শুক্রুবারে কেয়ামত - বুখারীর জাল হাদীস

 শুক্রবারে কেয়ামত?

-------------------------------

সহীহ মুসলিমের হাদিসে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত "সূর্য যে দিনে উদিত হয়েছে সেই দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো শুক্রবার; এই দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, এই দিনে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে, এবং কিয়ামত কখনো শুক্রবার ছাড়া অন্য কোনো দিনে সংঘটিত হবে না" এই ধর্মীয় দাবিটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও ইতিহাসের আলোয় পর্যালোচনা করলে অসংখ্য মৌলিক ত্রুটি ও যৌক্তিক অসংগতি প্রকাশ পায় যা এই সহি হাদিসকে সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর ও অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করে। 


এই সহীহ হাদিসের মূল সমস্যা হলো এটি ধরে নেয় যে আদম এর সৃষ্টির শুক্রবার থেকে শুরু করে সাত দিনের অবিচ্ছিন্ন চক্র অনুসরণ করে আজকের শুক্রবার পর্যন্ত ৭ এর নিখুঁত গুণিতক বজায় রয়েছে, কিন্তু মানব ইতিহাসে ক্যালেন্ডার সংস্কার, সময় গণনার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সভ্যতার ভিন্ন ভিন্ন দিন সপ্তাহ ব্যবস্থার কারণে এই ধারাবাহিকতা বহুবার ভেঙে গেছে এবং হারিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডার সংস্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ১৫৮২ সালের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সংস্কার, যেখানে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশের আদেশে ৪ই অক্টোবর ১৫৮২ সালের পরের দিনটি ১৫ই অক্টোবর ১৫৮২ ঘোষণা করা হয়, অর্থাৎ পুরো ১০ দিন সম্পূর্ণভাবে ক্যালেন্ডার থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং এর ফলে যদি ৪ই অক্টোবর শুক্রবার হয়ে থাকে তাহলে ১৫ই অক্টোবর সোমবার হওয়ার কথা, কিন্তু তা না করে ১৫ই অক্টোবরকেও শুক্রবার ঘোষণা করা হয়, যার ফলে সাত দিনের চক্রীয় ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং আদমের কথিত শুক্রবার থেকে ৭ এর গুণিতক হিসাবে চলে আসা শুক্রবারের ধারা চিরতরে হারিয়ে যায়। এই সংস্কারের আগে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হতো যেটি প্রতি ১২৮ বছরে একদিন এগিয়ে যেত, এবং ৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজার এই ক্যালেন্ডার চালু করার সময় পুরাতন রোমান ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য ৪৪৫ দিনের একটি বছর তৈরি করেছিলেন, যা "বিভ্রান্তির বছর" নামে পরিচিত এবং এর ফলেও সাত দিনের চক্রে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছিল। রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন ৩২১ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম সাত দিনের সপ্তাহ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেন এবং রবিবারকে বিশ্রামের দিন ঘোষণা করেন, কিন্তু এর আগে রোমানরা আট দিনের চক্র অনুসরণ করত, যার অর্থ হলো কনস্ট্যান্টাইনের সময়কাল পর্যন্ত সাত দিনের অবিচ্ছিন্ন ধারা আদৌ বিদ্যমান ছিল না। গ্রেগরিয়ান সংস্কারের পর বিভিন্ন দেশে এই নতুন ক্যালেন্ডার গ্রহণের সময়ে আরও অসংগতি সৃষ্টি হয়েছে। ইংল্যান্ড ও তার উপনিবেশগুলো ১৭৫২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে এবং ২রা সেপ্টেম্বরের পরে ১৪ই সেপ্টেম্বর গণনা করে মোট ১১ দিন বাদ দেয়, রাশিয়া ১৯১৮ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর এই ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে এবং ৩১শে জানুয়ারির পরে ১৪ই ফেব্রুয়ারি গণনা করে ১ৃ দিন এগিয়ে যায়, গ্রিস ১৯২৩ সালে, তুরস্ক ১৯২৬ সালে এবং চীন ১৯১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করলেও বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োগ করা হয়, আর এই সব পরিবর্তনের ফলে প্রতিটি অঞ্চলে ৭ এর গুণিতক ধারাবাহিকতা ভিন্ন ভিন্নভাবে ভেঙে যায় এবং আজকের পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে "শুক্রবার" বলতে আদম সৃষ্টির সেই মূল শুক্রবার থেকে ভিন্ন ভিন্ন দিন বোঝায়।


