শরীয়া আইনও মানব রচিত আইনই
শরিয়া আইনের পক্ষে ও বিপক্ষে বেশ কিছু বই পড়ার পর আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হলো একে পুরোপুরি ‘আল্লাহর আইন’ বলা কঠিন। কারণ প্রচলিত শরিয়া ব্যবস্থার বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে মানুষের ব্যাখ্যা, ফিকহ, কিয়াস, ইজতিহাদ ও বিভিন্ন আলেমের মতামতের ভিত্তিতে। তাই আমার কাছে এটি অনেকটাই মানব-রচিত আইনব্যবস্থা বলেই মনে হয়। এবং অনেক কিছুই সরাসরি কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক৷
শরিয়তের উৎস সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইদরিস আল-শাফিঈ পৃথকভাবে দুটি বই লিখেছিলেন। বই দুটিতে প্রায় ছয় হাজার আইন রয়েছে। আর বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ইসলামি আইনের বইগুলোতে মোট আইনের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।
অথচ কোরআনে আইন বা এ-সম্পর্কিত আয়াত রয়েছে মাত্র কয়েকটি, এবং হাদিসে রয়েছে আরও অল্প কিছু।
বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ৫১ অধ্যায়ে মোট ১৮৬টি আইন উল্লেখ আছে। সেখানে ৩৪৪টি সূত্রের মধ্যে কুরআনের আয়াত মাত্র ১টি, সহিহ হাদিস ১৮১টি এবং বাকি ১৬২টি সূত্র বিভিন্ন আলেম, ফকিহ বা মানবীয় ব্যাখ্যাভিত্তিক মতামত বলে দাবি করা হয়।
শরিয়া আইনে মুরতাদকে তিন দিন সময় দেওয়া হয় তওবা করে ইসলামে ফিরে আসতে। সে তা না করলে মৃত্যুদণ্ড। (বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন ৩য় খণ্ড, ধারা ১২৭৬, শাফি ল’ ও.৮.২ ইত্যাদি)
শরিয়ার অন্য একটি ভয়ানক আইন হল মুরতাদকে যে কেউ যে কোনো জায়গায় খুন করতে পারে, তাতে খুনীর মৃত্যুদণ্ড হবে না। (বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন ১ম খণ্ড, ধারা ৭২, শাফি ল’ ও.৫.৪ ইত্যাদি)
অর্থাৎ কোনো ধর্মান্ধ কাউকে মুরতাদ ঘোষণা করলে তাকে খুন করতে অন্য ধর্মান্ধকে উৎসাহিত করা হয়। মুসলিম বিশ্বে এমন ঘটনা ঘটেছে এবং খুনীর শাস্তি হয়নি।
হানাফি আইনে নারী মুরতাদের আজীবন কারাবাস। (হেদায়া, পৃষ্ঠা ১৪৬)
কিন্তু কুরআন এই আইনের বিরোধিতা করে। সুরা ইউনুস ৯৯– “তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তি করিবে ইমান আনিবার জন্য?”
কাহ্ফ ২৯ “যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।”,
নিসা ৮০ “আর যে লোক বিমুখ হইল, আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ!) তাহাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করি নাই।”
ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।" (সুরা আল-বাকারা, ২:২৫৬) ইত্যাদি প্রায় ৩০টি আয়াত।
মুরতাদের ওপরে কোরানে বেশকিছু আয়াত আছে, কিন্তু কোরানের কোথাও খুন করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। বরং এর ভেতরে মানুষের নাক গলানো নিষেধ করা আছে। যেমন: বাকারা ২১৭, ইমরান ৮২, ৮৬, ১০৬, নাহল ১০৬, মুনাফিকুন ৩, তওবা ৬৬ ও ৭৪, নিসা ৯৪, ও নিসা ১৩৭ “যাহারা একবার মুসলমান হইয়া পরে আবার কাফের হইয়া গিয়াছে, আবার মুসলমান হইয়াছে এবং আবার কাফের হইয়াছে এবং কুফরিতেই উন্নতি লাভ করিয়াছে, আল্লাহ তাহাদের না কখনও ক্ষমা করিবেন, না পথ দেখাইবেন।”
অর্থাৎ কোরান সুস্পষ্ট ভাষায় মুরতাদকে ইসলামে ফিরে আসার সুযোগ ও অধিকার দিয়েছে, তাকে খুন করলে সেই খুন সরাসরি কোরান লঙ্ঘন হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে কোরানের আরেকটা স্পষ্ট নির্দেশ আছে সুরা ইমরানের ৮৬ নম্বর আয়াতে। হারিথ নামে এক মুসলমান মুরতাদ হলে তার ওপর নাজিল হয়েছিল এ আয়াত:
“কেমন করে আল্লাহ এমন জাতীকে হেদায়েত দেবেন যারা ইমান আনার পর ও রাসুলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেওয়ার পরও তাদের কাছে প্রমাণ আসার পর কাফের হয়েছে?”
রাসুল (সা.) তাকে মৃত্যুদণ্ড কেন, কোনো শাস্তিই দেননি। (সিরাত – ইবনে হিশাম-ইবনে ইশাক, পৃষ্ঠা ৩৮৪)
আমাদের দেশে কোন অঘটনা ঘটলে একদল এসে বলেন "একবার আল্লাহর আইন শরিয়া প্রয়োগ করে দেখুন, দেশ থেকে ধ"র্ষ"ণ উঠে যাবে।”
তা-ই? হতেও পারে! তাহলে দলিলপত্র একটু ঘেঁটেই দেখা যাক।
আমি বিশেষ করে বাংলাদেশ ইসলামী ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’ ও মওলানা মুহিউদ্দীন খানের অনুদিত কোরান থেকে আলোচনা করছি।
• “বলপ্রয়োগকারী জেনার শাস্তি ভোগ করিবে যদি বলপ্রয়োগ প্রমাণিত হয়।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ১ম খণ্ড, ধারা ১৩৪খ।
চমৎকার আইন, ন্যায্যও বটে। কিন্তু গেঁড়ো বেঁধে যায় “বলপ্রয়োগ প্রমাণিত হয়” এখানে এসে। কারণ, শরিয়া আইনে ধর্ষণের প্রমাণ হল চারজন পুরুষ মুসলমানের চাক্ষুষ সাক্ষী, সেখানে নারী সাক্ষী বা ডিএনএ পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য নয়। সেজন্যই ১৫-২০ বছর আগে লাহোর হাইকোর্ট এক পরকীয়া মামলার রায়ে বলেছে, শরিয়ার “বিশেষ” অনুষঙ্গ আছে যেখানে ডিএনএ পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য নয়।
কোরানে জেনার উল্লেখ ও শাস্তি রয়েছে কিন্তু আলাদা করে ধর্ষণের উল্লেখ নেই। এদিকে শরিয়া আইনে ধর্ষণকে ধরা হয়েছে জেনার আওতায়। উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
“কোনো পুরুষ বা নারী বলপ্রয়োগ করিয়া পর্যায়ক্রমে কোনো নারী বা পুরুষের সহিত সঙ্গম করিলে তাহা জেনা হিসেবে গণ্য হইবে।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ১ম খণ্ড, ধারা ১৩৪।
অর্থাৎ ধর্ষণের ও জেনার প্রমাণ একই। সেজন্যই আইন বানানো হয়েছে:
“বলপ্রয়োগকারী জেনার শাস্তি ভোগ করিবে যদি বলপ্রয়োগ প্রমাণিত হয়।”
এখন তাহলে দেখা যাক শরিয়া আইনে জেনার প্রমাণ কী। বলা দরকার, শরিয়া আইনে হুদুদ মামলায় পারিপার্শ্বিক বা পরোক্ষ প্রমাণ গ্রহণযোগ্য নয়। উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
“হুদুদ মামলায় পারিপার্শ্বিক প্রমাণ চলিবে না।” (চাক্ষুষ সাক্ষী থাকতে হবে)
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ২য় খণ্ড, ধারা ৬০০।
• চুরি-ডাকাতি-মদ্যপান-খুন-জখম-মানহানি-জেনা (এগুলো হুদুদ মামলা) প্রমাণ চারজন পুরুষ সাক্ষী, নারী সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ১ম খণ্ড ধারা ১৩৩; শফি আইন 0.13.1, 0.24.9; মুহিউদ্দীন খানের অনুদিত বাংলা কোরান – পৃষ্ঠা ২৩৯ আর ৯২৮; ‘দ্য পেনাল ল অব ইসলাম’, পৃষ্ঠা ৪৪; হানাফি আইন হেদায়া, পৃষ্ঠা ৩৫৩; শফি আইন o.24.9; ‘ক্রিমিন্যাল ল ইন ইসলাম অ্যান্ড দ্য মুসলিম ওয়ার্লড’, পৃষ্ঠা ২৫১।
এ আইন ইসলামবিরোধী এটা শরিয়াবিদরাও বোঝেন। তাই আইনটাকে একটু মেরামত করার চেষ্টা হয়েছে। যেমন: ১১ শতাব্দীতে স্পেনের ইমাম ইবনে হাজম প্রস্তাব করেছিলেন, জেনা প্রমাণের ক্ষেত্রে চারজন ন্যায়পরায়ণ মুসলমান পুরুষ সাক্ষী অথবা প্রতিজন পুরুষের পরিবর্তে দুজন মুসলিম ন্যায়পরায়ণ মহিলা হলেও চলবে।
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ৩য় খণ্ড, ৮৮৮ পৃষ্ঠা।
