা নেত্রী হওয়াই যদি ইসলামের নিয়ম হতো তাহলে হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পরে হয়রত ফাতিমা (রা.) নেত্রী হতেন।


(খ)স্বামীর পরে স্ত্রী নেত্রী হবে এটাই যদি ইসলামের নিয়ম হতো তাহলে নবীজী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত আয়িশা (রা.) কে নেত্রী করা হতো।


(গ) বাস্তবে উপরিউক্ত কোনোটাই হয়নি। অর্থাৎ স্ত্রী বা কণ্যা হবার কারণে নেতৃত্বে আসীন হওয়ার রীতিটা ইসলামী পদ্ধতি নয়।


৩.ইসলামবিরোধী পুরুষ ইসলামভক্ত নারীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর:


(ক)নারী ও পুরুষ সকলের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামবিরোধী পুরুষই ইসলামভক্ত নারীর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।


(খ)পুরুষ যদি নারীর তুলনায় অধিকতর ইসলামবিরোধী বলে প্রতীয়মান হয় তাহলে নারীর শাসনই কম ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হবে।


৪.আদর্শিক ও বৈজ্ঞানিক (তথা যুক্তিসঙ্গত) কারণেই কোনো ইসলামী দলই নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পক্ষে নয়:


(ক)বাংলাদেশের কোনো ইসলামী দল কোনো নারীকে দেশের প্রধান নির্বাচিত করেনি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক (ইসলামকে না বুঝার কারণে বা না মানার কারণে) নারীকে নেত্রী নির্বাচিত করলে সে দোষ (বা দায়) কোনো ইসলামী দলের নয়।


(খ)ইসলামে সার্বিক পরিসরে (নারী ও পুরুষের সম্মিলিত কাঠামোতে) নারী নেতৃত্ব নেই। বাংলাদেশ যেহেতু এখনও ইসলামী রাষ্ট্র হয়নি সেহেতু এখানে নারী নেতৃত্ব বিদ্যমান থাকা (সহজ বা) সম্ভব হয়েছে।


(গ)পার্লামেন্টারী সিস্টেমে হয় ‘পজিশন’ না হয় ‘অপজিশন’ এ থাকতে হয়। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই নারীর প্রাধান্য থাকায় ইসলামী দলগুলো উভয় সংকটে পড়েছে (এ পক্ষেও নারী, ও পক্ষেই নারী)।


(ঘ)ইসলামী দলগুলো জোট গঠন না করলে যারা ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ছিলো তাদেরও নেত্রী একজন নারী। সেজন্যই ইসলামী দলগুলো (ব্যতিক্রম বাদে) দুটো মন্দের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম মন্দ (যেটিকে ভেবেছে সেটিকে) গ্রহণ করেছে।


(ঙ)ইসলামী দলগুলো রাজনৈতিক জোটের প্রধানকে নিজ দলের প্রধান স্বীকার করে না। আর জোটের সকল দলও ইসলামী দলের নেতা (বা আমীর) কে নিজ দলের নেতা মনে করে না। কাজেই একথা বলা যায় না যে ইসলামী দল জোটপ্রধানকে নেত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছে। কাজেই ইসলামী দল নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেনি। একসাথে চলা মানেই (সর্বদা) নেতৃত্ব মেনে নেওয়া বুঝায় না।


(চ)জোটের প্রধান দলে যোগ্য যোগ্য পুরুষ থাকার পরও তারা যদি কোনো নারীকে দলীয় প্রধান নির্বাচন করে তবে সে দায়-দায়িত্ব ঐ দলের; সে দায় কোনো ইসলামী দলের নয়।


(ছ)আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে, শক্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশীয় সিস্টেমের বাইরে চলা কঠিন, কখনও কখনও অসম্ভবও বটে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করা কোনো ধার্মিকতা নয়।


(জ)জনগণ ইসলামী দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে রায় দেওয়ার পরও যদি সংশ্লিষ্ট ইসলামী দল কোনো মহিলাকে রাষ্ট্রপ্রধান বা আমীর বানাতো কেবল তখনই বলা যেতো যে অমুক ইসলামী দল সার্বিক পরিসরে নারী নেতৃত্বের পক্ষে।


ইসলাম সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থাকে সবসময় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। এর জন্যে দুটি উদাহরণ আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। একঃ আপনারা সবাই জানেন কাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। মহানবী (সঃ) এর মাক্কী জীবনের পুরোটা সময় এবং মক্কা বিজয় হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ৩৬০ টি মূর্তি কাবাঘরেই ছিল। মহানবী (সঃ) এর মূল দাওয়াতই ছিল এই মূর্তির বিরুদ্ধে তদুপরিও তিনি মক্কা থাকাকালীন সময়ে কোন সাহাবীকে মূর্তি ভাঙ্গার নির্দেশ দেন নি বরং সেই সকল মুর্তি কাবাঘরে বর্তমান থাকা অবস্থাতেও কাবার চত্ত্বরে মূর্তি রেখেই নামাজ আদায় করেছেন। দুইঃ দ্বিতীয় ঘটনাটি হুদাইবিয়া সন্ধির সময়। যখন কুরাইশরা সন্ধি করতে প্রস্তুত হলো এবং এ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্যে সুহাইল বিন্ আমরকে দূত বানিয়ে পাঠালো। তার সঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলোচনা হলো এবং শেষ পর্যন্ত সন্ধির শর্তাবলী স্থিরিকৃত হলো। সন্ধিপত্র লেখার জন্যে হযরত আলী (রা)-কে ডাকা হলো। সন্ধিপত্রে যখন লেখা হলো ‘এই সন্ধি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর তরফ থেকে তখন কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল প্রতিবাদ জানিয়ে বললো : ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি লেখা যাবে না; এ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি আছে।’ একথায় সাহাবীদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। সন্ধিপত্র লেখক হযরত আলী (রা) কিছুতেই এটা মানতে রাযী হলেন না। কিন্তু হযরত (স) নানাদিক বিবেচনা করে সুহাইলের দাবি মেনে নিলেন এবং নিজের পবিত্র হাতে ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি কেটে দিয়ে বললেন : ‘তোমরা না মানো, তাতে কি? কিন্তু খোদার কসম, আমি তাঁর রাসূল। এবার আসা যাক যে হাদিসটার মাধ্যমে নারী নেতৃত্বকে হারাম মনে করা হয় সেটি জেনে নেই। “যখন রাসুল (সাঃ) এর কাছে খবর পৌছাল যে পারসিয়ানরা সম্রাট খসরুর মেয়েকে তাদের শাষক হিসাবে নির্বাচিত করেছে তখন তিনি (রাসুল (সাঃ)) বলেছিলেন, যে জাতি তাদের রাষ্ট্রের কতৃত্ব একজন মহিলার হাতে ন্যস্ত করে তারা কখনও উন্নতি করতে পারে না" (বুখারী)। হাদিসে কোথাও বলা হয়নি নারী নেতৃত্ব হারাম, বলা হয়েছে অকল্যাণকর , তাই জামায়াতও আনুষ্ঠানিকভাবে কখোনো নারী নেতৃত্বকে হারাম ঘোষণা করেনি। তবে জামায়াত হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী নারী নেতৃত্বকে দেশ ও জাতির জন্য অকল্যাণকর জানে এবং মানে। দলীয়ভাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে নারীর মনোনয়ন কিংবা নির্বাচনের কোন সুযোগ নেই। এবার আসুন উপরের ঘটনা দুটির সাথে হাদিসটি বিশ্লেষন করি। মহানবী (সঃ) বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কাবা শরীফে মুর্তি থাকা অবস্থায় নামাজ পড়েছেন অথচ ইসলামের মূল বিশ্বাস “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে মূর্তি। দ্বিতীয় ঘটনাটি ইসলামের দ্বিতীয় মূল বিশ্বাস “মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এর সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ সয়ং রাসুলুল্লাহ (সঃ) সে সময়ের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে এদুটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। গুরুত্বের বিবেচনায় এবার আপনারাই বলুন উপরিউক্ত দুটি ঘটনার সাথে নারী নেতৃত্ব সংক্রান্ত হাদিসটি কতটা গুরুত্ব বহন করে? রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে জোটবদ্ধভাবে জামায়াত বিএনপির সাথে জোট করেছে এবং অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে জোট করেছিল। বিএনপি কি আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে কে আছেন বা থাকবেন তা তো জামায়াত নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখেনা। জামায়াত দলের সাথে জোট করেছে এবং ঘটনাচক্রে সে দলের শীর্ষ ব্যক্তি মহিলা। রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে অনেকবারই ইসলামী দলগুলো নারী নেতৃত্বকে সমর্থন দিয়েছিল অধিকতর নিকৃষ্ট শাসকের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে। বর্তমানে জামায়াতের অবস্থান তেমনই। প্রসঙ্গত, হযরত সুলাইমান আ. এর সাথে সাবার রানি বিলকিসের যোগাযোগের বিষয়টি তো সকলেরই জানা। এবার আসা যাক কোন প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চার দলীয় ঐক্য হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে হিজাব পড়ে এবং পুর্বের ভুলভ্রান্তির ক্ষমা প্রার্থনা করে ক্ষমতা নেয়ার পরেই শেখ হাসিনা মাথার পট্টি খুলে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নেমে পড়েন। সে সময়ে শামসুর রহমান, হুমায়ুন আযাদ, শামসুল হক গং প্রকাশ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অশ্লীল সাহিত্য, কবিতা লিখতে থাকেন এবং সরকার তাদের পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে। অন্যদিকে ষাটোর্ধ্ব শাইখুল হাদিস আল্লামা আযিযুল হককে বিনা কারনে গ্রেফতার করে একমাস কারাগারে রাখে। ভারত তোষননীতি পূর্বের রেকর্ড ভঙ্গ করে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়। বিভিন্ন জায়গায় তৈরী হয় গডফাদার। জয়নাল হাজারী, শামীম ওসমান, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, তাহের উল্লেখযোগ্য। সন্ত্রাসের দৌড়াত্বে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে উঠে। প্রতিদিন খুন, ধর্ষন ছিল পত্রিকার নিয়মিত খবর। এ অবস্থায় এ ইসলাম বিরোধী অপশক্তিকে রুখতে দেশব্যাপী বিরোধী দলগুলোর ঐক্য ছিল সময়ের দাবী। সে পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। বর্তমানে আবার ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগ যেভাবে নাস্তিকদের তোষণ করেছে তা তো আপনারা চোখের সামনেই দেখছেন। এ অবস্থায় এই ইসলামবিরোধী অপশক্তিকে রুখতে হলে যে ব্যাপক ভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজন সেটা সবাই বুঝতে পারছে। এবং দেশবাসী এটাই চাচ্ছে। সুতরাং ইসলাম রক্ষায়, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীদের হাত থেকে জনগণকে পরিত্রান দিতে বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। বাস্তবতার নীরিখে ইসলাম ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জামায়াতে ইসলামী এ ব্যাপারে রাসুল (সঃ) এর বাস্তব কর্মপন্থার আলোকেই এ বিষয়ে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। জামায়াত যেদিন জনগণের আস্থা অর্জন করে রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে, সেদিন রাষ্ট্রের নেতৃত্বে একজন পুরুষই থাকবেন।


ভারতের ওলামায় হিন্দ বা দেওবন্দী আলেমগণও কিন্তু সোনিয়া গান্ধির নেতৃত্বাধিন কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়েছে। এমনকি তারা দেওবন্দ মাদ্রাসার বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিও বানাচ্ছেন এই মুশরিকাকে !!!


কেউ ইসলামী আন্দোলনের কাজ করলে দুনিয়ার যেখানে নারী নেতৃত্ব চলছে সবার বিরুদ্ধে কি জেহাদে নামতে হবে? কোরআনের কথা বলে এরকম ফালতু কথা বলা বড় মুর্খতা। যে কোন দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে যারা নারী নেতৃত্ব বিষয়ে ঢালাওভাবে কথা বলতে দ্বিধা-বোধ করেনা তারা জানেনা যে নেতৃত্বের পরিসর অনেক ব্যাপক। স্কুলের প্রধান, সংগঠনের প্রধান, কোম্পেনীর প্রধান, অফিসের ম্যনাজার সবাই তাদের আপন আপন স্থানে নেতৃত্বের পরিসরে। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেই কি বেছে বেছে সকল নারীদেরকে চাকুরিচুৎ করতে হবে না নেতৃত্বের বিভিন্ন পরিসর দেখতে হবে? না এ বিষয়ে বিবেচনা বা কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যাবার দরকার আছে? কেউ যদি কোথাও চাকুরী করেন এবং সেই স্থানের নেতৃত্ব যদি কোন মহিলার হাতে থাকে তবে কি তার চাকুরী ছেড়ে চলে যেতে হবে? স্বয়ং রাসুল (সHappy এর জিবনী কি শিক্ষা দেয়? তাঁকেও তো আল্লাহ এক মহিলার নেতৃত্বের ব্যবসায় চাকুরী করিয়েছেন।


সদালাপের সুপ্রিয় পাঠক ভাই বোনদের খেদমতে আমার এক পোষ্টের মন্তব্যে এম অহমেদ ভাই এ প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন রেখে ছিলেন যা এখানে উল্লেখ করতে চাই,


"নেতৃত্ব কি কাওম-প্রধানের সাথের বাস্তবতা, না সর্বব্যাপী বাস্তবতা -এসব কথা আলোচিত হতে হবে। তাছাড়া যারা নারী নেতৃত্বের দেশে বসবাস করেন তারা সবাই সেই নেতৃত্বের আওতাধীন। তারা সেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য যদি কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করে বসে বসে ফতোয়ার কথা বলেন এবং নির্বাচনের দিন নারী নেতৃত্বের বাক্সে ভোট দেন, তবে এর চেয়ে হাস্যকর অবস্থান আর কী হতে পারে? ‘ইসলামী রাষ্ট্রে নারী নেতৃত্ব নেই’ শুধু এতটুকু কারণেই এই প্রববক্তাদেরকে রাজনীতিতে নামতে হবে। কিন্তু তা না করে তারা যদি চুপসে চুপসে নারী নেতৃত্ব মেনে নেন তবে কিয়ামত পর্যন্ত পরিবর্তন আসবে না। এই বর্তমান সমাজের কিছু লোকের অবস্থান। তারা একদিকে নারী নেতৃত্বের বিপক্ষে বলবেন কিন্তু ভোটের দিন চুপসে নারীর বাক্সে ভোট দেবেন। এখানে যদি ধর্মীয় সমস্যা থেকে থাকে তবে এটা এই ধর্মের সকলের, কারো একার নয়।


জামাতের নেতা মৌ: দেলাওয়ার হুসেন সাঈদীকে বাংলা টিভিতে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি এবং আপনার দল নারী নেতৃত্বের বিপক্ষে অথচ আপনারা খালেদার সাথে একজোট -এটা কেমনে হয়? (এই ইন্টার্ভিউটা হয়ত এখনো ইউটিউবে পাওয়া যেতে পারে)। উত্তরে সাঈদী যা বলেন এবং যতটুকু আমি স্মরণ করতে পারি তার বর্ননা এরূপ: আমরা বিএনপি নামক একটি দলের সাথে জোট করেছি, যে দল একজন নারীকে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছে, আমরা করিনি। জোট না বাঁধলেও তো বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব বিরাজিত, সবাই সেই বিরাজিত নেতৃত্বের অধীন। আমরা কিছু কমন উদ্দেশ্য সামনে রেখে এক সাথে কাজ করতে জোট করেছি। এর উদাহরণ ধরুন এমন যে আমরা এক স্থান থেকে আরেকটি স্থানে যেতে রাস্তায় নেমেছি। সেখানে আরও কিছু লোকজনকে পেয়েছি যারা সেই অভিলক্ষ্যে যাত্রা করছেন। এখন রাস্তায় যদি কিছু বাধা বিঘ্ন আসে, কিছু গাছ-বাঁশ সেই রাস্তা বন্ধ করে দেয়, তখন কী করা হবে? এমতাবস্থায় কার দলে নারী নেতৃত্ব আর কার দলে পুরুষ এই বাদাবাদিতে নেমে গেলে রাস্তার প্রতিবন্ধকতা দূর হবে না, কারো পক্ষে গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না। আমাদের জোট হচ্ছে এমনই অভিলক্ষ্যে। আমরা আলাদা দল, দেশের জনগণ আমাদের উদ্দেশ্য-বিধেয় জানেন। জোটের দলগুলো আলাদা আলাদা দল, আমরা সবাই একে অন্যের উদ্দেশ্য-বিধেয় জানি। তবে আমরা এটাও জানি এবং বুঝি আমাদের সকলের মধ্যে কিছু কিছু কাজ ও উদ্দেশ্য কমন রয়েছে যেগুলো আমরা সবাই মিলিতভাবে করতে পারি। আমাদের অবস্থানগত উদাহরণ এভাবেই।


দ্বিতীয় কুফুরি যুদ্ধ ও বিচার -একটি মন্তব্যব্লগ


ইসলাম কখনোই সমাজের কোন কোন ব্যাপারে মেয়েদের ভূমিকাকে অন্যদের তুলনায় সীমিত করেনি। সর্বপ্রথম যে ব্যাক্তিটি নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর দাওয়াত কবুল করে ইসলাম ধর্ম কবুল করেছিলেন তিনি ছিলেন একজন নারী। ইসলামের প্রথম শহীদ ছিলেন একজন নারী, ঠিক তেমনি প্রথম মুহাজির ও ছিলেন একজন নারী। শত শত বছর ধরে নারীরা উচ্চ উচ্চ পদে দায়িত্তপালন করেছেন, তারা ছিলেন শাসক, বিচারক, যোদ্ধা, শিক্ষক, মুফতি, ইত্যাদি। ইসলামের ইতিহাসের যে কোন সৎ ছাত্রই এই সাক্ষী দেবে।


রাষ্ট্রের প্রধানের ব্যাপারে একটি হাদিস আছে যা পরোক্ষভাবে নারী নেতৃত্বকে নিষিদ্ধ করেছে, হাদিসে বলা হয়েছে, যেসব লোক কোন নারীকে তাদের নেতা নিয়োগ করে তারা উন্নতি করতে পারবে না( দেখুন টীকা-১) । অবশ্য, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে পঞ্চাশেরও বেশি নারী শাসক দেখা যায়, যেমন মিশরের সিত আল-মুলক, সিনায় রানী আসমা ও আরওয়া, আল-আন্দালুসে জায়নাব আল-নাফযাভিয়া, দিল্লিতে সুলতানা রাজিয়া, মিশরে শাজারাত আল-দুর ইত্যাদি। বিভিন্ন সামাজিক জীবনে, যুদ্ধে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, পুলিশে ( হিসবা), এবং বাজারে নারীদের অংশগ্রহনের ক্ষেত্রে রসুলুল্লাহর সম্মতির ব্যাপারে কোন বিতর্ক নাই।


উপরে উল্লেখিত হাদিসের কারনে, অনেক ইসলামিক স্কলাররা নারীদের রাষ্ট্র প্রধান হওয়াকে নিষিদ্ধ বলে মনে করেন। হানাফি মাজহাবে কিছুটা সীমিত পরিসরে নারীদের বিচারক হওয়াকে জায়েজ বলে মনে করা হয়। অবশ্য , নারীদের বিচারক ও রাষ্ট্র প্রধান হওয়াকে সম্পূর্ণ ভাবে জায়েজ বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ, যেমন ইবনে জারির আল-তাবারি, ইবনে হাজম আল-যাহিরি, আবু আল ফাতহ ইবনে তারার, ইবনে আল-কাসিম, ইত্যাদি।


এটা মনে রাখা খুবই গুরুত্ত পূর্ণ যে এই হাদিসটি একটি বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে ও অবস্থায় রসুলুল্লাহর উক্তি, যখন কিনা পারস্যবাসীরা শেষ উপায় ( কিসরা, ও তার ছেলের নিহত হওয়ার পর) হিসাবে একজন নারীকে (কিসরার কন্যাকে) তাদের প্রধান নিয়োগ করেছিলেন। নবীর এই হাদিসটি নির্দেশনা হিসাবে গ্রহন করা যাবে না, বরং ইহা পারস্যদের পতনের একটি ইঙ্গিত। আইনশাস্ত্রের মুলনীতিতে এটি পরিস্কার যে একটি বিশেষ ঘটনা (খাস) সর্ব অবস্থায় (আম) প্রয়োগ করা যায় না। অধিকন্তু, আল্লাহ্‌ নিজেই বিলকিস, শেবার রানী, এর যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার প্রশংসা করেছেন কুর’আনে।


ইসলামে খলিফার উচ্চস্থান এবং সমসাময়িক রাষ্ট্রের প্রধানের মধ্যে যে বিশেষ পার্থক্য আছে সে বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। খলিফা একটি ধর্মীয় পদ, যার অনেকগুলি দায়িত্তের একটি যা বর্তমান শাসকদের করতে হয়না তা হল মুসলিমদের নামাজের ইমামতি করা, এই শর্তটির ব্যাপারে সকল স্কলাররাই একমত। অন্যদিকে, সমসাময়িক রাষ্ট্রের প্রধানের পদটি একটি সরকারি পদ যেখানে সকল মুসলিম উম্মার প্রধান হওয়ার বিষয়টি নেই। সুতরাং, এই পদটিতে আসীন হওয়ার সকল অধিকার নারীদের আছে।


টীকা-১, এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু বাকরাহ ( খলিফা আবু বকর (রাঃ) না) যিনি একটি ব্যাভিচারের বিচারে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়াতে হজরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তাকে ৮০ বেত্রাঘাত করেন। আল্লাহ্‌ বলেছেন


আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ লাগায়, তারপর চারজন সাক্ষী আনে না , তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং তাদের সাক্ষ কখনো গ্রহণ করো না ৷ তারা নিজেরাই ফাসেক। (সূরা নূর, আয়াতঃ ৪)


তাহলে এই ব্যাক্তির বর্ণিত হাদিস গ্রহন করার সুযোগ কতটুকু? যদিও হাদিসটি বুখারী শরীফের অন্তর্ভুক্ত, তথাপি, ইবনে হাজম ও নাসির উদ্দিন আলবানী এই হাদিসটিকে গ্রহন করেন নি কেবল রাবীর কারনে। উল্লেখ্য, ইমান ইবনে বুখারী(রহঃ) একজন মানুষ ছিলেন তাই উনার ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।


[ প্রকৃত সত্যা আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন]


[ উপরে উল্লেখিত ফাতওয়াটি সম্পূর্ণ রুপে মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি আলী গমা এর মত]


নেতৃত্ব কি??


নেতৃত্ব হল নেতার একটি বিশেষ গুণ, যার মাধ্যমে সে তার সকল কর্মীবাহিনীকে নিয়ন্ত্রন করে। অথবা, যে বাক্তির কথাই কোন একটি দল,কোন একটি সংগঠন, অথবা কোন একটি গোষ্ঠী পরিচালিত হয় তাকে নেতা বলে। আর নেতার সকল গুনাবলিই নেতৃত্ব।


সন্ধি কি?


বিশেষ কিছু শর্ত সাপেক্ষে কোন একটি জাতি, কোন একটি গোষ্ঠী, অথবা কোন একটি দলের সাথে একটি সময় সীমার জন্য চুক্তি করাই হল সন্ধি। সন্ধির শর্ত পুরন হয় কেবল কিছু সময় পর্যন্ত। পক্ষান্তরে নেতার নেতৃত্ব ততদিন মানতে হয় যতদিন সে নেতা থাকে। সুতারাং সন্ধির শর্ত পুরন করা আর নেতৃত্ব মানা এক নয়!


নারি নেতৃত্ব কি?


নারি নেতৃত্ব হল একটি দলের/গোষ্ঠীর সকল প্রকার ক্ষমতা নারির হাতে তুলে দেওয়া। নারি যেইভাবে বলবে সেই ভাবে পালন করা।


জামাআত-শিবির নারি নেতৃত্বকে হালাল মনে করে এবং নারি নেতৃত্ব মানে এই কথাটা সত্যিকিনা? নাকি এটা জামাআত-শিবিরের নামে অপবাদ??


আমি আগেই বলছি নেতৃত্ব মানা আর সন্ধির শর্ত মানা এক নয়! জামায়াত কি তাদের দলের সকল কার্যক্রম নারির হাতে তুলে দিয়েছে? জামায়াতের প্রোগ্রাম কি বি.এন.পি পরিচালনা করে? নাকি জামায়াতের প্রোগ্রাম জামায়াত পরিচালনা করে? জামায়াতের কোন মিছিলে কি বি.এন.পি যোগদান করে? বি.এন.পি এর কোন মিছিলে কি জামায়াত যোগদান করে? না করেনা!!!! বরং জামায়াত যেহেতু বি এন পি এর সাথে জোটবদ্ধ অথবা সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ সেহেতু জামায়াত সেই সকল প্রোগ্রাম অথবা মিছিলে উপস্থিত থাকে যা জোটের পক্ষ থেকে ডাকা হয়। যেহেতু বি এন পি এর সাথে জামায়াত জোটবদ্ধ, এবং বি এন পি এর নেতা নারি। সেহেতু জোটের নেতা হল খালেদা জিয়া। এখন কেউ যদি বলে জামায়াত খালেদার নেতৃত্ব মানে তাহলে আমি বলব সে একটি ভুল ধারনার মধ্যে আছে। বরং জামায়াত সেই সকল প্রোগ্রাম বা মিছিল বি.এন.পি এর সাথে একসাথে পালন করে যা জোটের সকল দলের অংশগ্রহনে সিদ্ধান্ত হয়। আর যেই সকল প্রোগ্রাম জামায়াতের দলীয় প্রোগ্রাম তা বাস্তবায়ন করে জামায়াত। সুতারাং জামায়াত যদি নারি নেতৃত্ব মানতো তাহলে সকল কাজ করার ক্ষেত্রে বি এন পি কে জিজ্ঞাসা করেই করত।


এখন কেউ যদি বলে জামায়াত যদি নারি নেতৃত্ব না মানে তাহলে জামায়াত কেন বি এন পি এর সাথে জোট করেছে?


তাদেরকে শুধু একটি কথা বলব যে জামায়াত এটা কুরআন থেকে শিক্ষা গ্রহন করেছে। এই প্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন করব যে রাসুল সঃ হুদাইবিয়ার সন্ধি কাদের সাথে করেছে?


কেন করেছে? কোন প্রেক্ষাপটে করেছে? রাসুলুল্লাহ সঃ কাফেরদের সাথে সন্ধি করছেন! যখন মুসলমানদের কে বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে, দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রাসুল সঃ কাফিরদের সাথে সন্ধি করেন। যার ফলে ইসলামের দাওয়াত দিক বিদিক ছুটে যায়। সকল মানুষের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যায়, ইসলামের শক্তি হাজার গুনে বৃদ্ধি হয়। এখন কেও যদি বলে, (নাউজুবিল্লাহ) রাসুলুল্লাহ সঃ যেহেতু কাফিরদের সাথে সন্ধি করেছেন সেহেতু তিনি কাফিরদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন তা কি সঠিক? না সঠিক নয়!!! সুতারাং জামায়াত বি.এন.পি এর সাথে সন্ধি করার কারনে নারি নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন এই কথা কিভাবে সঠিক হয়???? যখন বাংলাদেশে আওয়ামিলীগ ইসলাম পন্থিদেরকে নির্যাতন করা শুরু করে, কুকুরের মাথাই টুপি পরাই, মসজিদের ভিতর জুতা নিয়ে প্রবেশ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করে মিষ্টি বিতরন করে, আলেম ওলামাদেরকে নির্যাতন করা শুরু করে, মাদ্রাসাকে জঙ্গিবাদের আখড়া বলে আক্ষায়িত করে, সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম বাদ দিয়ে দেই, সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ কে বাদ দিয়ে দেই, তখন বাংলাদেশের সকল মুসলমান এই জালিম সরকারের নির্যাতন থেকে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, যাতে করে দেশের মানুষ জালিমের হাত থেকে রক্ষা পাই। আর তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ছিল বি.এন.পি এবং জামায়াত। জামায়াত দেখল যে, যদি জামায়াত ও বি এন পি আলাদা নির্বাচন করে তাহলে ভোট কাটা গিয়ে আওয়ামিলিগ আবারো ক্ষমতাই চলে আসবে। আর বি এন পি ও উপলব্ধি করল যে একা নির্বাচন করলে আওয়ামিলীগ কে হটানো যাবেনা। তখন দেশের ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ জামায়াতে-ইসলামী আওয়ামি সরকারকে হটানোর জন্য এবং ইসলামী আন্দোলনের বৃহত্তর কথা চিন্তা করে বি এন পি এর সাথে ৩ নিরবাচনের সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। সুতারাং চুক্তি শেষ হয়ে গেলে এবং ইসলামি আন্দোলনের/সংগঠনের শক্তি মজবুত হলেই জামায়াতে ইসলামী বি.এন.পি থেকে বের হয়ে এসে আলাদা নির্বাচন করবে। এটাই হল বাস্তব সত্য কথা।


জামাত কি নারী নেতৃত্বে পজেটিভ?? আমি যদি প্রমান করে দিতে পারি, জামাত নয়, বরং জামাত বিএনপি জোট নিয়ে যাদের চুলকানি আছে তারাই নারী নেত্রীত্বে পজেটিভ...


নারী নেতৃত্ব জায়েজ (পর্ব - ১)


ইসলামে নারী নেতৃত্ব


http://www.somewhereinblog.net/blog/neel_supto/29801633


সাম্প্রতিক সময়ে, অতীতে ইসলাম নারী নেতৃত্বকে আদৌ বৈধতা দেয় কিনা কিংবা দিলে কতটুকু দেয় কিংবা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী নারী নেতৃত্ব এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে অনেক আলোচনা উঠেছে। তার-ই প্রেক্ষিতে এই লেখাটি লিখতে বসা। লেখাটির কোথাও আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজস্ব কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছিনা এবং কাউকে পরামর্শ দেবার ঔদ্ধত্ব্য ও দেখাচ্ছিনা। শুধু আলোচনা করতেই এই প্রয়াস। ইসলাম সর্বদা আলোচনাকে উৎসাহ প্রদান করে।



ভণিতা না করে সরাসরি নারী নেতৃত্ব নিয়ে ইসলাম কি বলে সেদিকে যাইঃ



ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম কিংবা নিষিদ্ধ কিনা এ ব্যাপারে সরাসরি কোন হাদীস এখনও খুঁজে পাইনি। আমাদের মধ্যে অনেকেই বলেন যে এরকম হাদীস রয়েছে, বুখারী শরীফে অন্তত এরকম হাদীস খুঁজে পাইনি। (যদি কেউ পেয়ে থাকেন অবশ্যই জানাবেন দয়া করে)



বরং নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে বিরক্তি প্রকাশ করে রাসূল(সাঃ) বলেছেন-

“যখন তোমাদের শাসক হবে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দুষ্ট ও শয়তান প্রকৃতির, তোমাদের ধনীরা যখন হবে তোমাদের মধ্যে বেশি কৃপণ আর তোমাদের (জাতীয়) কাজ-কর্মের দায়িত্ব যখন ন্যস্ত হবে তোমাদের স্ত্রী লোকদের হাতে তখন মৃত্যু হবে জীবন অপেক্ষা উত্তম।” ..................... (তিরমিযী)




রাসূল (সাঃ) যখন জানতে পারলেন যে ইরান (তৎকালীন পারস্য) এর রাষ্ট্রপ্রধানের কন্যাকে পারস্যবাসী নিজেদের বাদশাহ বানিয়েছে তখন এ খবর শুনে রাসূল (সাঃ) এরশাদ করলেন-

“যে জাতি নিজেদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের দায়িত্বসমূহ কোন নারীর ওপর সোপর্দ করে সে জাতি কখনোই প্রকৃত কল্যাণ এবং সার্থকতা লাভ করতে পারে না।” .................................(বুখারী,তিরমিযী,নাসাঈ)




দেশ শাসন এবং রাজনীতিতে যারা নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা প্রায়ই উটের যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর নেতৃত্ব দেয়ার ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে জাহির করেন; কিন্তু ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে তাদের হয় আংশিক জ্ঞান নতুবা চরম অবজ্ঞা কাজ করে। তারা জানেন না যে উটের যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রাঃ) কে উটের পিঠে এ ঘাঁটি থেকে ও ঘাঁটি দৌড়াদৌড়ি করতে দেখে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বলেছিলেন, “ আয়েশার জন্য তাঁর ঘর তাঁর উটের পিঠের আসন অপেক্ষা উত্তম; একথাটি স্মরণ রাখা উচিৎ।”

উটের যুদ্ধের সমাপ্তির পর হযরত আলী (রাঃ) হযরত আয়েশা(রাঃ) এর সাথে সাক্ষাতে বলেছিলেন,

“হে উটের পিঠে আরোহিণী, আল্লাহ্‌ পাক আপনাকে ঘরে থাকার নির্দেশ করেছিলেন কিন্তু আপনি যুদ্ধ করার জন্য বের হয়েছেন।”

আয়েশা(রাঃ) এর প্রত্যুত্তর দিতে পারেন নি।বরং আয়েশা (রাঃ) এ কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়ে হযরত আব্‌দুল্লাহ ইবনে উমার(রাঃ) এর নিকট অভিযোগ করেছিলেন,

“তুমি যদি তখন আমাকে নিষেধ করতে তাহলে নিশ্চয়ই আমি ঘর থেকে বের হতাম না।”

সুতরাং আয়েশা(রাঃ) এর ব্যক্তিগত এ কাজটি শরীয়তের দলিল মনে করে নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো কতটুকু যৌক্তিক তা এখন বিবেচনার বিষয়।



তাহলে কি “ইসলামে নারী নেতৃত্ব এর স্থান নেই” দাঁড়াচ্ছে...?

হুদায়বিয়ার সন্ধি দিয়েই শুরু করছি।



৬ষ্ঠ হিজরিতে রাসূল(সাঃ) ৭০০ জন উমরাসঙ্গী আর ৭০টি উট নিয়ে যুল্‌কাদাহ মাসে উমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন।এরপর টানা কয়েকদিনে কুরাইশদের আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং কোনভাবেই রাসূল(সাঃ) এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের মক্কায় প্রবেশ না করতে দেয়ার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্‌র নির্দেশে রাসূল(সাঃ) কুরাইশদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হোন।

কুরাইশদের প্রতিনিধি ছিল সুহাইল ইবনে আমর। তাকে এমন নির্দেশনা দিয়ে পাঠানো হয়েছিল যে মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে আপোষ করতে এবং এই আপোষের একমাত্র লক্ষ্য হবে তিনি যে অবশ্যই এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করতে পারেন এবং আরবরাও যাতে বলতে না পারে যে মুহাম্মদ (সাঃ) কুরাইশদের উপর বলপ্রয়োগে মক্কায় প্রবেশ করেছেন।



সন্ধি চুক্তির সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে লিখিত রূপ নিতে বাকী, এই সময়ে উমর(রাঃ) আবু বকর(রাঃ) এর নিকটে ছুটে গিয়ে বললেন, “হে আবু বকর, তিনি কি আল্লাহ্‌র রাসূল নন?” আবু বকর(রাঃ) বললেন,“অবশ্যই”। “আমরা কি মুসলমান নই?” “অবশ্যই”। “কুরাইশরা কি মুশ্‌রিক নয়?” “হ্যাঁ”। উমর এবার বললেন, “তাহলে কিসের জন্য আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এভাবে নতিস্বীকার করতে যাচ্ছি?” জবাবে আবুবকর(রাঃ) বললেন, “উমার, তাঁর আনুগত্য কর। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ(সাঃ) আল্লাহ্‌র রাসূল।” উমর(রাঃ) বললেন, “আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তিনি আল্লাহ্‌র রাসূল।”



তারপর তিনি রাসূল(সাঃ) এর কাছে এসে বললেন,“হে আল্লাহ্‌র রাসূল, আপনি কি আল্লাহ্‌র রাসূল নন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ”। “আমরা কি মুসলমান নই?”। “হ্যাঁ”।

“ওরা কি মুশ্‌রিক নয়?”। “হ্যাঁ”। উমর(রাঃ) আবারো বললেন যে, “ তাহলে কি কারণে আমরা আমাদের দ্বীনের প্রশ্নে এই অবমাননা বরদাশ্‌ত করতে যাচ্ছি?” রাসূল(সাঃ) বললেন, “আমি আল্লাহ্‌র বান্দা এবং রাসূল। তাঁর নির্দেশে আমি কখনো লঙ্ঘন করবো না। আর তিনি আমাকে কখনো বিপথগামী করবেন না।”




পরবর্তী কালে উমর(রাঃ) তাঁর এহেন প্রশ্নের জন্য অনুতপ্ত ছিলেন।সেটা বিস্তারিত এখানে উল্লেখ করলাম নাহ।



কুরাইশদের প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমর আর এই সন্ধি পত্রের লেখক ছিলেন হযরত আলী(রাঃ), রাসূল(সাঃ) আলী(রাঃ)কে বললেন “লেখো,বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহিম।” সুহাইল বলল, “এটা আমার অজানা কথা। তুমি বরং লেখ, “বিস্‌মিকা আল্লাহুম্মা (হে আল্লাহ্‌, তোমার নামে)।” রাসূল(সাঃ) এর নির্দেশে আলী(রাঃ) তাই ই লিখলেন।



অতঃপর রাসূল(সাঃ) বললেন, “লিখ, আল্লাহ্‌র রাসূল(সাঃ) সুহাইল ইবনে আমরের সাথে নিম্নলিখিত মর্মে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেন।” একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সুহাইল ইবনে আমর বলে উঠলো, “আমি যদি তোমাকে আল্লাহ্‌র রাসূল বলে মানতাম তাহলে তো তোমার সাথে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হতাম না। শুধু তোমার নাম ও পিতার নাম লিখ।” ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এ পর্যায়ে আলী(রাঃ) প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং এহেন কিছু লিখতে অস্বীকৃতি লিখেন। তখন রাসূল(সাঃ) এর নির্দেশক্রমে তিনি আবার লিখতে বসেন। রাসূল(সাঃ) বলেন, “বেশ, তাই লেখ। আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ নিম্নলিখিত মর্মে আমরের পুত্র সুহাইলের সাথে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন.............................................”



এই চুক্তি সাহাবায়ে কেরামগণের কাছে তাতক্ষণিকভাবেই চরম অপমানজনক মনে হয়েছিল এবং আপাদত দৃষ্টিতে ইসলামের জন্য ও চরম অপমানজনক বলেই মনে হয়। অথচ এই চুক্তিকে ঐতিহাসিকবৃন্দ দেখছেন “ইসলামের সবচেয়ে বড় বিজয়” হিসেবে।



যুহরী বলেন যে, “পূর্বে ইসলামের যতগুলো বিজয় অর্জিত হয়েছে তার মধ্যে এটিই (হুদায়বিয়ার সন্ধি) ছিল সবচেয়ে বড় বিজয়।”



যুহরীর এ উক্তির পক্ষে প্রমাণ এই যে, রাসূল(সাঃ) হুদায়বিয়ায় গিয়েছিলেন ১৪০০ মুসলমানকে নিয়ে। এর মাত্র ২ বছর পরে তিনি যখন মক্কা বিজয় করেন তখন তাঁর সাথে ছিল ১০,০০০ মুসলমান। সুবহানাল্লাহ।



চুক্তি সম্পাদন শেষে রাসূল(সাঃ) যখন মদীনা অভিমুখে রওনা হলেন, তখন সূরা আল ফাতহ নাজিল হলোঃ

“হে নবী, আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয়ের উদ্বোধন করেছি যেন আল্লাহ্‌ তোমার আগের ও পেছনের সকল গুনাহ মাফ করে দেন, তোমার উপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করেন এবং তোমাকে নির্ভুল পথে পরিচালিত করেন।”



আল্লাহ্‌ আরও বলেন যে, “আল্লাহ্‌ তাঁর রাসূলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন যে তিনি শীগ্রই নিরাপদে ও নির্ভয়ে মক্কায় প্রবেশ করবেন। আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে নিরাপদে মাথার চুল মুন্ডিয়ে ও ছেটে নির্ভীকচিত্তে প্রবেশ করবে। সে (আল্লাহ্‌র রাসূল) সেই জিনিস অবগত হয়েছে যা তোমরা অবগত হওনি। ঐ ঘটনার (হুদায়বিয়া সন্ধি) পরেই নির্ধারিত রেখেছেন আসন্ন বিজয়।”


এবার, আলোচনা করছি সূরা আন-নামলের আয়াত ১৫-৪৪ এ বর্ণিত সাবার রাণী বিল্‌কিস এবং হযরত সুলাইমান(আঃ) এর ঘটনা।



“সুলায়মান পক্ষীদের খোঁজ খবর নিলেন, অতঃপর বললেন, কি হল, হুদহুদকে দেখছি না কেন? নাকি সে অনুপস্থিত?আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা হত্যা করব অথবা সে উপস্থিত করবে উপযুক্ত কারণ।কিছুক্ষণ পড়েই হুদ এসে বলল, আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি।আমি এক নারীকে সাবাবাসীদের উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে।আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলী সুশোভিত করে দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। অতএব তারা সৎপথ পায় নাতারা আল্লাহকে সেজদা করে না কেন, যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের গোপন বস্তু প্রকাশ করেন এবং জানেন যা তোমরা গোপন কর ও যা প্রকাশ কর।আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই; তিনি মহা আরশের মালিক।সুলায়মান বললেন, এখন আমি দেখব তুমি সত্য বলছ, না তুমি মিথ্যবাদী।তুমি আমার এই পত্র নিয়ে যাও এবং এটা তাদের কাছে অর্পন কর। অতঃপর তাদের কাছ থেকে সরে পড় এবং দেখ, তারা কি জওয়াব দেয়।বিলকীস বলল, হে পরিষদবর্গ, আমাকে একটি সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে।সেই পত্র সুলায়মানের পক্ষ থেকে এবং তা এইঃ সসীম দাতা, পরম দয়ালু, আল্লাহর নামে শুরু;আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন করো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও।বিলকীস বলল, হে পরিষদবর্গ, আমাকে আমার কাজে পরামর্শ দাও। তোমাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোন কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না।তারা বলল, আমরা শক্তিশালী এবং কঠোর যোদ্ধা। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই। অতএব আপনি ভেবে দেখুন, আমাদেরকে কি আদেশ করবেন।সে বলল, রাজা বাদশারা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে, তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকে অপদস্থ করে। তারাও এরূপই করবে। আমি তাঁর কাছে কিছু উপঢৌকন পাঠাচ্ছি; দেখি প্রেরিত লোকেরা কি জওয়াব আনে। অতঃপর যখন দূত সুলায়মানের কাছে আগমন করল, তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদেরকে প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাক। ফিরে যাও তাদের কাছে। এখন অবশ্যই আমি তাদের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব, যার মোকাবেলা করার শক্তি তাদের নেই। আমি অবশ্যই তাদেরকে অপদস্থ করে সেখান থেকে বহিষ্কৃত করব এবং তারা হবে লাঞ্ছিত। সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্নসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে? জনৈক দৈত্য-জিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বে আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত।কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, আপনার দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলায়মান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখলেন, তখন বললেন এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল।



সুলায়মান বললেন, বিলকীসের সামনে তার সিংহাসনের আকার-আকৃতি বদলিয়ে দাও, দেখব সে সঠিক বুঝতে পারে, না সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের দিশা নেই ? অতঃপর যখন বিলকীস এসে গেল, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বলল, মনে হয় এটা সেটাই। আমরা পূর্বেই সমস্ত অবগত হয়েছি এবং আমরা আজ্ঞাবহও হয়ে গেছি। আল্লাহর পরিবর্তে সে যার এবাদত করত, সেই তাকে ঈমান থেকে নিবৃত্ত করেছিল। নিশ্চয় সে কাফের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাকে বলা হল, এই প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করল সে ধারণা করল যে, এটা স্বচ্ছ গভীর জলাশয়। সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেলল। সুলায়মান বলল, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ। বিলকীস বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলায়মানের সাথে বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্নসমর্পন করলাম।”





আয়াতগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে যা জানা এবং উপলব্ধি হয় যে, সাবার রাণী তার শাসনের অধীন এলাকায় প্রজ্ঞা এবং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন,সফলতা ও দেখিয়েছেন এবং তাদের সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল সূর্যকে উপাসনা করা যেটা ‘হুদ্‌হুদ’ পাখি সুলায়মান(আঃ)কে জানায়। সুলায়মান(আঃ) যখন সাবার রাণীকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানালেন তখন সাবার রাণী তার সভাপরিষদগণের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত না নিয়ে সুলায়মান(আঃ) এর রাজত্ব ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সূরা নামলের ২৯-৩৫ নং আয়াতে বিল্‌কিসকে একজন প্রাজ্ঞ শাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে যেহেতু তিনি তাঁর পরিষদের সাথে সভায় যুদ্ধ না করে শান্তির পথে সমাধায় যেতে চেয়েছেন। এখান থেকে কুরআন আমাদেরকে একজন মহিলার মধ্যে নেতৃত্বের প্রশংসনীয় গুণ প্রদর্শন করায়।

সূরা আন-নামলের ৪১-৪৪ নং আয়াতে বর্ণিত তথ্যে দেখা যায়,সুলায়মান(আঃ) সাবার রাণীর জন্য ২টা পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন,

১, সাবার রাণীর সিংহাসনকে তিনি আসার আগেই নিজের দরবারে নিয়ে আসলেন, এবং বিল্‌কিস তা দেখেই চিনতে পারলেন। এখান থেকে বিল্‌কিসের তাঁর প্রাজ্ঞতা পরিচয় পাওয়া যায়।

২, সুলায়মান(আঃ) এর দরবারে রাণী যখন প্রবেশ করলেন যার মেঝে ছিল পানির মতন স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি এবং তা ভেবে রাণী তার পরিধেয় বস্ত্র পা থেকে একটু উপরে উঠালেন। যখন তিনি বুঝলেন তিনি বিভ্রমের স্বীকার তখন সাথে সাথেই তিনি অনুধাবন করলেন যে তিনি এতোদিন জাগতিক মোহে কিভাবে চূড়ান্ত বিভ্রমের ছিলেন এবং মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সাবার রাণী আল্লাহ্‌র দ্বীন কবুল করলেন। ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে, বিল্‌কিস তাঁর সজাগ বিবেক,প্রজ্ঞা এবং নিজেদের মিথ্যা অন্ধ বিশ্বাসকে অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য দেখান।

মুসলিম নারীবিদগণ (যেমন আমিনা ওয়াদুদ) এই জায়গায় নিজেদের যুক্তিকে আরও প্রগাঢ় করেন যে, যেহেতু আল্লাহ্‌ ই মানুষকে হেদায়াত দান করেন সেহেতু এক্ষেত্রেও বিল্‌কিসে বেলায় তাই ঘটেছে এবং কোরআন সাক্ষ্য দিচ্ছে যে নারীরাও বিচারিক ও আধ্যাত্মিকতার ব্যাপারে প্রথাগত ধারণার উপরে আছেন এবং এই ঘটনা নারী নেতৃত্ব নিয়ে ঋণাত্মক ধারণাকে বাতিল করে দেয়।


একেবারে প্রথম পর্বেই বলেছি যে লোকমুখে একটা কথা রটা “ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম।” অথচ এ ধরনের কোন সরাসরি উদ্ধৃত নেই। সুতরাং এই কথা থেকে আমরা দায়মুক্ত হতে পারি

এবার প্রসংগ, তাহলে যে দুটো হাদীসের রেফারেন্স দিলাম সেগুলো?

এখানে যথেষ্ট মতভেদ আছে।



রাসূল (সাঃ) যখন জানতে পারলেন যে ইরান (তৎকালীন পারস্য) এর রাষ্ট্রপ্রধানের কন্যাকে পারস্যবাসী নিজেদের বাদশাহ বানিয়েছে তখন এ খবর শুনে রাসূল (সাঃ) এরশাদ করলেন-

“যে জাতি নিজেদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের দায়িত্বসমূহ কোন নারীর ওপর সোপর্দ করে সে জাতি কখনোই প্রকৃত কল্যাণ এবং সার্থকতা লাভ করতে পারে না।” .................................(বুখারী,তিরমিযী,নাসাঈ)




এই হাদীসের বর্ণনাকারী নিয়েই মতভেদ এবং এই হাদিস কতটুকু সহিহ তা শুরু।

১, এছাড়াও, তাকে হযরত উমর(রাঃ) এর খেলাফতের সময় মিথ্যা বলার কারণে শাস্তি দেয়া হয়েছিল।

২, অনেকেই বলেন যে, এই হাদিসের শব্দমালা রাসূল(সাঃ) পারস্যের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথে সংযুক্ত করে বলেছেন (পারস্য তখন বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ছিল না)

৩, এই হাদীস বর্ণনা করেছেন আবু বকর নামে একজন সাহাবী ( ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর(রাঃ) কোন ক্রমেই নন) যিনি এই হাদীস উদ্ধৃত করেছেন রাসূল(সাঃ) এর অন্তর্ধানের ২৫ বছর পর উটের যুদ্ধের পরে; যখন যুদ্ধে হযরত আয়েশা(রাঃ) পরাজিত হয়েছেন হযরত আলী(রাঃ) এর কাছে এবং আবুবকর এ যুদ্ধে আয়েশা(রাঃ) এর হয়ে অংশ নিয়েছিলেন।


৪, ফাতিমা মার্‌নিসি (মরোক্কের একজন মুসলিম নারীবিদ) আরেকটি কারণ দেখান যে, আবু বকর সুযোগসন্ধানী হিসেবে এই হাদীস উদ্ধৃত করেন যাতে তার যুদ্ধকালীন প্রতিপক্ষ আলী(রাঃ) এর সহানুভূতি অর্জন করা যায়। (এটা একান্তই তার ব্যক্তিগত অভিমত, তাই এটা নিয়ে কথা বাড়াচ্ছিনা)





** যদি ১ নং ঘটনা সত্য হয় তাহলে ইমাম মালিক(রহঃ) এর মতে এই হাদিসটি গ্রহনযোগ্য নয় (এমন কি আবু বকর আর যেসব হাদীস বর্ণনা করেছেন সেগুলো ও)

যদি ২ নং সত্য বলে প্রতিভাত হয় , তাহলে হাদিসটি একটা নির্দিষ্ট স্থান এবং ঘটনার প্রসংগ, সার্বিক নয়।

যদি ৩ নং প্রমাণিত হয়, এটা হাদিসকে দুর্বল করে ফেলে।




প্রসঙ্গক্রমে আরও যোগ করতে চাই যে, একই হাদীসের একাধিক বর্ণনাকারী পাওয়া গেলে সেই হাদিসের শুদ্ধতা নিয়ে তত প্রশ্ন জাগেনা। কিন্তু আলোচ্য হাদীসের একজন বর্ণনাকারী ই পাওয়া যায়, অন্য কেউ এইরকম হাদীস বর্ণনা করেন নি।



((উল্লেখযোগ্য যে, Mohammad Hashim Kamali এর Hadith Studies বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, যখন ইমাম বুখারী(রহঃ) সংগ্রহের কাজ শেষ করেন তিনি সেটা সেই সময়ের ইসলামী পণ্ডিতদের ( আহমদ ইবনে হান্‌বাল সহ প্রমুখ) যারা চারটি হাদিসকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেন, কিন্তু বুখারী(রহঃ) সেগুলো রেখে দেন যেহেতু তিনি এ ব্যাপারে যথেষ্ট বিশ্বাসী ছিলেন। তারপরও বুখারী(রহঃ) তাঁর সংকলনের ভূমিকা পত্রে লিখেছেন যে মানুষ হিসেবে ভুল হতেই পারে তাঁর। এছাড়াও হাদীস বিশেষজ্ঞরা বুখারী শরীফের ৪৩০ জন বর্ণনাকারীর মধ্যে ৮০ জনের বর্ণনাকৃত হাদীস নিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন কিংবা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, আর ৮৯টি হাদিসকে চিহ্নিত করা হয়েছে “কিছু ত্রুটি আছে” এই বিবেচনায়। এটা কিন্তু কোনভাবেই বুখারী শরীফের সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয় বরং প্রগাঢ় সত্য অনুধাবনে এই গবেষণার কাজে জড়িতদের মতামত সম্পর্কে অবগত থাকা।))



এবার একটু কিয়াস আর ইজতিহাদী মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছি। কিয়াস হচ্ছে ইসলামী ফিকহ এর ৪র্থ উৎস, কোন বিষয় নিয়ে যখন কোরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবেনা, এরপরে হাদীসেও পাওয়া যাবেনা এমন কি ইজমাহ তেও না; তার সমাধান এর জন্য কিয়াস আরোপিত হয় হক্কানী পন্ডিতগণের সিদ্ধান্তে ; তবে অবশ্যই কোরআন এবং সুন্নাহ্‌র ভিত্তিতে।



আর ইজতিহাদী মাসআলা (কিয়াসের একটা অংশ) হচ্ছে এমন বিষয়াদি যেগুলোতে সরাসরি কোন সর্বাঙ্গীন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়না। উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করি; ইংরেজ শাসনামলে খন্ড ভারত আর অখন্ড ভারত সমর্থনের বিষয়টি ছিল ইজতিহাদী মাসআলা। উভয় পক্ষেই হক্কানী এবং যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমগণ ছিলেন। দেওবন্দ আলেমরা এই বিষয় নিয়ে স্পষ্টত দু ভাগ হয়ে পড়েন। দারুল উলুম দেওবন্দের সদ্‌রুল মুদার্‌রিস শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহ্‌মদ ওসমানী(রহঃ) এর নেতৃত্বাধীন আলেমগণ খন্ড ভারত (অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টি) আর শায়খুল ইসলাম আল্লামা সাইয়্যেদ হোসাইন আহ্‌মদ মাদানী(রহঃ) এর নেতৃত্বে আলেমগণ অখণ্ড ভারত এর পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যান।



এখন, প্রশ্ন হচ্ছে যে “নারী নেতৃত্ব” নিয়ে কোরআন কিংবা হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা (হ্যাঁ/না সূচক) আছে? উত্তর হচ্ছে, নেই। যেভাবে উদ্ধৃত আছে (হাদিস সহিহ কিংবা নয়; যেটাই হোক) সেখান থেকে দৃশ্যমান হয় যে নারী নেতৃত্বকে বলা হচ্ছে “এটি মাত্র অনুত্তম।” সরাসরি নিষেধ কিংবা হারাম কোথাউ বলা নেই।

আলোচনা এখানে শেষ করলে অপূর্ণ থেকে যায় বিধায় ২য় পর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রসংগ উত্থাপন। ভাল করে যদি আপনারা ঘটনা প্রবাহ খেয়াল করেন (হুদায়বিয়ার সন্ধি) তাহলে স্পষ্ট দেখবেন যে ইসলামের চরম অপমান করা হয়েছে সন্ধিতে (আপাত দৃষ্টিতে); আল্লাহকে অস্বীকার করা; রাসূল (সাঃ) যে আল্লাহ্‌র রাসূল সেটায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা কাফেরদের সেই পত্রে রাসূল(সাঃ) সম্মত হয়েছেন। আপনার চিন্তার ডাল পালা এখান থেকেই মেলে ধরুন কিছু প্রশ্নের আলোকে---

=> আল্লাহকে অস্বীকার করা এই সন্ধিতে কেন রাসূল(সাঃ) চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন?

=> আল্লাহ্‌র রাসূল(সাঃ) কে অস্বীকার করা এই সন্ধিতে কেন রাসূল(সাঃ) চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন?

=> মুসলমানদের উপর একরোখা এই সন্ধিতে কেন রাসূল(সাঃ) চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন?

=> উমর(রাঃ) এর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাসূল(সাঃ) কেন ওরকম বলেছিলেন?




উত্তরটা জানতে হলে কোরআনের আয়াত খুঁজে নিতে হবে, সূরা আল-ফাতহের ১-২ নং আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেন,

“হে নবী, আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয়ের উদ্বোধন করেছি যেন আল্লাহ্‌ তোমার আগের ও পেছনের সকল গুনাহ মাফ করে দেন, তোমার উপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করেন এবং তোমাকে নির্ভুল পথে পরিচালিত করেন।”

একই সূরার ২৭ নং আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেন,

“আল্লাহ্‌ তাঁর রাসূলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন যে তিনি শীগ্রই নিরাপদে ও নির্ভয়ে মক্কায় প্রবেশ করবেন। আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে নিরাপদে মাথার চুল মুন্ডিয়ে ও ছেটে নির্ভীকচিত্তে প্রবেশ করবে। সে (আল্লাহ্‌র রাসূল) সেই জিনিস অবগত হয়েছে যা তোমরা অবগত হওনি। ঐ ঘটনার (হুদায়বিয়া সন্ধি) পরেই নির্ধারিত রেখেছেন আসন্ন বিজয়।”




যেহেতু পবিত্র কোরআন এবং হাদীসে নারী নেতৃত্ব এর ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই সেহেতু এই জায়গাতে অনেক ব্যাখ্যা থাকবেই। হুদায়বিয়া সন্ধিতে রাসূল(সাঃ) মুসলমানদের জন্য (আপাতদৃষ্টিতে) অপমানজনক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র নির্দেশে এক ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য, সেই বিজয় যা ইসলামের জয়ের ইতিহাসকে করেছে এর আগের কয়েক বছরের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় উজ্জ্বল এবং স্মরণীয়। হাদীসের রেফারেন্স, সাবার রাণীর ঘটনা সহ অন্যান্য দিকের পরেও যে দিকটি আমরা ভুলে না যাই সেটি হল “পরিস্থিতি”। মনে রাখবেন,গুরুতর প্রয়োজনে ইসলাম “pork ” অর্থাৎ “Meat from a domestic hog or pig” খাওয়াকে মেনে নেয়; তাই “পরিস্থিতি” অনেক কিছুর নির্দেশক।



আগেই বলেছিলাম, “লেখাটির কোথাও আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজস্ব কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছিনা এবং কাউকে পরামর্শ দেবার ঔদ্ধত্ব্য ও দেখাচ্ছিনা। শুধু আলোচনা করতেই এই প্রয়াস। ইসলাম সর্বদা আলোচনাকে উৎসাহ প্রদান করে।”



বুখারী শরীফের হাদিস অনুযায়ী , এহেন আলোচনার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তার জন্য যেমনি সওয়াব; ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলেও তার জন্য সওয়াব। আর ভুল ঠিকের নির্ধারক কিন্তু মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন।



শেষ করছি পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত দিয়েঃ



১) এটি একটি গ্রন্থ, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে করে আপনি এর মাধ্যমে ভীতি-প্রদর্শন করেন। অতএব, এটি পৌছে দিতে আপনার মনে কোনরূপ সংকীর্ণতা থাকা উচিত নয়। আর এটিই বিশ্বাসীদের জন্যে উপদেশ।(সূরা আরাফ: আয়াত ২)

২) এটা মানুষের একটি সংবাদ-নামা এবং যাতে এতদ্বারা ভীত হয় এবং যাতে জেনে নেয় যে, উপাস্য তিনিই-একক; এবং যাতে বুদ্ধিমানরা চিন্তা-ভাবনা করে। (সূরা ইবরাহিম: আয়াত ৫২)

৩) আপনাকে ক্লেশ দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করিনি। কিন্তু তাদেরই উপদেশের জন্য যারা ভয় করে। (সূরা ত্বাহা: আয়াত ২-৩)

৪) আমি রসূলকে কবিতা শিক্ষা দেই নি এবং তা তার জন্যে শোভনীয়ও নয়। এটা তো এক উপদেশ ও প্রকাশ্য কোরআন। যাতে তিনি সতর্ক করেন জীবিতকে এবং যাতে কাফেরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূরা ইয়াসীন: আয়াত ৬৯-৭০)

৫) আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি? (সূরা কামার: আয়াত ১৭)


পীর চর্মনাই এর নারী নেতৃত্ব সমর্থন:


চর্মনাই পীরের শিষ্যরা প্রায়ই বলে থাকে তাদের পীর নারী নেতৃত্ব বিরোধী। জামাত, ঐক্যজোট, খেলাফত মজিলসের মত তারা নারী নেতৃত্ব সমর্থন করেনা।নারীর সাথে তারা জোট বাঁধেনাই।ইত্যাদি ইত্যাদি।


আসলে তারা কতটুকু নারী নেতৃত্ব বিরোধী? নারী নেতৃত্বের সাথে কি তাদের কোন সম্পর্ক নেই? তারা কি নারী নেতৃত্ব সমর্থন করেনা?


একজন ওলিআল্লাহ বা পীর সাহেব উনার কথা ও কাজে উনি পরিপূর্নরূপে খাঁটি হবেন।


কিন্তু চর্মনাইর নামধারি পীর সাহেব কথা ও কাজে কি খাঁটি? চরমনাইর পীর নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বললেও সে তার কথা ও কাজে যে নারী নেতৃত্ব সমর্থনকারী তা নীচের আলোচনা থেকেই পরিষ্কার বুঝা যাবে ইনশাআল্লাহ।


চর্মনাইর পীর ২০০১ সালের নির্বাচনে এরশাদের সাথে জোট করে ইসলামি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিল।তার এই ফ্রন্টেও রওশন এরশাদ, জিনাত মশাররফ ইত্যাদি নারী নেত্রী ছিল। এদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েই চর্মনাই পীর তথাকথিত ইসলামি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিল।


অত:পর নির্বাচনে যখন খালেদা জিতল তখন ২০০২ সালে মু্ক্তাঙ্গনের জনসভায় চর্মনাইর পীর বলেছিল, ” বর্তমান ক্ষমতাসীন নেত্রীর উচিত আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা কারন গত নির্বাচনে আমি যদি এরশাদকে আমার সাথে না রাখতাম তাহলে এরশাদ বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে যোগ দিত তাতে করে ক্ষমতাসীন নেত্রীর জয় এত সহজ হতোনা।”


তার এ বক্তব্য থেকে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ২০০১ এর সেই নির্বাচনে চর্মনাই পীর নারী নেতৃত্বের পক্ষেই কাজ করেছেন, তার নেত্রী যেন সহজে জয় লাভ করতে পারে সে ব্যাবস্থা করেছেন। কৌশলের মাধ্যমে নেত্রীর বিজয়ে ভূমিকা রেখেছেন। আসলে কি তাই? আসলে এটা হচ্ছে ধান্দাবাজ চর্মনাই পীরের আরেক ধান্দাবাজি বক্তব্য, ধান্দাবাজির আরেক নিকৃষ্ট উদাহরণ।যদিও তার এ বক্তব্য তাকে নারী নেতৃত্ব সমর্থনকারী প্রমাণ করে (যেটা তিনি নিজেই হারাম বলেন) তারপরও যদি কিছু সুবিধা পাওয়া যায় এই ধান্দায় তখন সে হারামের পক্ষেই বলা শুরু করেছে।


এরপর খুলনা শহিদ হাদিস পার্কে ১৭-০৫-২০০২ এক জনসভায় তিনি বলেন, ” ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসি চার দলীয় জোট বর্তমানে ক্ষমতায়” (দৈনিক ইনকিলাব ১৮ মে, ২০০২,পৃষ্ঠা ৩)


এখানেও তিনি নারী নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটকে ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসি বলে সাফাই গেয়ে হারাম নারী নেতৃত্বের পক্ষেই বলেছেন, নারী সমর্থন করেছেন।এটাও তার স্বার্থান্বেষী সুবিধাবাধি বক্তব্য।


এরপর মানবজমিন পত্রিকায় দেখা গেল চর্মনাই পীর খালেদাকে আট দফা শর্ত দিয়ে বলেন খালেদা আট দফা মানলে তিনি খালেদার সাথে যোগ দিবেন।কিন্তু খালেদার নিকট চর্মনাইকে তেমন কোন ফেক্টর বলে মনে হয়নাই বলে খালেদা তার আট দফায় কান দেয়নাই।তবে এর মাধ্যমে এই ভন্ড পীরের নারী নেতৃত্ব প্রীতিই জাহির হয়েছে।


এরপর বর্তমান পীর রেজাউল করিম সে যখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হলো তখন সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ” আপনি মহিলা সদস্যাদের সাথে কিভাবে বৈঠক করবেন?” জবাবে সে বলেছে, “আমি মহিলাদের সাথে বৈঠক করতে কোন ইতস্তত করবনা, তাদেরকে বোরকা পরতে বলবনা, নারী নেতৃত্বের বিরোধীতা শীর্ষ পর্যায়ে করলেও তৃণমূল পর্যায়ে করবনা” (দৈনিক ভোরের কাগজ)- এ ভন্ড পীর বেপর্দা হতে কোন ইতস্ততই নাকি করবেনা আবার বলে তৃনমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের বিরোধীতা করবেনা, তৃনমূল পর্যায়ে কি নারী নেতৃত্ব জায়েজ?


অর্থাৎ এই পীর নিজেকে নারী নেতৃত্ব বিরোধী দাবি করলেও অনেকভাবেই সে নারী নেতৃত্ব সমর্থন করছে, নারী নেতৃত্বের পক্ষে সাফাই গেয়েছে, নারী নেত্রীর জন্য কাজ করেছে। কিঞ্চিৎ প্রমাণ এখানে দেয়া হলো।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নির্ভেজাল ইসলামের স্বরুপ সন্ধানে

ইসলাম ও গনতন্ত্র

সাড়ে তিন হাত বডিতে ইসলাম !