ক্যালেন্ডার সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন সভ্যতার নিজস্ব সময় গণনা পদ্ধতি এই ধারাবাহিকতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রাচীন মিশরীয়রা ১০ দিনের সপ্তাহ ব্যবহার করত, মায়ানরা ২০ দিনের মাস এবং ১৩ দিনের ধর্মীয় চক্র অনুসরণ করত, চীনারা ১০ দিনের দশক এবং ১২ দিনের পশুচক্র ব্যবহার করত, হিন্দু ক্যালেন্ডারে চাঁদের হিসাবে ভিন্ন দিন গণনা আছে, ইনকা সভ্যতায় ১০ দিনের সপ্তাহ প্রচলিত ছিল, আর ফরাসি বিপ্লবের সময় (১৭৯৩-১৮০৫) ফ্রান্সে ১০ দিনের দশকীয় ক্যালেন্ডার চালু করা হয়েছিল যেখানে ঐতিহ্যবাহী সাত দিনের সপ্তাহ সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়, সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯২৯-১৯৪০ সাল পর্যন্ত পাঁচ দিন এবং পরে ছয় দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছিল যা ঐতিহ্যবাহী শুক্রবারের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছিল। এই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে সাত দিনের সপ্তাহ কোনো সর্বজনীন বা প্রাকৃতিক নিয়ম নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে প্রয়োগ বা পরিত্যাগ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক দলিল ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আরও স্পষ্ট করে যে প্রাচীনকালে সময় গণনায় অসংখ্য ত্রুটি, বিভ্রান্তি ও স্বেচ্ছাচারিতা ঘটেছে - রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা ও নিরো তাদের ইচ্ছামতো বিভিন্ন মাসের নাম পরিবর্তন করেছেন এবং দিন সংখ্যা বাড়িয়ে-কমিয়েছেন, মধ্যযুগে বিভিন্ন সন্ন্যাসী ও পণ্ডিত ক্যালেন্ডার গণনায় ভুল করেছেন যার ফলে অনেক বছরের হিসাব ভুল হয়ে গেছে, ভূমিকম্প, যুদ্ধ, মহামারী ও সামাজিক অস্থিরতার সময় অনেক অঞ্চলে নিয়মিত দিন গণনা ব্যাহত হয়েছে, বিভিন্ন ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার চালু করেছে যা পূর্ববর্তী হিসাবের সাথে সাংঘর্ষিক, এবং সর্বোপরি লিখিত ইতিহাসের শুরুর আগে হাজার হাজার বছর ধরে মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে সময় গণনা চলত যেখানে ভুল ও পরিবর্তনের অসংখ্য সুযোগ ছিল। এই সমস্ত কারণে আদমের কথিত শুক্রবার থেকে আজকের শুক্রবার পর্যন্ত ৭ এর নিখুঁত গুণিতক বজায় থাকার দাবি গাণিতিকভাবে অসম্ভব, ঐতিহাসিকভাবে অপ্রমাণিত এবং যৌক্তিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।


পৃথিবী একটি গোলাকার গ্রহ যা তার নিজ অক্ষের চারদিকে ২ ঘন্টায় একবার আবর্তিত হয় এবং এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একই মুহূর্তে ভিন্ন ভিন্ন সময় ও দিন বিরাজ করে,  যখন মক্কায় শুক্রবার দুপুর ১২টা, তখন লস অ্যাঞ্জেলেসে বৃহস্পতিবার রাত ২টা, নিউইয়র্কে শুক্রবার ভোর ৫টা, লন্ডনে শুক্রবার সকাল ১০টা, টোকিওতে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা এবং সিডনিতে শুক্রবার রাত ৯টা বাজে, যার অর্থ হলো আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার কারণে পৃথিবীতে একযোগে দুইটি ভিন্ন দিন অবস্থান করে এবং ২ টি ভিন্ন টাইমজোনের মধ্যে কিছুতে শুক্রবার, কিছুতে বৃহস্পতিবার এবং কিছুতে শনিবার চলতে থাকে। এই বাস্তবতায় "শুক্রবারে কিয়ামত" ধারণাটি মৌলিক একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, ঠিক কোন টাইমজোনের শুক্রবার বোঝানো হচ্ছে এবং যদি মক্কা-মদিনার সময়কে প্রাধান্য দেওয়া হয় তাহলে পশ্চিম গোলার্ধের কোটি কোটি মানুষের জন্য সেই ঘটনা বৃহস্পতিবারে ঘটবে, যা একটি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান সত্তার ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে প্রকট ভাবে সাংঘর্ষিক।


এই হাদিস ও ভবিষ্যদ্বাণী এমন এক যুগের ও ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের সাপেক্ষে দেওয়া যখন মানুষ পৃথিবীকে একটি সমতল ভূমি মনে করত, সূর্য সবার জন্য একযোগে উঠত এবং ডুবত বলে বিশ্বাস করত, টাইমজোনের ধারণা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল, আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার অস্তিত্ব জানা ছিল না, মহাকাশ বিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার কোনো ধারণা ছিল না, এবং স্থানীয় সূর্যঘড়ি ও চাঁদের হিসাবের বাইরে সময় পরিমাপের কোনো উন্নত পদ্ধতি ছিল না, এই কারণে তারা মনে করতো সারা দুনিয়াতে একই সময়ে একটি বারই( শুক্র, শনি, রবি...) হয়।  যদি সে যুগের মানুষদের গোল পৃথিবী, টাইমজোন, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, মহাকাশীয় পরিমাপ ও বৈশ্বিক সময় ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকত তাহলে কখনোই একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় দিনের নাম দিয়ে একটি বৈশ্বিক বা মহাজাগতিক ঘটনা বর্ণনা করা সম্ভব হতো না। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ও সাধারণ তত্ত্ব অনুযায়ী সময় একটি আপেক্ষিক বিষয় যা গতি, মাধ্যাকর্ষণ ও পর্যবেক্ষকের অবস্থানের উপর নির্ভরশীল - আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীদের জন্য সময় পৃথিবীর তুলনায় ভিন্নভাবে প্রবাহিত হয়, বিভিন্ন গ্রহ ও নক্ষত্রে সময়ের গতি ভিন্ন, এবং মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতার কারণে স্থান-কালের বক্রতা পরিবর্তিত হয়, তাই "একটি নির্দিষ্ট দিনে মহাবিশ্বের সর্বত্র একযোগে কিয়ামত" ধারণাটি পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রের পরিপন্থী।


আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের সময়কে প্রাধান্য দেওয়ার যুক্তি আরও হাস্যকর ও অযৌক্তিক কারণ বর্তমানের সৌদি আরব বিংশ শতাব্দীতে (১৯৩২ সালে) গঠিত একটি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র যার রাজনৈতিক সীমানা, শাসন ব্যবস্থা ও ভৌগোলিক পরিচয় ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়েছে, উসমানীয় সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ প্রভাব, আরব জাতীয়তাবাদ ও পেট্রোলিয়াম রাজনীতির ফসল হিসেবে গড়ে উঠেছে, এবং সৃষ্টির আদিকাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত এই কৃত্রিম রাজনৈতিক সত্তার অস্তিত্ব বজায় থাকবে এমন কোনো যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। ভবিষ্যতে যদি মানবজাতি অন্য গ্রহে বসতি স্থাপন করে, যেমন মঙ্গল গ্রহ যার একদিন পৃথিবীর চেয়ে ৩৯ মিনিট দীর্ঘ এবং এক বছর পৃথিবীর ৬৮৭ দিনের সমান, তাহলে সেখানকার অধিবাসীদের জন্য "শুক্রবার" ধারণাটি কোনো অর্থ বহন করবে না, কারণ তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিন-রাত চক্র, ঋতু পরিবর্তন ও ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করবে। সর্বশেষে, এই পুরো আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে সহীহ মুসলিম এর "শুক্রবারে কিয়ামত" সংক্রান্ত হাদিসটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক সভ্যতার একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মিথ মাত্র, যার কোনো বৈজ্ঞানিক, যৌক্তিক, গাণিতিক বা ভৌগোলিক ভিত্তি নেই। আদমের কথিত শুক্রবার সৃষ্টি থেকে ৭ এর গুণিতক হিসাবে আজকের শুক্রবার পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার দাবি ইতিহাসের অসংখ্য ক্যালেন্ডার সংস্কার, সময় গণনার পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কারণে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গেছে এবং হারিয়ে গেছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় এটি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর, অপ্রাসঙ্গিক ও পরিত্যাজ্য , যা প্রমাণ করে যে এই ধরনের ধর্মীয় দাবিগুলো মানুষের স্থানীয় অভিজ্ঞতা, সীমিত জ্ঞান ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের উৎপাদন, কোনো অতিপ্রাকৃত বা ঐশ্বরিক উৎসের নয়।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নির্ভেজাল ইসলামের স্বরুপ সন্ধানে

ইসলাম ও গনতন্ত্র

সাড়ে তিন হাত বডিতে ইসলাম !