অর্থাৎ সাতজন মেয়ের সামনে যদি জেনা বা ধর্ষণ হয় তবে অপরাধীরা সবার সামনে অট্টহাসি হাসতে হাসতে পগার পার হয়ে যাবে। আর “ন্যায়পরায়ণ মহিলা” কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী, তা নিয়ে উকিলের তর্কবিতর্কের শেষ হবে না। তাছাড়া ইমাম হজমের প্রস্তাবটা কেউ পাত্তা দেয়নি, ‘হানাফি’-‘শফি’-‘পেনাল ল অফ ইসলাম’-‘ক্রিমিন্যাল ল ইন ইসলাম অ্যান্ড দ্য মুসলিম ওয়ার্লড’ ইত্যাদি কেতাবে নারী সাক্ষী নিষিদ্ধই রয়ে গেছে। এর সঙ্গে মিলিয়ে নিন–
• “পরকীয়া এবং ধর্ষণের প্রমাণ অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি অথবা চারজন বয়স্ক পুরুষ মুসলমানের চাক্ষুষ সাক্ষ্য।”
– পাকিস্তানের হুদুদ আইন, নং ৭-১৯৭৯, সংশোধনী ২০, ৮ এর খ – ১৯৮০।
২০০৬ সালে সংসদে এ আইন বাতিলের প্রস্তাব উঠলে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী ক্ষিপ্ত হয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন ও সংসদ থেকে পদত্যাগের হুমকি দিয়ে বলেছে:
“শরিয়া মোতাবেক এই আইনই সঠিক, এর কোনোরকম পরিবর্তন কোরান ও শরিয়ার খেলাফ। এ পরিবর্তন দেশকে অবাধ যৌনতার স্বর্গ বানাবে।” এই হল ইসলামি নেতৃত্বের বিবেক ও বোধ।
• “হুদুদ মামলায় নারী বিচারক অবৈধ।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ২য় খণ্ড, ধারা ৫৫৪।
• “জেনা ও ধর্ষণ সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ না হইলে জেনাকারীর শাস্তি হইবে না যদি সে অস্বীকার করে।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, প্রথম খণ্ড, ৩০১ পৃষ্ঠা।
• “কোনো কারণে শাস্তি মওকুফ হইলে ধর্ষক ধর্ষিতাকে মোহরের সমান টাকা দিবে।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ১ম খণ্ড, ৩০১ পৃষ্ঠা, শফি আইন এম ৮-এর ১০।
• “চাক্ষুষ সাক্ষ্য না থাকলে শুধু আলামতের ভিত্তিতে খুনি-ডাকাতের শাস্তি হবে না।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ধারা ৬০০-এর বিশ্লেষণ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯২।
কী হবে যদি কোনো বোবা পুরুষ বা গায়িকা কিংবা সমাজের নিচু ব্যক্তির সামনে ধর্ষণ হয়? সে ব্যাপারেও শরিয়া আইন খুবই পরিষ্কার। উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
• “বোবার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ১ম খণ্ড, ধারা ১৪৯।
• “দাস-দাসী, গায়িকা এবং সমাজের নিচু ব্যক্তির (রাস্তা পরিষ্কারকারী বা শৌচাগারের প্রহরী ইত্যাদি) সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।”
– ‘বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন’, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৩; হানাফি আইন পৃষ্ঠা ৩৬১; শফি আইন o.24.3; ‘পেনাল ল অব ইসলাম’, পৃষ্ঠা ৪৬।
অর্থাৎ আমরা পেলাম এসব মামলায় নারীর বিচারক নিষিদ্ধ এবং নারী, গায়িকা, বোবা (পুরুষ হলেও), ও সমাজের নিচু ব্যক্তির (পুরুষ হলেও) চোখের সামনে পরকীয়া বা ধর্ষণ হলে তথাকথিত “আল্লাহর আইনে” তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
শরিয়া আইনে মামলা করার সময় ধর্ষিতা মাহরাম অভিভাবক (প্রধানতঃ বাবার) অনুমতি নিয়ে থানায় যাবেন। এবং বাকী কোর্ট প্রসিডিং এ বাবা কিংবা ভাই সমস্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণের বিধান করবেন।
সমস্ত আলামত, ডিএনএ টেস্টে যদি প্রমাণ হয় ইন্টারকোর্স হয়েছে; তাহলে সবার আগে প্রমাণ করতে হবে এটা জেনা নয়। বলপ্রয়োগ হয়েছে। ধর্ষিতা যদি ৪ জন স্বাক্ষী দিয়ে প্রমাণ না করতে পারেন যে, উনি এটি মিউচুয়াল সেক্স করেন নাই; বরং উনাকে জোর করে রেইপ করা হয়েছে; তবেই কোর্টের বিচার চলবে।
নইলে ধর্ষক ও ধর্ষিতা উভয়েরই বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের দায়ে বেত্রাঘাত থেকে মৃত্যুদন্ড হতে পারে। যেমন সৌদি আরবে আয়েশা ইব্রাহিম দুহুলো শরীয়াহ কোর্টে ৩ জন পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছিলেন ২০০৮ সালে। ১৩ বছরের এই নারী প্রমাণ করতে পারেন নাই, ৪ জন স্বাক্ষী দিয়ে শরীয়াহ কোর্টে। তারপর উল্টো ওই মেয়েকেই পাথর মেরে হত্যা করা হয়। এই নিয়ে নিউজ অনলাইনেই আছে। জাতিসঙ্ঘের নিন্দাসহ।
৪ জন স্বাক্ষীর কথা বলা হয়েছে, যারা প্রমাণ করবে তারা দেখেছেন- যে মিউচুয়াল সেক্স হয় নাই। রেইপ হয়েছে। তখন ভিক্টিম ছাড়া পাবেন। নইলে জেনার দায়ে রেপিস্ট আর ভিক্টিম উভিয়েরই বিচার হবে। যেমন কাতিফ রেইপ কেইসে রেইপড মহিলাকেও ১০০ বেত্রঘাত দেয়া হয়েছিল, কেননা উনি সন্ধ্যার পর একা গাড়িতে ছিলেন। ৪ রেপিস্টকে দেয়া হয়েছিল ৮০ থেকে ১ হাজার বেত্রাঘাত।
ধর্ষণ হয়েছে স্বীকার করলে ধর্ষকের শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু সে যদি আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে ধর্ষিতাকে বিয়ে করতে রাজি হয়, তবে ঐ কেইস বাতিল করে তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে। সৌদি, বাহরাইন, ইয়ামেন, নাইজেরিয়ার বহু শরীয়াহ কোর্টে দেনমোহর পরিশোধ করে বিয়ে করাই ধর্ষণের শাস্তি।
শরিয়া আইনে স্বাক্ষরকৃত স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নেয়ার সুযোগ আছে। ফলে কনভিকশন সফল হওয়ার হার আরও কমে যায়। এবং বিচারকরা ধর্ষণের চেয়ে বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতা কিংবা সাধারণ মেলামেশাকে আরও বড়ো অপরাধ হিসেবে বিচার করেন। ফলে এমনকি রেপের অভিযোগকারীকেও শাস্তি পেতে হয়, যার কারণে অভিযোগকারীদের মধ্যে রেপের অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে ভীতি বিরাজ করে।
ধর্ষিতা আদালতে ধর্ষণের চারজন পুরুষ মুসলমানের চাক্ষুষ সাক্ষী বা আটজন নারী সাক্ষী উপস্থিত করতে পারবেন, এটা কি সম্ভব? এই অবাস্তব আইন মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস নয়? এমন অবস্থায় হতভাগিনী ধর্ষিতা আরেকটা হুদুদ শরিয়া আইনে অপরাধী হয়ে পড়ে, সেটা হল মানহানির মামলা। অর্থাৎ চারজন পুরুষ মুসলমানের চাক্ষুষ সাক্ষী আনতে পারেননি বলে ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি, তাই ধর্ষণের অভিযোগ করে ধর্ষিতা ধর্ষকের সম্মানহানি করেছেন। তাই ধর্ষিতাকে শাস্তি পেতে হয়।
কল্পনা নয়, এটা বহুবার ঘটেছে, হাজার হাজার ধর্ষিতা শরিয়া কোর্টে ন্যায়বিচার চেয়ে শাস্তি পেয়েছে। ওই হতভাগিনীদের জায়গায় নিজের মা বা বোন বা কন্যাকে ভেবে দেখুন ইসলামের নামে ধর্ষিতারা কী দোজখে জ্বলছে!
• সবচেয়ে মর্মান্তিক শাস্তি পেয়েছে ১৩ বছরের গণধর্ষিতা অভাগিনী আয়েশা দুহুলো। সোমালিয়ার ১৩ বছরের ওই বাচ্চাটাকে কয়েকজন পুরুষ গণধর্ষণ করেছিল, ওর বাবা সুবিচারের আশায় মেয়েকে শরিয়া কোর্টে নিয়ে গিয়েছিলেন। শরিয়া কোর্ট আয়েশাকে পাথরের আঘাতে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং সেটা কার্যকর হয় ২৭ অক্টোবর ২০০৮ সালে, সোমালিয়ায়। জাতিসংঘের তখনকার সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন তীব্রভাবে এর নিন্দা করেছিলেন।
• নাইজিরিয়ায় ১২ বছরের ধর্ষিতা বরিরা শাস্তি পেয়েছে।
• বাংলাদেশেও অবৈধ ফতোয়ার আদালতে এ ঘটনা ঘটেছে কয়েকবার।
• এই আইনের পাল্লায় পড়ে পাকিস্তানে হাজারো মা-বোন ১০-১৫ বছর ধরে জেলখানায় বন্দি ছিলেন। কারণ তাঁরা ধর্ষণের চারজন চাক্ষুষ সাক্ষী আদালতে হাজির করতে পারেননি।
• কল্যাণপুরে মাকে বেঁধে কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের একমাত্র সাক্ষী হল মেয়ের মা, ধর্ষক হল স্থানীয় তিন ব্যক্তি।
(‘দ্য ডেইলি স্টার’, ৭ জুলাই ২০০৩)
এই মামলা যদি শরিয়া কোর্টে ওঠে তবে শরিয়ার আইন অনুযায়ী এক নারীর সাক্ষ্যে ধর্ষকদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ–
রাসুল (সা.) শুধুমাত্র নারীর একক সাক্ষ্যে ডাকাতের (জেনার মতো ডাকাতিও হুদুদ মামলার অন্তর্ভুক্ত) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন এবং তা কার্যকরও করেছেন।
– ‘সহি বুখারি’, ৭ম খণ্ড হাদিস ২১৬হ; ‘সহি ইবনে মাজাহ’, ৪র্থ খণ্ড হাদিস ২৬৬৬; ‘সহি তিরমিজি’, ১৩৯৯।
রাসুলের (সা.) সে নির্দেশ পায়ে দলেছে কেন শরিয়া আইন?
এসব ইসলামবিরোধী আইন প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে ওই আল্লাহ-রাসুলের (সা.) নামেই। এ জন্যই বুঝি নবীজি (সা.) উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছেন:
“আমার অনুসারীদের জন্য আমার সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা পথভ্রষ্টকারী ইমামগণ নিয়ে।”
– ‘সহি ইবনে মাজাহ’, ৫ম খণ্ড, হাদিস ৩৯৫২।
২০০৬ সালের একটা তুমুল সাড়া জাগানিয়া কেইস আছে সৌদি আরবে, সেটা এখানে উল্লেখযোগ্য। কাতিফ রেইপ কেইস নামে এই কেইসটা নিয়ে আলাদা উইকিপিডিয়া পেইজ আছে আগ্রহীরা পড়ে নেবেন।
ঘটনাটা হলো এই যে, একজন শিয়া নারী ও তার পুরুষ সঙ্গীকে অপহরণ করা হয় এবং নারীকে সাত জন পুরুষ গণধর্ষণ করে। বিচারে চার জন পুরুষকে তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ১০০-১০০০ বেত্রাঘাতের সাজা দেয়া হয়; সঙ্গে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। (অর্থাৎ, এক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের দেশের সেক্যুলার আইন অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড ইতিমধ্যেই বেশি কঠোর।) কিন্তু এরপর বিচারক করলেন আরেক কাহিনি। ওই ভুক্তভোগী নারী যেহেতু নিকট-আত্মীয় নন এমন পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে ছিলেন, সেহেতু উভয়কেই বিচারক নব্বইটি দোররা ও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন। এরপর আরেক আপিল আদালত আরেক কাঠি সরেস হয়ে ভুক্তভোগীদের সাজার পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেন। এরপর ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিন্দা ও প্রতিবাদের পর সৌদি বাদশাহ তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ঘোষণা করেন।
এমন ভুরি ভুরি কেইস আছে সৌদি আরবে যেখানে অভিযোগ করতে গিয়ে উল্টো ভিক্টিম সাজা পেয়ে বসেন। ২০০৯ সালে এমন একটি মামলায়, একজন গণ-ধর্ষণের ভুক্তভোগী নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। কিন্তু বিচারক বিশ্বাস করতে অস্বীকৃতি জানান যে তিনি ধর্ষিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি ভুক্তভোগীকেই ১ বছর কারাদণ্ড ও ১০০টি দোররা বা বেত্রাঘাতের আদেশ দেন। সন্তান জন্মদানের পর তার ওই সাজা কার্যকরের আদেশ দেয়া হয়। ২০১৩ সালের কেইস আছে যেখানে অভিযুক্ত নিজের স্বাক্ষর করা স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে নেয়ার পর, মামলা ধসে পড়ে।
শরিয়া আইনে মহিলাদের অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে কম অধিকার দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, আদালতে নারীর সাক্ষ্যের মূল্য পুরুষের তুলনায় কম, এবং উত্তরাধিকার আইনে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অর্ধেক সম্পত্তি পান।
কোরআনের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট আইনি বিষয় নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে আলাদা হলেও, মানবাধিকারের দিক থেকে কোরআন নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে। কোরআনে নারীদের যথেষ্ট মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই নারীরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
- কোরআনে বলা হয়েছে: "যে পুরুষ বা নারী সৎকর্ম করবে এবং মুমিন হবে, আমি তাকে সৎ জীবন দান করব..." (সুরা আন-নাহল, ১৬:৯৭)
শরিয়া আইনে নারীদের জন্য বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে, যেমন বাইরে চলাচলে মাহরাম (পুরুষ অভিভাবক) থাকা বাধ্যতামূলক ছিল (যদিও সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তন এসেছে)। নারীদের কর্মক্ষেত্র ও স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। কোরআন নারীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার উপর গুরুত্ব দেয় এবং নারীদের সম্মানজনকভাবে সমাজে অংশগ্রহণ করার অনুমতি দেয়।
- কোরআন পুরুষ ও নারী উভয়কে সমান মর্যাদা দিয়েছে: "পুরুষ বা নারী, তোমাদের মধ্যে যে কোনো সৎকর্ম করবে এবং মুমিন হবে, আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব।" (সুরা আন-নাহল, ১৬:৯৭)
শরিয়া পন্থীরা মহিলাদের ঘরের বাইরে বের হতে হলে একান্ত পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম) সঙ্গে রাখার নিয়ম চালু করেছে এবং মহিলাদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। যদিও কোরআনে পুরুষ ও নারীদের জন্য কিছু পোষাকের নিয়ম রয়েছে, তবে মহিলাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ নিয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কথা কোরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই। কোরআনে মহিলাদের সম্মান, মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নিজে তার স্ত্রী খাদিজা (রাঃ)-এর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেছিলেন, এবং বিভিন্ন মহিলা সাহাবীরাও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন
শরিয়া আইনে ইসলাম ত্যাগ করে (মুরতাদ), তাদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও কোরআনে ধর্মত্যাগীদের শাস্তি সরাসরি উল্লেখ নেই এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। কোরআনে কোথাও বলা হয়নি যে, একজন মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বরং, ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে আল্লাহর বিচারই প্রধান।
-কোরআনে বলা হয়েছে: "যদি তারা (মুসলিমদের মধ্যে থেকে) ফেরত যায়, তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।" (সুরা আল-ইমরান, ৩:১৭৬)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন