লাশ পচার জন্য পরিবেশ বহুত বড় ভুমিকা পালন করে। যেমন অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম পরিবেশ লাশ পচায় বাধা হয়ে দাড়ায়। কারণ অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা লাশ পচাতে দায়ী মথ, পোকা, অনুজীব মেরে ফেলে, অনেক সময় এরা বাইরে বের হতে চায় না। অনুকুল তাপমাত্রা না হলে লাশ সহজে পচে নাহ। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা কেটে গেলে আবারও শরীর স্বাভাবিকভাবে পচতে শুরু করে কিন্তু গরমে একবার শরীর হাইড্রেট হয়ে গেলে তা মমি হয়ে যায়।
কেউ বর্ষাকালে মারা গেলে তার দেহ কত কিভাবে পঁচবে, দেহ ফুলে ফেঁপে উঠবে, কত গন্ধ হবে এ নিয়ে কথাবার্তা হয়। কিন্তু অনেক সময় বর্ষার পানি বা জলাভূমি বা পানি পূর্ন জায়গায় মৃত দেহ পচার ভিলেন হয়ে ওঠে৷ কারণ অতিরিক্ত পানিতে ওইসব মথ, ম্যাগেট ব্যক্টেরিয়াগুলো জন্মাতে পারে না। পানি মাঝেমধ্যে মৃতদেহ মমি করে ফেলে৷ এজন্য নদীর কাছে কবর দেওয়া তাজা লাশ পাবার রেকর্ড বেশি।
মৃতদেহ পচাতে ম্যাগট বা ওইসব অনুজীবগুলোর অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে। তাই অক্সিজেনের অভাবেও অনেক সময় লাশ পচে নাহহহহ।
লাশের পচার হার মাটির উপরও অনেকটা নির্ভর করে৷ যেমন মাটি লবনাক্ত হলে, বেশি পরিমাণে আর্সেনিক থাকলে মৃতদেহ প্রকৃতিকভাবে সংরক্ষিত হয়ে যায়। মাটিতে পচনে সহায়তাকারী অনুজীব থাকার অনুকূল পরিবেশও দরকার পড়ে। এজন্য কবরস্থানে অক্ষত লাশ পাওয়া যায় নাহহহ।
একজন চ্যাঙড়া বালক আর একজন ভুড়িওয়ালার মৃতদেহর ভিতর কোনটা আগে পঁচবে??? ওই ভুড়িওয়ালা। কারণ যার দেহে যতবেশি অর্গানিক ম্যাটেরিয়াল থাকবে সে তত তাড়াতাড়ি পচবে। সেই হিসেবে মমি হবার চান্স ওই চ্যাংড়া ছেলেটারই বেশি।এজন্য ছোট বাচ্চাদের মমি হবার চান্স বেশি।
অধিকাংশ সংস্কৃতিতেই মৃতদেহ সৎকারের জন্য কাপড় বা কিছু দিয়ে দেহ মুড়ে দেওয়া হয়। এরজন্য পোকামাকড়, ব্যাক্টেরিয়া এগুলো লাশে ঢুকতে পারে না৷ আবার অনেকক্ষেত্রে মৃতদেহকে সাজানো হয় বিভিন্ন ক্রিম দিয়ে৷ এগুলোও পোকামাকড়, ব্যাক্টেরিয়াদের দুরে রাখে। এটাও একটা কারণ দেহ না পচার বা দেরিতে পচার।
মমি বা অক্ষত দেহ সাধারণত মরুভূমি, গ্লেসিয়ার, সমুদ্রে( যদি না কোন প্রাণী খেয়ে ফেলে) এমন জায়গায় বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু তারপরও প্রকৃতিকভাবে একটা দেহ অক্ষত থাকার হার খুব কম।
মৃত্যুর পর লাশ অক্ষত থাকা কি আল্লাহর ওলী হওয়ার প্রমাণ??
মুমিনদের মৃত্যুর পর তাদের রূহ আসমানে চলে যায় এবং শরীর মাটিতে খেয়ে নেয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আদমের সকল সন্তানকে মাটিতে খেয়ে নিবে শুধু তার মেরুদন্ডের সর্বনিম্ন হাড্ডি (عَجْبُ الذَّنَبِ) ব্যতীত। কারণ তা থেকেই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তা থেকেই তাদের দেহ পুনর্গঠন করা হবে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫৫২১)।
কিন্তু নবী-রাসূলের লাশ অক্ষত থাকবে। মাটিতে খাবে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন,
وَعَنْ أَوْسِ بْنِ أَوْسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللّهِ ﷺ: «إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمُ الْجُمُعَةِ فِيهِ خُلِقَ ادَمُ وَفِيهِ قُبِضَ وَفِيْهِ النَّفْخَةُ وَفِيْهِ الصَّعْقَةُ فَأَكْثِرُا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَليّ» فَقَالُوْا: يَا رَسُوْلَ الله وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلَاتُنَا عَلَيْك وَقَدْ أَرَمْتَ؟ قَالَ: يَقُولُونَ: بَلِيْتَ قَالَ: «إِنَّ اللّهَ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي الدَّعْوَاتِ الْكَبِيْرِ
আওস ইবনু আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: জুমু’আর দিন হলো তোমাদের সর্বোত্তম দিন। এ দিনে আদামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনে তাঁর রূহ কবয করা হয়েছে। এ দিনে প্রথম শিঙ্গা ফুৎকার হবে। এ দিন দ্বিতীয় শিঙ্গা ফুৎকার দেয়া হবে। কাজেই এ দিন তোমরা আমার উপর বেশী বেশী দরূদ পাঠ করবে। কারণ তোমাদের দরূদ আমার নিকট পেশ করা হবে। সহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের দরূদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে? অথচ আপনার হাড়গুলো পচে গলে যাবে? বর্ণনাকারী বলেন, এ. (আরাম্তা) শব্দ দ্বারা সহাবীগণ [আরবি] (বালীতা) অর্থ বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ আপনার পবিত্র দেহ পঁচে গলে মাটিতে মিশে যাবে। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা'আলা নবী-রসূলদের শরীর মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন (অর্থাৎ মাটি তাদের দেহ নষ্ট করতে পারবে না)। (তিরমিযী, আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ্, দারিমী ও বায়হাক্বীর দা’ওয়াতুল কাবীর)
(মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস নং ১৩৬১)
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সহীহ : আবূ দাঊদ ১০৪৭, নাসায়ী ১৩৭৪, ইবনু মাজাহ্ ১০৮৫, ১৬৩৬, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৬৯৭, আহমাদ ১৬১৬২, দারিমী ১৬১৩, ইবনু খুযায়মাহ্ ১৭৩৩, ইবনু হিব্বান ৯১০, মুসতাদরাক লিল হাকিম ১০২৯, দা‘ওয়াতুল কাবীর ৫২৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৯৯৩, ইরওয়া ৪, সহীহ আত্ তারগীব ৬৯৬, ১৬৭৪, সহীহ আল জামি‘ ২২১২।
তাঁরা ব্যতীত অন্য কারো লাশ মাটিতে খাবে না বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। হতে পারে কারো লাশ দ্রুত খাবে, কার দেরিতে। অনেকের লাশ বহুদিন পরেও স্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া যায়। এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। উল্লেখ্য যে,
ফেরাঊনের লাশকে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের উপদেশ গ্রহণের জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্তত অক্ষুণ্ণ রাখবেন (সুরা ইউনুসঃ ৯২)।
সুতরাং লাশ অক্ষত থাকলে আল্লাহর ওলী মনে করা। আর অক্ষত না থাকতে আল্লাহর ওলী নয় মনে করা সঠিক নয়। ওলী হওয়ার সাথে লাশ অক্ষত থাকার কোন সম্পর্ক নেই।
والله اعلم بالصواب
কিছু অমুসলিমের পাওয়া অক্ষত লাশ
১. সেন্ট বার্নাডেট (Saint Bernadette of Lourdes) – খ্রিস্টান (ক্যাথলিক)
মৃত্যু: ১৮৭৯ সাল
দেহ প্রথম কবর থেকে তোলা হয় ১৯০৯ সালে – প্রায় ৩০ বছর পর।
অবাক করা বিষয়: শরীর ছিল প্রায় অক্ষত, কোনো রাসায়নিক সংরক্ষণ ছাড়াই।
বর্তমানে তার দেহ ফ্রান্সের নেভারে প্রদর্শিত হয়।
২. সেন্ট জোসেফ অব কাপার্টিনো (Saint Joseph of Cupertino) – খ্রিস্টান (ক্যাথলিক)
একটি কফিনে ১০০ বছর পরও তার দেহ তুলনামূলক অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।
৩. গুপ্তা আমলের এক বৌদ্ধ ভিক্ষু – বৌদ্ধ ধর্ম
চীনে একটি বৌদ্ধ ভিক্ষুর দেহ মমির মতো সংরক্ষিত পাওয়া যায়, যেটি কোনো রাসায়নিক সংরক্ষণের ফল নয় বলে ধারণা।
মৃত্যুর বহু বছর পর তার শরীর প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।
৫. সদগুরু মহারাজ কৌশিক (Hindu ascetic) – হিন্দু ধর্ম
ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাধুদের দেহ প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত থাকার দাবি পাওয়া গেছে।
কিছু ক্ষেত্রে ২০-৩০ বছর পরও দেহের চামড়া ও অস্থি অক্ষত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
৬. ১৯৫২ সালে ডেনমার্কের গ্রাউবালে গ্রামের কাছের একটি পিট বগে পাওয়া যায় 'গ্রাউবালে ম্যান' নামক এক ব্যক্তির দেহ, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর দেহ এতটাই অক্ষত ছিল যে, প্রথমে তাঁকে সদ্য মৃত বলে মনে হয়েছিল।
৭. ১৯৫০ সালে ডেনমার্কের সিল্কেবর্গে পাওয়া যায় 'টোলুন্ড ম্যান' নামের এক ব্যক্তির দেহ, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে মারা যান। তাঁর মুখে এমন শান্ত ভঙ্গি ছিল যেন ঘুমাচ্ছেন মাত্র।
৮. ২০১৫ সালে ফ্রান্সের রেন শহরে পাওয়া যায় লুইস ডি কুয়েঙ্গো নামক এক অভিজাত খ্রিস্টান নারীর দেহ। তিনি ১৬৫৬ সালে মারা যান, তবু তাঁর দেহ প্রায় অক্ষত অবস্থায় সীসার কফিনে সংরক্ষিত ছিল।
৯. লেবাননের কাদিশা উপত্যকার গুহায় পাওয়া গেছে ১৩ শতকের মারোনাইট খ্রিস্টানদের মৃতদেহ—তারা প্রায় ৭০০ বছর ধরে মাটির নিচে থেকেও অক্ষত ছিল।
Reference:
Lindow Man (England)
🔗 British Museum – Lindow Man
Tollund Man (Denmark)
🔗 Silkeborg Museum – Tollund Man
Grauballe Man (Denmark)
🔗 Moesgaard Museum – Grauballe Man
Windeby Girl (Germany)
🔗 National Geographic – Bog Bodies
Clonycavan Man (Ireland)
🔗 National Museum of Ireland – Clonycavan Man
অক্সিজেনের অভাব: যখন লাশ এমন স্থানে থাকে যেখানে বাতাস পৌঁছায় না—যেমন জলাবদ্ধ কাদা বা গভীর বগ—সেখানে পচনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়া বাঁচতে পারে না। ফলে দেহ অক্ষত থাকে।
ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেনে নির্ভর করে। বাতাস না থাকলে তারা সক্রিয় হতে পারে না। অম্লীয় ও রাসায়নিক মাটি যেমন; পিট বগে থাকা ট্যানিন ও হিউমিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং প্রোটিনকে রক্ষা করে। এতে দেহ শক্ত হয়ে যায়, চামড়া কালচে হয়, কিন্তু অক্ষত থাকে।
প্রাকৃতিক লবণ ও শুকনো পরিবেশে কিছু মাটিতে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে, যা জীবাণু নষ্ট করে। আর মরুভূমির মতো শুষ্ক এলাকায় পানি না থাকায় ব্যাকটেরিয়াও টিকে থাকতে পারে না।
কিছু মৃতদেহ প্রাকৃতিক তেল বা টার পিটে চাপা পড়ে যায়। এসব জায়গা ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে এবং শরীর সংরক্ষিত থাকে।
এসব বৈজ্ঞানিক কারণেই মৃতদেহ বহু বছর অক্ষত থাকতে পারে। এর পেছনে অলৌকিকতার প্রয়োজন হয় না।
মূলত মৃতদেহের সংরক্ষণে পরিবেশগত শর্তাবলী, রাসায়নিক উপাদান এবং জীবাণুর কার্যক্রমের মতো বহু জটিল কারণ একযোগে কাজ করে। এসব কারণের সমন্বয়ে কখনও কখনও মৃতদেহ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রায় অক্ষত অবস্থায় বিরাজমান থাকতে পারে যা আমাদের কৌতূহল এবং গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পচন প্রক্রিয়ার মৌলিক ধাপ
মৃত্যুর পরপরই দেহের কোষে একটি প্রক্রিয়া শুরু হয় যাকে বলে অটোলাইসিস বা কোষের স্বয়ং-পচন। কোষের ভেতরের এনজাইম ও রাসায়নিক পদার্থ কোষগুলোকে ভাঙতে শুরু করে। একইসঙ্গে, দেহে থাকা ও বাইরের পরিবেশ থেকে আসা ব্যাকটেরিয়া মৃত টিস্যু ভাঙতে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায়, এই প্রক্রিয়া দ্রুত এগোতে থাকে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই দেহ কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু থাকে না। কিন্তু এই গতি অনেকটাই বদলে যায় যখন পরিবেশের কিছু বিশেষ শর্ত একসাথে কাজ করে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি মৃতদেহটি এমন মাটিতে কবর দেওয়া হয় যেখানে অক্সিজেনের প্রবাহ অত্যন্ত সীমিত, তাহলে ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণুর কার্যকলাপ অনেকটা ধীর হয়ে যায়। একইভাবে, অত্যন্ত ঠান্ডা বা অতিরিক্ত শুষ্ক পরিবেশে দেহের জলীয় অংশ দ্রুত হারিয়ে যায়, ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো বেঁচে থাকতে পারে না এবং পচন প্রক্রিয়া থেমে যায় বা খুব ধীর গতিতে চলে।
কবরের পরিবেশ ও মাটির ভূমিকা
লাশ পচার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাটির রাসায়নিক গঠন। কিছু মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে এমন খনিজ বা অ্যাসিড থাকে যা জীবাণুর বৃদ্ধি রোধ করে। উদাহরণস্বরূপ, যেসব মাটি অম্লীয় বা অতিরিক্ত ক্ষারীয় সেগুলো ব্যাকটেরিয়ার কাজ বাধাগ্রস্ত করে। কিছু মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে জীবাণুনাশক গুণ থাকে, আবার কিছু মাটিতে এমন খনিজ থাকে যা টিস্যুকে সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।
তাছাড়া, মৃতদেহ যদি গভীরে কবর দেওয়া হয় বা মাটি যদি জলাবদ্ধ ও শক্তভাবে চাপা থাকে তবে সেখানে অক্সিজেনের অভাব তৈরি হয়। যেহেতু অধিকাংশ জীবাণু ও পোকামাকড় অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না, তাই এই অবস্থায় পচন প্রক্রিয়া অনেক ধীর হয়ে যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পিটবগের অতি অ্যাসিডিক ও ঠান্ডা পরিবেশে বহু শতাব্দী পুরনো লাশও প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এছাড়াও, কবরের গভীরতা এবং কফিনের ধরনও বড় ভূমিকা রাখে। ধাতব কফিন বা সম্পূর্ণ সিল করা কফিনের ভেতরে বাতাস ঢুকতে না পারায় পচনকারী জীবাণুর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয় না, ফলে দেহ দীর্ঘদিন অক্ষত থাকে। অপরদিকে, কাঠের কফিন কিছুটা বাতাস প্রবাহিত হতে পারে যা পচন প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত ঘটায়।
আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার প্রভাব
এখানে আশ্চর্যের বিষয় হলো অতিরিক্ত ভেজা কিংবা অতিরিক্ত শুকনো পরিবেশ এই দুটোই দেহ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। জলাবদ্ধ, অক্সিজেনহীন পরিবেশে দেহে Adipocere বা Corpse wax নামের মোমের মতো পদার্থ তৈরি হয় যা টিস্যুকে বহু বছর ধরে অক্ষত রাখে। অপরদিকে, মরুভূমির মতো শুকনো পরিবেশে দেহ দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হওয়ার আগেই টিস্যু শক্ত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক মমি তৈরি হয়।
তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডা পরিবেশে রাসায়নিক বিক্রিয়া ও জীবাণুর কাজ ধীর হয়ে যায় ফলে পচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। এজন্য ঠান্ডা পাহাড়ি এলাকা বা বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলে শত শত বছর আগের মৃতদেহ প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।
কফিন ও কবরের নকশা
দেহকে কবরে কীভাবে কবরস্থ করা হচ্ছে সেটিও বড় ভূমিকা রাখে। ধাতব সিল করা কফিন মৃতদেহকে বাইরের বাতাস, পানি ও জীবাণুর সংস্পর্শ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় ফলে পচন অনেক ধীর হয়। অন্যদিকে কাঠের কফিন বাতাস এবং আর্দ্রতা প্রবাহ করতে সাহায্য করে। কাঠ নাতিদীর্ঘ সময় সিল হয়ে থাকে না তাই বাতাস ও জলীয় বাষ্প সহজে কফিনের ভিতরে ঢুকতে পারে।
এতে করে দেহে পচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ব্যাকটেরিয়া ও কীটপতঙ্গের উপস্থিতি বাড়ে। আর্দ্রতা বাড়লে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় যা দেহের পচনকে দ্রুততর করে। এছাড়া কাঠের কফিন সময়ের সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে ফলে কফিনের ভিতরের পরিবেশ বাইরের সাথে মিশে যায় এবং দেহের সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে।
তাছাড়া, কফিনের উপাদান এবং নির্মাণের মানও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কাঠের কফিনে নিরোধক বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় যা পচন ধীর করতে সাহায্য করে তবে এটি ধাতব কফিনের তুলনায় অনেক কম কার্যকর।
রাসায়নিক সংরক্ষণ ও এমবামিং
অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহ এমবামিং নামের প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এখানে ফরমালডিহাইড, ফেনল, অ্যালকোহল এবং লবণ জাতীয় রাসায়নিক দেহের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে জীবাণুর কার্যকলাপ বন্ধ করা হয়। সঠিক পদ্ধতিতে এমবামিং করা হলে দেহ বহু বছর ধরে চেহারার বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্য অক্ষত রাখে। কিছু ক্ষেত্রে, কবরের পরিবেশ বা মৃতদেহের ভেতরকার প্রাকৃতিক রাসায়নিকও পচন রোধে সাহায্য করতে পারে, এমনকি এমবামিং ছাড়াও।
প্রাকৃতিক মমি ও বগ বডি
প্রাকৃতিক মমিফিকেশন এমন একটি অসাধারণ প্রক্রিয়া, যেখানে মানবদেহ কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ বা কৃত্রিম সংরক্ষণ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবেই সংরক্ষিত থাকে। এই প্রক্রিয়ায় দেহের নরম টিস্যুগুলো, যেমন ত্বক, চুল, নখ, এমনকি অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অনেক সময় ধরে অক্ষত থাকে যা সাধারণ পচনের প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়।
একটি সুপরিচিত উদাহরণ হলো পিট বগ নামক জলাভূমির মধ্যে পাওয়া Bog Bodies। এই বগ বডিগুলো শত শত বছর আগের হলেও আজও তাদের ত্বক, চুল, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো বগের পানি ও মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পিট বগের পানি অত্যন্ত অম্লীয় অর্থাৎ এতে উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয় অ্যাসিড থাকে যা জীবাণুর বৃদ্ধি এবং ব্যাকটেরিয়ার ক্রিয়াকলাপকে বন্ধ করে দেয়।
একটি বগ বডি (Image Credit : National Geographic)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এই জলাভূমির অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম বা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকে। দেহকে পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেনের অভাবে কার্যকর হতে পারে না। এছাড়াও বগ এলাকাগুলো সাধারণত ঠান্ডা যা রাসায়নিক এবং জৈবিক বিক্রিয়াকে আরও ধীর করে দেয়।
এই সব শর্ত একত্রিত হয়ে দেহকে শত শত বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় সংরক্ষণ করে, যা গবেষকদের জন্য একটি মূল্যবান জানার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই প্রাকৃতিক মমিফিকেশন না হলে সাধারণত দেহ কিছু বছরেই সম্পূর্ণ পচে যেত।
এই কারণে, বগ বডিগুলো প্রাচীন মানব জীবনের ধাঁচ, তাদের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস এবং এমনকি মৃত্যু কারণ সম্পর্কেও অনেক তথ্য উন্মোচন করে যা ইতিহাস এবং বিজ্ঞান উভয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ
কবরস্থ মৃতদেহের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ একটি জটিল প্রক্রিয়া যার পেছনে কাজ করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম কারণের সমন্বয়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে সমাধিস্থলের গভীরতা, মাটির রাসায়নিক গঠন এবং আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য মৃতদেহের পচনের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উদাহরণস্বরূপ, উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে দেহ সাধারণত দ্রুত পচে যায় কারণ এই ধরনের পরিবেশ ব্যাকটেরিয়া ও কীটপতঙ্গের সক্রিয় বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তবে যদি মাটি এমন কিছু বিশেষ খনিজ বা রাসায়নিক দ্বারা সমৃদ্ধ হয় যা জীবাণুর কার্যকলাপকে বাধা দেয় তবে দেহ অনেক দিন পর্যন্ত অক্ষত থাকতে পারে।
কবরের ভেতরের পরিবেশ যেমন অক্সিজেনের অভাব বা ঠান্ডা তাপমাত্রায় থাকে তেমনি কফিনের ধরণ এবং নকশাও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ধাতব সিল করা কফিন দেহকে বাইরের বাতাস ও আর্দ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় যা পচন প্রক্রিয়াকে অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত করে। তাছাড়া, বহু ক্ষেত্রে এমবালমেন্ট বা রাসায়নিক সংরক্ষণও দেহের দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ফরমালডিহাইড, লবণ ও অন্যান্য সংরক্ষণকারী রাসায়নিক ব্যবহারে দেহ দশকের পর দশক পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় রাখা সম্ভব হয়।
এই সকল কারণের মিলিত প্রভাবে অনেক সময় মৃতদেহ অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে, যা স্বাভাবিক পচনের নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে। এই অবস্থা শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয় বরং মানব সমাজের সংস্কৃতি ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের আগ্রহ ও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অতএব, কবরের ভেতরে মৃতদেহ দীর্ঘসময় অক্ষত থাকার রহস্য একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক বিষয়। পরিবেশগত শর্ত, রাসায়নিক প্রভাব এবং জীবাণুর কার্যকলাপের সূক্ষ্ম সমন্বয় মিলেই এই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে থাকে। এইভাবেই প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম নানা উপায়ে মৃতদেহের সংরক্ষণ হয় যা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সমান্তরালে চলমান একটি বিস্ময়কর অধ্যায়।
১। ইসলামকে আধুনিকায়ণ করণ (মর্ডানিজম) ২। আকীদা শাস্ত্রের দরকার আছে কি? ৩। সকল হাদীসই সন্দেহযুক্ত ! ৪। আহলে কুরআনীগন কাফের ৫ । পীর প্রথা ইসলাম বিরোধী প্রথা ৬। কাফের কর্তৃক প্রচলিত আমল জায়েজ ৭। আল্লামা ইকবালের গোমরাহী ৮। সেকুলার ওলামায় কেরামগন ৯। ইবনে তাইমিয়া ১০। রাসূলুল্লাহ (সা) কি ওহী ছাড়া কোন কথাই বলতেন না ? ১১। গান বাজনা কি আসলেই হারাম ১২। তাফসীর সমুহ কতটুকু নির্ভুল? ১৩। বর্তমান ইহুদী খৃষ্টানগনকি কাফের (চিরস্থায়ী জাহান্নামী)? ১৪। ইমাম মাহদী ও গাজওয়ায় হিন্দ ১৫ । তবে কি মুসলিম জাতিই জাহান্নামী জাতি এবং কাফের জাতিই জান্নাতি জাতি? !!! ১৬। ৭৩ ফেরকাই জান্নাতি ১৭। ইসলামকে জানুন - ইসলামিক লিঙ্কস ১৮। ইসলাম ও গনতন্ত্র ১৯। আওয়ামিলীগ/বিএনপি/জাতিয় পার্টি/এনসিপি সমর্থনকারীগন কাফের ২০। লেবাস দাড়ী ইসলাম নয় ২১। জামায়াতে ইসলাম বিরোধী সকল অভিযোগের জবাব ২২। মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগনের নাস্তিকতা ২৩। চিন্তা করুন ২৪। লালন বাউলদের ধর্ম বিশ...
বাংলাদেশে ইসলাম কায়েমের মডেল আফগান নয় তুরস্ক খেলাফত কেনো অসমভব https://youtu.be/lMcr9dyzYn4?si=i8ncwnV1JtzY4Crp https://youtu.be/0AknpsAdrXE?si=16DtlCeINuLywhty https://youtu.be/GZgdPJfH63c?si=uz6egkwVBuvDmbPO জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর --------------------------------------------------------- [পুরোটা মনোযোগ দিয়ে পড়ার অনুরোধ থাকবে] প্রশ্ন: জামায়াত-শিবির কি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে? উত্তর: প্রথমত, গণতন্ত্রকে শুধু গণতন্ত্র বললে এর সামগ্রিকতা বোঝা সম্ভব হয় না। কারণ, ভোটিং সিস্টেম একটা ইনটিউটিভ সিস্টেম, শূরাতে ভোটিং হয়, নেতা নির্বাচনে ছোট পর্যায়ে ভোটিং হয় আবার সামান্য ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচনেও ভোটিং হয়। এগুলো কোনটাই প্রব্লেমেটিক ব্যাপার না। গণতন্ত্রকে সেকুলার ডেমোক্রেসি বললে এটাকে সামগ্রিকভাবে বোঝা যায়। ইউরোপিয়ান মডার্নিটির গর্ভ থেকে জন্ম নেয় সেকুলার সিস্টেম আর সেই সেকুলার সিস্টেমের একটা রিক্রুটার হলো গণতন্ত্র। এখানে আমি রিক্রুটার বললাম এজন্য, সেকুলার সিস্টেমের ইন্টেগ্রাল পার্ট হওয়ায় সেকুলার ডেমোক্রেসির অন্যতম কাজ হলো এর পার্টিসিপেন্টদের সেকুল...
মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের মতে নবিজী স. এর পোষাক আমাদের জন্য সুন্নাত নয় ছবির উৎস: t.ly/VTMPc ছবিতে শার্টপরা যুবক হলেন পবিত্র কা'বা শরীফের সম্মানিত ইমাম ও খতীব 'তরুণ শায়খ' ড. ইয়াসির আদ-দাওসারি। আজকে মসজিদ আল-হারামে তিনিই ঈদের নামায পড়িয়েছেন এবং খুতবা দিয়েছেন। তিনি একজন প্রখ্যাত ক্বারী। রেডিও-টিভিতে হামেশা তিলাওয়াত করেন। নানা ক্বিরাআত প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন মুহাম্মদ বিন সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, তুলনামূলক আইনশাস্ত্রে। ১৯৮১ সালে রিয়াদে জন্মগ্রহণ করা ড. ইয়াসির আদ-দাওসারি অক্টোবর ২০১৯-এ মসজিদ আল-হারামের সর্বকনিষ্ঠ ইমাম ও পরে খতীব হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর কুরআন তিলাওয়াতে এক ধরণের স্বকীয় মাধুর্য রয়েছে, ফলে দুনিয়ার অসংখ্য মুসলমান তাঁর সুর অনুকরণ করতে চেষ্টা করেন। কাবার মশহুর মুয়াজ্জিন হানাফি মাযহাবের কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্র এদের দাড়ির অবস্থা দেখুন ১) শাইখুশ শাম মুসনাদুশ শাম ইমাম মুহাম্মদ সালেহ আল ফারফুর ২) সানিয়ে ইমামে আযম ইমাম আব্দুর রাজ্জাক হালাভি ৩) শাইখুল ইসলাম ইমামুল মুতাকাল্লিমিন ইমাম মুহাম্মদ আল কাওসারি ৪) হুজ্জাতুল ...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন